গুণমানের সেবা প্রদানই হতে হবে মূল লক্ষ্য

  ড. আতিউর রহমান

২৮ মার্চ ২০১৯, ১১:৪৫ | অনলাইন সংস্করণ

আমাদের দেশে এখন দ্রুত নাগরিকসেবা ও জনবান্ধব ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসারে ডিজিটাল রূপান্তর এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছে। এ কারণেই সারা বিশ্ব অবাক দৃষ্টিতে বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের দিকে তাকিয়ে রয়েছে। এখন মোটা দাগে আমাদের উন্নয়নের কয়েকটি দিক উল্লেখ করছি। গত চার বছর ধরে আমাদের জিডিপি বেড়েছে ৭ শতাংশের বেশি হারে। গেল বছর তা ছিল প্রায় ৮ শতাংশের কাছাকাছি। আমরা স্বপ্ন দেখছি এই হার দুই অঙ্কে পৌঁছে যাবে। বর্তমান হারে জিডিপি বাড়লেও প্রতি এক দশক পর পর এর আকার দ্বিগুণ হবে। আর দুই অঙ্কের হারে তা বাড়লে আরো কম সময়ের মধ্যে জিডিপি দ্বিগুণ হবে। তা হলে আমাদের অন্য স্বপ্নগুলো পূরণ অনেকটাই সহজতর হবে। স্বাস্থ্য, নারীর ক্ষমতায়ন, শিক্ষা, সামাজিক সংরক্ষণ, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় আমাদের সহনক্ষমতা এবং কম খরচে সামাজিক সেবা প্রদানের উপায় উদ্ভাবনে পারদর্শিতার বিচারে আমরা আমাদের সম-আয়ের দেশগুলো থেকে অনেকটা পথ এগিয়ে রয়েছি। এসব উদ্ভাবনের কারণেই প্রাথমিক শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের হার, শিশু ও মাতৃমৃত্যুর হার, জীবনের গড় আয়ুর মতো সূচকে বাংলাদেশের সাফল্য এতটা নজরকাড়া। এসব ক্ষেত্রে সরকারি ও ব্যক্তি খাত এবং অলাভজনক খাত হাতে হাত ধরে কাজ করে চলেছে। সবাইকে নিয়ে চলার এই রাষ্ট্রীয় ঔদার্য বাংলাদেশকে অনেক বেশি সাফল্য এনে দিয়েছে। এর সঙ্গে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে আমাদের জনমিতি লভ্যাংশ (আট কোটি মানুষের বয়স ৩০ বছরের নিচে, গড়ে এক দম্পতির সন্তানের সংখ্যা দুইয়ের আশপাশেই) এবং জনসংখ্যার ঘনত্ব যাকে বলা যায় ‘ডেনসিটি ডিভিডেন্ড’। জনঘনত্বের এই লভ্যাংশ আমাদের যেকোনো উদ্যোগকে দ্রুত ‘স্কেল-আপ’ করতে যেমন সাহায্য করছে তেমনি নেটওয়ার্কিং তথা সংযোগ বাড়াতেও সাহায্য করছে। আর আছে আমাদের দেশটির কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থান। ভারত, চীন ও আসিয়ান—বিরাট অর্থনৈতিক ত্রিভুজের মধ্যখানে আমাদের অবস্থান। কল্পনা করতে পারেন বিদেশি বিনিয়োগ ও সাপ্লাই চেইন আকর্ষণে বাংলাদেশের এই সুবিধাজনক অবস্থান আমাদের জন্য কতটা আশীর্বাদ বয়ে আনতে পারে!

নিঃসন্দেহে আমরা আমাদের সম-আয়ের অন্যান্য দেশ থেকে অনেকটাই সুবিধাজনক অবস্থায় পৌঁছে গেছি। এতটা পথ আমরা কঠিন কঠিন সব নীতি-কৌশল বাস্তবায়ন করেই পাড়ি দিয়েছি। এখন আমাদের সামনে যে পথরেখা দেখা দিয়েছে, তা পাড়ি দেওয়ার জন্য সহজ কিছু নীতি সংস্কার ও কর্মকৌশল গ্রহণ করতে হবে। আমাদের চলার পথের মৌল ভিত্তি কিন্তু নির্মাণ করে ফেলেছি। এখন তাতে চুন, সুরকি, পাথর, পিচ ঢেলে তাকে মসৃণ চলার পথে রূপান্তরের পালা। এই পর্যায়ে আমাদের নিজেদের সাফল্যের গল্পগুলো খুবই সতর্কতার সঙ্গে, সৃজনশীলতার সঙ্গে এবং বিশ্বাসের সঙ্গে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরতে হবে। ব্যক্তি খাতের (দেশের ভেতর ও বিদেশ থেকে) বিনিয়োগ আকর্ষণ  করতে হলে একদিকে আমাদের সাফল্যের গল্পগুলো সুন্দর করে বলতে হবে এবং একই সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য সহজ করার প্রয়োজনীয় উদ্যোগগুলো আর কালবিলম্ব না করে আমাদের হাতে নিতে হবে। বিশ্বব্যাংকের ‘কস্ট অব ডুয়িং বিজনেস’ সূচকে আমরা এতটা পেছনে কেন পড়ে রয়েছি? আগেই বলেছি আমাদের প্রশাসনে ডিজিটাল রূপান্তর দ্রুতই ঘটছে। সেই রূপান্তরের স্পর্শ আমাদের ব্যবসা-বাণিজ্য সম্পর্কিত নিয়ম-নীতিতে সহজীকরণে কেন পড়বে না? আমার ধারণা, এ জন্য আমাদের সদিচ্ছাই যথেষ্ট। আমরা চাইলে এ ক্ষেত্রেও দ্রুত পরিবর্তন আনা সম্ভব।

আমাদের আশাজাগানিয়া প্রধানমন্ত্রী যেভাবে ওপর থেকে বড় বড় সব সিদ্ধান্ত দিচ্ছেন সেগুলোর আলোকে মাঠপর্যায়ে দ্রুত কাজ করার উদ্যোগ মন্ত্রী ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নিতে হবে। সম্পত্তির রেজিস্ট্রেশন, ট্রেড লাইসেন্স, বিদ্যুৎ সংযোগ, ট্যাক্স রিটার্ন, ভ্যাট রিটার্ন, ব্যাংক থেকে ঋণ প্রাপ্তি—এ সবকিছুই ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার করে মনিটর করা যায়। ‘ডিএসএল ট্র্যাকার’ যেমন তাদের পাঠানো প্যাকেট ডিজিটালি অনুসরণ করে তেমনি ফাইলটি কোথায় যাচ্ছে, কতটা সময় বসে আছে, কখন তার নিষ্পত্তি হচ্ছে তা অনুরূপ ট্র্যাকার দিয়ে কেন মনিটর করা যাবে না? প্রযুক্তি ব্যবহার করেই দ্রুত কাজের তাগিদ দিতে পারে ঊর্ধ্বতন মহল। একই সঙ্গে ‘ট্রিপ অ্যাডভাইজারের’ মতো সফটওয়্যার ব্যবহার করে গ্রাহক সন্তুষ্টির খবরও নেওয়া সম্ভব। যাঁরা সেবা পাচ্ছেন তাঁরা কতটা সন্তুষ্ট সে কথা এভাবেই জানা সম্ভব। তাই প্রস্তাব করছি যে প্রত্যেক মন্ত্রণালয়, বিভাগ, অধিদপ্তর ও পাবলিক প্রতিষ্ঠানে হটলাইনসহ যেন একটি নাগরিক গ্রাহক স্বার্থ সংরক্ষণ বিভাগ খোলা হয়। নাগরিকরা সরকারি সেবার মানের কথা, তাদের অভাব-অভিযোগ ও সম্ভাব্য সংস্কার কথা ওই বিভাগে ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার করে পাঠাবে। আমরা বাংলাদেশ ব্যাংকে ‘১৬২৩৬’ নম্বরের হটলাইনসহ অনুরূপ কেন্দ্র খুলেছি এবং গ্রাহকদের মনের কথা জানার সুযোগ সৃষ্টি করেছি। হাজার হাজার গ্রাহক এই সেবার সুযোগ এখনো নিচ্ছেন। এভাবেই জনসেবা গুণমানের করার এক নয়া সুযোগ সৃষ্টি করা গেছে। ডিজিটাল প্রযুক্তির কল্যাণে এই সেবার মান দিন দিনই আরো উন্নত হচ্ছে। সিঙ্গাপুরসহ অনেক দেশের প্রশাসনিক ব্যবস্থায় এমন ফিডব্যাক ইউনিট রয়েছে। আমাদের অনেক ব্যক্তি খাতের প্রতিষ্ঠানেও গ্রাহকদের অভিযোগ গ্রহণের সুযোগ রয়েছে। যেমন—‘বিকাশ’ তার গ্রাহকদের অভিযোগ শোনার জন্য টেলিফোন, ফেসবুক, ই-মেইল, এসএমএস ছাড়াও মুখোমুখি অভিযোগ দেওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করেছে। আমরা ব্যাংকগুলোকেও অনুরূপ গ্রাহকবান্ধব সেবার সুযোগ সৃষ্টির তাগিদ দিয়েছি। জানি না, তারা এই সুযোগ কতটা কার্যকরভাবে তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গ্রাহক স্বার্থ সংরক্ষণ কেন্দ্রই বা এখন কেমন সেবা দিচ্ছে তা আমার জানা নেই। আশা করছি, গ্রাহকসেবার মান সর্বত্রই আরো উন্নততর হবে।

বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করে সত্যিকার অর্থেই ‘ওয়ানস্টপ’ সার্ভিস ‘বিডা’কে কার্যকর করতে হবে। আশার কথা, বিডা ও বেজা এ কাজে অনেকটা পথ পেরিয়ে এসেছে। এখন আরো দ্রুত হাঁটার পালা। তাদের এ কাজে সরকারের ওপরমহল থেকে উপযুক্ত রাজনৈতিক সমর্থন দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। আর সরকার যে তা দিতে চায় তার প্রমাণ আমরা দেখতে পাচ্ছি। রাজউক বাড়ির নকশা অনুমোদনের বেশ কয়েকটি ধাপ কমিয়ে ফেলার উদ্যোগ নিয়েছে। বিদ্যুেসবা, সামাজিক সংরক্ষণ সুবিধা প্রদানেও ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার করে এসব সেবায় গতি ও স্বচ্ছতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে। ভূমি মন্ত্রণালয়ের ইতিবাচক ডিজিটাল উদ্যোগের কথা আগেই বলেছি।

হালে ‘কস্ট অব ডুয়িং বিজনেস’ সূচকের উন্নতি খানিকটা হয়েছে। তবে আমাদের চেয়ে আরো কয়েক গুণ বেশি উন্নতি হয়েছে আমাদের প্রতিযোগী দেশ ভিয়েতনাম ও ভারতে। আসলেই বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে দেশগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা দিন দিন বেড়েই চলেছে। সে কথা মনে রেখেই ব্যবসা-বাণিজ্য করার প্রক্রিয়াকে আরো সহজ করার উদ্যোগ আমাদের নিতে হবে। সে জন্য যদি বিদেশ থেকে কিংবা প্রবাসী বিশেষজ্ঞের সহযোগিতা নিতে হয়, তাহলে তা-ই নিতে হবে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এরই মধ্যে আমাদের উন্নয়নপ্রক্রিয়ায় প্রবাসীদের যুক্ত হওয়ার উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর এই আহ্বানে যখন প্রবাসী পেশাজীবীরা এগিয়ে আসবেন তখন যেন আমাদের রক্ষণশীল আমলাতন্ত্র প্রতিবন্ধকতার দেয়াল তুলে না দেয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। আমরা যদি ক্রিকেটের মানোন্নয়নে বিদেশি কোচ আনতে পারি, তাহলে আমাদের ব্যবসা-বাণিজ্যের উন্নয়নের জন্য আন্তর্জাতিক মানের উপদেষ্টা কেন নিতে পারব না। ইন্দোনেশিয়া যদি জর্জিয়ার ভেরা কেরালিয়ার সাহায্য নিয়ে ব্যবসা-বাণিজ্য প্রক্রিয়াকে সহজ করতে পারে, আমরা কেন তা পারব না? তা ছাড়া বিদেশে আমাদের অনাবাসী পেশাজীবীরা দারুণ সুনামের সঙ্গে কাজ করছেন। তাঁদের এই অভিজ্ঞতা আমাদের দেশের উন্নয়নে কেন কাজে লাগাতে পারব না? ভিয়েতনাম আমাদের চেয়ে ১২ গুণ বেশি এফডিআই আকর্ষণ কোন জাদুবলে করতে পারছে? এ প্রশ্নের মুখোমুখি আমাদের নীতিনির্ধারক ও কর্মকর্তাদের অবশ্য হতে হবে। বিদেশি বিনিয়োগকারীকে আমরা ঢাকা বিমানবন্দরে প্রথমবার যেভাবে স্বাগত জানাব সেটিই তাঁর মনে থাকবে। অনেকটা প্রথম দেখায় ভালোবাসার মতো। এ সুযোগ দ্বিতীয়বার মিলবে না। অনুরূপভাবে অনিবাসী শিক্ষক, গবেষক, বিজ্ঞানীদের সহযোগিতা নিয়ে আমরা আমাদের জনশক্তির দক্ষতাকেও উন্নতর করতে পারি। তাদের এফডিআই সংগ্রহের জন্য সেতু হিসেবে ব্যবহার করতে পারি। তারা এভাবে কাজ করতে পারলে আমাদের উন্নয়ন অভিযাত্রা নিশ্চয়ই কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছতে পারবে। বাংলাদেশও উন্নত দেশ হতে পারবে।

লেখক : অর্থনীতিবিদ ও সাবেক গভর্নর, বাংলাদেশ ব্যাংক

[email protected]

এই বিভাগের আরো সংবাদ