অভাবের দুর্নীতি দূর করা যায় স্বভাবেরটা নয়

  প্রভাষ আমিন

২০ জানুয়ারি ২০১৯, ০৯:২১ | অনলাইন সংস্করণ

আওয়ামী লীগের এবারের নির্বাচনি ইশতেহারে দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’-এর অঙ্গীকার ছিল। নতুন সরকার গঠনের পর প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপমন্ত্রীরাও দুর্নীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করছেন। এটা খুবই আনন্দের সংবাদ। দুর্নীতি দূর এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে পারলে আমাদের উন্নয়ন আরও টেকসই ও দৃশ্যমান হবে। 

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে অফিস করতে গিয়ে দুর্নীতির বিরুদ্ধে তার দৃঢ় অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে কেউ দুর্নীতি করলে সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নিতে বলেছেন। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দুর্নীতির খবরে বিস্ময় প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘যে হারে আমরা বেতন বাড়িয়েছি, তার উদাহরণ মনে হয় পৃথিবীর কোথাও নেই। যেটা প্রয়োজন সেটা তো আমরা মেটাচ্ছি। তাহলে দুর্নীতি কেন হবে?’ প্রধানমন্ত্রীর এ প্রশ্ন, এ বিস্ময় যৌক্তিক। কিন্তু সমস্যা হলো, দুর্নীতিটা আমাদের যতটা না অভাবের কারণে, তারচেয়ে অনেক বেশি স্বভাবজাত। বেতন বাড়িয়ে মানুষের অভাব দূর করতে পারবেন, অভাবের কারণে সৃষ্ট দুর্নীতিও হয়তো বন্ধ করা যাবে, কিন্তু স্বভাব বদলানো যায় না। 

সরকার যতই জিরো টলারেন্সের কথা বলুক, বাংলাদেশে দুর্নীতি দূর করা সহজ নয় বলে আমি মনে করি। দুর্নীতি আমাদের রক্তে মিশে গেছে। সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুর্নীতি ছড়িয়ে পড়েছে। অনেক দুর্নীতি আমাদের গা-সওয়া হয়ে গেছে। অনেক দুর্নীতি এমনভাবে মিশে গেছে; আমরা সেটা আলাদাও করতে পারি না, চিনতেও পারি না। বাংলাদেশে এখন কেউ ঘুষ নিয়ে কাজ করে দিলে মানুষ আর তাকে দুর্নীতিবাজ মনে করে না। বরং পরোপকারী হিসেবে তিনি সমাজে সমাদৃত হন। এখন দুর্নীতির ধারণাটাই পাল্টে গেছে। যিনি টাকা নিয়েও কাজটা করে দেন না এবং টাকাও ফেরত দেন না, তিনিই দুর্নীতিবাজ। তবে তাকে প্রকাশ্যে ঘৃণা করার বা প্রতিবাদ করার সাহসও আমাদের নেই। তাই দুর্নীতির বিস্তার ঘটছে এবং দুর্নীতিবাজরা সমাজের উঁচুতলায় বিচরণ করছে। দুর্নীতি করে পাওয়া টাকায় তারা সম্মান কিনে নিচ্ছে। 

আমাদের সমস্যা হলো আমরা অভাবের দুর্নীতি নিয়ে যতটা সোচ্চার, স্বভাবের দুর্নীতি নিয়ে ততটা নয়। ট্রাফিক পুলিশ রিকশাওয়ালার কাছ থেকে খুচরা টাকা নিচ্ছে, এই দৃশ্য গোপনে ধারণ করতে পারলে আমরা ফেসবুক ফাটিয়ে ফেলি; কিন্তু সেই পুলিশের বসের দুর্নীতির খোঁজ করারই সাহস নেই আমাদের, ভিডিও করা তো দূরের কথা। আর এখন আমরা ভিডিও ছাড়া কিছু বিশ্বাস করি না। সেই ট্রাফিক পুলিশ ঘুষ খান অভাবের কারণে। আর তার বস খান স্বভাবের কারণে। শুরুতেই অভাবেরটা আটকাতে না পারলে পরে সেটা স্বভাবে বদলে যায়, রক্তে মিশে যায়। মফস্বলের একজন সংবাদকর্মী টাকার বিনিময়ে সংবাদ ছাপেন, এটা শুনলে আমরা ছি ছি করি। কিন্তু সেই সাংবাদিকের ঢাকার জুনিয়র সহকর্মী যে পাঁচ বছরে বাড়ি-গাড়ি বেশ জমিয়ে বসেছে, তাকে আমরা বাহবা দেই। মফস্বলের সেই সাংবাদিক টাকা নিয়ে নিউজ ছাপেন অভাবের কারণে। কারণ, তাকে আমরা কোনোরকমে কার্ড ধরিয়ে দিয়ে খালাস। তাকে অনেক প্রতিষ্ঠানই বেতন দেয় না, দিলেও নামকাওয়াস্তে এবং অনিয়মিত। তাই তাকে টিকে থাকার স্বার্থে, পেটে ভাত জোগানোর স্বার্থে দুর্নীতি করতে হয়। আর তার ঢাকার অনেক সহকর্মী দুর্নীতি করেন স্বভাবে। তার অনেক আছে, তারপরও আরও চাই, আরও  চাই। মানুষের আসলে চাহিদার কোনও শেষ নেই। কারো স্বপ্ন হয়তো একটা সাইকেল কেনার, তারপর স্বপ্নটা আপগ্রেড হয় মোটরসাইকেলে, তারপর গাড়ি, আরও ভালো গাড়ি, টয়োটা থেকে বিএমডব্লিউ। এভাবে স্বপ্ন বদলে যায়, চাহিদা বদলে যায়, অভাবের দুর্নীতি বদলে যায় স্বভাবে। তখন সেই দুর্নীতির লাগাম টানা কঠিন। স্বাস্থ্য অধিদফতরের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী আবজাল-রুবিনা দম্পতির হাজার কোটি টাকার সম্পদের খোঁজ মিলেছে। তার সন্তানেরা অস্ট্রেলিয়ায় পড়াশোনা করে। এখন বেতন বাড়িয়ে কি আবজালের অভাব দূর করা যাবে? আর স্বাস্থ্য অধিদফতরে কি আবজাল একজনই? শিক্ষা অধিদফতর, কৃষি অধিদফতর, মৎস্য অধিদফতর, পূর্ত অধিদফতর, রাজউক, এলজিইডি- সর্বত্রই ছড়িয়ে আছে শত শত আবজাল। খালি আবিষ্কারের অপেক্ষায়।

আমরা না হয় এতদিন আবজালের খোঁজ পাইনি। কিন্তু তার সহকর্মীরা কি জানতেন না তাদের আঙুল ফুলে বটগাছ হওয়ার কাহিনি। এতদিন তারা বলেননি কেন? এটাই আমাদের মূল সমস্যা। চুপ করে থাকা, সমস্যা এড়িয়ে যাওয়া, প্রতিবাদ না করা। শুধু আর্থিক দুর্নীতিই কিন্তু দুর্নীতি নয়। নৈতিকভাবে দুর্নীতিগ্রস্ত হওয়া, অন্যায়ের সঙ্গে আপস করা, দুর্নীতির প্রতিবাদ না করা, দুর্নীতিবাজের সঙ্গে সামাজিক সম্পর্ক রাখাও কিন্তু দুর্নীতিরই অংশ। ‘অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে সহে, তব ঘৃণা তারে যেন তৃণ সম দহে...’। আপনার পাশের টেবিলের সহকর্মী কত টাকা বেতন পান আর কত টাকা খরচ করেন, সেটা নিশ্চয়ই আপনি জানেন। অস্বাভাবিক হলে আপনি প্রতিবাদ করুন, না পারলে তাকে ঘৃণা করুন। 

দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স মানে জিরো টলারেন্স। অভাবের দুর্নীতির বিরুদ্ধে বলতে হবে, স্বভাবের দুর্নীতির কথা বলতে হবে, ছোট দুর্নীতির কথা বলতে হবে, বড় দুর্নীতির কথা বলতে হবে, আর্থিক দুর্নীতির কথা বলতে হবে, নৈতিক দুর্নীতির কথা বলতে হবে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়তে হবে। তবে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে বা মূল্যবোধের কথা বলে দুর্নীতি ঠেকানো যাবে না। দুর্নীতি ঠেকাতে হলে চাই আইনের সমান এবং কঠোর প্রয়োগ। দুর্নীতি দমন কমিশনকে সত্যিকার অর্থেই স্বাধীন করতে হবে। ব্যাংক বা শেয়ারবাজার থেকে হাজার কোটি টাকা লুটে নিয়েও যাতে কেউ এমপি হতে না পারে, উপদেষ্টা হতে না পারে; তা নিশ্চিত করতে হবে। লুটেরাদের ধরতে হবে।

টানা ১০ বছর ধরে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায়। তাই এখন যারাই সমাজে দুর্নীতিবাজ হিসেবে চিহ্নিত বা পরিচিত; তারা সবাই কোনও না কোনোভাবে আওয়ামী লীগের সঙ্গে জড়িত। তাই দুর্নীতির বিরুদ্ধে শূন্যসহনশীলতার লড়াইটা শুরু করতে হবে ঘর থেকে। দুর্নীতি যে-ই করুক, যে দলেরই হোক, যত বড়ই হোক, তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। কয়েকটা বড় দুর্নীতিবাজকে ধরে ফেলতে হবে। তাহলেই কেবল দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স লড়াইয়ে সফল হওয়া সম্ভব। কাজটা কঠিন, কিন্তু অসম্ভব নয়। এই বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের বিচার হবে, যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি হবে; কেউ কি ভেবেছিল? বিশ্বব্যাংককে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে যে পদ্মা সেতু করে ফেলা যাবে, কে ভেবেছিল। এত অসম্ভবকে যিনি সম্ভব করেছেন, সেই বঙ্গবন্ধুকন্যার কাছে কিছুই অসম্ভব নয়। এ দফায় তাঁর টার্গেট দুর্নীতি। আইনের কঠোর প্রয়োগ, সোচ্চার সামাজিক আন্দোলন, ধর্মের ভয়- সব মিলিয়েই দুর্নীতির শিকড় উপড়ে ফেলা সম্ভব। তাহলেই আর শেখ হাসিনাকে বিস্মিত হয়ে প্রশ্ন করতে হবে না, বেতন এত বাড়ানোর পরও দুর্নীতি কেন হবে?

লেখক: হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ   

এই বিভাগের আরো সংবাদ
well-food