অবাধে বৃক্ষ নিধনে বিপর্যয়ের মুখে পরিবেশ, এখনই তৎপর হওয়া জরুরি

  হৃদয় দেবনাথ

১৬ জানুয়ারি ২০১৯, ১৩:৪২ | অনলাইন সংস্করণ

মানুষের অত্যাচারে প্রকৃতি রুদ্ররূপ ধারণ করেছে! অবাধে বৃক্ষ নিধন আর পাহাড় কাটার ফলেই প্রকৃতি ক্ষেপে ওঠেছে! প্রকৃতির এই রুদ্র আচরণ থেকে পরিত্রাণের জন্য ব্যাপকভাবে  বৃক্ষরোপণ করা জরুরি হয়ে পড়েছে। খাদ্য, জ্বালানি, আসবাবপত্র তৈরি, গৃহনির্মাণ, ওষুধ, সৌন্দর্যায়ন প্রকৃতির জন্য আমরা গাছ  লাগাই। সবচেয়ে বড়কথা গাছ থেকে আমরা অক্সিজেন গ্রহণ করি । আর অক্সিজেনের মাধ্যমে আমরা বেঁচে থাকি। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে ইদানীং একটি বিশেষ মহল কর্তৃক সারাদেশেই ব্যাপকভাবে বৃক্ষ নিধন চলছে। 

বন বিভাগের ফাইলপত্র ও অন্যান্য সূত্র হতে প্রাপ্ত খবরে জানা যায়, দেশের যে সমস্ত এলাকায় কিছু বনাঞ্চল ছিল তা নির্বিচারে কেটে শুধু উজাড়ই করা হচ্ছে না নিশ্চিহ্নও করা হচ্ছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম, সুন্দরবন, কুমিল্লা ও সিলেট অঞ্চলের মূল্যবান বৃক্ষাদি কেটে বনভূমি উজাড়ের খবর দেশের সকল মহলের জানা। এ কাজে বন বিভাগের ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত বাহিনীর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভূমিকাও প্রশ্নবিদ্ধ। তার সঙ্গে রয়েছে অসাধু কাঠ ব্যবসায়ী।

প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষায় বনাঞ্চলের বিকল্প নেই। এ কথা ইতোমধ্যে বিশ্বের সব মানুষ অনুধাবন করতে শুরু করেছে। তাই লাখ লাখ ডলার খরচ করে মধ্যপ্রাচ্যের বালুর পাহাড়ে বৃক্ষচারা রোপণ, পরিচর্যা, রক্ষণাবেক্ষণ করে বনাঞ্চল সৃষ্টি করা হচ্ছে। মরুময় এসব দেশে গাছপালার বদৌলতে বৃষ্টিপাত হতে শুরু হয়েছে। নিত্যদিনের ব্যবহার্য শাক-সবজি আজ তারা নিজেরাই উৎপন্ন করছে। কোনো কোনো দেশ পার্শ্ববর্তী দেশগুলো রফতানিও করছে।

সরকার বনভূমি হতে প্রতি বছর বেশ মোটা অংকের রাজস্ব আয় করে থাকেন। এ আয় থেকে অন্তত চার ভাগের এক ভাগও যদি আন্তরিকতা, সততা, নিষ্ঠা ও দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে বনাঞ্চল সৃষ্টিতে ব্যয় করতেন তাহলে সবুজ, সুজলা, সুফলা, শস্য-শ্যামলা দেশটির এ জীর্ণশীর্ণ অবস্থা হতো না। আবার কোথাও প্রচুর বৃষ্টির পানিতে ভেসে যাচ্ছে ক্ষেত, খামার, বাড়িঘর, গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগি ইত্যাদি। দেশে জলবায়ু ও আবহাওয়ার পরিবর্তন বেশ ভালো করে অনুভব করা যায়। 

বিশেষজ্ঞদের মতে, আবহাওয়া ও জলবায়ুর পরিবর্তনের অন্যতম প্রধান কারণ দেশের বনাঞ্চল সংকুচিত হয়ে যাওয়া। নির্বিচারে বন উজাড় ও জনসংখ্যার চাপে দিনে দিনে তা আরো হ্রাস পাচ্ছে। প্রতি বছরই কারণে-অকারণে প্রচুর গাছ কাটা হয়, রোপণ করা হয়, তাও আবার পরিচর্যা রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে নষ্ট হয়ে যায়। এদিকে বনাঞ্চল বা বনভূমি দিনে দিনে উজাড় হচ্ছে। ফলে বিপদের আশংকা বাড়ছে। কালবৈশাখী ঝড়, সাইক্লোন, অকাল বন্যার তা-ব দেখা দিচ্ছে। এসব প্রাকৃতিক বিপর্যয় হতে রক্ষার একমাত্র উপায় দেশে পর্যাপ্ত পরিমাণে বনাঞ্চল সৃষ্টি করে প্রাকৃতিক ভারসাম্য ধরে রাখা। এদিকে নজর না দিলে ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি হবে। সমস্যাটি আরো প্রকট হয়ে উঠার পূর্বে আমাদের সচেতনতার সাথে যেখানে সম্ভব বৃক্ষরোপণ করে রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমে বনাঞ্চল সৃষ্টি করতে হবে। অন্যথায় আমাদের মহাবিপর্যয়ের সম্মুখীন হতে হবে।

ইদানীং ইটের ভাটায় অবাধে কাঠ ব্যবহার করা হচ্ছে। আইন ও নিয়মনীতি না মেনে গড়ে ওঠা পরিবেশ বিধ্বংসী এসব ইটের ভাটা এখন জনমনে আতঙ্ক তৈরী করেছে। ইটভাটার অনুমোদন প্রদান করেন জেলা প্রশাসক। ইটের ভাটায় ইট পোড়ানো নিয়ন্ত্রণ আইন, ১৯৮৯-এর আওতায় জেলা প্রশাসক ইটভাটার কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণে এককভাবে ক্ষমতাবান। উদ্যোক্তা ইটভাটা নির্মাণের সূচনা করলে তা প্রথমেই নজরে আসে জেলা প্রশাসকের। ইটভাটার লাইসেন্সের আবেদনের সূত্রপাত ঘটে জেলা প্রশাসকের দপ্তরে। আবার ইটভাটা নির্মাণে জমি দখল ও পরিবেশ দূষণে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কান্না, আর্তি ও অভিযোগ সবার আগে পৌঁছে জেলা প্রশাসকের কাছেই। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে জেলা প্রশাসক ভূমি ব্যবস্থাপনার মূল অভিভাবক ও নিয়ন্ত্রক। ভূমি নিয়েই ইটভাটার পুরো কর্মযজ্ঞ ও ব্যবস্থাপনা। ইটভাটার জন্য উদ্যোক্তারা জমি ভাড়া, দখল, মাটি কর্তন ও মাটি পুড়িয়েই ইট তৈরি করেন। ইটভাটা এক রাতেই গড়ে ওঠে না। এ বিশাল কার্যক্রম শুরু ও শেষ করতে প্রয়োজন দুই থেকে তিন মাস। এত দীর্ঘ সময়ের মধ্যেও ইটভাটা নির্মাণের অনেক ঘটনা জেলা প্রশাসকদের অগোচরে থেকে যায়। ফলে বিস্তীর্ণ এলাকায় ফসলি জমি ভরাট করে, জমিতে গর্ত করে, গ্রামীণ নৈঃশব্দ ভেঙে ইটবাহী ট্রাক চলাচলের রাস্তা তৈরি করে, গাছপালা উজাড় করে এবং পাহাড় কেটে প্রচুর ইটভাটা গড়ে উঠছে। অর্থের প্রয়োজনে ইটভাটা এবং ইটভাটার প্রয়োজনে কৃষি জমি- এ দুইয়ের যোগসূত্র এখন অবিচ্ছিন্ন। ইটভাটার লেলিহান শিখায় মুনাফালোভী ইটভাটার মালিকরা জ্বালিয়ে দিচ্ছে গ্রামবাংলার সবুজ ধানক্ষেত ও চোখ জুড়ানো পরিবেশ। কেড়ে নিচ্ছে মানুষের অনাবিল শান্তি, হরণ করছে স্বস্তি। অবৈধ ইটভাটার আগ্রাসনে প্রতিনিয়ত হারিয়ে যাচ্ছ সবুজ বন-বনানী। ধ্বংস হচ্ছে অর্থনীতি। ভরাট হচ্ছে নদ-নদী।

গত আড়াই বছরে পরিবেশ অধিদপ্তরের এনফোর্সমেন্ট অভিযানে এসব ঘটনা বেরিয়ে এসেছে প্রতিনিয়ত। এ কারণে গ্রামীণ জনপদের উর্বর মাটি পরিণত হয়েছে সোনার খনিতে। সে খনি থেকে বেরিয়ে আসছে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা। শুধু একটি মৌসুমেই ইটভাটা মালিকের লাভ থাকে ৩০ থেকে ৪০ লাখ টাকা। ইটভাটা তৈরিতে ভারী অবকাঠামো বা উচ্চমূল্যের যন্ত্রপাতির প্রয়োজন হয় না। শ্রমশক্তি সহজলভ্য, জমিও অতি সস্তা। অভাবতাড়িত কৃষক, দারিদ্র্যপীড়িত শ্রমিক পেটের দায়েই চোখ বুঁজে শ্রম দিচ্ছে ইটভাটায়। অনেক কম ব্যয় অথচ অনেক বেশি মুনাফা এতে।

অপরিণামদর্শী কিছু উদ্যোক্তার পরিবেশবিধ্বংসী কার্যকলাপে ইটভাটার নামে এভাবেই কৃষির সর্বনাশ এবং জীববৈচিত্র্যের বিনাশ ঘটছে। জনস্বাস্থ্য ঝুঁকির কবলে পড়ছে। কিন্তু এসব নিষ্ঠুর বাস্তবতা বিবেচনায় না এনেই দিন দিন এ ধ্বংসাত্মক বিনিয়োগের প্রতি আকর্ষণ বাড়ছে উদ্যোক্তাদের। এ উদ্যোগ স্কুলশিক্ষক থেকে শুরু করে প্রবাসী এমনকি অনেক সম্মানজনক পেশার মানুষ আর্থ সামাজিক ক্ষেত্রে ও পরিবেশগত প্রভাবকে অবহেলায় রেখে ইটভাটা ব্যবসায় ঝাঁপিয়ে পড়ছে। গ্রামে-গঞ্জে ও বনে-বাদাড়ে ফসলি জমিতে গড়ে ওঠা এসব ইটভাটার সিংহভাগেরই নেই বিএসটিআই লাইসেন্স বা পরিবেশ ছাড়পত্র। এসব ইটভাটায় উৎপাদিত ইটের গুণগত মান নিশ্চিত করারও কেউ নেই। মানহীন সব ইটের সরবরাহ যাচ্ছে রাস্তাঘাট, স্কুল-কলেজ, বাড়িঘরসহ সরকারি-বেসরকারি নির্মাণ কাজে। দ্রুত ধাবমান উন্নয়ন কর্মকা-ের চাহিদা পূরণ করছে এসব পরিবেশবিধ্বংসী ইটভাটায় ইটভাটার মালিকদের ভ্রƒক্ষেপ নেই দেশ, মানুষ ও পরিবেশের প্রতি। এভাবেই মানুষের সুস্থভাবে বেঁচে থাকার অধিকার পদদলিত হচ্ছে, নির্বিঘেœ ফসল উৎপাদনের অধিকার হারিয়ে যাচ্ছে। ব্যক্তিস্বার্থই যেখানে ঊর্ধ্বে, সেখানে পরিবেশ প্রতিবেশ রক্ষা অনেক দূরে! গ্রাম-গঞ্জে এখনো বহাল আছে সনাতনী পদ্ধতির অসংখ্য ইটভাটা। এসব ইটভাটার নির্গত ধোঁয়ায় পুড়ে যাচ্ছে মূল্যবান ফসল, ফলের বাগান, সবুজ গাছপালা। ছাইয়ের আস্তরণে ঢাকা পড়ছে বাড়িঘর, মসজিদ, স্কুল, ধানক্ষেত ও সবজিক্ষেত। তাই অসহায় মানুষ প্রতিবাদ জানাচ্ছে ইটভাটার লেলিহান শিখার বিরুদ্ধে।

পরিবেশ অধিদপ্তরের এনফোর্সমেন্ট গত আড়াই বছর ইটভাটার স্থাপনা ও অবকানুঠামো সমূলে উচ্ছেদ করে তাৎক্ষণিকভাবে পরিবেশ ও প্রতিবেশের ক্ষতিপূরণ হিসেবে বিপুল অঙ্কের জরিমানা আদায় করেছে। অধিদপ্তরের ‘এনফোর্সমেন্ট অভিযান’ এভাবে প্রকৃতিবিনাশী ইটভাটা বন্ধে কার্যকর ‘প্রতিষেধক’ হিসেবে কাজ করেছে। অথচ এর সমান্তরালে জেলা প্রশাসকদের নিয়মিত মোবাইল কোর্ট কার্যকর প্রভাব ফেলতে পারে। ইটভাটার মালিকরা অনেক ক্ষেত্রে জেলা প্রশাসকের তহবিলে অর্থ দেয়, যা জনকল্যাণে এবং সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় আচার-অনুষ্ঠানে ব্যয়িত হয়। কিন্তু ইটভাটার মালিকদের ভ্রান্ত বিশ্বাস, জেলা প্রশাসকের তহবিলে অর্থ জমা দিলেই ইটভাটার লাইসেন্স পাওয়া যাবে, পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্রের আর প্রয়োজন নেই। এ ভ্রান্ত ধারণা দূর করার দায়িত্ব জেলা প্রশাসকের।

একটি ইটভাটায় বছরে ৫০০ থেকে এক হাজার টন কয়লা পুড়ে। কাঠ পুড়ে দুই থেকে তিন হাজার মণ। জমির টপ সয়েল ব্যবহার করা হয় ১০ থেকে ১৫ লাখ ঘনফুট। বছরে কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ প্রায় ৩০ টন। ইটভাটা ব্যবসা বাংলাদেশের আবহাওয়ার প্রেক্ষাপটে মওসুমি ব্যবসা। এভাবে অবিরাম কাঠ, কয়লা ও মাটি পোড়ানোয় বাতাসে নিঃসরণ ঘটছে শত শত টন কার্বন, বিষাক্ত ফ্লোরিন গ্যাস এবং ক্ষতিকর গ্রিনহাউস গ্যাস ও ধূলিকণা। এ ধ্বংসযজ্ঞের বিনিময়ে ইটভাটার মালিকরা তাদের নগদ মুনাফা তুলে নিয়ে আলিশান বাড়ি ও বিলাসবহুল গাড়ি নিয়ে জীবনকে উপভোগ করছেন। বিনিময়ে মাটি, মানুষ ও পরিবেশ রিক্ত ও নিঃস্ব হচ্ছে। কিন্তু ইটভাটার মালিকরা দূষিত পরিবেশে বসবাস করেন না। তারা থাকেন আরাম-আয়েশে এবং নিরাপদ আশ্রয়ে।

পরিবেশ অধিদপ্তর ইটভাটার প্রযুক্তিতে পরিবর্তন এনে সময়সীমা বেঁধে দিয়েছে। এ সময়ের মধ্যে সব ইটভাটাকে  ইত্যাদি উন্নত প্রযুক্তির জ্বালানি সাশ্রয়ী ও স্বল্প দূষণকারী আধুনিক ইটভাটায় আবশ্যিকভাবে রূপান্তর করতে হবে। কিন্তু বাস্তবে এ প্রযুক্তি গ্রহণ ও পরিবর্তনের গতি খুবই শ্লথ। পরিবেশ রক্ষার জন্য এ প্রযুক্তিগত পরিবর্তন বর্তমান সরকারের বৈপ্লবিক পদক্ষেপ। জেলা প্রশাসকরা জেলায় সরকারের উন্নয়ন কর্মকা- ও নীতি বাস্তবায়নের গুরুত্বপূর্ণ এজেন্ট। যুগপৎ আইনি ক্ষমতা প্রয়োগ, ইটভাটার মালিকদের সঙ্গে সমন্বয় এবং জনসাধারণকে পরিবেশ সচেতন করার মাধ্যমে দেশের ৮-১০ হাজার ইটভাটাকে পরিবেশবান্ধব করার যুগান্তকারী কার্যক্রমে জেলা প্রশাসকদের ভূমিকা অপরিহার্য। এই ভূমিকায় নিশ্চিত হোক সবুজ অর্থনীতি, সবুজ বাংলাদেশ এবং সবুজ পৃথিবী।

লেখক : সাংবাদিক ও সমাজকর্মী

এই বিভাগের আরো সংবাদ
well-food