উন্নতি ও প্রগতি যেখানে মুখোমুখি

  অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ০১ জুন ২০১৮, ১১:২০

অজয় দাশগুপ্ত, ০১ জুন, এবিনিউজ : এখন কে কাকে মারছে, কেন মারছে বা কে মাদক খায় আর কে বেচে, সব মিলেমিশে একাকার। সবাই চায় দেশ ভালো চলুক। শান্তি আসুক। সবাই এও চায় নেশা দূর হোক। তবে যেভাবে চায় সেভাবে হয়নি হয়ও না। একমুখী রাজনীতি যতই ঢোল বাজাক উন্নয়ন ও প্রগতি এখন মুখোমুখি। এভাবে মানুষ মারা কোন সমাজ অনুমোদন দেয়না।

দেশ বা জাতির জন্য টেকসই উন্নয়নের একটি প্রধান শর্ত শান্তি ও নিরাপত্তা। বাংলাদেশের অগ্রযাত্রার দিকটা যেমন প্রকাশ্য তেমনি এর অনিরাপদ জীবন বা নিরাপত্তাহীনতা ও এখন গোপন কিছু নয়। এটা মানতে হবে আমাদের প্রধানমন্ত্রীর আন্তরিকতা সন্দেহাতীত। সরকারে এমন কিছু মন্ত্রী আছেন যাদের সততাও নিষ্ঠা প্রমাণিত। সবচেয়ে বড় কথা দেশের মেধাবী ও পরিশ্রমী মানুষের কৃতিত্বে আজ আমরা এগিয়ে চলেছি। যারা সবসময় নেগেটিভ বা দেশ ও সমাজের ভালোকিছু দেখতে পাননা তাদের চোখেও এখন শর্ষে ফুল। কিন্তু ঐযে বললাম শান্তি ও নিরাপত্তা সে প্রশ্নে মাঝে মাঝেই হুমকি ও প্রশ্নের মুখোমুখি হচ্ছি আমরা।

সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ জননিরাপত্তা। যেভাবেই হোক প্রায়শ এমন কিছু ঘটনা ঘটছে যা সবার জন্য অস্বস্তিকর। মানুষের জীবনের চাইতে বড় কোন সম্পদ নাই। দেশের নাগরিক সাধারণ মানুষ বা যাদের আমরা আম জনতা বলি, তারা কিন্তু শান্তি বা নিরাপত্তা ব্যতীত কোন উন্নয়নের তোয়াক্কা করেনা। সাধারণ মানুষের সাথে কথা বললেই বোঝা যায় তারা কি চায়। দেশের মানুষের মনে এখন নিরাপত্তাহীনতার যে সংশয় তা কিন্তু অলীক কিছু নয়। কদিন পর পর খুন রাজপথে লাশ দিনদুপুরে মুক্তচিন্তার মগজ পড়ে থাকা বা স্বাভাবিক জীবন ব্যাহত করার জন্য রক্তপাত কারো জন্য মঙ্গলের কিছু না। সরকারের যত অর্জন বা যত ধরণের সফলতা থাকুক এদিকটা ঠিক না হলে তাদের মূল্যায়ন করবেনা মানুষ। বরং অসন্তোষ আর হতাশা একদিন এত বড় হয়ে দাঁড়াবে যে সামাল দেয়াই মুশকিল হয়ে যাবে। এসব অকল্যাণ বা অসুন্দরের পেছনে যতবড় অশুভ শক্তির হাত থাকুক তাকে বাগে আনতেই হবে। এদায়িত্ব সরকারের।
যেসব দেশে মানুষ নিরাপদ জীবনযাপন করে বা যে সমাজে মানুষ মানুষের মত বাঁচতে পারে তাদের হাতে আলাদা কোন ম্যাজিক নেই। তাদের সবচেয়ে বড় শক্তি আইনের শাসন। আমাদের দেশে আইনের শাসন আছে কি নেই সে তর্কে না গিয়েই বলবো অপরাধের সঠিক বিচার নাই। এলেখা যখন লিখছি টিভিতে মিডিয়ায় রানা প্লাজা দূর্ঘটনার তিন বছর পূর্তির আয়োজনে মায়াকান্নার বহর দেখছিলাম। মায়াকান্না এ কারণে যে মানুষগুলো এখনো ধুঁকছে যাদের এখনো জীবন আছে কিন্তু পরিশ্রমের সামর্থ্য নাই যারা পঙ্গু বা অচল যাদের জীবনের স্বাভাবিকতা কেড়ে তাদের অথর্ব অচল করে রেখেছে রানা প্লাজা তাদের আসলে খুব বেশী কিছু চাওয়ার নাই। গরীব নিম্নবিত্ত এই মানুষরা চ্যানেলগুলোর একটা ট্যালেন্ট শো বা গানের প্রতিযোগিতার টাকাতে বেঁচে যেতে পারে। শুধু তাই নয় দেশে এত এনজিও এত প্রতিষ্ঠান এত সরকারী ও অসরকারী সহায়তার গালগল্প যে কেউ পাশে দাঁড়ালেই হয়ে যেতো। আমরা সেদিকে মনযোগী নই । মনযোগ দেয়ার সময় নাই কারো। সময় হচ্ছে দিন তারিখ মনে রেখে প্রচার আর মায়াকান্নার ধুম। এক ভদ্রলোকতো এমন অভিযোগ করলেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীর আদেশের পর ও তার কাছে অনুদানের টাকা যায়নি।

তবে এরা কারা? যারা আদেশ নির্দেশ অমান্য করে খেয়াল খুশী মত কাজ করে? কারো আদেশ মানেনা। এদের কারণেই আজ আমরা এক অনিশ্চয়তার এবং ঝুঁকির মুখে দাঁড়িয়ে। এদের কারণেই দেশে এত খুন এত হানাহানি। কথাটা উড়িয়ে দেবার মত না। কারণ এরা কোনদিন শাস্তি পায়নি। অপরাধ করে নাকের ডগায় ঘুরে বেড়ানো এরা এখন পাপ বা মানুষ খুনের পর হেলিকপ্টারে উড়ে বেড়ায় । রানা প্লাজার ঘটনার কয়েকবছর পর আমরা কেউ খবর রাখিনা অপরাধী রানা এখন কোথায়? তাকে শাস্তি দেয়ার চাইতে আমাদের আগ্রহ হতভাগ্যদের নিয়ে আবেগপ্রবন কয়েকঘণ্টা পার করা। এপ্রবণতা সবকিছুতে দৃশ্যমান। কদিন হৈ চৈ বা মাতমের পর আবার যে কপাল সেই মাথা। এসরকারের আমলে আমরা এর ব্যতিক্রম কিছু দেখতে চেয়েছি। তার যথেষ্ট যুক্তিগ্রাহ্য কারন আছে বৈকি।কোন সরকার যখন মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও চেতনার কথা বলে যখন আমরা দেখি তারাই এদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রধান দল স্বাভাবিক কারণেই প্রত্যাশা বাড়ে। সে আশার দিকটা এখন ঝাঁকুনির মুখে। এটা যতটা সরকারের দোষ তারচেয়ে বেশী রাজনীতির। মানুষের জীবনে বন্ধ্যাকরণ যেমন সন্তানহীনতার জন্য ঠিক আবার জনসম্পদের দিক থেকে ভয়াবহ, রাজনীতির বন্ধ্যাকরণ দেশশাসনকে চ্যালেঞ্জহীন রাখলেও আখেরে তার ফলাফল বিষময়। একসময় সে সরকার ও জনগণকে মুখোমুখি করে তোলে। আমরা যদি আওয়ামী লীগের অতীত বিশ্লেষণ করি , দেখব বহুদল ও মতের পরিচর্যা আর মোকাবেলাই ছিল আর বিশাল হবার অনুপ্রেরণা। আজ সে জায়গাটা নানা কারণে বিপদের মুখে। এটা মানতেই হবে বিরোধীদলের ভূমিকাও জঘন্য। যানবাহন জ্বালিয়ে মানুষ মেরে বোমা সন্ত্রাসে বিরোধী দল আর যাই পাক জনসমর্থন পেতে পারেনা। সেটা বোঝার পরও কোন দলের হুঁশ নাই।

আজ তাই বাংলাদেশের জনগণ ও তারুণ্য রাজনীতির ওপর বীতশ্রদ্ধ। আন্তর্জাতিকভাবেও তারুণ্য এখন রাজনীতিবিমুখ। এতে ইন্ধন দিচ্ছে বিশ্বায়নের খোলা হাওয়া। আনন্দ ও জীবন যাপনের এত উপকরণ খোলা থাকলে রাজনীতির মত বোরিং ও ঝুঁকিপূর্ণ বিষয়ে মন দিতে যাবে কে? কিন্তু এক শ্রেণির যুবকরা বসে নাই। তারা এটিকে এখন চাঁদাবাজী টেন্ডার বা অসততার হাতিয়ার বানিয়ে নিয়েছে। সে জায়গাটাই আসলে উন্নয়নকে ঢেকে দিয়ে খুন জখম অস্থিরতার পথ খুলে দিয়েছে বা দিচ্ছে। সরকারের কাছে এটাই বড় চ্যালেঞ্জ। সমাজ ও জাতির কাছে এটাই এখন জিজ্ঞাসা কে বা কারা আসলে সামনে এসে দাঁড়াতে পারে? যাদের কাছে আমাদের আশা ও প্রত্যাশা পথ খুঁজে পাবে। কারা আমাদের হানাহানিমুক্ত বিদ্বেষমুক্ত শান্তির বাংলাদেশ উপহার দিতে পারবে যার সাথে পায়ে পা মিলিয়ে চলবে উন্নয়ন। অন্যথায় শুধু উন্নতি বা শুধু মারামারির একটাও দেশকে দেশের মত রাখতে পারবেনা। এটাই ইতিহাস ও পৃথিবীর শিক্ষা।

আমরা যদি সত্যি আমাদের আর্থিক উন্নতি ও সামাজিক প্রগতিকে সামনে নিতে চাই বাংলাদেশীদের পূর্ণ গণতন্ত্র বিষয়ে পাঠ দানের বিকল্প নাই। এটা আপনি আচরি ধর্ম পরকে শিখাবে আর চর্চার বিষয়। মানুষকে লেখাপড়া বা জ্ঞানের পাশাপাশি উদারতার দিকে নিয়ে যাবার বিকল্প নাই। সে কাজটা থমকে গেছে। ভয়ে বিহ্বলতায় বা নানা প্ররোচনায় কোন দল কোন রাজনীতি ই সেটা করতে চাচ্ছেনা। একা মিডিয়া বা সুশীল বা কোন সাংস্কৃতিক শক্তিও তা করতে পারবেনা। এর জন্য চাই সবার সম্মিলিত উদ্যোগ। মানুষ কিন্তু চাইলেই পারে আর করেও। পহেলা বৈশাখেই তার পরিচয় দেখেছি আমরা। বাকীটা সদিচ্ছা আর দেশভাবনার ওপর নির্ভরশীল।
এত পাপ এত ধর্ষণ এত হানাহানি আগে দেখা যায়নি। পচে যাওয়া সমাজ আর পাপী রাজনীতি দিয়ে দেশ কতটা এগুতে পারে? সে ভাবনা মাথায় নারেখে এগুলে উন্নয়ন ও প্রগতি একসাথে চলতে পারবেনা।

লেখক : কবি, প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক
(সংগৃহীত)

এই বিভাগের আরো সংবাদ