বঙ্গবন্ধু ও বঙ্গমাতা

  কাঞ্চনা চক্রবর্ত্তী

০৭ এপ্রিল ২০১৯, ১৪:৪৫ | অনলাইন সংস্করণ

‘কোনো কালে একা হয়নি ক’ জয়ী পুরুষের তরবারি,
প্রেরণা দিয়াছে, শক্তি দিয়াছে বিজয়া লক্ষ্মী নারী।’’
কবির এই মহান বাণী বাংলাদেশের স্বাধীনতার মহানায়ক, রাজনীতির কবি, বাঙালির রাখাল রাজা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবনে চরম সত্য। তাঁর জীবনে সফলতার জন্য শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের অবদান সবচাইতে বেশি। বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবনে শেখ ফজিলাতুন্নেছার মতো ধীরস্থির, বুদ্ধিদীপ্ত, দূরদর্শী ও স্বামী অন্তঃপ্রাণ মহিলার আত্মত্যাগ, সাথে বলিষ্ঠ, নির্লোভ ও নিষ্ঠাবান ইতিবাচক ভূমিকা শেখ মুজিবকে বঙ্গবন্ধু, জাতির পিতা এবং সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি হতে সহায়তা করেছে। তাঁর আত্মত্যাগের ফলই বাঙালির স্বাধীনতার সংগ্রাম। তিনি ইতিহাসে আজ বঙ্গমাতা হিসাবে চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন এবং আজীবন থাকবেন।
বঙ্গবন্ধুর আজীবনের সুখ দুঃখের সঙ্গী, মৃত্যুকালেও তাঁর সঙ্গী হয়েছিলেন। ইতিহাসে তাই বেগম শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব কেবল জাতির পিতার সহধর্মিণীই নন, বাঙালির মুক্তি সংগ্রামের অন্যতম এক অনুপ্রেরণাদায়ী মহীয়সী নারী। এই মহান মানবী আমাদের স্বাধীনতার ইতিহাসের এক কিংবদন্তি। আসলে তিনি ছিলেন সর্বংসহা এক বাঙালি নারী।
মহান মুক্তিযুদ্ধের পুরো নয়টি মাস অসীম সাহস, দৃঢ় মনোবল ও ধৈর্য নিয়ে বেগম শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব কঠিন দিনগুলোর মোকাবিলা করেছেন। ইতিহাস পর্যালোচনা করলে অবাক হতে হয়। এক কঠিন মনোবল ও দৃঢ় চিত্তের অধিকারিনী ছিলেন আমাদের বঙ্গমাতা। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ ও ২৩ মার্চের পতাকা উত্তোলনে বঙ্গবন্ধুর প্রধান পরামর্শক হিসেবে তাঁকে বিবেচনা করা হয়। স্বামীর রাজনৈতিক জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সর্বান্তকরণে সহযোগিতা করেছেন।
জাতির পিতার রাজনৈতিক জীবনের দুটি ঐতিহাসিক ঘটনার সাথে বঙ্গমাতা বঙ্গবন্ধুর সাথে চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন। ১৯৬৮ সালে পাকিস্তান সরকার কর্তৃক দায়ের করা আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার কথা সর্বজনবিদিত। বঙ্গবন্ধুকে প্রধাণ আসামী করে ৩৫ জন বাঙালি, নৌ ও সেনাবাহিনীর সদস্য এবং উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্র দ্রোহের মামলা দায়ের করা হয়। বঙ্গবন্ধু মোটেই বিচলিত না হয়ে এর মোকাবিলা ও প্রস্ততি গ্রহণের জন্য আইনজীবীদের অর্থ জোগানোর জন্য নানাভাবে চেষ্টা করেন। এই মামলায় বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করা হলে বঙ্গবন্ধুসহ সব রাজবন্দিকে মুক্তির দাবিতে বাঙালি রাস্তায় নামে। পূর্ব পাকিস্তানের রাজপথ বিক্ষোভে পরিণত হয়। পূর্ব পাকিস্তানের উত্তাল রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে পাকিস্তান সরকারের গোয়ান্দা সংস্থা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিবকে ও গ্রেফতারের হুমকি দেয়। এই সময় সরকার পিছু হটে এবং পাকিস্তান সরকার লাহোরের গোল টেবিল বৈঠকে অংশগ্রহণের জন্য বঙ্গবন্ধুকে প্যারোলে মুক্তি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। প্যারোলে মুক্তির সিদ্ধান্তে বেঁকে বসেন ফজিলাতুন্নেছা মুজিব। তিনি প্যারোলে মুক্তির বিষয়ে জোরালো আপত্তি জানান। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন – শেখ মুজিবকে প্যারোলে নয়, নিঃশর্ত মুক্তি দিতে বাধ্য হবে। তিনি কারাগারে শেখ মুজিবের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে প্যারোলে মুক্তি নিয়ে লাহোর বৈঠকে যেতে নিষেধ করেন।বঙ্গবন্ধু তাঁরই পরামর্শে প্যারোলে মুক্তির ক্ষেত্রে অসম্মতি জানান। এরই মধ্যে শেখ মুজিবের মুক্তি আন্দোলন সারাদেশে বিদ্যুতের মতো ছড়িয়ে পড়ে এবং তা গণঅভ্যুত্থানের রূপ নেয়। গণঅভ্যুত্থানের মুখে ১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিবুর রহমান মুক্তিলাভ করেন। ২৩ ফেব্রুয়ারি বাঙালি তাঁকে ‘বঙ্গবন্ধু’’ উপাধি দিয়ে বরণ করে নেয়। বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে প্যারোলে মুক্তি না নেওয়ার বেগম শেখ ফজিলাতুন্নেছার এই সিদ্ধান্ত ছিল সঠিক ও অনন্য। বঙ্গমাতার অপর একটি অনন্য সিদ্ধান্ত হচ্ছে— ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ। ইতিহাস বলে, বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের নেপথ্যে বঙ্গমাতার সঠিক পরামর্শও ছিল। বঙ্গবন্ধুকে সেই সময় তাঁর বুদ্ধি পরামর্শকরা বিভিন্ন দিক নির্দেশনা দিচ্ছিলেন। কিন্তু বঙ্গমাতা এই সময় বঙ্গবন্ধুকে যা মন থেকে বলতে ইচ্ছে করে, যা বলা উচিত তা বলার পরামর্শ দিয়েছিলেন।” এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, একবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম ”বলে বঙ্গবন্ধুর সেদিনের স্বাধীনতার ডাকে বঙ্গমাতার সমর্থন তাঁকে উৎসাহ, প্রেরণা ও সাহস যুগিয়েছিল।
এই দুটি ঘটনা থেকেই জানা যায়, বঙ্গমাতার প্রত্যক্ষ অবদান না থাকলে বাঙালির ও বাংলাদেশের ইতিহাস অন্য রূপ নিত।প্রকৃতপক্ষে বঙ্গবন্ধুকে নিজের মতামত জানাতে কখনও দ্বিধা করেননি বঙ্গমাতা। যেমন : ১৯৭১ সালের ২৩ ও ২৪ মার্চ রাতে আওয়ামী লীগের সাথে পিপিপি’র” সমন্বয়ে কোয়ালিশন সরকার গঠন করার প্রস্তাব আসে বঙ্গবন্ধুর কাছে।এ প্রস্তাব আসার সাথে সাথে বঙ্গমাতা বঙ্গবন্ধুকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ” দেখো আমি তোমার রাজনীতি করি না, তুমি যদি ভুট্টোর সাথে কোয়ালিশন করো তবে লোক এই বাড়িতে পাথর মারবে।
আমি এই বাড়িতে থাকবো না। টুঙ্গিপাড়ার বাড়িতে চলে যাবো।” এমন দৃঢ় চেতা মনোভাবের কারণেই বঙ্গবন্ধু তা করেনি।কিন্তু বঙ্গবন্ধু যদি নেতাদের চাপে কোয়ালিশন সরকার গঠনের সিদ্ধান্ত নিতেন তাহলে কি আমরা স্বাধীন বাংলাদেশ পেতাম! এখানেই ব্যতিক্রমী ভূমিকা পালন করেছেন বঙ্গমাতা। ওনার দৃঢ়চেতা মনোভাবের কারণে বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক পথ মসৃণ হয়েছিল। বঙ্গমাতার কারণেই বাংলার মানুষের মুক্তির পথ এত দীপ্তিময় হয়েছিল। আন্দোলনের সময়ও প্রতিটি ঘটনা জেলখানায় সাক্ষাৎকারের সময় বঙ্গবন্ধুকে জানাতেন। কারাগার থেকে বঙ্গবন্ধুর প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও নির্দেশ নিয়ে আসতেন। আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগকে সেই নির্দেশ জানাতেন। কারাগারে সাক্ষাতকালে বঙ্গবন্ধুর মনোবল দৃঢ় রাখতেন। জাতির পিতার অবর্তমানে সংসার, সন্তানসহ দেশ সকল কিছুই তিনি চরম ধৈর্যের সাথে পরিচালনা করতেন। যা বিস্মিত হওয়ার মত।আসলে বেগম শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাহস ও অনুপ্রেরণার জায়গা।তিনি বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক দর্শন ও আদর্শকে ছায়ার মত অনুসরণ করেছেন।
শুধু ১৯৭১ সালেই নন, যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশ গড়ার কাজেও তিনি বঙ্গবন্ধুর পাশে দাঁড়ান। তিনি অনেক বীরাঙ্গনাকে বিয়ে ও সামাজিকভাবে মর্যাদা সম্পন্ন জীবন দান করেন। আমাদের প্রয়াত মহামান্য রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান মহাত্মা গান্ধীর স্ত্রী কস্তুরবা, জওহরলাল নেহেরুর স্ত্রী কমলা ও দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের স্ত্রী বাসন্তী দেবীর সাথে তুলনা করতে গিয়ে শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিবকে ” বঙ্গমাতা” খেতাবে ভূষিত করেন।
তিনি জীবনের শেষ দিনও জাতির পিতার পাশে ছিলেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমানসহ পরিবারের সকলের সাথে মানবতার শত্রুরা বঙ্গমাতাকেও হত্যা করল। তাঁর সমগ্র জীবনে তিনি অকাতরে দুঃখ বরণ এবং সর্বোচ্চ আত্মত্যাগ করেছেন। তাইতো তিনি শুধুমাত্র বঙ্গমাতা নন তিনি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি মহিয়সী নারী। যাঁর নাম ও অবদান বাংলার ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। তোমায় প্রণতি জানাই—‘মাগো তুমি ঘুমিয়ে আছ স্বাধীন বাংলাদেশে, আমরা মাথা করব নত তোমায় ভালবেসে।’ (দৈনিক আজাদী থেকে সংগৃহীত)

লেখক : বিভাগীয় প্রধান, প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, নিজামপুর সরকারি কলেজ

এই বিভাগের আরো সংবাদ
well-food