পুঁজি পাচারকারীরা ঔপনিবেশিক পুঁজি-লুটেরাদের মতই জাতির ঘৃণ্য দুশমন

  ড. মইনুল ইসলামের কলাম

১৭ জানুয়ারি ২০১৯, ১২:৪৮ | অনলাইন সংস্করণ

যুক্তরাজ্যের গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর ইকনমিক এন্ড বিজনেস রিসার্চ (ঈঊইজ) বাংলাদেশকে বিশ্বের ৪১তম অর্থনীতি হিসেবে ঘোষণা করে পূর্বাভাষ দিয়েছে যে, আগামী ১৫ বছর বাংলাদেশ যদি সাত শতাংশ বা তার বেশি বার্ষিক জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার অর্জন ধরে রাখতে পারে তাহলে ২০৩৩ সালে বাংলাদেশ বিশ্বের ২৪তম বৃহত্তম অর্থনীতিতে পরিণত হবে। এই ঘোষণার মধ্যে জাতি হিসেবে এখনই আমাদের গর্ব করার যে বিষয়টি রয়েছে তাহলো ইতোমধ্যেই মুক্তিযুদ্ধে পরাজিত নব্য-উপনিবেশবাদী শত্রুরাষ্ট্র পাকিস্তানের অর্থনীতিকে পেছনে ফেলে বাংলাদেশ দক্ষিন এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতিতে পরিণত হওয়ার বিষয়টি বিশ্বের গবেষক মহলে স্বীকৃতি পেয়ে গেছে। সিইবিআর এর ঘোষিত বিশ্ব-র‌্যাংকিং মোতাবেক ভারতের অর্থনীতির অবস্থান বিশ্বে পঞ্চম, আর পাকিস্তানের অর্থনীতির অবস্থান বিশ্বে ৪৪তম। পাকিস্তানের জনসংখ্যা যেহেতু বাংলাদেশের জনসংখ্যার চাইতে প্রায় আড়াই কোটি বেশি হয়ে গেছে তাই মাথাপিছু জিডিপি’র বিচারেও এখন বাংলাদেশের পেছনে পড়ে গেছে পাকিস্তান। মানব উন্নয়ন সূচকের (হিউম্যান ডেভেলাপমেন্ট ইনডেক্স) এর মাপকাঠিতে বাংলাদেশ পাকিস্তানকে টপকে গেছে প্রায় এক দশক আগে, বাকি ছিল মাথাপিছু জিডিপি। ১৯৬৮-৬৯ অর্থ-বছরে তদানীন্তন পাকিস্তানের পশ্চিমাঞ্চলের মাথাপিছু জিডিপি ছিল ৯৯.৫৮ ডলার, আর পূর্ব পাকিস্তানের মাথাপিছু জিডিপি ছিল ৪০.৩৪ ডলার। ২০১৭-১৮ অর্থ-বছরে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাব মোতাবেক বাংলাদেশের মাথাপিছু জিডিপি প্রাক্কলিত হয়েছে ১৭৫১ ডলার। আইএমএফ এর হিসাব অনুযায়ী ২০১৭ সালে বাংলাদেশের মাথাপিছু জিডিপি ছিল ১৬০২ ডলার, আর পাকিস্তানের মাথাপিছু জিডিপি ছিল ১৫৪১ ডলার (উইকিপিডিয়া দ্রষ্টব্য)। আইএমএফ এর বিশ্ব-র‌্যাংকিং মোতাবেক ২০১৭ সালে প্রথমবারের মত বাংলাদেশ পাকিস্তানকে মাথাপিছু নমিন্যাল জিডিপি’র দিক্ থেকেও টপকে গেল।
অতএব, উন্নয়নের প্রতিযোগিতায় ইনশাআল্লাহ আর কোনদিন পাকিস্তান ভবিষ্যতে বাংলাদেশের নাগাল পাবে না, যদি আমরা অর্থনৈতিক উন্নয়নের বর্তমান ধারাবাহিকতাকে নিজেরা বরবাদ করে না দেই। আমাদের দেশের রাজনীতিতে এখনো বিএনপি-জামায়াতের মত যেসব দল বা জোট পরাজিত শত্রু পাকিস্তানের প্রেতাত্মা বহন করে চলেছে তারা যাতে ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে সংঘাতমূলক রাজনীতির পুরানো ধারাকে ফিরিয়ে এনে উন্নয়নের এই সফল যাত্রাকে থামিয়ে দিতে না পারে সেজন্যে দেশের ক্ষমতাসীন ও বিরোধী সকল মহলকে সার্বক্ষণিক সাবধানতা অবলম্বন করতেই হবে। পাকিস্তান এখন আর বাংলাদেশের প্রতিবেশী দেশ না হওয়া সত্ত্বেও এসব দল কেন পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই এর সাথে সম্পর্ক রেখে বাংলাদেশে রাজনীতি করছে তার কৈফিয়ত চাওয়া এখন সময়ের দাবি মনে করি। ইতিহাস সাক্ষ্য দিচ্ছে, ১৭৫৭ সালে পলাশী যুদ্ধে পরাজয়ের পূর্বে তদানীন্তন বাংলা ছিল সারা ভারতবর্ষে সবচেয়ে সমৃদ্ধ কৃষি অর্থনীতি এবং কুটির শিল্পজাত পণ্য রফতানির বিশ্বখ্যাত অঞ্চল। বৃটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর বেধড়ক্ পুঁজি লুন্ঠন, পুঁজি পাচার এবং ঔপনিবেশিক লুটেরা শাসন-শোষণের শিকার হয়ে পরবর্তী ১০০ বছরে ঐ সমৃদ্ধ অর্থনীতি অবিশ্বাস্য বরবাদির অসহায় শিকারে পরিণত হয়ে গিয়েছিল। ঐতিহাসিক ব্রুকস এডামস জানাচ্ছেন, ১৭৫৭ সালের পর বাংলা থেকে ইংল্যান্ডে কাঠের জাহাজে পুঁজি পাচার এত বিপুলভাবে বেড়ে গিয়েছিল যে ঐ জাহাজগুলো লন্ডন বন্দরে মাল খালাস করার জন্যে প্রায় তিন মাস অপেক্ষা করতে হত। এই লুন্ঠন-পর্বকে ইতিহাসবিদরা এখন ‘দি বেঙ্গল লুট’ নামে অভিহিত করে থাকেন। বলা হচ্ছে যে ঐ লুটেরা পুঁজি ইংল্যান্ডের ‘প্রথম শিল্প বিপ্লবে’ তাৎপর্যপূর্ণ অবদান রেখেছিল। ১৮৫৮ সালে সরাসরি বৃটিশ শাসন চালু হওয়া সত্ত্বেও ঐ ঔপনিবেশিক লুন্ঠন ও পুঁজি-পাচার থেকে মুক্তি মেলেনি বাংলার। বরং, মরার ওপর খাঁড়ার ঘা নেমে এসেছিল ১৯৪৭ সালে, যখন পূর্ব বাংলা বৃটিশ প্রভুদের ধুরন্ধর ভারত-বিভাগের শিকার হয়ে আরেকবার অভ্যন্তরীণ-উপনিবেশ হিসেবে পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। পরের ২৪ বছর মেকী স্বাধীনতার আড়ালে আবারো চলেছিল বেধড়ক্ শোষণ, লুন্ঠন, পুঁজি-পাচার এবং সীমাহীন বঞ্চনা ও বৈষম্য। এই ২১৪ বছরের লুন্ঠন, পুঁজি-পাচার, শোষণ-বঞ্চনার শিকার হয়ে রিক্ত-নিঃস্ব হওয়ার কারণেই ১৯৭২ সালে স্বাধীন বাংলাদেশকে অভিহিত করা হয়েছিল ‘ আন্তর্জাতিক তলাবিহীন ভিক্ষার ঝুড়ি’। শাসক মহলের কাছে আমার জিজ্ঞাসা, ২৪ বছরের ঐ পাকিস্তানী লুটেরাদের কবল থেকে এক নদী রক্তের বিনিময়ে স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনার ৪৮ বছর পরও যেসব ব্যক্তি বা রাজনৈতিক দল এখনো পরাজিত পাকিস্তানের দালালি করার ঘৃণ্য অপরাধে অপরাধী তাদেরকে ‘জাতীয় দুশমন’ ঘোষণা করা হবে না কেন?
আজকের কলামে আমি জনগণের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি আমাদেরই দেশের আরেক জাতের ‘ঘৃণ্য জাতীয় দুশমন’ পুঁজি পাচারকারী গোষ্ঠিগুলোর প্রতি, যারা প্রতি বছর গড়ে ৯০০ কোটি ডলার (ডলারের বিনিময় হার ৮৪ টাকা ধরে যার পরিমাণ দাঁড়াচ্ছে ৭৫,৬০০ কোটি টাকা) বা তারও বেশি পুঁজি থেকে বাংলাদেশকে বঞ্চিত করছে বলে নিউইয়র্ক-ভিত্তিক গবেষণা সংস্থা গ্লোবাল ফাইনেন্সিয়াল ইন্টিগ্রিটির (জিএফআই)গবেষণায় উদঘাটিত হয়েছে। জিএফআই এর এই হিসেবটি ২০১৩ সালের, এর পরের কোন হিসেব তাদের পক্ষ থেকে এখনো প্রকাশিত হয়নি। এই হিসেব প্রকাশিত হওয়ার আগে ২০১১ সালে আইএলও জানিয়েছিল, বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর গড়ে ৫০০ কোটি ডলার পুঁজি বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে। তখনই আমাদের নীতি-প্রণেতাদেরকে আমরা পুঁজি পাচার প্রতিরোধ করার জন্যে কঠোর নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের অনুরোধ জানিয়েছিলাম, কিন্তু ঐ আহ্বান যে বিফলে গেছে সেটা বোঝা গেল জিএফআই এর ৯০০ কোটি ডলারের সর্বশেষ হিসেবটা প্রকাশিত হওয়ায়। ছয় বছর পর ২০১৯ সালে এসে পুঁজি পাচারের পরিমাণ যে আরো বেড়ে যাওয়াই স্বাভাবিক সেটা না বোঝার কোন কারণ নেই। আজকের কলামে পুঁজি পাচারের গতি-প্রকৃতি ও মিকানিজমগুলো ব্যাখ্যা করার উদ্দেশ্যই হলো পাঠকরা নিজেরাই যেন সমস্যার গুরুত্বটা বুঝতে সক্ষম হন তা নিশ্চিত করা। বৈদেশিক বাণিজ্যের আমদানি-রপ্তানির সাথে জড়িত ব্যবসায়ী-শিল্পপতিরা পুঁজি-পাচারের প্রধান কুশী-লব হিসেবে বহুল-পরিচিত হলেও বর্তমানে দেশের দুর্নীতিবাজ রাজনীতিক-সিভিল আমলা-সামরিক অফিসার-প্রকৌশলী-পেশাজীবিরাও এখন পুঁজি-পাচারকারীর ভূমিকা পালনে কামেলিয়ত হাসিল করেছেন। সপরিবার বিদেশে হিজরত করে কোন উন্নত পুঁজিবাদী দেশে পরবর্তীতে দিন গুজরানের খায়েসে মত্ত হয়ে এই নব্য-পাচারকারীরা এখন অহর্নিশ পুঁজি-পাচারে মেতে উঠেছেন। বৈদেশিক বাণিজ্যে আমদানির ক্ষেত্রে ওভার-ইনভয়েসিং কিংবা ফেইক ইনভয়েসিং পুঁজি-পাচারের সবচেয়ে বহুল-ব্যবỊত পদ্ধতি, আর রপ্তানির ক্ষেত্রে আন্ডার-ইনভয়েসিং এবং রপ্তানি-আয় যথাযোগ্যভাবে জমা না দিয়ে বিদেশে রেখে দেওয়া পুঁজি-পাচারের সবচেয়ে ‘পপুলার মেথড’। কিন্তু, এই পুরানো পদ্ধতিগুলোর পাশাপাশি এখন প্রবাসী বাংলাদেশীদের বহুল-ব্যবỊত হুন্ডি পদ্ধতিতে রেমিট্যান্স প্রেরণের অভ্যাস পুঁজিপাচারকারীদেরকে একটি সহজ বিকল্প উপহার দিয়েছে পলাতক পুঁজির পলায়নকে একেবারে নিরাপদ, নির্বিঘ্ন ও সুলভ করে দেওয়ার মাধ্যমে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব মোতাবেক দেশে ২০১৮ সালে ১৫৫৩ কোটি ডলার রেমিট্যান্স এসেছে রেকর্ডেড/ডক্যুমেন্টেড চ্যানেলগুলোর মাধ্যমে, যে পরিমাণটা গত বছরের তুলনায় ভাল প্রবৃদ্ধির পরিচায়ক বলা হচ্ছে। কিন্তু, হুন্ডি পদ্ধতিতে বৈদেশিক মুদ্রার সিংহভাগ যেহেতু বিদেশেই থেকে যায় তাই ঠিক কত পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা প্রতি বছর হুন্ডিচক্রে প্রবেশ করছে তার হদিশ পাওয়া প্রায় অসম্ভব বলা চলে। কিন্তু, এই ‘হুন্ডি ডলারের’ সবচেয়ে বড় অংশের সমপরিমাণ টাকা রেমিট্যান্স-প্রেরকের পরিবারের সদস্যবৃন্দ ও আত্মীয়স্বজনরা যেহেতু পেয়ে যাচ্ছেন তাই এই অর্থ প্রবাসীদের পরিবার ও স্বজনদের ভোগ এবং বিনিয়োগে ব্যাপক অবদান রাখছে। ফরমাল চ্যানেল বা ইনফরমাল চ্যানেল্তযেভাবেই রেমিট্যান্সের অর্থ অর্থনীতিতে প্রবাহিত হোক্ না কেন তার অর্থনৈতিক সুফল পুরো অর্থনীতিতে ছড়িয়ে যাচ্ছে। এত বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণ সত্ত্বেও বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত যে বড়সড় সংকটে পড়ছে না তার পেছনেও রেমিট্যান্স থেকে উদ্ভূত বিশাল আমানত প্রবাহ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এক অর্থে এই বিপুল অর্থ বৈদেশিক প্রত্যক্ষ বিনিয়োগের (ফরেন ডাইরেক্ট ইনভেস্টমেন্ট) একটা তাৎপর্যপূর্ণ বিকল্পের ভূমিকা পালন করছে। বাংলাদেশ যে এখনো বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণে ব্যর্থ একটা দেশ, অর্থনীতিতে তার তেমন একটা আছর পড়ছে না এই রেমিট্যান্স প্রবাহের কারণে। বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হারের চমকপ্রদ উল্লম্ফনও ঘটাচ্ছে প্রবাসীদের ক্রমবর্ধমান রেমিট্যান্স, এটা এখন সারা বিশ্বের সপ্রশংস মনোযোগের কেন্দ্রে চলে এসেছে।
কিন্তু, যে হুন্ডি ডলার বিদেশেই রয়ে যাচ্ছে সেগুলো হুন্ডিওয়ালা চক্রগুলোর কাছ থেকে কারা কিনছে? ওখানেই পুঁজি-পাচারের সাথে এই ব্যাপারটা জড়িয়ে যাচ্ছে। আমার গবেষণায় প্রমাণ পেয়েছি যে দেশে দুর্নীতিজাত কালোটাকার মালিকরা এবং ব্যাংকের ঋণ নিয়ে ফেরত না দেওয়ার ‘কালচার’ যারা সৃষ্টি করেছেন সে ব্যবসায়ীরা এই হুন্ডি ডলারের সবচেয়ে বড় খদ্দের। মার্জিনখোর রাজনীতিক বলুন, দুর্নীতিবাজ আমলা-সামরিক অফিসার-প্রকৌশলী বলুন, রাঘববোয়াল ঋণখেলাপি বলুন, ডাকসাইটে ব্যবসায়ী-শিল্পপতি বলুন্তহুন্ডি ডলারের সহায়তায় বিদেশে পুঁজি পাচারে মশগুল হয়ে রয়েছেন বাংলাদেশের উচ্চবিত্ত-উচ্চ মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো। আর, এভাবেই ক্রমশ গড়ে উঠছে টরোন্টোর বেগমপাড়া কিংবা মালয়েশিয়ার সেকন্ড হোম কেনার রমরমা কালচার। খেলাপি ঋণের ওপর আমার গবেষণায় বারবার উঠে এসেছে যে ব্যাংকের খেলাপি ঋণের সিংহভাগই আদতে ফেরত পাওয়া যাবে না, কারণ এই ঋণের অর্থ আসলে বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে। ব্যাংকের ঋণ পাচারকারী এবং বৈদেশিক বাণিজ্যের মাধ্যমে পুঁজি পাচারকারীদেরকে সেজন্যেই আমি ‘ঘৃণ্য জাতীয় দুশমন’ আখ্যায়িত করছি। দেশ থেকে পাচার হওয়া ৯০০ কোটি ডলার যদি প্রতি বছর দেশে নানা উৎপাদনশীল কার্যক্রমে বিনিয়োজিত হতো তাহলে আমাদের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার নয়-দশ শতাংশে উন্নীত হয়ে যেতো কিনা তা সবাইকে ভেবে দেখতে বলি। (দৈনিক আজাদী থেকে নেয়া)

লেখক : একুশে পদকপ্রাপ্ত অর্থনীতিবিদ ও অবসরপ্রাপ্ত প্রফেসর, অর্থনীতি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

এই বিভাগের আরো সংবাদ
well-food