বাজেটের চ্যালেঞ্জ : অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি এবং সমতাভিত্তিক সমাজ গঠন

  অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ০৩ জুন ২০১৮, ১৪:০০

ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ, ০৩ জুন, এবিনিউজ : বাজেট হচ্ছে সরকারের বার্ষিক আয়-ব্যয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল, যা প্রতিবছরের জুলাই থেকে কার্যকর শুরু হয়। এটা সরকারের আয়-ব্যয়ের দলিল হলেও সামাজিক ক্ষেত্রে এর ভূমিকা অপরিসীম। কারণ বাজেটের কার্যকারণ সবাইকে স্পর্শ করে। ব্যবসা-বাণিজ্য ও নাগরিক জীবনের নানা ক্ষেত্রের প্রায় প্রতিটি বিভাগে প্রভাব ফেলে। ফলে এর গুরুত্বটা অনেক বেশি। বাজেট দেওয়া কিন্তু সরকারের সংবিধানের একটি বাধ্যবাধকতার বিষয়। সংবিধানের ৮১ থেকে ৯২ অনুচ্ছেদে বাজেটের কথা এসেছে, যদিও সরাসরি বাজেট কথাটি সেখানে নেই। সেখানে বলা হয়েছে, সরকারের আয়-ব্যয়ের একটি অর্থনৈতিক বিবরণ দেওয়া দরকার। আর বাজেটটি সংসদে বিস্তারিত আলাপ-আলোচনার পরে পাস হবে।

বাজেট এক বছরের হলেও এর ধারাবাহিকতা রাখতে হয়। বাজেটে যে অভীষ্ট বিষয়গুলো আছে তা এক বছরের মধ্যে অনেক সময় সম্পন্ন করা সম্ভব নাও হতে পারে। কিন্তু খেয়াল রাখতে হবে জনগণের প্রত্যাশা এবং সমাজের উন্নয়ন যেন ঘটে। এটা হচ্ছে বাজেটের একটি পালনীয় দিক। কিছু জিনিসের সরাসরি প্রতিফলন দেখা যায় আর কিছু বিষয় ভবিষ্যতে সম্পন্ন হওয়ার জন্য প্রক্রিয়াধীন থেকে চলতে থাকে।

এবারের বাজেটের একটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, কিছু আমরা এরই মধ্যে অর্জন করেছি, আর কিছু বিষয় ভবিষ্যতে হবে। একটা হচ্ছে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে আমরা উন্নয়নশীল দেশে যাত্রা করেছি। এটা জাতিসংঘ থেকে একটি স্বীকৃতি। আরেকটি হচ্ছে নিম্ন আয়ের দেশ থেকে নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে উত্তরণ ঘটেছে এবং যেটা বিশ্বব্যাংকের মাধ্যমে মূল্যায়িত হয়েছে।

একটি বিষয় বিবেচনায় রাখতে হবে, ৪৭ বছর লেগেছে আমাদের এ পর্যায়ে আসতে। কিন্তু জিনিসটি ঘনীভূত হয়েছে ১৯৯০ থেকে এবং সেখান থেকে অর্জনগুলো ধারাবাহিকতা পেয়েছে। এ অর্জনটির মূল কৃতিত্ব হলো কৃষক, মজুর, ব্যবসায়ী ও সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের। যাঁরা সরকার পরিচালনা করছেন এবং সমাজের নীতিনির্ধারক, তাঁদেরও ভূমিকা আছে এ অর্জনে। এ অর্জন ত্বরান্বিত করতে কিছু চ্যালেঞ্জ নিয়ে সামনে এগোতে হবে এবং সেটা বেশ দ্রুতগতিতে। এই চ্যালেঞ্জগুলো বাজেটের সঙ্গে কিছু সম্পৃক্ত, আর কিছু অন্যভাবে সম্পাদন করতে হবে।

আমাদের যে রেমিট্যান্স এবং রপ্তানির মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা আয়, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং প্রবৃদ্ধির ধারাবাহিকতা ছয়ের ঘর পেরিয়ে সাতের ঘরে এসেছি, এসবের সমন্বয় করে আমরা অন্য যে অর্জনগুলো করেছি, সেগুলোকে আরো অর্থবহ করে দ্রুত এগিয়ে নিতে হবে। আমাদের যে অর্জন ও উন্নতি সেগুলোর সুবিধা বা ফল কিন্তু তৃণমূল এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে সুষমভাবে পৌঁছায়নি। এ বিষয়টিতে নজর দিতে হবে। এগুলোকে গুরুত্ব দিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে হবে। বাজেটটি কিন্তু সামষ্টিকভাবে সাধারণ জনগণের প্রত্যাশার একটা জায়গা নিয়ে কাজ করে। আমাদের বেশ কিছু ক্ষেত্রে উন্নতি হয়েছে, বাজেট সে ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখছে। যেমন—ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প বা বড় ধরনের আর্থিক খাতে উন্নতি হয়েছে। কিন্তু অর্থনীতি ত্বরান্বিত রাখতে সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব কাদের—সাধারণ কৃষক, শ্রমিক আর ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের। তারা কিন্তু জনগণের জন্য বাজেট হবে, তারা সেই প্রত্যাশায় তাকিয়ে থাকে।

একটা বিষয় খেয়াল করার মতো, আমরা কিন্তু দিন দিন সম্পদ ও আয়-বৈষম্যের দিকে যাচ্ছি। আয় ও সম্পদের বৈষম্য বেড়ে যাচ্ছে। কাজেই এবারের বাজেটের একটা গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে, সরকারের যে অর্জনগুলো নানা ক্ষেত্রে এসেছে, সেসব থেকে কিভাবে সাধারণ মানুষ সুবিধা পায়। এ বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে। আমি যে ধরনের বাজেট চাই বা আমার প্রত্যাশা হচ্ছে, এবারের বাজেটটি হবে সমতাভিত্তিক, কল্যাণমুখী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক। সমতাভিত্তিক হতে হবে। কারণ সমাজে যে অর্থনৈতিক বৈষম্য, সেটা কমিয়ে আনতে হবে। একেবারে সমান সমান হয়ে যাবে, তা নয়। কিন্তু বৈষম্যটা কমিয়ে আনতে হবে। আর হতে হবে কল্যাণমুখী। এটা শুধু অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য নয়, জীবনের মান উন্নয়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগব্যবস্থা এবং সামাজিক নিরাপত্তা যেন গুরুত্ব পায়। আরেকটি বিষয় হচ্ছে, অন্তর্ভুক্তিমূলক; সবাই যেন বাজেটে অংশগ্রহণ করতে পারে এবং কমবেশি সবাই বাজেট থেকে সুবিধা পায়। তবে উচ্চ প্রবৃদ্ধির দিকটা কিন্তু সুনিশ্চিত করতে হবে এবং প্রবৃদ্ধি অন্তর্ভুক্তিমূলক হলেই সামাজিক সমতা অনেকটা নিশ্চিত হবে।

বাজেটের প্রধান দিক হচ্ছে আয় ও ব্যয়। এবারের সরকারের বাজেট হবে বেশ বড়—প্রায় চার লাখ কোটি টাকার বেশি। সম্প্রসারণশীল বাজেট হবে, তা আশা করা যায়। ব্যয় বাড়বে। আর নির্বাচনী বছরে সরকার চাইবে যে বিশেষ কিছু খাতে বাজেট করে খরচ করবে। এতে সাধারণ মানুষের হয়তো কিছু উপকার হবে। যাতে মানুষ ভাবতে পারে যে সরকার জনকল্যাণমুখী কাজ করছে। বড় বাজেট হলে বাস্তবায়ন করাটাও চ্যালেঞ্জমুখী হবে। জিডিপির তুলনায় আমাদের বাজেট যে খুব বড় তা নয়। বড় বাজেট হলে যেটা হয়, ব্যয়টা সরকার আগে থেকেই ধরে নিয়ে বাজেটটা করছে; তখন হবে কী—আয়ের ওপর চাপ পড়বে। আর আয়ের ওপর চাপ মানেই সরকারের রাজস্ব আয় বাড়াতে হবে। তখন মানুষের ওপর করের বোঝা বাড়বে। কারণ আয় তো করতে হবে সরকারকে। সাধারণত মানুষ আয় ঠিক করে ব্যয় করে। সরকার ব্যয় ঠিক করে আয় করবে। অতএব এ ক্ষেত্রে চাপ বাড়বে। এতে পরোক্ষভাবে সাধারণ মানুষের ওপর করের চাপ বাড়বে। প্রত্যক্ষ করটা কিন্তু বিত্তবানদের জন্য, আর পরোক্ষ করটা সবার জন্য। কাজেই আয়-ব্যয় ও করটা যদি প্যাগমেটিক বা বাস্তবভিত্তিক না হয়, অর্জনটা সেভাবে না হয়, তাহলে কর ও ঋণের বোঝা বাড়তে থাকবে। বাজেটে প্রত্যক্ষ করের ওপর বেশি গুরুত্ব দিতে হবে, পরোক্ষ করের (যেমন—ভ্যাট) ওপর নয়।

প্রতিবছর কিন্তু বার্ষিক উন্নয়ন পরিকল্পনা বিরাট আকার ধারণ করে এবং প্রতিবার রিভাইজ করা হয়। ফলে এপ্রিলের পর থেকে আগামী মে-জুলাই মাস পর্যন্ত কিন্তু বহু টাকা খরচ করা হয়। এতে হবে কী—কাজের ক্ষেত্রে যে গুণগত মান সেটা তো বজায় রাখা যায় না। ফলে কাজের মান খারাপ হয়। সময়মতো কাজ শেষ হয় না, খরচও বেশি পড়ে যায়। কাজেই আয়-ব্যয়ের দিকটা ভালোভাবে তদারকি করতে হবে।

সরকার কোন কোন খাতে আয় ও ব্যয় করবে, সেটা স্থির করতে হবে উন্নয়ন এবং মানুষের জীবনমানের ওপর কী প্রভাব হয় সেটা দেখে। যোগাযোগ খাতে ব্যয় করা দরকার। সড়কপথের উন্নয়ন দরকার। এসবের ব্যাপক একটা ইতিবাচক দিক আছে। কিন্তু এর সঙ্গে স্বাস্থ্য খাতে নজর দিতে হবে। স্বাস্থ্য খাত এবং শিক্ষা খাতে ব্যয়সহ সামাজিক নিরাপত্তা খাতে ব্যয় বাড়াতে হবে। স্বাস্থ্য খাতে মূলত খরচ হয়ে যায় অবকাঠামো নির্মাণ ও শিক্ষা খাতে শিক্ষকদের বেতন, এগুলোর পেছনে ব্যয়টা বেশি হয়।

স্বাস্থ্য খাতে ডাক্তার, প্রশিক্ষিত সহকর্মী-নার্স, যন্ত্রপাতি, ওষুধ—এগুলোর পেছনে বেশি ব্যয় করতে হবে। শিক্ষা খাতে ছাত্রদের ক্লাসরুম, শিক্ষার উপকরণ, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ—এগুলোতে ব্যয় করতে হবে বেশি। শিক্ষার মান, কার্যকারিতা, শিক্ষকদের মান, এ দিকগুলো পেছনে পড়ে থাকছে। আমাদের বাজেটে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে মোট দেশজ আয়ের ৩ থেকে ৪ শতাংশের বেশি বরাদ্দ দেওয়া হয় না। কোরিয়া ও থাইল্যান্ডে এই হার ১০ থেকে ১২ শতাংশ। এখন হয়তো বেসিক স্বাস্থ্যসেবাটা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। কিন্তু সেকেন্ডারি যে স্বাস্থ্যসেবা, সেটা হচ্ছে না। গরিব বা নিম্ন আয়ের মানুষকে প্রাইভেটে সেবা নিতে যেতে হচ্ছে। প্রাইভেটে স্বাস্থ্যসেবা নেওয়া তো তাদের সামর্থ্যের বাইরে। এরপর সামাজিক নিরাপত্তার খাতে বাজেট দরকার। কিছু সুবিধা চালু আছে—বয়স্ক ভাতা এবং কাজের বিনিময়ে খাদ্য। কিন্তু সামাজিক নিরাপত্তা বলতে তো শুধু এসব নয়। সরকারি চাকরির বাইরে যারা আছে, গার্মেন্ট শ্রমিক বা অন্যান্য পেশায় আছে, তাদের সামাজিক নিরাপত্তার দায়িত্বটা কে নেবে। এসব ক্ষেত্রে তেমন বাজেট থাকে না। যা আছে সরকারি চাকরিজীবীদের পেনশন, গ্র্যাচুইটি ইত্যাদি। এবং তাদের জন্যই সুবিধাগুলো বেশি। সরকার চাইলে কিছু ইনস্যুরেন্স চালু করতে পারে। কিন্তু এবার সেটা চালু করতে পারবে না জানিয়ে দিয়েছে সরকার।

আমাদের কর্মসংস্থানের বেশ ঘাটতি আছে। এসব নিয়ে কয়েক বছর ধরেই অবশ্য কথা হচ্ছে। আমাদের যে বিশাল তরুণসমাজ, তারা অনেক সময় হতাশায় ভোগে এবং এর ফলে নানা অসুবিধা তৈরি হয়। আমাদের তরুণদের কর্মসংস্থান বাড়ানোর ব্যাপারে জোর দিতে হবে। শিক্ষা, বিশেষ করে কারিগরি শিক্ষাক্ষেত্রে গুরুত্ব দিতে হবে। সেবাবিষয়ক খাতে আমাদের মোটামুটি অংশগ্রহণ আছে। এখন শিল্প খাতে সরকারকে নজর দিতে হবে।

বিনিয়োগ খাতটা আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ খাত। বেসরকারি খাতে আমাদের বর্তমানে যে বিনিয়োগ আছে তা জিডিপির ২৩-২৪ শতাংশ মাত্র। বিশাল বিনিয়োগ কিন্তু সরকারি খাতেই হয়ে থাকে। অতএব আমাদের বেসরকারি সেক্টরে বিনিয়োগ আরো বাড়াতে হবে, অন্ততপক্ষে ৩২ শতাংশ নিতে হবে। একটা বিষয় দেখা যায়, যাঁরা কর দিচ্ছেন, এনবিআরের লোকজন তাঁদের পেছনেই দৌড়াচ্ছে। রুরাল সেক্টরে তাঁদের মনোযোগ কম। শহরের বাইরে বহু ব্যবসায়ী আছেন করের আওতার বাইরে। তাঁদের করের জালের মধ্যে নিয়ে আসতে হবে। করের জালটা না বাড়ালে কর বিশেষ করে প্রত্যক্ষ কর (ইনকাম ট্যাক্স) বাড়ানো সম্ভব হবে না। এখন বিনিয়োগকারী যাঁরা আছেন, তাঁরা অভিযোগ করেন যে যাঁরা কর দিচ্ছেন তাঁদের কাছেই শুধু ট্যাক্সের লোকজন যাচ্ছে। এটা কিন্তু ভালো লক্ষণ নয়। ট্যাক্সের আওতায় অনেক ব্যক্তি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে আনতে হবে। করপোরেট ট্যাক্সের কথা অবশ্য বলছে সরকার, এটা কমালে ভালো ফল দেবে।

বাজেটে আরো কিছু বিষয়ে নজর দিতে হবে। ব্যাংক ও ব্যবসায় সুদের হার কমাতে হবে। যোগাযোগব্যবস্থায় বিশেষ নজর দিতে হবে। কারণ পত্রিকার পাতা খুললেই সারা দেশের রাস্তার যে চিত্র দেখা যায়, এটা কিন্তু ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প-ব্যবসায়ীদের এবং বিশেষ করে কৃষিপণ্যের ওপর প্রভাব পড়ে। জিনিসপত্র বাজারে বিক্রি করতে না পারলে তারা ফিরিয়েও নিয়ে যেতে পারে না। ফলে কম মূল্যে বিক্রি করতে হয়। ইন্টারনেট সেবা নিয়ে অনেক কথা হয়। ব্রডব্যান্ডের স্পিড নিয়ে গ্রাহকের অসন্তুষ্টি আছে। বাজেটটি শুধু অর্থনৈতিক বিষয় নয়। দুর্নীতি দূরীকরণ, সামাজিক নিরাপত্তা, জীবনের মান উন্নয়ন এবং সুশাসন দরকার। মানুষের জন্য বাজেট। কাজেই বাস্তবায়নযোগ্য, কল্যাণমুখী, অংশগ্রহণমূলক ও জবাবদিহির বাজেট প্রয়োজন। সব বিষয়ে বাজেটে নজর দেওয়া সম্ভব হবে না। এই নিবন্ধে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে, সেগুলো সরকার বাজেটে গুরুত্ব দিয়ে দেখবে- এটাই প্রত্যাশা। (কালের কণ্ঠ থেকে নেয়া)

লেখক : সাবেক গভর্নর, বাংলাদেশ ব্যাংক
অধ্যাপক, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়

এই বিভাগের আরো সংবাদ