বৈশাখী উৎসব ও আমাদের সংস্কৃতি

  আয়েশা পারভীন চৌধুরী

১৪ এপ্রিল ২০১৯, ১২:০৪ | অনলাইন সংস্করণ

বৈশাখী মেলা যদিও আমাদের নিজস্ব ও দেশীয় সংস্কৃতি তবুও এই মেলা নিয়ে নানান মতামত আছে। একেকজন একেকভাবে এই মেলাকে গ্রহণ করে। নিম্ন আয়ের মানুষের কাছে আনন্দ-বিনোদনের এটি একটি অন্যতম মাধ্যম। আর নিম্ন মধ্য ও উচ্চবিত্তদের কাছে বৈশাখী মেলা নিজেদের সংস্কৃতি উপভোগের একটি উপায়। কিন্তু উচ্চবিত্তরা এটাকে একেবারে স্বাভাবিকভাবে নিতে পারে না। কারণ সাধারণ ও অতি সাধারণ মানুষের সাথে এক হয়ে এই মেলা উপভোগ করা অনেক উচ্চবিত্তের পক্ষে সম্ভব নয়। তা ছাড়া সমাজের সকল পেশার মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি ভিন্ন হওয়ায় মেলার ক্ষেত্রে একমত হয় না। বিশেষ করে রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় ক্ষেত্রে মতভেদ থেকেই যায়। যে কোন অঞ্চলে মেলার আয়োজনে স্থানীয় ক্ষমতাসীন দলীয় নেতাকর্মীদের দ্বারা মেলা প্রভাবিত হয়। এটা স্বীকার করতেই হয় । এই ক্ষেত্রে অন্যদলের কর্মীরা বেশ ম্রিয়মাণভাবে বৈশাখী মেলা উদ্যাপন ও উপভোগ করে। ফলে সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে সক্রিয়তা প্রকাশে বাধা প্রাপ্ত হয়। হয়ত লাল-সাদা পোশাক নির্বাচন এক সাথে করে, কিন্তু খাওয়ার ক্ষেত্রে কিছুটা ভিন্নতা থেকে যায়। বড় বড় রেস্টুরেন্টগুলো দেশীয় খাবারের পাশাপাশি অন্যান্য খাবারের ব্যবস্থা করে। সামাজিক ক্ষেত্রে শ্র্রেণি-ভেদতো আছে। শ্রেণিভেদে এই মেলাতে আগত মানুষগুলোর জীবনের এই দিনটি হচ্ছে একটি আনন্দঘন মুহূর্ত। সামাজিকভাবে সবাই এই আনন্দ ভাগাভাগি করে নেওয়ার শিক্ষাই হচ্ছে বৈশাখী মেলার বৈশিষ্ট্য। নতুন আনন্দ ও সৃষ্টির উল্লাসে সবাই একতাবদ্ধ হয়ে নতুন বছরকে বরণ করে নেয়। ‘‘ধর্ম যার যার উৎসব সবার’’ এই আঙ্গিকে মিলন মেলা। ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে আলাদা হয়ে বরং জাতি-ধর্ম-বর্ণ সকলেই বৈশাখী মেলাতে অংশ গ্রহণ করে। ধর্ম নয়, বরং মানুষই সত্য এই শিক্ষাতেই বিভিন্ন ধর্মীয় মানুষ বর্ষবরণ করে থাকে। ‘‘ধর্ম যার যার, উৎসব সবার’’। ঐ ম্যাসেজটি তখন সকলের মধ্যে কাজ করে বলে বৈশাখী উৎসবটি একটি সার্বজনীন উৎসবে রূপ নেয়। এক সময় বৈশাখী উৎসব অঞ্চল ভেদে ছোট ছোট আঙ্গিকে হত। মানুষও তখন তেমন আগ্রহী ছিল না। কিন্তু সময় যতই যাচ্ছে ততই দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন হচ্ছে। দেশের আয়তন ও সীমানা একই আছে। এ দেশের জনসংখ্যা বর্তমানে প্রায় ১৭ কোটি। এই ১৭ কোটি জনসংখ্যার একটা বিরাট অংশ বৈশাখী মেলায় অংশ নেয়। তাই আয়োজনের ক্ষেত্রে ব্যাপক প্রস্তুতি নিতে হয়। বিনোদনের দিকটি বিবেচনায় রেখে প্রশাসনকে কড়া নিরাপত্তা নিতে হয়। যাতে সকলে বৈশাখী মেলায় নিরাপদে আসতে পারে এবং আবার ফিরে যেতে পারে। তবুও মাঝে মাঝে নানা অনাকাংঙ্ক্ষিত ঘটনার জন্ম নেয়। তাতে এই সমাজ কলঙ্কিত হয়, সংস্কৃতির মূলে আঘাত প্রাপ্ত হয়, ধর্মীয় সহনশীলতায় কালিমার প্রলেপ পড়ে। বর্ষ বরণের এই সুন্দর আয়োজন তখন নিরাপত্তাহীনতা ও হতাশার কারণ হয়ে যায়। যারা এতে জড়িত তাদেরকে আইনের আওতায় এনে যথাযথ শাস্তি দিতে না পারলে সাধারণ মানুষের কাছে এর গ্রহণযোগ্যতা থাকবে না। আর যারা এই ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার ভুক্তভোগী তারা সারা বছরই এক ধরনের মানসিক যন্ত্রনায় ভোগে। নববর্ষ উদযাপন নিয়ে যে ব্যাপক প্রস্তুতি চলে তাতে পুরো বৈশাখে দেশের অর্থনীতির চাকা বেশ সচল থাকে। সামর্থ্য অনুযায়ী সকলেই এই দিনটি আনন্দ আয়োজনের মধ্যে দিয়ে কাটানোর চেষ্টা করে। এখানে উল্লেখ্য সরকারি কর্মচারীদের বৈশাখী উৎসব ভাতা দেওয়া হলেও অন্যান্য ক্ষেত্রে ভাতা দেওয়া হয় না। তাই সরকারি ও বেসরকারি ক্ষেত্রে বৈষম্য থাকে। একটি দেশ ও একটি সরকার। কিন্তু বর্ষবরণে এই বিভেদ ক্ষোভের সৃষ্টি করে।
বৈশাখী মেলা হচ্ছে বাঙালিয়ানার একটি বিমূর্ত নিদর্শন ও কালের সাক্ষীর প্রতীক। মেলার অপর নাম জীবনের মিলনমেলা। মেলায় কত শত রকমের মানুষের সমাবেশ ঘটে তার কোনো হিসেব নেই। কথায় বলে জগতে ‘‘বার রকমের মানুষ’’ আছে। এই বার রকমের মানুষই এই জগৎ সংসারকে নিজেদের মত করে সাজিয়েছে। আবার এই বার রকম মানুষই বিভিন্ন মেলার আনন্দ বিনোদনের অংশীদার। অঞ্চলভেদে বৈশাখী মেলায় আগত দর্শনার্থীদের রুচি হয়ত ভিন্ন। কিন্তু প্রাণের টানে যারা এখানে আসে তারা কিন্তু বাঙালি সংস্কৃতির ধারক ও বাহক। প্রতিটি বছর এই মেলাতে যারা তাদের তৈরি আনুষঙ্গিক নিয়ে আসে তারাই আবার নতুন বছরে নতুন নতুন কিছু জিনিস উপহার দেওয়ার জন্য সারা বছর শ্রম ও মেধাকে কাজে লাগায়। তাদের শ্রম ও মেধার সাথে তাদের রুচি ও সৃজনশীলতা জড়িয়ে আছে। তাই মেলাতে বিভিন্ন ধরণের জিনিসের সাথে সাথে ভিন্ন ভিন্ন মানুষের আচরণ ও ব্যবহারের পরিচয় ঘটে। বৈশাখী মেলার কথা বলতে গিয়ে ছোট বেলার কিছু কিছু স্মৃতি বার বার মনে ভেসে উঠে। শৈশবের সেই দিনটিতে আব্বার সাথে আমি ও আমার বোন রীটা আপা জাম্বুরী মাঠে মেলায় যেতাম। তখন আগ্রাবাদ কলোনীর চারিদিকে দেওয়াল ছিল। আব্বার দুই হাত দু’বোন ধরে নাচতে নাচতে মেলার দিকে চলতে থাকতাম। আর যত ছড়া জানতাম সুরে সুরে আবৃত্তি করতে থাকতাম, গলা ছেড়ে গান করতাম। এ যেন শৈশবের স্বাধীনতার এক বহি:প্রকাশ। কোনো বিশেষ আবদার ছিল না। শুধু ঘুরাঘুরি করতে করতে সন্ধ্যা হয়ে যেত। ছোট হওয়াতে চড়কীতে ও দোলনায় চড়তে ভয় পেতাম। তবুও আব্বা আমাদেরকে সাহস দিয়ে চড়কী ও দোলনায় চড়াতো। একটু একটু আপছা আপছা মনে পড়ছে, কত বয়স ছিল জানি না। তবে এই আপছা আপছা স্মৃতিগুলোই যেন আব্বার সাথে কাটানো বিশেষ সুখকর সময়। আবার ফিরে আসার সময় দুই হাতে করে কাগজের টোঙ্গায় মুড়ি, মুড়কি, বাতাসা, চনামনার ট্যাং কিনে আনতাম। আম্মার জন্যে সংসারের টুকিটাকি জিনিস আনতে আব্বা আমাদেরকে একদিকে দাড় করিয়ে রাখত। হাত-পাখা, ভাত নাড়ানোর কাঠি, আরো কয়েকটি সাংসারিক জিনিস নিয়ে যখন আব্বা আমাদের দিকে এগিয়ে আসতো তখন অজানা আতঙ্ক থেকে নিজেকে আবার নিরাপত্তায় আবিষ্কার করতাম। কারণ নতুন নতুন মুখ ও অজানা মানুষের ভিড়ে তখন এক ধরণের ভয় কাজ করত। কিন্তু আব্বার হেসে হেসে ফিরে আসার সাথে সাথে সেই ভয় ফিকে হয়ে যেত। এভাবে সন্ধ্যার আগে আগে আমরা ঘরে ফিরে আসতাম। তারপর আম্মা আমাদের সব ভাই-বোনকে একত্রে বসিয়ে মেলা থেকে আনা খাবারগুলো ভাগ করে দিতেন। আমরা খুব আনন্দের সাথে মজা করে খেতাম। মায়ের হাতে বানানো না, তবুও মনে হতো আম্মার বানানো নাস্তার মত। আম্মা ও অন্য ভাই-বোনরা আমাদের সাথে একত্রে খেয়ে খেয়ে মেলার গল্প শুনতাম। সে এখন শুধ্ইু স্মৃতি। এই একটুকরো স্মৃতিই যেন জীবনের একটি বিশেষ স্মৃতি। এখন আর সেই আনন্দ-নিরাপত্তা যেন কোথায় হারিয়ে গেছে। বাচ্চাদেরও তেমন জানার ও যাওয়ার আগ্রহ দেখিনা। কেন যেন যান্ত্রিক যুগে আজকালের বাচ্চাদের চাওয়া পাওয়া, ইচ্ছা-অনিচ্ছা যন্ত্রের মত হয়ে গেছে। ক্লাসে ছাত্র-ছাত্রীদের যখন বৈশাখী মেলার সাথে জড়িত বিভিন্ন বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করতে থাকি তাদের মধ্যে কোন উচ্ছ্বাস দেখা যায় না। পুতুল নাচ, সাপের খেলা, বানরের বুদ্ধির খেলা, এগুলো নিয়ে বর্তমান প্রজন্মের কোন আগ্রহ নেই। নতুন নতুন পোশাক, ফাস্ট ফুড, হাই ভলিউমের নাচ-গানের মধ্যে তাদের আনন্দ-বিনোদন সীমাবদ্ধ। আমাদের সম্মানিত অভিভাবকই পারেন বর্তমান প্রজন্মকে বাঙালি সংস্কৃতির শ্রেষ্ঠ নিদর্শন ‘‘বৈশাখী’’ মেলা সম্পর্কে উদ্বুদ্ধ করতে। অভিভাবকরা তাদের শৈশবের ছোট ছোট গল্প তুলে ধরে বাচ্চাদের মধ্যে বাঙালি সংস্কৃতির সুস্থ ধারা সম্পর্কে আলোচনা করতে পারে। এখন সারা দেশব্যাপী বড় আঙ্গিকে মেলার আয়োজন হয়। জনসংখ্যা বাড়াতে মানুষের আগমন হয় মাত্রাতারিক্ত। নিরাপত্তাহীনতার কারণে অপরাধের সংখ্যাও কম নয়। আকাশ সংস্কৃতির কারণে কুরুচিপূর্ণ বিনোদনের বিশেষ আয়োজন মেলার গাম্ভীর্যকে নষ্ট করে। সমাজের এক শ্রেণির তথাকথিত শিক্ষিত ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিরা মেলাকে নিম্নমানের মানুষের বিনোদনের ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচনা করে। তাদের কাছে ক্লাবের সীমিত পরিবেশে বৈশাখী আয়োজন অনেক বেশী গ্রহণীয়। অথচ বৈশাখী মেলা হচ্ছে বাঙালির একটি সার্বজনীন উৎসব।
বৈশাখী মেলার বৈশাখী উৎসব ভাতা নিয়ে অনেক ক্ষেত্রে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। অনেকে বলেন শুধুমাত্র সরকারি কর্মচারীরা বাঙালি, আমরা কি বাঙালি না? আপামর জনসাধারণের প্রাণের উৎসব এই বর্ষবরণকে সর্বজনীন উৎসবে পরিণত করার জন্য সার্বজনীন দৃষ্টিভঙ্গির প্রয়োজন। তাছাড়া বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বাঙালিরা এই উৎসবটিকে ব্যাপকভাবে উদযাপন করে থাকায় বিশ্ব দরবারে এই বর্ষবরণ উৎসবটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। বিশেষ করে আমাদের ‘‘মঙ্গলশোভা যাত্রার’’ স্বীকৃতি এই দেশীয় সংস্কৃতিকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিয়ে যাওয়াতে এর গুরুত্ব আরো বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই বর্ষবরণের এই বাঙালি উৎসবটি সকল বাঙালির জন্য একটি প্রাণের উৎসবে পরিণত হয়েছে। সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি পর্যায়েও বৈশাখী উৎসব ভাতা প্রদানে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। সাধ্য ও সামর্থ্যের মধ্যে থেকে সকলে যেন এই উৎসবটি নিজেদের অস্তিত্বের একটি আপন ঠিকানা হিসেবে বরণ করে নিতে সমর্থ হয় তার জন্য সকলের চেষ্টা করা উচিত। যে উৎসবটি আমাদের রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় জীবনের সাথে অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িত সেই উৎসবটি যেন সকলের মাঝে আনন্দ বয়ে আনে। আমাদের প্রাণের উৎসব, আমাদের অস্তিত্বের ঠিকানা, আমাদের ভ্রাতৃত্ববোধের নিদর্শন হিসেবে বর্ষবরণ উৎসব যেন আগামী দিনের সুভ সূচনা করে তার জন্য সকলকে বাঙালির সুস্থ সংস্কৃতিকে লালন করতে হবে।

লেখক : অধ্যাপক, ইংরেজি বিভাগ, ডা. ফজলুল-হাজেরা ডিগ্রি কলেজ, চট্টগ্রাম।

এই বিভাগের আরো সংবাদ
well-food