বাংলাদেশের বইমেলার পথিকৃৎ: সরদার জয়েনউদদীন

  অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ২২:১৩

খান মাহবুব : বাঙালির ইতিহাস চর্চার নাকাল দশা অতীত থেকেই বহমান। ইতিহাস চর্চার এই করুণ অবস্থা দেখেই ১৮৮০ সালে বঙ্কিমচন্দ্র বলেছিলেন, ‘‘বাঙালির ইতিহাস নাই, যাহা আছে তাহা ইতিহাস নয়, তাহা কতক উপন্যাস, কতক বাংলার বিদেশী বিধর্মী অসার পরপীড়কদিগের জীবন চরিতমাত্র। বাংলার ইতিহাস চাই, নইলে বাংলার ভরসা নাই।”

সত্যই আমাদের ইতিহাসের অনেক সমৃদ্ধ উপকরণ থাকলেও তার সংরক্ষণ ও যথার্থ উপস্থান নেই। ফলে অনেক সময় ইতিহাস পাঠে বিভ্রাট দেখা যায়। সংকীর্ণতা, তথ্যের ঘাটতি, একপেশে দৃষ্টিভঙ্গিসহ নানা নেতিবাচক অনুষঙ্গ যোগ হয় ইতিহাস চর্চায়। ফলে ইতিহাসের সত্যপাঠে সত্যের দ্বার যথার্থভাবে উন্মোচিত হয় না। এ কথা বাঙালির ইতিহাস পাঠের অনেক ক্ষেত্রেই লক্ষণীয়। আমাদের বইমেলার অঙ্কুর ও বিকাশ নিয়ে নানা আলোচনা হয়, কিন্তু‘ অনেক ঘটনার পরম্পরা সার্বিকভাবে উপস্থাপন করা হয় না। ইতিহাসের লেখায় ও আলাপে অনেকের নাম সামনে চকচক করলেও গুণ বিচারে তারও আগে চলে আসবে আরো কিছু নাম। কিন্তু‘ তা সত্ত্বেও মুখে মুখে কিছু নাম সামনে থিতু হয়ে আছে ইতিহাস হয়ে। পিছনে পড়ে থাকা ইতিহাসের খেরোপাতার ধূলিতে ধূসর এই নামগুলোকে কে সামনে আনবে এদের গুণবিচার করে? এমনিভাবে ইতিহাসের পৃষ্ঠা থেকে প্রায় মুছে যেতে বসেছে একটি নাম- সরদার জয়েনউদদীন। তিনি বাংলাদেশে বইমেলা আন্দোলনের পথিকৃৎ। আলোচনার টেবিলে সরদার জয়েন উদদীনের নাম যেখানেই থাকুক কর্ম বিচারে তিনিই পুরোধা। 
এদেশে বইমেলার উদ্ভব ও বিকাশের কথা বলতে গিয়ে লোক গবেষক ও বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান লিখেছেন ‘বাংলাদেশের বইমেলার উদ্ভবের ইতিহাস খুবই কৌতূহলোদ্দীপক। বইমেলার চিন্তাটি এদেশে প্রথমে মাথায় আসে প্রয়াত কথাসাহিত্যিক জাতীয় গ্রন্থ’কেন্দ্রের সাবেক পরিচালক সরদার জয়েনউদদীনের। তিনি বাংলা একাডেমিতে ১৯৬২ সালে প্রকাশনা ও বিক্রয় বিভাগে প্রকাশনাধ্যক্ষ হিসেবে কর্মরত ছিলেন। বাংলা একাডেমির তৎকালীন সচিব আহম্মেদ হোসেনের স্বাক্ষরকৃত নিয়োগপত্রে দেখা যায় সরদার জয়েনউদদীন ২৮০ টাকা মূল বেতন আর এলাউন্স সহযোগে চাকুরিতে যোগদান করেন। তিনি ১৯৬৪ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত বাংলা একাডেমিতে কর্মরত ছিলেন।২ পরে তিনি জাতীয় গ্রন্থ কেন্দ্রে যোগদান করেন। যখন তিনি বাংলা একাডেমিতে ছিলেন তখন বাংলা একাডেমি প্রচুর বিদেশি বই সংগ্রহ করত। এর মধ্যে একটি বই ছিল Alfred stefferud সম্পাদিত the wounderful world of books নামের একটি সংকলন। এতে বইয়ের জগত সংক্রান্ত ৭২টি বিচিত্র লেখা পড়তে গিয়ে তিনি হঠাৎ দু'টি শব্দ দেখে পুলকিত বোধ করেন। শব্দ দুু'টি হলো : Book এবং Fair। কত কিছুর মেলা হয়। কিন্তু‘ বইয়ের যে মেলা হতে পারে এবং বইয়ের প্রচারের কাজে এই বইমেলা কতটা প্রয়োজনীয় সেটি তিনি এই বই পড়েই বুঝতে পারেন। ওই বইটি পড়ার কিছু পরেই তিনি ইউনেস্কোর শিশু-কিশোরদের পাঠ-উপকরণ উন্নয়নের একটি প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন করেছিলেন । কাজটি শেষ হওয়ার পর তিনি ভেবেছিলেন বিষয়গুলো নিয়ে একটি প্রদর্শনীর ব্যাবস্থা করবেন। তখনই তাঁর মাথায় আসে বইমেলার বিষয়টি। তিনি ভাবলেন প্রদর্শনী কেন, এগুলো নিয়ে তো একটি শিশু গ্রন্থ মেলার ব্যবস্থা করা যায়?

যেমন ভাবনা তেমন কাজ। তিনি বইমেলার আয়োজন করলেন। শিশু গ্রন্থ’মেলার পোশাকি নাম নিয়ে আয়োজিত হলেও অনেক ধরনের বইয়ের সমাহার ছিল সেই বইমেলায়। প্রসঙ্গত শিশু সাহিত্যের প্রতি সরদার জয়েনউদদীনের বিশেষ আগ্রহ ছিল। তিনি ১৯৫৫-১৯৫৬ সালে পাকিস্তান কো-অপারেটিভ বুক সোসাইটি হতে প্রকাশিত ‘শাহীন’ ও ‘সেতারা’ নামীয় শিশু-কিশোরদের পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন।   

১৯৬৪ সালে সরদার জয়েনউদদীনের উদ্যোগে পূর্ববঙ্গের প্রথম বইমেলার আয়োজনটি ছিল ব্যাপক। ১৯৬৪ সালের ১৮-২৪ অক্টোবর পর্যন্ত আয়োজিত এ গ্রš’মেলার ভেন্যু ছিলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগার ভবনের নিচতলায়। সেই সময়ে এই ভবনের নিচতলা পাবলিক লাইব্রেরি হিসেবে ব্যবহৃত হতো। সরদার জয়েনউদদীনের নেতৃত্বে সাতদিনব্যাপী আয়োজিত এ মেলায় প্রতিদিন বই বিষয়ক প্রবন্ধ পাঠ ও আলোচনার অনুষ্ঠিত হতো। সরদার জয়েনউদদীন ন্যাশনাল বুক সেন্টার অফ পাকিস্তানের ঢাকা কেন্দ্রের রিসার্চ অফিসার ও বইমেলা আয়োজক কমিটির সেক্রেটারি ছিলেন। কেন্দ্রীয় পাকিস্তান গ্রন্থ কেন্দ্রের পরিচালক ছিলেন ইবনে ইনশা, প্রধান কার্যালয় ছিল করাচিতে। বইমেলার উদ্বোধন করেছিলেন বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী। বইমেলায় বিভিন্ন পর্বের প্রবন্ধকার ও আলোচকদের মধ্যে ছিলেন ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, আবদুল কাদির, মোহাম্মদ নাসির আলী, জুলফিকার আলী, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, মুহম্মদ সিদ্দিক খান, সৈয়দ আলী আহসান, মোহাম্মদ মাহফ্জু উল্লাহ, মোহাম্মদ মোর্তজা, ফজলে রাব্বী, জিয়া হায়দার, হুমায়ুন খান প্রমুখ। পঠিত প্রবন্ধের শিরোনাম ছিল মুদ্রণ ও প্রকাশন: প্রতিবন্ধক ও প্রতিকার (মুহম্মদ সফিয়ুল্লাহ), বইয়ের বাজার (মোহাম্মদ নাসির আলী), গ্রন্থাকাগার সম্প্রসারণ ও জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির উপায় (মোহাম্মদ সিদ্দিক খান), জীবন রস আস্বাদনে গ্রন্থাকারের ভূমিকা (জুলফিকার আলী)।৪ পূর্ববঙ্গের প্রথম এই বইমেলায় আলাদা করে শিশু বিভাগে নানা বর্ণের, আকাশের গল্প-কাহিনী, ছড়া ও ছবির বই ছিলো বইমেলার উল্লেখযোগ্য দিক। কবি সুফিয়া কামালের নেতৃত্বে বেশ কিছু নারী পাঠককে বই কিনতেও দেখা গেছে। এই বইমেলা সম্পর্কে সমাপ্তি দিনে গ্রন্থমেলা আয়োজক কমিটির সভাপতি ড. মুহম্মদ এনামুল হক বলেন, গ্রন্থ মেলার জনপ্রিয়তা ও সাফল্য লক্ষ্য করে আমরা অভিভূত হয়েছি। এ কথা স্বীকার করতে দ্বিধা নেই যে, গ্রন্থমেলা আয়োজনের সময় আমরা এর জনপ্রিয়তা ও সাফল্য সম্পর্কে দ্বিধামুক্ত ছিলাম না। আমাদের ধারণা ছিল যে, হয়তো এ জাতীয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান জনসমাজের মনোরঞ্জনে সমর্থ হবে না। কিন্তু গত এক সপ্তাহ ধরে গ্রš’মেলায় যে বিপুল সংখ্যক দর্শক সমবেত হয়েছেন এবং নিজেদের দেশের গ্রন্থ ও প্রকাশনা শিল্প সম্পর্কে উৎসাহ প্রকাশ করেছেন তাতে আমরা বিস্ময়াভিভূত হয়েছি। আমাদের দেশের সংস্কৃতি সেবীদের এই আগ্রহ আমাদেরকে ভবিষ্যতের জন্য আশাবাদী করে তুলেছে”

পূর্বাণী, কার্তিক ১৩৭১, বঙ্গাব্দ সংখ্যায় গ্রš’মেলা নিয়ে প্রতিবেদনে মতলুব আনাম লিখেন ‘এবারকার গ্রন্থমেলার উদ্দেশ্য হলো জনসাধারণ বলতে আমরা যা বুঝি, তাদের মধ্যে সুপ্ত গ্রন্থ চেতনার উন্মেষ।’ ১৯৬৪ সালে বইমেলায় পঠিত প্রবন্ধের অংশবিশেষ নিম্নরূপ :
“প্রকাশকের দ্বারা লেখক সৃষ্টি হয় এবং সাহিত্যের সমৃদ্ধি হয়, যদি প্রকাশক বাজারে প্রকাশিত বই এবং পাঠকের আগ্রহ সম্পর্কে জ্ঞান রাখেন। ...লেখক খুঁজে বার করতে হবে, তবেই সর্বাঙ্গীণ সহেজ সুন্দর সাহিত্য সৃষ্টি হবে।”

আমাদের পূর্বসূিররা যখন স্কুল পাঠের বাইরে ছেপেছেন একখানা ‘আলেফ লায়লার কেচ্ছা’ এবং তা ছেপেই আত্মপ্রসাদ লাভ করেছেন, ঠিক তখনই আমাদের চোখের সামনেই অনেকে ছেপেছেন আরব্যোপন্যাসের সচিত্র শোভন সংস্করণ- ছেপেছেন মনোমুগ্ধকর রুবাইয়াৎ-ই-ওমর খৈয়াম। কে বলতে পারে যে, আমাদের মধ্যে কান্তি ঘোষ, নরেণ দেব, হেমেন্দ্রলাল রায় তখনও ছিলেন না কিন্তু; একথা অবধারিত সত্য যে, গুরুদাস চট্টোপাধ্যায় আমাদের কেউ ছিলেন না।

গ্রন্থমেলার আলোচনাপর্বে অংশ নিয়ে জ্ঞানতাপস ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ বলেন, “জনসাধারণের মধ্যে গ্রন্থচেতনা জাগাতে হলে তাদেরকে শিক্ষিত করে তুলতে হবে, অন্য যা সব রকম সাংস্কৃতিক আন্দোলনই ব্যর্থ হতে বাধ্য। যে দেশের জনগণের মধ্যে মাত্র শতকরা সাড়ে চারজন শিক্ষিত তাদের কাছে গ্রন্থকারের সমাদর আশা করা বাতুলতা মাত্র; আমাদের সরকার ও সংস্কৃতিসেবীরা যদি জনসাধারণের মধ্যে শিক্ষার বিস্তার ঘটাতে চান তবে তাদেরকে সুচিন্তিত কার্যক্রম গ্রহণ করতে হবে। শিক্ষার আলোর বিকীরণের মধ্য দিয়েই পাঠকদের মধ্যে গ্রন্থ চেতনা জাগানো সম্ভব ”। 
যদিও ১৯৬৯ সালে ক্ষুদ্র আঙ্গিকে পাকিস্তান আর্ট কাউন্সিলের উদ্যোগে অনুবাদক ফখরুজ্জামান চৌধুরী ময়মনসিংহে একটি বইমেলা আয়োজন করেছিলেন।৯ এবং ১৯৫৭ সালে ঢাকা’ সোভিয়েত দূতাবাসের কনসল অফিস এক বইমেলার (যা মূলত বই প্রদর্শনী) আয়োজন করেছিল কিন্তু আঙ্গিকের ক্ষুদ্রত্ব ও সাংগঠনিক কাঠামোর দুর্বলতা সর্বোপরি প্রচার ও প্রসারে ম্রিয়মাণ এসব বইমেলার স্বীকৃতি প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে সিদ্ধ হয়নি। এক্ষেত্রে কার্যকরণে ও সংগঠনে ১৯৬৪ সালে সরদার জয়েনউদদীনের নেতৃত্বে বাস্তবায়িত বইমেলা বাংলাদেশের (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের) প্রথম বইমেলা হিসেবে মান্য ও স্বীকৃতির জয়মাল্য বরণ করে আছে।

যে সময়ে সরদার জয়েনউদদীন পূর্ববঙ্গে বইমেলার সূত্রপাত ঘটান সেই কালপর্ব বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রবল প্রাবল্যের সময়। পাকিস্তান কায়েমের পরপরই ১৯৪৮ সালে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে চাপিয়ে দিতে বাঙালি সাংস্কৃতিক জাগরণের উপর আঘাত আসে। যে আঘাতে বাঙালি জাতিসত্তা বিপন্ন ভেবে সপ্রতিভ সাহসে ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলনে শহীদের রক্তের বিনিময়ে বাঙালি বাংলাভাষা স্বীকৃত ও সুসংহত হয়। সেই কালপর্বেই ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনী অঙ্গীকারের ষোড়শ দফা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ১৯৫৫ সালের ৩ ডিসেম্বর বাংলা একাডেমি প্রতিষ্ঠা হয়।

যে প্রতিষ্ঠান প্রাদেশিক সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন থেকে বাঙালির জাতিসত্তা ও মননের প্রতীকরূপে কাজ করতে থাকে, সেই প্রতিষ্ঠানে চাকুরির সুবাদে জড়িত হয়ে প্রাগ্রসর চিন্তার দীপ্যমান মানুষ জয়েনউদদীন সব সময় জাতীয় জাগরণের বীজমন্ত্র মাথায় নিয়ে কাজ করেছেন। এ সময় বাংলা একাডেমিতে আবদুল গণি হাজারী, সানাউল হক, মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী, মুনীর চৌধুরী নিয়মিত আসতেন ও একাডেমির কর্মকর্তাদের সঙ্গে আড্ডার মাধ্যমে শিল্পসংস্কৃতির গতি ও গন্তব্য বিষয়ক আলোচনা করতেন। এমন পরিম-লে সরদারের সৃজনপ্রত্যয়ী মন বাঙালির সাংস্কৃতিক জাগরণে জ্বালানি সরবরাহের কাজে নিয়োজিত ছিলেন । সরদার জয়েনউদদীন বাংলা একাডেমিতে কর্মসূত্রে সহকর্মী হিসেবে যাঁদের পেয়েছিলেন তাঁর মধ্যে অন্যতম ছিলেন গ্রন্থ বিজ্ঞানী ফজলে রাব্বি। তিনিও বাংলা একাডেমিকে কীভাবে বাঙালির সাংস্কৃতিক অগ্রগতির ক্ষেত্রে অধিক কর্মক্ষম রাখা যায় সে চিন্তায় মগ্ন ছিলেন। অন্যান্য সহকর্মীরাও অনুরূপ মনোভাব পোষণ করতেন। ১৯৬৩-১৯৬৪ সালে বাংলা একাডেমি সম্পর্কে বলতে গিয়ে ফজলে রাব্বি বলেন, “বাংলা একাডেমিতে বই প্রকাশের জন্য যে অনুদান পাওয়া যেত তা দিয়ে মাত্র গোটা দশ বারোটি বই প্রকাশ হাজার কপি করে প্রকাশ করা সম্ভব হতো। আমরা সেটুকু অর্থ দিয়ে দ্বিগুণ বই ছাপিয়ে প্রকাশ করতাম। সে কাজ সম্ভব হতো কারণ সব বই একসঙ্গে বাঁধাই করতাম না। বাঁধাইয়ের টাকা বাঁচিয়ে সে টাকা দিয়ে আরো বই ছাপতাম। আরো বই অর্থাৎ নতুন টাইটেলের বই”।

ওই সময় মাতৃভূমির শিল্প-সংস্কৃতির চর্চার ক্ষেত্রে একটা বড় সমস্যা ছিলো আমাদের প্রকাশনার নাজুক অবস্থা। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, পাকিস্তান সাহিত্য সম্মেলনে তৎসময়ে সভাপতির বক্তব্যে পল্লীকবি জসীমউদদীন বলেন নানা সঙ্কটের মধ্য দিয়ে আমাদের বইগুলি ছাপা হইয়া যখন বাহির হয়, তাহারা দেখিতেও যেমন কুৎসিত, দামও পড়ে তেমনি বেশি। সীমান্তের ওপার হইতে যেসব চকচকে বই আমাদের বাজারে আমদানী হয়, তাহার দাম পড়ে আমাদের দামের অর্ধেকে। আমাদের মানসকন্যারা ছেঁড়া ন্যাকড়া আর চটের বসন পরিধান করিয়া সেইসব রঙীন শাড়ী আর অলঙ্কারের জৌলুসভরা সুন্দরীদের পাশে পাঠকের উপহাসের পাত্র হইয়া বিরাজ করে।

সার্বিক পরিস্থিতি বাঙালি সংস্কৃতির বিকাশে বৈরীতার আভায় আ”ছাদিত ছিল। রাষ্ট্রীয় আচার বাঙালিদের অগ্রগতির ক্ষেত্রে প্রতিকূল ছিলো। রাজপথের আন্দোলন নির্মমভাবে রাষ্ট্রযন্ত্র দমন করতো। কিন্তু নিজস্ব সংস্কৃতিকে ভিতর থেকে জাগিয়ে তোলার দায়িত্ব নিয়ে বাঙালি লেখক, সংস্কৃতিকর্মী, সংগঠকরা এগিয়ে নিয়েছিলো। সরদার জয়েনউদদীন একাধারে সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠক ছিলেন ফলে তাঁর মধ্যে বাঙালি জাতয়তাবাদী চেতনার ভ্রমণ অনেক গভীরে রোপিত ছিলো। যার বিস্তার ও বিকাশে তিনি সব সময় সৃজনশীল কর্মের মাধ্যমে মানুষকে জাতিগঠন ও অগ্রায়ণে সংযোগ ঘটাতে চাইতেন। এ সব বর্ণনার সত্যতা মেলে তাঁর উদ্যোগ, আয়োজন ও বই সংশ্লিষ্ট কর্মকান্ডে।

আজ বাংলাদেশে বইমেলার উদ্ভবের অর্ধশতক পরে আমরা অনেক ব্যক্তি সংস্থা সংগঠন প্রক্রিয়া পদ্ধতির মিলনে শিক্ষানীতি প্রণয়ন করে শিক্ষার যে মৌল লক্ষ্য ‘ব্যক্তি ও জাতীয় জীবনে নৈতিক, মানবিক, সাংস্কৃতিক, বিজ্ঞানভিত্তিক ও সামাজিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠাকল্পে শিক্ষার্থীদের মননে, কর্মে ও ব্যবহারিক জীবনে উদ্দীপনা সৃষ্টি করা।

এসব বিষয় অনেক আগেই আঁচ করতে পেরেছিলেন সরদার জয়েনউদদীন। যার প্রতিফলন ঘটেছে তাঁর উদ্যোগ ও কর্মে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত বইমেলার পূর্বেও ১৯৬৪ সালে ঢাকার টিচার্র্স ট্রেনিং কলেজে একটি বইমেলার আয়োজন করেছিলেন সরদার জয়েনউদদীন। ওই বইমেলা উদ্বোধন করেন তৎকালীন ডিপিআই শামসুল হক। সরদার জয়েনউদদীনের উদ্যোগে ১৯৭০ সালে নারায়ণগঞ্জ ক্লাবের সহায়তায় সুধীজন পাঠাগার নারায়ণগঞ্জে একটি বইমেলার আয়োজন করে। নারায়ণগঞ্জের বইমেলায় সুধীজন পাঠাগারকে সহায়তা দিয়েছিল জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র ও কেন্দ্রীয় বাংলা উন্নয়ন বোর্ড সুধীজন পাঠাগারের তৎকালীন কর্মাধ্যক্ষ ছিলেন পাঠাগারের প্রতিষ্ঠাতা কর্ম্যধ্যক্ষ ফজলে রাব্বি। বাৎসরিক সাংস্কৃতিক সপ্তাহের অংশ হিসেবে এই বইমেলা আয়োজিত হয়, যা বাংলাদেশের (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের) প্রথম বড় পরিসরের বইমেলা।

নারায়ণগঞ্জ বইমেলায় উৎসুক দর্শকও এসেছিলেন প্রচুর। বইয়ের বেচাকেনাও মন্দ ছিল না, কিš‘ তাদের জন্য ছিল একটি রঙ্গ তামাশাময় ইঙ্গিতধর্মী বিষয়ও। মেলার ভেতরে একটি গরু বেঁধে রেখে তার গায়ে লিখে রাখা হয়েছিলো ‘আমি বই পড়ি না’। সরদার জয়েনউদদীনের এই উদ্ভাবনা দর্শকদের শুধু কৌতুকের খোরাকই জোগায়নি, পাঠ সচেতন ও গ্রন্থমনস্কও করে তুলেছিল।

এই বইমেলাকে বিশেষ সহযোগিতা দিয়েছিলেন কেন্দ্রীয় বাংলা উন্নয়ন বোর্ড। মেলায় বিভিন্ন ব্যানারে তাদের নামও দেখা যায়। কেন্দ্রীয় বাংলা উন্নয়ন বোর্ড বই প্রদর্শনের ব্যবস্থাও করেছিলেন। কেন্দ্রীয় বাংলা উন্নয়ন বোর্ড ১৯৬২ সালে প্রতিষ্ঠিত। এ সংস্থা পাঠ্য পুস্তকের উন্নয়নে কাজ করলেও সামগ্রিক বাংলা সাহিত্য সংস্কৃতির উন্নয়নে এ সংস্থা কাজ করেছে। নজরুল রচনাবলি প্রকাশ, সারা দেশের প্রকাশিত বইয়ের দু’কপি করে সংগ্রহ, এক হাজার আটশত পা-ুলিপি সংগ্রহ করে এই প্রতিষ্ঠান। কেন্দ্রীয় বাংলা উন্নয়ন বোর্ডের পরিকল্পনায় অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী অক্লান্ত পরিশ্রম করে বাংলা টাইপ রাইটার আধুনিকায়ন করেন। স্বাধীনতার পর কেন্দ্রীয় বাংলা উন্নয়ন বোর্ড বাংলা একাডেমির সঙ্গে একীভূত হয়।

নারায়ণগঞ্জ স্বাধীনতাপূর্ব এই বইমেলার আলোচনা পর্বে অংশ নেন অধ্যাপক আবদুল হাই, মুনীর চৌধুরী, সরদার ফজলুল করিম প্রমুখ। বাংলাদেশে বইমেলা নিয়ে সাংগঠনিক কর্মের চিন্তন ও কর্মপ্রয়াস সরদার জয়েনউদদীনের মস্তিষ্কপ্রসূত। উল্লেখ্য ১৯৬৪ সালের ৮জুন বাংলা একাডেমি থেকে অব্যাহতি নিয়ে সরদার জয়েনউদদীন পাকিস্তান ন্যাশনাল বুক সেন্টারের ঢাকা কেন্দ্রের রিসার্চ অফিসার হিসেবে ৪৫০/- টাকা বেতন স্কেলে যোগদান করেন। টেকনিক্যাল পে ৫০/-, চার্জ এলাউন্স ৫০/-সহ অনুমোদিত। ৮ জুন ১৯৬৪ সালে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের চাকুরিতে যোগদান করলেও নিয়োগ পেয়েছিলেন ২ জুন ১৯৬৪ সালে।১৭ কর্মজীবনে সেনাবাহিনীর চাকুরি থেকে শুরু করে বীমা কোম্পানীর চাকুরি তাঁকে জীবিকা হিসেবে প্রয়োজনের তাগিদে গ্রহণ করতে হলেও ন্যাশনাল বুক সেন্টারের চাকুরি তাঁর চিন্তা ও অভিজ্ঞতার সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ ছিলো।১৮ ফলে এই কমস্থলে সুযোগ পেয়েই তিনি নিত্য নতুন উদ্যোগের সংশ্লেষ ঘটান। 

পরাধীন পূর্ব পাকিস্তানে সরদারের বই সংশ্লিষ্ট কর্মপ্রয়াস সঠিকভাবে পাখা বিস্তৃত করতে পারেনি রাষ্ট্রীয় বৈমাতৃসুলভ আচরণের কারণে। কিন্তু স্বাধীনতার পর ১ জুলাই ১৯৭২ স্বাধীন দেশের জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের পরিচালক হিসেবে নিয়োগ পেয়ে তিনি স্বাধীন ও সার্বভৌম দৃষ্টিতে বই আন্দোলনকে এগিয়ে নেন। 

উল্লেখ্য, ৭ অক্টোবর ১৯৭২ সালে সরকারের শিক্ষা, সংস্কৃতি  ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম-সচিবের সভাপতিত্বে তাঁর পরিচালক পদটি সর্বসম্মতিক্রমে অনুমোদিত হয়।১৯  এ প্রসঙ্গে ১৯৭২ সালে সাপ্তাহিক বিচিত্রা পত্রিকায় এক সাক্ষাৎকারে সরদার বলেন, “আমরা পুরো পরিকল্পনাটিকে একটি আন্দোলন বলছি, কারণ সবাই যেন এতে আন্দোলিত হয়, সবাই যেন জাগ্রত হয়। বইয়ের জন্য, জ্ঞানের জন্য আরো উৎসাহী হয়। দেশের বিভিন্ন স্তরের লোকের মধ্যে শিক্ষার আলোক যদি স্পর্শ করাতে হয়, তবে সবাইকে বই পড়ার সুযোগ করে দিতে হবে। বাংলাদেশের ট্রপিক্যাল প্যারাডক্স হচ্ছে যে, যাদের বইকেনার পয়সা আছে তাদের বই পড়ারে ইচ্ছে নেই। যাদের বই পড়ার চাহিদা আছে তাদের বই কেনার ক্ষমতা নেই।”

স্বাধীন দেশের এমন বইবান্ধব চিন্তক মানুষটি ইউনেস্কো ঘোষিত আন্তর্জাতিক গ্রন্থবর্ষ হিসেবে ১৯৭২ সালকে সামনে পেয়ে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের উদ্যোগে বাংলা একাডেমিতে একটি আন্তর্জাতিক বইমেলার আয়োজন করেন। তিনি আয়োজক কমিটির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন, সভাপতি ছিলেন ড. মুহম্মদ এনামুল হক।২১ ১৯৭২ সালের ২০-২৬ ডিসেম্বর সপ্তাহব্যাপী এই বইমেলা বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত হয়েছিলো। বইমেলার উদ্বোধন করেন রাষ্ট্রপতি আবু সাঈদ চৌধুরী। 

আবু সাঈদ চৌধুরীর বক্তব্যে নব্য স্বাধীন দেশের শিল্প-সংস্কৃতির গতির নির্দেশক ছিল। তিনি বলেন, প্রয়োজন শুধু নিরলস কর্মসাধনার, পরিশ্রম ও প্রয়াসের। প্রয়োজন ব্যক্তি ও দলগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে জাতীয় স্বার্থ রক্ষণে, প্রয়োজন ভোগের আত্মপরতার উপরে ত্যাগের মহিমা প্রতিষ্ঠা, অনাড়ম্বর জীবন পদ্ধতির দৃষ্টান্ত ও আদর্শ স্থাপনের।

বইমেলার শ্লোগান ছিলো ‘সবার জন্য বই’। এই বইমেলায় ইউনস্কোসহ ভারত, জাপান, ফ্রান্স, অষ্ট্রেলিয়া, ভিয়েতনাম, সোভিয়েত ইউনিয়ন, বৃটেন, পূর্ব-জার্মানী বুলগেরিয়া অংশ নেয়। বইমেলায় বাংলাদেশসহ ১০টি দেশ অংশ নেয়। মেলা উপলক্ষে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাণী পাঠিয়েছিলেন।২৩ গ্রš’মেলায় আলোচনা সভা, সাহিত্য এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও চলচ্চিত্র প্রদর্শনের ব্যবস্থ্যা ছিল। এ অনুষ্ঠানের সময় বাংলা একাডেমির দেয়ালের বাইরে স্ট্যান্ডার্ড পাবলিশার্সের রুহুল আমিন নিজামী তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রগতি প্রকাশনীর কিছু বইয়ের পসরা সাজিয়ে বসেন। তাঁর দেখাদেখি পরদিন যুক্ত হন মুক্তধারা প্রকাশনীর প্রকাশক চিত্তরঞ্জন সাহা ও বর্ণমিছিলের কর্ণধার তাজুল ইসলাম। সেই চট বিছানো বইয়ের পসরাই নানা অনুষঙ্গের মিছিলে আজকের অমর একুশে গ্রন্থমেলার মহীরূহে পরিণত হয়েছে। যে চট বিছিয়ে বই বিক্রির আয়োজনের প্রেক্ষাপট ও পরিবেশ অনেক পূর্ব থেকেই সৃজন করেছিলেন সরদার জয়েনউদদীন এ কথা ইতিহাসের স্মারক। তা আমাদের মনে রাখতে হবে এবং মান্য করতে হবে।

১৯৭২ সালের আন্তর্জাতিক বইমেলার উৎসব লোগো এবং এ সময় পাঠকের উ”চারণ নামে ছোট একটি নান্দনিক পুস্তিকা প্রকাশ করেছিলেন সরদার জয়েনউদদীন। বইমেলার দাওয়াত কার্ড ও খামের ডিজাইনেও নান্দনিকতা ছিলো। বইমেলার পুস্তিকা ২৪ পৃষ্ঠার ও মোহাম্মদ মহসীনের আঁকা প্র”ছদপট ছিলো। পুস্তিকাটি বই নিয়ে বিভিন্ন মনীষীর বাণী ও বইসংক্রান্ত বিভিন্ন তথ্যের সন্নিবেশ ছিলো। 

আন্তর্জাতিক গ্রন্থবর্ষ ১৯৭২ উপলক্ষে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র হতে প্রকাশিত স্মরণিকার ইনার কভারে লেখা ছিল  গ্রন্থজগৎ সম্পর্কিত সব রকমের খবর এবং সাহিত্যধারার সঙ্গে নিজেকে সম্যক ওয়াকিবহাল রাখতে হলে ‘বই’ জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র বাংলাদেশ কর্তৃক প্রকাশিত মাসিক পত্রিকা আপনার হাতের কাছেই চাই। নিজে গ্রাহক হোন এবং বন্ধুবান্ধবদের গ্রাহক হতে বলুন। বার্ষিক চাঁদা ৫.০০ ষান্মাসিক চাঁদা ২.৫০ কার্যালয় : ৬৭, ক. পুরানা পল্টন, ঢাকা-২, ফোন ২৮০৯৫১, জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র, বাংলাদেশ।

আন্তর্জাতিক গ্রন্থবর্ষ উপলক্ষ্যে প্রকাশিত পুস্তিকার সূচনাতে লেখা ছিল “প্রিয়জনদের প্রিয় গ্রন্থ উপহার দিন”। “মনের মতো বইয়ে সমৃদ্ধ করে তুলুন আপনার ব্যক্তিগত সংগ্রহ; আপনার সন্তান সন্ততি প্রভূত উপকৃত হবে। গ্রন্থের সাহচর্য মনোজগতকে সমৃদ্ধ করে।” “পাড়ায় পাড়ায় আদর্শ লাইব্রেরী গড়ে তুলুন। তাহলেই গড়ে উঠবে সুস্থ্য’ পরিবেশ। জন জীবনে লাইব্রেরী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। সম্মিলিত প্রচেষ্টায় গড়ে তুলুন আদর্শ লাইব্রেরী। পুস্তিকায় রবীন্দ্রনাথ, প্রমথ চৌধুরী, মেকলে, ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, বুদ্ধদেব বসু, মোতাহার হোসেন চৌধুরী, শামসুর রাহমান, সৈয়দ মুজতবা আলী, সরদার জয়েনউদদীন প্রমুখের বই সংশ্লিষ্ট উক্তি শোভা পায়।

সরদার জয়েনউদদীন লিখেন “যে জাতি যত বেশি পরিমাণে গ্রš’ অধ্যয়ন করেছে এবং সে অধ্যয়নের ফলশ্রুতি কার্যে নিয়োজিত করতে পারছে সে জাতি তত বেশি আবিষ্কারের গৌরবে গৌরবান্বিত হচ্ছে”। এছাড়াও পুস্তিকায় পাঠকদের গ্রন্থ মনস্ক করতে নানা চিত্তাকর্ষক কথামালার সন্নিবেশ ছিলো। যেমন “বিছানার পাশে থাকুক না একখানা বই। ঘুম যতক্ষণ না আসে কাজে লাগবে।”

“প্রতি মাসেই কিছু কিছু নতুন বাংলা বই কিনবেন; এবং জীবনযাত্রার পক্ষে খাদ্য জামা কাপড়ের মতো অত্যাবশ্যক দ্রব্যের তালিকা থেকে বই জিনিসটাকে খারিজ করবেন না।” “বই আমাদের বন্ধু হতে পারে, সহচর হতে পারে। স্পেৎসিয়া উপসাগরের জলে ডুবে মৃত্যু হয়েছিল শেলীর আর তখনো তাঁর পকেটে ছিল কীটস্-এর কাব্য গ্রন্থ।
১৯৭২ সালে সরদার জয়েনউদদীন জাতীয় গ্রন্থ কেন্দ্রের বিক্রয় কেন্দ্র হতে বৎসরের বেশি সংখ্যক বইক্রেতাদের পুরস্কারে ঘোষণা দিয়েছিলেন কিন্তু আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় এই কার্যক্রম বাস্তবায়িত হয়নি।

১৯৭২-এর বইমেলা সম্বন্ধে পত্রিকার সংবাদ ছিল এ রকম যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশে আমরা এমন একটি উৎসবের ব্যাবস্থা করতে পেরেছি এটা কম আনন্দের কথা নয়। আমাদের সাধ অনেক সাধ্য সীমিত। এই সীমিত সাধ্যের সিড়ি বেয়েই বই প্রকাশ, বই মেলা, ও বই পড়ার দুর্বার আন্দোলনে আমরা ঝাঁপিয়ে পড়বো। অশান্ত বিশ্বে বই বয়ে আনুক শান্তির বাণী এই হোক আমাদের সকলের শ্লোগান।
সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭২ সালের বইমেলার অব্যবহিত পর ১৯৭৩ ও ১৯৭৪ সালে এপ্রিল মাসে (বাংলা বৈশাখ মাসে) সরদার জয়েনউদদীন বর্তমান শিল্পকলা একডেমিতে একটি জাতীয় গ্রন্থমেলার আয়োজন করেন।২৮ জাতীয় গ্রš’কেন্দ্রের আয়োজনে জেলায় জেলায় বইমেলার আয়োজনের প্রসার ঘটান। এসব মেলায় শুধু বইয়ের পসরা নয়, আলোচনা, আড্ডা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের সহযোগ থাকত। অভিনেতা ও আবৃত্তিশিল্পী গোলাম মোস্তফা, হাসান ইমাম, হাসান আজিজুল হকসহ শিল্পী, সাহিত্যিক ও বহু বুদ্ধিজীবী এতে অংশ নেন। 

সরদার জয়েনউদদীন অনুধাবন করতেন তৃণমূলের বইমেলা হচ্ছে সমাজ জাগরণের বাতিঘর। তাই তিনি চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, সিলেট, ময়মনসিংহ, দিনাজপুর, বরিশাল, বগুড়া শহরে বাৎসরিক মেলার আয়োজন করেন। এর মধ্যে আঞ্চলিক মেলার আয়োজন করে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র যশোহর ও মাদারীপুরে। তিনি জেলায় জেলায় বইমেলা করেই থামতে চাননি। তাঁর চিন্তার ক্যানভাসে ছিলো থানাগুলোতে বইমেলার আয়োজন করা। কিন্তু তাঁর সে উদ্যোগ তিনি নানা প্রতিকূল পরিস্থিতিতে বাস্তব রূপদান করতে পারেন নি।

এ সময় ঢাকার বাইরের বইমেলার বিভিন্ন পর্বে অংশ নেন কবি শামসুর রাহমান, আবু হেনা মোস্তফা কামাল, অভিনেতা গোলাম মোস্তফা, হাসান আজিজুল হক প্রমুখ। সরদার জয়েনউদদীনের তৃণমূলের বইমেলার মাধ্যমে পাঠাভ্যাস বৃদ্ধির আন্দোলনে উজ্জীবিত হয়ে ঢাকার বাইরে সেই সময় কয়েকজন গ্রš’কর্মী সৃজন হয়েছিলো। যাদের মধ্যে যশোরের অধ্যাপক শরীফ হোসেন ও আমীর উল ইসলাম খান মাদারীপুরের কামাল উজ্জামান প্রমুখ উল্লেখযোগ্য।

সরদার জয়েনউদদীনের সৃজিত পথেই অনুপ্রাণিত হয়ে যশোরে ১৯৬৭ সালে অধ্যাপক শরীফ হোসেনের সংগঠনে প্রথম বইমেলার সূত্রপাত হয়। যা পরবর্তী সময়ে বৃহত্তর যশোরে ছড়িয়ে পড়ে। অধ্যাপক শরীফ হোসেন ও ফজলে রাব্বী পরবর্তীতে বাংলাদেশে গ্রš’গার আন্দোলন সংগঠিত ও বিস্তৃত করেছেন।

ফজলে রাব্বী ও অধ্যাপক শরীফ হোসেনের সঙ্গে জয়েনউদদীনের কর্ম ও সংগঠন সূত্রে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ও সান্নিধ্য ছিলো। ফলে বই ও বইমেলা সংশ্লিষ্ট কর্মে ত্রয়ী ব্যক্তির সহযোগ ছিলো। সরদার জয়েনউদদীনের কর্মপ্রয়াসে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রে নব-আঙ্গিকে ভিন্ন মাত্রা পায়। বইমেলা আয়োজনের পাশাপাশি বই পড়ার আয়োজনও করেন। বই পড়ার হার ও মান নির্ণয়ের জন্য সারাদেশে জরিপ চালান। বাংলাদেশের লেখকদের গ্রন্থপঞ্জিও প্রকাশ করেছিলো জাতীয় গ্রš’কেন্দ্র। স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীদের গ্রন্থ পাঠের অভ্যাস গড়ে তুলতে স্কুলে স্কুলে বক্তৃতামালার আয়োজন করা হয়েছিল। 

বাংলাদেশে গ্রন্থজগতের নানা চিন্তা, কল্প, নিরীক্ষা নিয়ে আজও যে পত্রিকাটি টিকে আছে সেটি হচ্ছে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র থেকে প্রকাশিত ‘বই’-পত্রিকা। কেন্দ্রের সূচনাকাল থেকে পত্রিকাটি প্রকাশিত হয়। এই পত্রিকাটির পরিচালনা, সম্পাদনা ও প্রকাশনার মুখ্য ভূমিকা পালন করেন সরদার জয়েনউদদীন। বই পত্রিকার প্রথম সংখ্যা বের হয় ফাল্গুন ১৩৭১ বঙ্গাব্দে। সম্পাদকীয়তে পত্রিকা প্রকাশের উদ্দেশ্য সম্পর্কে জয়েনউদদীন লিখেন দেশের বর্তমান বইয়ের অবস্থা কোন ধারায় প্রবাহিত, কোন প্রকাশক কি বই প্রকাশ করছেন তার বিস্তারিত পরিচয় এই পত্রিকায় বাস্তবায়ন পাবে। এই পত্রিকার ভূমিকা হবে বইয়ের উৎকৃষ্ট সাধন, পাঠক লেখক, প্রকাশক, মুদ্রণ গ্রন্থজগত সম্পর্কিত যাবতীয় খবর জনসাধারণ্যে প্রকাশ করা। প্রকাশক, মুদ্রক এবং যারা গ্রন্থ জগতের সাথে সম্পর্কিত রয়েছেন তাদের ব্যবসা সংক্রান্ত অসুবিধাগুলি আমরা বইয়ে নানাভাবে আলোচনা করে দূর করতে তৎপর হবো।

সূচনা থেকে সরদার জয়েনউদদীন গ্রš’কেন্দ্রে তার কর্মকাল পর্যন্ত (ফেব্রুয়ারি ১৯৭৮, ত্রয়োদশ বর্ষ, একাদশ, দ্বাদশ সংখ্যা) বই পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন। স্বাধীনতার পূর্বকালে বই পত্রিকার সহযোগী সম্পাদক ছিলেন কথাসাহিত্যিক রশীদ করিম, স্বাধীনতা পরবর্তীকালে কবি কায়সুল হক।

শিশুসাহিত্যের অনুরাগীদের প্রতি সরদার জয়েনউদদীনের বিশেষ দরদ ছিলো। চেষ্টা করতেন জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের বই বিষয়ক কর্মকান্ডে গ্রন্থ’মনস্ক লেখক, সাহিত্যিকদের কাজের সুযোগ তৈরি করার। তাঁর কর্মজীবনে বিবৃত বয়ানের সত্যতা একাধিক বার পাওয়া যায়।

১৯৭২ সালে সরদার জয়েনউদদীন যখন জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের পরিচালক তখন তিনি কবি কায়সুল হকের জন্য নতুন পদ সৃজন করে চাকুরি দিয়েছিলেন এবং বই পত্রিকার সহযোগী সম্পাদকের দায়িত্ব দিয়েছিলেন।

জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রর পরিচালক হিসেবে সরদার জয়েনউদদীন ভারত, শ্রীলঙ্কা, জার্মানি প্রভৃতি দেশে অনুষ্ঠিত বইমেলায় অংশগ্রহণ করেন। জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্টে ১৯৭৩ সালে বইমেলায় অংশ নিয়ে বাংলাদেশের স্টল রৌপ্য পদক পায়। সরদার জয়েনউদদীন ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলায় ব্যক্তিগতভাবে একটি পদকও লাভ করেন। ১৯৭৮ সালে রাশিয়াতে যাওয়া হয়েছিলো সরদার জয়েনউদদীনের। কিন্তু তার পূর্বেই সরকার এই প্রাগ্রসর চিন্তার মানুষটিকে অযাচিতভাবে অব্যাহতি দেন জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের পরিচালকের দায়িত্ব থেকে। তৎকালীন সরকার তাদের চিন্তা ও পরিকল্পনের সঙ্গে সরদারের সাজুয্য মনঃপুত হয়নি বিধায় অসময়ে জয়েনউদদীনকে জাতীয় গ্রš’কেন্দ্র ছাড়তে হয়। ফলে গ্রন্থকেন্দ্র বঞ্চিত হয় সরদারের কর্মকুশলতার সুফল লাভে। 

সরদার জয়েনউদদীনের বই বিষয়ক কর্মকা- সম্পর্কে তাঁর জেষ্ঠ্য কন্যার বক্তব্য শিক্ষার পাশাপাশি মানসিক উৎকর্ষতা বিকাশে জীবনবোধকে উন্নত করতে বইয়ের ভূমিকা অনস্বীকার্য। এদেশের কিছু শিশুকিশোর, যুবক, প্রবীণ আপামর জনসাধারণকে তাই বই পড়ায় আগ্রহী করে তুলতে শুরু করেছিলো গ্রন্থমেলা আন্দোলন। চেয়েছিলেন গ্রামে গ্রামে পাঠাগার গড়ে উঠুক। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় আয়োজন করেছেন বইমেলা, বই নিয়ে আলোচনা গল্পবলা কবিতা পাঠ ইত্যাদি।

সরদার জয়েনউদ্দীনের দেশব্যাপী বইমেলা আয়োজন প্রসঙ্গে ডক্টর আবু হেনা মোস্তফা কামাল বলেছেন “প্রায় এককভাবে সারাদেশে বছরের পর বছর বই পড়ার অভ্যাসকে জনপ্রিয় করার তিনি যে আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন তার মূল্য একদিন নির্ধারিত হবে”।

জাতীয় গ্রন্থ’কেন্দ্র হতে অন্যায় ও অযাচিতভাবে অব্যাহতির ফলে সরদার জয়েনউদদীনের গ্রন্থ’প্রেম ও গ্রন্থ আন্দোলনে সাংগঠনিক উদ্যোগের যবনিকাপাত ঘটে। ফলে তাঁর ভিতর গভীর বেদনাবোধ পরিষ্ফুট হয়। এই প্রসঙ্গে সরদার জয়েনউদদীন তাঁর এক ভক্ত যশোহরের শাহজালালকে পত্রে লিখেছিলেন “তুমি আমার পরিচয় জানতে চেয়েছ। কিছুকাল পূর্ব পর্যন্ত আমার দুটি পরিচয় ছিল। এক. জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের পরিচালক, দুই. একজন সাধারণ লেখক। প্রথমটি বর্তমান সরকারের রোষাণলে হারিয়েছি। এখন শুধু দ্বিতীয়টির পরিচয়েই কোন মতে বেঁচে আছি। সেটাও বোধ হয় আর বেশিদিন থাকবে না। কেননা কুসংস্কার দেশে এমনভাবে জেগে আসছে যে, না যাবে তার বিরুদ্ধে কিছু লেখা- না যাবে সে চাপ সহ্য করা।

জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের আজ নতুন ভবন রয়েছে, জনবল, বাজেট আছে, গ্রন্থ আজ অবধি সরদার জয়েন উদদীনের মতো নেতৃত্ব গ্রন্থকেন্দ্র পায়নি। যে জাতীয় গ্রš’কেন্দ্রকে নানা সীমাবদ্ধতার মাঝেও সরদার জয়েনউদদীন বইমেলা ও বইয়ের প্রচারপ্রসারে স্বাধীনতা পরবর্তীকালে একটি অনুকরণীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে সামনে নিয়ে এসেছিলেন, আজ নিয়মতান্ত্রিকভাবে অমর একুশে বইমেলা আয়োজনের দায় জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের উপর থাকলেও যে বিষয়ে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের কোনো উৎসাহ ও উদ্যোগ দেখা যায় না। বাংলা একাডেমির ২০১৩ সালের নতুন আইনেও বইমেলা আয়োজনের কোনো দায়িত্ব বিধিবদ্ধ নেই। কেবল আইনের একাডেমির কার্যাবলির মধ্যে ১৩নং অনুচ্ছেদে লেখা আছে “বাংলাভাষা ও সাহিত্য এবং বাংলাদেশের সংস্কৃতি ও জ্ঞানচর্চা বহির্বিশ্বে প্রচার ও পরিচিত করিবার জন্য বিদেশে সেমিনারও বইমেলার আয়োজন করা এবং বিভিন্ন দেশে বাঙালি অভিবাসী এবং তাহাদের নতুন প্রজন্মের সহিত বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও ঐতিহ্যের সংযোগ সৃষ্টির ব্যবস্থা গ্রহণ...”

বাংলা একাডেমি দীর্ঘদিনের রীতিকে মান্য করেই অমর একুশে গ্রন্থমেলার আয়োজনের দায়িত্ব পালন করে। এ কাজ করতে গিয়ে বাংলা একাডেমির মূল কাজ অর্থাৎ বাংলাভাষা সাহিত্য সংস্কৃতির উন্নত মানসম্পন্ন চর্চা ও গবেষণা এবং বাঙালি জাতির বুদ্ধিবৃত্তিক ইতিহাস রচনাও তার ব্যাখ্যা বিশেষণ৩৭-যা অনেকাংশে ব্যাহত হয়।

অথচ সরদার জয়েনউদদীন যে আদলে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রকে গড়ে তুলেছিলেন, কাগজে কলমে গ্রš’কেন্দ্রের দায়িত্ব ও পরিধি তাঁর পরবর্তী সময়ে অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে কিš‘ কার্যত জাতীয় গ্রš’কেন্দ্রের অবস্থা তথৈবচ। 

বাংলাদেশের সংবিধানের ২৩ অনুচ্ছেদে লেখা আছে-‘জাতীয় সংস্কৃতি, রাষ্ট্র জনগণের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও উত্তরাধিকার রক্ষণের জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন এবং জাতীয় ভাষা সাহিত্য ও শিল্পকলা সমূহের এমন পরিতোষণ ও উন্নয়নে ব্যবস্থাগ্রহণ করবেন যাহাতে সর্বস্তরের জনগণের জাতীয় সংস্কৃতির সমৃদ্ধীতে অবদান রাখিবার ও অংশগ্রহণ করিবার সুযোগ লাভ করিতে পারবে।’

এই অনুচ্ছেদের বাস্তবায়নের আলোকে বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান সৃজন ও পুনর্বিন্যাস করে স্বাধীনতা পরবর্তীকালের সরকার। জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র এই কার্যক্রমের আওতায় ন্যাশনাল বুক সেন্টার অব পাকিস্তানের আঞ্চলিক ঢাকা অফিস থেকে নাম ও পরিধি পরিবর্তন করে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র নাম ধারণ করে। জাতীয় গ্রš’কেন্দ্রের বিদ্যমান আইনের আলোকে উল্লেখযোগ্য কার্যাবলি হচ্ছে পুস্তক প্রকাশনা বিষয়ক জাতীয় এবং সরকারের পূর্বানুমোদনক্রমে আন্তর্জাতিক সেমিনার, সম্মেলন, কর্মশালা, সিম্পোজিয়াম ও বইমেলার আয়োজন ও পরিচালনা করা।

সরদার জয়েনউদদীন যখন জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের (স্বাধীনতা পরবর্তী) দায়িত্বগ্রহণ করেন তখন লোকবল ছিল ৯/১০ জন। সুসংহত আইন, কাঠামো, প্রবিধানমালা ছিল না, ছিলো আন্তরিকতা, দেশপ্রেম ও উদ্যোগ তাই নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও নানাবিধ আয়োজনে গ্রন্থকেন্দ্র সরব ছিলো। আজ অর্ধশতাধিক জনবল বাৎসরিক, তৃণমূলের পাঠাগার উন্নয়নের জন্য বাজেট ২ কোটি ৫০ লক্ষ টাকা।৪০ তা পাওয়া সত্ত্বেও জাতীয় গ্রš’কেন্দ্রের কর্মকা- কার্যকর ও দৃশ্যমান নয়। কারণ পরবর্তী সময়ে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের নেতৃত্বে সৃজন প্রত্যয়ী মানুষের সংযোগ খুব একটা ঘটেনি কার্যকারণে একথার প্রমাণ বহন করে।

সরদার জয়েনউদদীন আধুনিক ও বিজ্ঞানমনস্ক মানুষ ছিলেন। তিনি পারস্পরিক বিভিন্ন বিষয় ও ঘটনার সঙ্গে নিজের চিন্তা ও কর্মের যোগাযোগ ঘটাতেন। এজন্যই স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলা একাডেমিতে (১৪-২১ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৪) আয়োজিত বাংলা সাহিত্য সম্মেলনের বিশালতা সরদার জয়েনউদদীনকে অনুপ্রাণিত করেছিল। বিশেষত ভারতের অন্নদাশঙ্কর রায়ের নেতৃত্বে ছিলেন সুভাষ মুখোপাধ্যায়, লীলা রায়, ড. রমা চৌধুরী, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, ড. জগন্নাথ চক্রবর্তী, ড. হরপ্রসাদ মিত্র, মনোজ বসু, শ্রী সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায়, বিনয় সরকার, ড. আশুতোষ ভট্টাচার্যসহ ৭৫ জন লেখকের প্রতিনিধি দল। সম্মেলনের ১৩টি প্রবন্ধ, বিভিন্ন অধিবেশন বসে।

ভিয়েতনাম থেকে লেখক সংঘের সাধারণ সম্পাদক লুগয়েন দিয়েন, যুগোস্লাভিয়া লেখক সংঘের সাধারণ সম্পাদক সিডো জামিনভস্কি, রুমানিয়ার জাহারিয়া স্টানকুর-এর উপস্থিতি ও বক্তব্যে সে সব দেশের জাতীয় জাগরণের সূত্রের আঁচ করতে পেরেছিলেন সরদার জয়েনউদদীন। সম্মেলন উদ্বোধন পর্বে প্রধান অতিথি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বক্তব্যে সরদার জয়েনউদদীন তার কর্মের দিশা খুঁজে পেয়েছিলেন। বাংলা সাহিত্য সম্মেলনের উদ্বোধন ভাষণে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন “একুশের রক্তরাঙা পথ বেয়েই বাঙালির জাতীয়তাবাদী আন্দোলন এবং স্বাধীকার চেতনা ধীরে ধীরে এক দুর্বার গতি লাভ করে। আমাদের ভাষার ২০০০ বছরের একটি গৌরবময় ইতিহাস আছে আমাদের সাহিত্যের ভা-ার সমৃদ্ধ। আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য নিজস্ব বৈশিষ্ট্যে ভাস্বর। আজকে স্বাধীন জাতি হিসেবে বিশ্বের দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে হলে আমাদের ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্যের মর্যাদা দেশ ও বিদেশে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে।”

১৯৭৪ সাহিত্য সম্মেলনের বার্তায় সরদার জয়েনউদদীন ১৪-২০ এপ্রিল ১৯৭৪ বাংলাদেশে প্রথম জাতীয় গ্রন্থমেলা সেগুন বাগিচায় আর্ট কাউন্সিল ভবনে আয়োজন করে। এ মেলায় দেশের ১৯টি প্রকাশনা সংস্থা ও ৬টি বিদেশি দূতাবাস অংশ নেয়। অতঃপর বিকেন্দ্রীকরণের নীতি অনুসরণ করে জাতীয় গ্রন্থমেলা বিভিন্ন বিভাগ, জেলা শহরে আয়োজিত হতে থাকে। মফস্বল শহরের ‘বুক ক্যাপাসিটি’ অপেক্ষাকৃত কম হওয়ায় জাতীয় গ্রন্থমেলা তৃণমূল পর্যায়ে বইয়ের প্রচার প্রসারে সহায়তা করা সত্ত্বেও আর্থিক বিচারে গুরুত্ব হারাতে থাকে। ঢাকায় বৃহৎ আকারে গ্রন্থমেলা আয়োজনের প্রয়োজনীয়তা প্রকাশক মহলে অনুভূত হতে থাকে।
বিভিন্ন পক্ষের চাপ, দাবি ও বাস্তবতার সঙ্গে সংগতি রেখে ১৯৭২ সালে যে বইমেলার অঙ্কুর ঘটিয়েছিলেন সরদার জয়েনউদদীন সেই পথে অগ্রসর হয়ে মেলার বিস্তার হয়েছে ১৯৭৩, ৭৪ থেকে ১৯৮৩ পর্যন্ত। অবশেষে সরদার জয়েনউদদীনের সৃজিত বইমেলা আনুষ্ঠানিকতার মোড়ক পড়ে বাংলা একাডেমির ব্যবস্থাপনায় ১৯৮৪ সাল থেকে অমর একুশে গ্রš’মেলা নাম নিয়ে যাত্রা করে যা আজ বাঙালি সংস্কৃতির ভিত্তিভূমি, এক মিলন মেলা।

বাংলাদেশে বইমেলার উদ্ভব ও বিকাশে সরদার জয়েনউদদীনের উদ্যোগ ও আয়োজন অগ্রগণ্য। তবে স্বাধীনতা পরবর্তীকালে মুক্তধারার চিত্তরঞ্জন সাহার বই বিষয়ক কর্মে অবদান প্রণিধানযোগ্য। চিত্তবাবু এশিয়ান কালচার ফর ইউনেস্কোর বুক ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রামে প্রশিক্ষণ নিয়ে আসেন। তিনি তাঁর প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান মুক্তধারা থেকে ‘বইয়ের খবর’ নামে একটি পত্রিকা নিয়মিত প্রকাশ করতেন। বই প্রকাশের জন্য একটি রিভিউয়ার প্যানেলও তৈরি করেন। এই প্যানেলে ছিলেন অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, সুব্রত বড়ুয়া, শামসুজ্জামান খান, হাশেম খান, আবুল হাসনাত প্রমুখ। চিত্তরঞ্জন সাহা সারাদেশে বইমেলা, সেমিনার, সিম্পোজিয়ামসহ নানামুখী বইবান্ধব কর্মপ্রয়াস চালান। সারাদেশ সৃজনশীল বইয়ের বিপণনকে নানা লোকপ্রিয় কর্মকা-ের ব্যবস্থা করেন।

বাংলাদেশে বইমেলার উদ্ভব ও বিকাশ সম্পর্কে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান লিখেন, প্রথম দিকে যেমন সরদার জয়েনউদদীন সারাদেশের বিভিন্ন জেলায় বইমেলার আয়োজন করেছিলেন, সেই দিকটিকে বছর দশেক পরে শক্তিশালী ভিত্তির উপর দাঁড় করান শ্রী চিত্তরঞ্জন সাহা। অতএব বলা যায়, আমাদের বইমেলার প্রবর্তক সরদার জয়েনউদদীন হলেও তাকে একটি শক্তিশালী পেশাদারিত্বের স্তরে উন্নীত করার ক্ষেত্রে চিত্তরঞ্জন সাহার অবদান অসামান্য।

বাংলাদেশের গ্রন্থজগতের প্রাণপুরুষ সরদার জয়েনউদদীন শুধু গ্রন্থ আন্দোলনই নয়, ছিলেন একজন মজ্জাগত সাহিত্যনুরাগী। সাহিত্য ক্ষেত্রে অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ তিনি ১৯৬৭ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার, ১৯৮১ সালে অগ্রণী ব্যাংক সাহিত্য পদক, ১৯৮২ সালে উত্তরা ব্যাংক সাহিত্য পদক এবং ১৯৮৪ সালে বাংলাদেশ লেখক সংঘ পুরস্কার অর্জন করেন।

১৯১৮ সালে পাবনা জেলায় জন্ম নেয়া এই গ্রন্থবান্ধব মানুষটি ১৯৮৬ সালের ২২ ডিসেম্বর মৃত্যুবরণ করেন। বাংলাদেশের বই-বইমেলা কর্মযজ্ঞের ও বিস্তারের জমিনে ছড়িয়ে আছে সরদার জয়েনউদদীনের সরব উপস্থিতি ও দক্ষ নেতৃত্বের পরিচয়।এদেশে বইমেলার ইতিহাসের পথ পরিক্রমায় ১৯৬৪ সালে পূর্ব বঙ্গের প্রথম বইমেলা, স্বাধীনদেশে ১৯৭২ সালে আন্তর্জাতিক বইমেলা। ১৯৭৩ সালের জাতীয় বইমেলা এছাড়া আন্তর্জাতিক বইমেলায় বাংলাদেশের অংশগ্রহণ, তৃণমূলে বইমেলা, পাঠাভ্যাস বৃদ্ধি, গ্রন্থ পঞ্জি তৈরি, পাঠক জরিপ ইত্যাদি কাজের সঙ্গে এদেশের গ্রন্থ’জগতকে সম্পৃক্ত করার মূল কারিগর সরদার জয়েনউদদীন। 

বইমেলা সংক্রান্ত আলোচনায় সরদার জয়েনউদদীনের নাম অনেক সময় কর্মগুণের চেয়ে অনুজ্জ্বল হলেও বিদগ্ধ ব্যক্তিবর্গ তাঁকে নমস্য হিসেবেই মান্য করেন। সরদার সম্পর্কে ১৯৮৯ সালে বাংলা একাডেমিতে প্রকাশিত জীবনী গ্রন্থের প্রসঙ্গ কথায় বলা হয় বাংলাদেশে পাঠাগার সংগঠনের ক্ষেত্রে তিনি অগ্রণী ভূমিকা গ্রহণ করেছিলেন।

সরদারের জীবনীগ্রন্থ’র লেখক আহমদ কবির সূচনায় লিখেছেন শুধু কথাসাহিত্যে নয়, অন্য একটি ক্ষেত্রে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। দীর্ঘকাল জাতীয়গ্রন্থ কেন্দ্রের পরিচালক রূপে তিনি বাংলাদেশের গ্রন্থ’ উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেন। গ্রন্থ’পাঠের অভ্যাসে একটি জাতির সাংস্কৃতিক মান যে উপরে উঠে যায় যে সম্পর্কে তিনি ছিলেন নিঃসন্দেহ এবং সে জন্য নানা শুভ উদ্যোগও তিনি নিয়েছিলেন। কথা সাহিত্যের জন্য তো বটেই, এই ভূমিকার জন্যও তিনি স্মরণীয়।
বই বিষয়ক আলোচনায় আজকাল বিভিন্ন আঙ্গিকে লেখকবৃন্দ বিভিন্ন মাত্রায় আলোচনার ছক তৈরি করেন। অনেক আলোচনায় সরদারের নামটা পর্যন্ত থাকে না। কিন্তু‘ ইতিহাসের সত্যপাঠ উন্মোচন লেখক ও গবেষকদের একটা দায়। একে মহান দায়িত্বও বলা যায়। সেই বিবেচনায় সরদার জয়েনউদদীনের নামটি প্রসাদগুণেই সামনে থাকা উচিত যিনি আমাদের বই আন্দোলনের পথিকৃৎ।

খান মাহবুব, গবেষক ও প্রকাশক 
খন্ড-কালীন শিক্ষক, প্রিন্টিং এন্ড পাবলিকেশন স্টাডিজ বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা
যোগাযোগ : ৪৭ (নিচতলা) আজিজ সুপার মার্কেট, শাহবাগ, ঢাকা, সেল: ০১৭১১ ৩৬৩০৩০

এই বিভাগের আরো সংবাদ