বিকল্প তো দেখছি না, অবসরে যাবেন কিভাবে?

  আবদুল মান্নান

২৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ১০:৫৮ | অনলাইন সংস্করণ

বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত ১৩ ফেব্রুয়ারি জার্মান টিভি ডয়চে ভেলেকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এটাই তাঁর শেষ মেয়াদ। এরপর তিনি নতুনদের হাতে নেতৃত্ব তুলে দিতে চান। শেখ হাসিনার এই বক্তব্য অবশ্যই একজন আদর্শ রাজনীতিবিদের চিন্তা। পাঠকদের মনে থাকতে পারে, ২০০১ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের পরাজয়ের পর শেখ হাসিনা পরাজয়ের সব দায়-দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়ে দলের সাধারণ সম্পাদক বেগম সাজেদা চৌধুরীর হাতে দলের প্রধান হিসেবে পদত্যাগপত্র তুলে দিয়েছিলেন। বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন ঘটনা শুধু নজিরবিহীনই নয়, এমন একটা সিদ্ধান্ত নিতে প্রচণ্ড সাহস লাগে, যা শেখ হাসিনার তখনো ছিল, এখনো আছে। অবশ্য সেবার দলের নেতাকর্মীদের তীব্র বাধার মুখে তিনি তাঁর পদত্যাগপত্র প্রত্যাহার করে নিয়েছিলেন।

পাঠকদের একটু পেছনে ১৯৯৪ সালের ১৪ আগস্টে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে চাই। প্রায় সিকি শতাব্দী আগে। সেদিন ধানমণ্ডি ৩২ নম্বর সড়কে অবস্থিত বঙ্গবন্ধু ভবনকে বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর হিসেবে উদ্বোধন করবেন বঙ্গবন্ধুকন্যা সংসদে তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা। সড়কের সামনে মঞ্চ তৈরি করা হয়েছে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি সেই ঐতিহাসিক বাড়িটিকে ঘিরে তাঁর অনেক ধূসর হয়ে যাওয়া স্মৃতি নতুন করে আবার দর্শক-শ্রোতাদের সামনে তুলে ধরেছিলেন। বক্তৃতামঞ্চে আরো উপস্থিত ছিলেন ছোট বোন শেখ রেহানা। তিনি সেদিন এক অসাধারণ আবেগঘন বক্তৃতা দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, ‘ত্রিশ লাখ শহীদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত বাংলাদেশের সূতিকাগার এই বঙ্গবন্ধু ভবন। ...১৯৮৭ সালে এরশাদ এই বাড়িতেই আমাকে বন্দি করলে আমি তখন নিজ হাতে বাড়িটি পরিষ্কারের চেষ্টা করি। যেটাই ধরি, সব কিছুই স্মৃতি। তখন প্রতিটি মুহূর্তে মনে হতো, সবাইকে হারিয়ে আমি কেন বেঁচে থাকলাম। শুধু ভাবতাম, ওদের সঙ্গে যদি চলে যেতে পারতাম।...বাবা তাঁর জীবনে যত জেল-জুলুম সহ্য করেছিলেন, তা এই বাংলার মানুষের জন্যই। তিনি আমাদের নন, বাংলার মানুষের সম্পদ। আজ সমস্ত ব্যথা-বেদনা ভুলে আমরা দু’বোন এ জনই আনন্দিত যে জনগণের সম্পদ এই বাড়ি জনগণের হাতে তুলে দিতে পেরে আজ আমরা দু’বোন ভারমুক্ত হলাম।’ সেদিনের পড়ন্ত বিকেলের অনুষ্ঠানে হাজার কয়েক লোক জড়ো হয়েছিল। মঞ্চের সামনে বিক্রি হচ্ছিল শিল্পী হাশেম খানের করা বঙ্গবন্ধুর একটি বড় সাইজের পোস্টার। এক কপি কিনে বঙ্গবন্ধুকন্যার অটোগ্রাফ চাইলে তিনি তখন তা সঙ্গে সঙ্গে ছবির ওপর দিয়ে দেন। ছবিটি এখনো সযত্নে রেখে দিয়েছি।

সেই দিনের সেই অনুষ্ঠান ও শেখ হাসিনার বক্তৃতা নিয়ে অধুনালুপ্ত দৈনিক বাংলার বাণীতে একটি উপসম্পাদকীয় লিখেছিলাম, যা ২৫ সেপ্টেম্বর ছাপা হয়েছিল। লিখেছিলাম, ‘ইতিহাসের এক ক্রান্তিকালে বঙ্গবন্ধুর তনয়া শেখ হাসিনা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ভাঙা তরিটির বৈঠা হাতে তুলে নিয়েছিলেন। বাবা তথা জাতির জনকের কাজ শেষ করতে গেলে প্রথমেই ভাঙা নৌকাটা মেরামত করতে হবে এবং উপযুক্ত মাঝিমাল্লা নিয়োগ করতে হবে। গত এক দশকে অনেক ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে তিনি এই কঠিন কাজটি অনেকাংশে সমাধা করতে পেরেছেন। কিন্তু ১৯৯১-এর নির্বাচনে অন্য আরেক রকম ষড়যন্ত্র ও অশুভ আঁতাতের ফলে তাঁর বা তাঁর দলের পক্ষে ক্ষমতায় যাওয়া সম্ভব হয়নি।’ সেই নির্বাচনে বিএনপি জামায়াতের সঙ্গে গোপন আঁতাত করে বিজয় লাভ করে সরকার গঠন করেছিল এবং পরবর্তী পাঁচ বছরে দেশটাকে একটি মধ্যযুগীয় সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রে পরিণত করেছিল। একাত্তরের ঘাতকদের শিরোমণি জামায়াতের আমির গোলাম আযমকে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব দেওয়া হয়েছিল। ১৯৯৪ থেকে ২০১৯ সাল, দীর্ঘ সময়। এরশাদ পতনের পর থেকে খালেদা জিয়া পূর্ণ মেয়াদে দুবার আর শেখ হাসিনা তিনবার শেষ করে এখন চতুর্থ মেয়াদে দেশের শাসনভার হাতে নিয়েছেন। এই সময়ে বিএনপিদলীয় সংসদ সদস্য সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীসহ বিএনপির অনেকে সংসদে দাঁড়িয়ে ১৫ আগস্টের মতো আরেকটি ঘটনা ঘটিয়ে শেখ হাসিনাকে পিতার মতো হত্যা করার হুমকি দিয়েছেন। তাঁকে হত্যা করার চেষ্টা করা হয়েছে অসংখ্যবার। সবচেয়ে ভয়াবহ চেষ্টা ছিল বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে আওয়ামী লীগের জনসমাবেশে ২০০৪ সালের ২১ আগস্টে গ্রেনেড হামলা। ভাগ্যচক্রে সেই গ্রেনেড হামলায় শেখ হাসিনা বেঁচে গেলেও দলের ২৩ জন নেতাকর্মী গ্রেনেডের আঘাতে মৃত্যুবরণ করেছিল। এর অনেক আগে ১৯৯৪ সালে আমি লিখেছিলাম, ‘মুক্তিযুদ্ধের চিন্তা ও চেতনাকে ফিরিয়ে এনে বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত কাজকে সমাপ্ত করার জন্যই সৃষ্টিকর্তা তাঁকে (শেখ হাসিনাকে) বাঁচিয়ে রেখেছেন।’

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শেখ হাসিনা তাঁর চার মেয়াদের শাসনামলে একজন প্রধানমন্ত্রী থেকে পরিণত হয়েছেন একজন বিশ্বনন্দিত স্টেট্সম্যান বা রাষ্ট্রনায়কে। বিএনপি-জামায়াত জোটের নানা টালবাহানা সত্ত্বেও তিনি ১৫ই আগস্টের ঘাতকদের বিচারকাজ সমাপ্ত করেছেন। একাত্তরের ঘাতকদের প্রকাশ্য আদালতে বিচার করে রায় কার্যকর করেছেন। একটি ভিক্ষুকের দেশ থেকে দেশের মানুষের সহায়তায় দেশটাকে একটি উন্নয়নশীল দেশের কাতারে নিয়ে গেছেন। দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করেছেন। যে বাঙালি রিলিফ নিতে অভ্যস্ত ছিল আজীবন, সেই রিলিফ খাওয়ার সংস্কৃতি থেকে তাদের বের করে এনে বাংলাদেশকে একটি রিলিফ দেওয়ার সক্ষমতার দেশ হিসেবে পরিণত করেছেন। বাংলাদেশের কোনো সম্মানজনক আইডেন্টিটি ছিল না। শেখ হাসিনা বিশ্বদরবারে দেশটাকে একটা আইডেন্টিটি দিয়েছেন। আগেও বলেছি, আবারও বলি, শেখ হাসিনা এখন বাংলাদেশের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসাডর। পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের ২৩ বছরে নানা নির্যাতন সহ্য করে প্রায় ১৪ বছর কারাভোগ করে দুবার মৃত্যুর মুখোমুখি হয়ে যে বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন, যে স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে ত্রিশ লাখ মানুষ নিজের জীবন উৎসর্গ করেছে, সেই সব স্বপ্নের অনেক কিছুই এখনো অর্জনের বাকি আছে। একটি গণতান্ত্রিক সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থার পূর্বশর্ত হচ্ছে অসাম্প্রদায়িক সমাজ বিনির্মাণ। এ কাজটি বাংলাদেশে এখনো করা সম্ভব হয়নি। এখনো এখানে ধর্মের নামে অধর্মের বেসাতি চলে। এখনো দেশের বিভিন্ন স্থানে অর্ধশিক্ষিত মোল্লারা সাধারণ জনগণের মাঝে হিংসা আর বিদ্বেষের বাণী প্রচার করে। দেশের সুষম উন্নয়ন সম্ভব নয়, যদি সমাজে চরম আর্থিক বৈষম্য বিরাজ করে। বাংলাদেশে এই বৈষম্য খোলা চোখে দৃশ্যমান। দুর্নীতি দেশের উন্নয়ন পেছন থেকে টেনে ধরে। বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার পর এক জনসভায় বলেছিলেন, দেশের খেটে খাওয়া শ্রমিকশ্রেণি দুর্নীতি করে না, করে সমাজের উচ্চবিত্তরা। দীর্ঘ পঁয়তাল্লিশ বছর পর তাঁর এই বক্তব্য এখনো সত্য। শেখ হাসিনা বা তাঁর পরিবারের সদস্যরা সব ধরনের দুর্নীতির ঊর্ধ্বে থেকেছেন—এই কথার সঙ্গে কেউ দ্বিমত করবেন না বলে বিশ্বাস করি। সেই কাজটি তো অন্য প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া বা তাঁর পরিবারের সদস্যদের ক্ষেত্রে বলা যাবে না। তাঁর আমলে দুর্নীতি তো একটি শিল্পে পরিণত হয়েছিল। কিন্তু একজন শেখ হাসিনাকে দেখে দলের অনেক নেতা প্রকৃত শিক্ষা নিতে পারেননি। হতে পারেননি বিনয়ী। তাঁর শিক্ষকের গায়ের চাদর পড়ে গেলে তখন তিনি ভুলে যান যে তিনি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। তিনি নিজে তাঁর বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের শিক্ষক প্রফেসর আনিসুজ্জামানের চাদর ঠিক করে দেন। ভারতে রাষ্ট্রীয় সফরসঙ্গী হওয়ার সুযোগ হয়েছিল। সঙ্গে তাঁর দুই শিক্ষক। অধ্যাপক আনিসুজ্জামান আর অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম। আমার ওপর দায়িত্ব পড়ে তাঁদের দেখভাল করার। দেখা হলেই প্রধানমন্ত্রী জানতে চেয়েছেন, তাঁর স্যাররা ঠিক আছেন তো। এমন প্রধানমন্ত্রী কোথায় পাওয়া যাবে? আমি লিখেছিলাম, ‘শেখ হাসিনার প্রতিদ্বন্দ্বী শেখ হাসিনা নিজে।’ বন্ধুবর মুনতাসীর মামুন লিখেছিল, ‘সব কিছুর বিকল্প আছে, শেখ হাসিনার বিকল্প নেই।’ শহীদকন্যা ডা. নুজহাত চৌধুরী প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে এক অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, ‘আমাদের জন্য আপনিই বাংলাদেশ।’ নুজহাতের এই কথার সঙ্গে দ্বিমত করার কী কোনো কারণ আছে? ১৯৭৫ সালের পর ত্রিশ লাখ প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত বাংলাদেশ তো হারিয়ে গিয়েছিল। সারা দেশে শুরু হয়েছিল বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জেনারেল জিয়ার নেতৃত্বে একাত্তরে পরাজিত জামায়াত-আলবদর-মুসলিম লীগের নেতা-সমর্থকদের উল্লাসনৃত্য। সেই উল্লাসনৃত্য থামাতে পেরেছিলেন শেখ হাসিনা ১৯৯৬ সালে ও পরবর্তী সময়ে সরকার গঠন করে। সেই পরাজিতরা এখন ঘাপটি মেরে আছে, কখন তাদের সরকার আবার ক্ষমতায় আসবে। তেমন রাষ্ট্রীয় দুর্যোগ সামনে রেখে কী করে শেখ হাসিনার অবসরের কথা বংলার মানুষ মেনে নেবে?

নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য বয়স কোনো বিষয় নয়। যোগ্যতা হচ্ছে আসল। শেখ হাসিনা যোগ্য পিতার যোগ্য কন্যা, তা তিনি তাঁর কর্ম দ্বারা প্রমাণ করেছেন। বর্তমানে তাঁর বয়স বাহাত্তর। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এই মেয়াদ শেষ হলে তাঁর বয়স হবে সাতাত্তর। মালয়েশিয়ায় দেশের প্রয়োজনে বিরানব্বই বছর বয়সে মাহাথির মোহাম্মদ অবসর থেকে ফিরে এসেছেন। শেখ হাসিনার সুস্থতা আর দীর্ঘায়ুর জন্য দেশের কত মানুষ নিত্যদিন দোয়া করে, তা হয়তো তিনি জানেনই না। এত মানুষের ভালোবাসা আর দেশের মানুষের প্রত্যাশা ফেলে কোথায় যাবেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। অবসর নিয়ে অবশ্যই টুঙ্গিপাড়া যাবেন। তবে সেই সময় যে এখনো আসেনি। ইতিহাস আপনাকে যত না সৃষ্টি করেছে, আপনি ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন তার কয়েক গুণ বেশি। অবসরের বিষয়টা এখন তোলা থাকুক।

লেখক : বিশ্লেষক ও গবেষক

এই বিভাগের আরো সংবাদ
well-food