বঙ্গবন্ধু ও ১৯৫ যুদ্ধাপরাধী

  জাফর ওয়াজেদ

১০ জানুয়ারি ২০১৯, ২১:১৬ | অনলাইন সংস্করণ

স্বাধীনতার চার দশক পেরিয়ে গেলেও এখনও প্রশ্ন তোলা হয়, কেন ১৯৫ জন পাকিস্তানি যুদ্ধাপরাধীর বিচার হলো না। বিচার ছাড়া তাদের কেন পাকিস্তানিদের হাতে ছেড়ে দেয়া হলো। কেন পাকিস্তান প্রতিশ্রুতি দিয়েও যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের পদক্ষেপ নেয়নি। আটকেপড়া বাঙালিরা পাকিস্তান থেকে ফেরত এলেও বাংলাদেশে আটকেপড়া পাকিস্তানিরা এখনও কেন পাকিস্তান প্রত্যাবর্তন করছে না। প্রশ্ন যখন আছে, উত্তরও তার রয়েছে দণ্ডায়মান। কেন, কী কারণে যুদ্ধবন্দিরা মুক্তি পেল, তার নেপথ্যে ঘটনার ঘনঘটাও কম নয়।

একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি হানাদার সেনাদের আত্মসমর্পণ পরবর্তী পর্যায়ে বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও ভারত এই তিন দেশের মধ্যেই নিজস্ব ও পারস্পরিক টানাপড়েন শুরু হয়। যুদ্ধাপরাধী পাকিস্তানি সেনাদের বিচার নিয়ে বাংলাদেশ এবং পাকিস্তান পরস্পরবিরোধী অবস্থান নেয়। ভারত এক্ষেত্রে বাংলাদেশকে সমর্থন করে। কিন্তু ভারতের তাদের আশ্রিত প্রায় এক লাখ পাকিস্তানি যুদ্ধবন্দির ভরণপোষণে হিমশিম খাওয়ার অবস্থা। বাংলাদেশেও আটকেপড়া পাকিস্তানিদের দ্রুত প্রত্যাবর্তনে আগ্রহী হয়ে ওঠে।

কারণ, যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশের পক্ষে তাদের ভরণপোষণ অসম্ভব হয়ে ওঠে। যদিও তারা তখন জেনেভা কনভেনশনের অধীনে ছিল। যেমন ছিল পাকিস্তানি যোদ্ধারা। ভারত যেহেতু আন্তর্জাতিক জেনেভা কনভেনশনের সদস্য এবং যুদ্ধে প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণকারী, তাই যুদ্ধবন্দিদের রক্ষা করার জন্য আন্তজার্তিকভাবে দায়বদ্ধ দেশটি। যে কারণে পাকিস্তানি হানাদাররা বাঙালি মুক্তিবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণে আগ্রহী হয় নি। হলে জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী মর্যাদা পেতো না। যদিও যৌথ মিত্রবাহিনীর কাছে শেষ পর্যন্ত আত্মসমর্পণ করেছে। কিন্তু দলিলে মিত্রবাহিনীর বাঙালি অংশের স্বাক্ষর নেই।

আর যৌথ বা মিত্রবাহিনীর কাছে পাকিস্তানি সেনাদের আত্মসমপর্ণের জন্য যে আহব্বান জানানো হয়, তাতে যৌথবাহিনীর কথা উল্লেখ ছিল। আত্মসমর্পণ দলিলে বলা হয়, আত্মসমর্পণকারী সেনাদের জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী মর্যাদা ও সম্মান প্রদান করা হবে এবং ‘আত্মসমর্পণকারী সকল পাকিস্তানি সামরিক ও আধা-সামরিক বাহিনীর সদস্যদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে; তবে হানাদারদের স্থানীয় সহযোগী রাজাকার, আলবদররা জেনেভা কনভেনশনের অন্তর্ভুক্ত না হওয়া, এদের দায়িত্ব বাংলাদেশ সরকারের হাতে ন্যস্ত বলে ভারতীয় সেনা কর্মকর্তারা উল্লেখ করেছিলেন। যখন তারা পাকিস্তানি যুদ্ধবন্দিদের ভারতে স্থানান্তর করছিলেন। যুদ্ধবন্দিদের যাতে বিচার হতে না পারে, সেজন্য পাকিস্তান তখন, ‘তুরুপের তাস’ হিসেবে সে দেশে আটকেপড়া প্রায় চার লাখ বাঙালিকে জিম্মি করার হুমকি দেয়।

যুদ্ধবন্দিদের দ্রুত পাকিস্তানে ফেরত পাঠানোর জন্য জাতিসংঘ, মুসলিম দেশগুলো ভারত ও বাংলাদেশকে চাপ দিতে থাকে। একাত্তরের সশস্ত্র যুদ্ধ শেষে তখন শুরু হয় তিন দেশের মধ্যে কূটনৈতিক লড়াই। তাতে বিশ্বের অন্য দেশগুলোও জড়িয়ে পড়ে। বাংলাদেশই প্রথম যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিটাকে সামনে নিয়ে আসেন। মুজিবনগর সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে এম কামরুজ্জামান ঘোষণা দেন যে, বাংলাদেশ ইতোমধ্যে ৩০ জন শীর্ষস্থানীয় পাকিস্তানি সরকারি কর্মকর্তাকে গ্রেফতার করেছে এবং গণহত্যায় শিকার সাতজন বাংলাদেশী কর্মকর্তার পরিবারের পক্ষ থেকে ভারত সরকারের কাছে দোষী পাকিস্তানিদের বিচারে বাংলাদেশকে সহায়তার জন্য আবেদন জানিয়ে সংবাদ সম্মেলন করে। আবেদনের প্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী’র উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ডিপি ধর বলেন যে, ভারত যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিষয়ে আন্তজার্তিক আইন পরীক্ষা করছে। সে অনুযায়ী  পদক্ষেপ নেয়া হবে।

যুদ্ধ শেষ হবার পরই ভারত স্পষ্ট ঘোষণা দেয় যুদ্ধাপরাধী বিচারের ব্যাপারটি বাংলাদেশ যৌথ কমান্ডের কাছে। ফলে এ নিয়ে ভারতের একার বলার বা সিদ্ধান্ত নেয়ার কিছু নেই। যা কিছু করতে হয় তা বাংলাদেশের সঙ্গে সরাসরি আলোচনার ভিত্তিতেই করতে হবে। বাংলাদেশ সরকারও ঘোষণা দেয় যে, কূটনৈতিক স্বীকৃতির আগে এবং সম্পর্কের সমতা অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত পাকিস্তানের সঙ্গে এ নিয়ে কোনো কথা বলতে সে প্রস্তুত নয়। আর ১৯৭১-এর ডিসেম্বরে ক্ষমতায় বসে ভুট্টো দেখলেন, ক্ষমতা ধরে রাখা সহজ নয়। জাতশত্রু ভারতের কাছে হেরে এবং আত্মসমর্পণ করে পাকিস্তানের তখন করুণ দশা।

ভুট্টো জাতিসংঘে দাবি তোলেন ভারতে তার ৯৩ হাজার সেনাকে পাকিস্তান ফেরত পাঠাতে। কিন্তু বাংলাদেশ তখন গোঁ ধরে বসে আছে: তারা পাকিস্তানি সেনাদের যুদ্ধাপরাধের জন্য বিচার করবে। সে উদ্দেশ্যে যুদ্ধাপরাধী অফিসার ও সেনা সদস্যের এক তালিকাও বাংলাদেশে তৈরি করছে। ভুট্টোর জন্য প্রধান চ্যালেঞ্জ ছিল সে বিচার ঠেকানো এবং যুদ্ধাপরাধীসহ সব বন্দিকে দেশে ফিরিয়ে নেয়া। ভুট্টোর জন্য এই এজেন্ডা পাকিস্তানি জেনারেলরা ঠিক করে দেয় ক্ষমতায় বসার প্রথম দিন থেকেই। অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিরোধিতার কারণে বাংলাদেশকে স্বীকৃতির প্রশ্ন সে সময় ছিল পাকিস্তানের বিবেচনার বাইরে। বরং যেসব দেশ বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়েছে, তাদের সঙ্গে কোনো কূটনৈতিক সম্পর্ক রাখবে বলে পাকিস্তান ঘোষণা করে। তাই দেখা যায়, ১৯৭২-এর প্রথমদিকে ছোট-ছোট গোটাকয়েক দেশের সঙ্গে পাকিস্তান তার সম্পর্কচ্ছেদও করে। বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দান করায় যুক্তরাজ্যের ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে পাকিস্তান কমনওয়েলথ থেকেও বেরিয়ে আসে।


’৭২ সালের ১০ জানুয়ারি দেশে ফিরেই বঙ্গবন্ধু ঘোষণা করেছেন  যে, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করা হবে। সে অনুযায়ী বিচারের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু হয়। বাংলাদেশ সরকার ২৯ মে মার্চ ঘোষণা করে যে, নিয়াজি ও রাও ফরমান আলীসহ ১১০০ পাকিস্তানি যুদ্ধাপরাধীর বিচার করা হবে। সেজন্য একটি প্রস্তাবনাও উপস্থাপন করা হয়। যাতে শীর্ষস্থানীয় যুদ্ধাপরাধীর বিচারে দেশি-বিদেশি জুরি নিয়োগ এবং অন্যদের জন্য শুধু দেশীয় জুরি নিয়োগের উল্লেখ করা হয়। ভারত বাংলাদেশের আহ্বানের প্রেক্ষিতে সেসব পাকিস্তানি সেনাদের বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তর রাজি হয়। যাদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ সরকার প্রাথমিকভাবে প্রমাণের ভিত্তিতে ‘প্রাইমা ফেসিই কেল’ যোগ করতে পারবে। বাংলাদেশে সংগৃহীত তথ্য প্রমাণের ভিত্তিতে ১৯৭২ সালের ১৪ জুন ভারত সরকার প্রাথমিকভাবে ১৫০ জন যুদ্ধবন্দিকে বিচারের জন্য বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তরে রাজি হয়। ১৯৭২ সালের ১৯ জুন বঙ্গবন্ধু পুনরায় যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের কথা উল্লেখ করেন।


১৯৭২ সালের ২৮ জুন থেকে ৩ জুলাই ভারতের ষোলশহর সিমলায় অনুষ্ঠিত হয় ইন্দিরা-ভুট্টো বৈঠক। ১৮ বছর বয়সী ভুট্টোকন্যা বেনজিরও এই সময় উপস্থিত ছিলেন। এক অনাড়ম্বর অনুষ্ঠানে ইন্দিরা তাদের অভ্যর্থনা জানান। প্রথমে ইন্দিরা ও ভুট্টোর মধ্যে বৈঠক হয় অন্য কোনো উপদেষ্টা বা পরামর্শক ছাড়াই। এরপর উভয় সরকারের উপদেষ্টা ও পরামর্শদাতাদের উপস্থিতিতে ইন্দিরা-ভুট্টোর মধ্যে আরো কয়েক দফা বৈঠক হয়। অতঃপর দুই দেশের মধ্যে অতীতের সমস্ত সংঘর্ষ এবং উপমহাদেশে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সংকল্প ব্যক্ত করে ইন্দিরা ও ভুট্টো যে চুক্তি সই করে, তা সিমলা চুক্তি নামে খ্যাত। সামরিক ও রাজনেতিক নানা দ্বিপক্ষীয় সমস্যা নিয়ে বৈঠকে মতৈক্য প্রতিষ্ঠিত হলেও বাংলাদেশের স্বীকৃত বা যুদ্ধবন্দি ফেরত নিয়ে কোনো আলোচনা হয়নি।


চুক্তিতে কাশ্মির সীমান্তসহ দ্বিপাক্ষিক কতিপয় বিষয় যেমন পাকিস্তানের যে অঞ্চল ভারত দখল করেছে, তা ছেড়ে দেয়া নিয়ে চুক্তি হয়। সিমলা চুক্তির পরপরই বঙ্গবন্ধু মন্তব্য করেন যে, বাংলাদেশের মাটিতেই যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হবে। প্রতিবাদ জানায় ভুট্টো। তিনি বলেন, পাকিস্তানি যুদ্ধবন্দিদের বিচার করার কোনো অধিকার বাংলাদেশের নেই। কারণ, পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পণ করেছে ভারতীয় বাহিনীর কাছে। তখন ভারত সরকার বিষয়টির ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, প্রকৃত সত্য এই যে, পাকিস্তান বাহিনী আত্মসমর্পণ করেছে ভারতীয় বাহিনী এবং বাংলাদেশ মুক্তিবাহিনীর সমন্বয়ে গঠিত মিত্রবাহিনীর কাছে। আর সে কারণেই যুদ্ধবন্দিদের প্রশ্নে যে কোন সিদ্ধান্ত ভারত ও বাংলাদেশের মতৈক্যের ভিত্তিতেই গৃহীত হবে।


পাকিস্তান সরকার সে দেশে আটকেপড়া চার লাখ বাঙালিকে জিম্মি করে যুদ্ধবন্দিদের বিচারকে বাধাগ্রস্ত করার জন্য বাংলাদেশের পক্ষে আনুগত্য প্রকাশকারী সন্দেহে অনেককে বন্দিদশায় আটকে রাখে। প্রায় ১৬ হাজার বাঙালি সরকারি কর্মকর্তা, যাদের একাত্তরেই চাকরিচ্যুত করা হয়, তাদের পাকিস্তান ত্যাগের ওপর নিষেধজ্ঞা আরোপ করা হয়। অনেক বাঙালি আফগানিস্তানের দুর্গমপথ পাড়ি দিয়ে দেশে আসার পথে মারা যান। যুদ্ধ শেষ হবার পর পাকিস্তানে আটকেপড়া বাঙালিদের অমানবিক পরিবেশে বন্দিদশায় রাখে। যারা আফগানিস্তান হয়ে পালিয়ে যাচ্ছিলেন, সেই সব বাঙালিদের ধরিয়ে দেয়ার জন্য ভুট্টো সরকার মাথাপিছু এক হাজার রুপি পুরস্কার ঘোষণা করেছিল। পাকিস্তানিরা অসত্য অভিযোগ এনে প্রতিবেশি অনেক বাঙালিকে ধরিয়ে দেয়। যাদের পুলিশি নির্যাতন ভোগ করতে হয়েছে। ইন্টারন্যাশনাল রেসকিউ কমিটি পাকিস্তানে বাঙালিদের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে প্রতিবেদন পেশ করে। যাতে বলা হয়েছিল, ‘হাজার-হাজার বাঙালি বিনাবিচারে জেলে আটক আছে।

 

পাকিস্তান ত্যাগ করতে পারে এই অভিযোগে বাঙালিদের গ্রেফতার করা হয়েছে, প্রতিদিনই তাদের হয়রানি করা হচ্ছে এবং তারা বৈষম্যমূলক আচরণের শিকার। বিশেষ করে বাঙালিদের মধ্যে যারা উঁচু পদে রয়েছেন এবং বিত্তবান তারা দুর্বিষহ অবস্থায় রয়েছে। এদের ‘নিগার’ বা নিচুজাত হিসেবে দেখা হচ্ছে। যারা ইতোমধেই নির্যাতন নিপীড়নের শিকার তাদের প্রতি অত্যন্ত খারাপ আচরণ করা হচ্ছে। তবে সেনাবাহিনীসহ সরকারি উঁচু পদে অনেক বাঙালি পাকিস্তানের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে চাকরিরত ছিলেন। যেসব বাঙালি নারী বা পুরুষ পাকিস্তানি বিয়ে করেছেন, তাদের অবশিষ্টাংশ পাকিস্তানের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে বহালতবিয়তে রয়ে যায়। ভুট্টো প্রকাশ্য জোর গলায়ও বলেছেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে বাংলাদেশের প্রস্তাবের বিপরীতে আটকেপড়া বাঙালিদের জিম্মি করা হয়েছে।


আটকেপড়া বাঙালিদের ফেরত আনার জন্য তাদের পরিবার ঢাকাসহ সারাদেশে বিক্ষোভ মিছিল শুরু করে। প্রয়োজনে যুদ্ধাপরাধীদের বিনিময়ে তাদের স্বজনদের ফেরত আনার দাবি জানাতে থাকে। এই দাবিতে তারা সমাবেশ এবং অনশন পালন করতে থাকে। ১৯৭২ সালের ৪ মে পুরো ঢাকা শহরজুড়ে জনতার বিক্ষোভ মিছিল বের হয় বাঙালিদের ফিরিয়ে আনার দাবিতে। সরকারের ওপর তারা ক্রমাগত চাপ বাড়াতে থাকে। আটকেপড়া বাঙালিদের ব্যাপারে বাংলাদেশ তখন উদ্বেগ প্রকাশ করে। বাংলাদেশ জাতিসংঘের মহাসচিবের সাহায্য কামনা করে ভারতের মাধ্যমে আবেদন জানায়।

অপরদিকে হানাদার বাহিনীর নৃশংসতায় নিহত শহীদদের পরিবারগুলো সারাদেশে সভা-সমাবেশ করতে থাকে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে। ইতোমধ্যে বাংলাদেশ সরকার দালাল আইন জারি করে। আলবদর, রাজাকারসহ দালালদের গ্রেফতার অব্যাহত থাকে। চীনাপন্থী দল, উপদল এবং ভাসানী এই আইন বাতিলের দাবি জানাতে থাকে। তারা এই আইনে কাউকে গ্রেফতার করা যাবে না বলে সভা-সমাবেশ ও মিছিলে হুঁশিয়ারি জারি করে। ন্যাপ, সিপিবিসহ কয়েকটি দল আটকেপড়া পাকিস্তানিদের দ্রুত পাকিস্তানে ফেরত পাঠানোর দাবি তুলতে থাকে। নানামুখী চাপে তখন বঙ্গবন্ধু সরকার।

অপরদিকে ভুট্টো বুঝতে পেরেছেন, আটকেপড়া বাঙালিদের ফেরত নিতে শেখ মুজিবের সরকার চাপের মুখে রয়েছেন। এই সুযোগ কাজে লাগাতে দেরি না করে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীতে কর্মরত সেনা সদস্য ও চাকরিজীবী কয়েকশ’ বাঙালিকে গুপ্তচর বৃত্তির অভিযোগ এনে গ্রেফতার করে, বঙ্গবন্ধু তাদের মুক্তি প্রদানের দাবি জানালেও ভুট্টো তাতে সাড়া দেয়নি। বরং আটকেপড়াদের বিনিময়ে সকল যুদ্ধবন্দিদের ফেরত নিতে ষড়যন্ত্র আঁটেন। ১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ভুট্টো বিহারি অধ্যুষিত সিন্ধুপ্রদেশে ‘বিহারি বাঁচাও’ নামে মিছিল সামবেশ করেন এবং আন্তর্জাতিক মহলকে এ ব্যাপারে সোচ্চার হতে আবেদন জানালেও ফেরত নেয়ার ব্যাপারে কোনো আগ্রহ দেখায়নি।

১৯৮৯ সালে দিল্লি থেকে প্রকাশিত বাংলাদেশ অ্যান্ড ইন্ডিয়ান ওসান এরিয়াস গ্রন্থে  অধ্যাপক ডেনিস রাইট উল্লেখ করেছিলেন সে সময়ের কথা ‘বিকৃত বিচারের বদলে যুদ্ধাপরাধীদের প্রশ্নটি বাংলাদেশ ও পাকিস্তান উভয় দেশের জন্য একটি ‘কু’ কূটনৈতিক তুরুপের তাস-এ পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশ তাকে ব্যবহার করবে পাকিস্তানের স্বীকৃতি আদায়ের জন্য। আর পাকিস্তান স্বীকৃতি দেয়ার পূর্বশর্ত হিসেবে দাবি করবে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নাকচ করার জন্য।’

আটকেপড়া পাকিস্তানি সেনাদের নিয়েও বিপাকে পড়ে ভারত। জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী এদের নিরাপত্তা, খাওয়া-দাওয়াসহ ভরণপোষণ এবং ভাতা প্রদান করতে হতো। এ খাতে প্রতিমাসে ব্যয় দাঁড়াচ্ছিল এক লাখ ডলার। যুদ্ধ শেষ, যুদ্ধবিরতি চুক্তিও সই হয়েছে, পরাজিতরা আত্মসমর্পণও করেছে। সুতরাং তাদের আর আটকে রাখার পক্ষে কোনো যুক্তিও ভারতের সামনে তখন ছিল না।

ভারত বেতারে বিশেষ চ্যানেল চালু করে, যেখান থেকে যুদ্ধবন্দিরা পাকিস্তানে তাদের পরিবারের কাছে নিজের অবস্থা জানান দিয়ে বার্তা পাঠাতো। তাই দেখা যায়, বিষয়টির নিষ্পত্তির জন্য জাতিসংঘের মহাসচিব ওয়াল্ডহেইম ভারত সফরে এসে ইন্দিরা গান্ধীকে পাকিস্তানি যুদ্ধবন্দিদের ফেরত পাঠানোর বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পরামর্শ দেন।

ইন্দিরা অবশ্য সরাসরি জানিয়েছেন, বাংলাদেশের মতামত অগ্রাহ্য করে ভারত একতরফাভাবে কিছু করতে পারে না, করবেও না। ইন্দিরা জানতেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিষয়ে শেখ মুজিব দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। বাংলাদেশ সরকার যুদ্ধাপরাধীদের প্রথম তালিকায় ১৫০০ পাকিস্তানি সেনা কর্মকর্তা ও সেনা সদস্যের নাম প্রকাশ করে। কিন্তু আন্তজার্তিক মান অনুযায়ী যথাযথ তথ্য-প্রমাণ হাজির করার ক্ষেত্রে ঘাটতি থাকায় তালিকা কমিয়ে আনে। শেষে তা দাঁড়ায় ১৯৫ জন।

১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারিতে গঠিত উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন কমিটি এই তালিকা করে। ১৯৭৩ সালের জুলাই মাসে বাংলাদেশ জাতীয় সংসদে যুদ্ধবন্দি বিষয়ে প্রথম আইন পাস করা হয়।

দিল্লি থেকে ১৯৭৫ সালে প্রকাশিত ‘ইন্ডিয়া, পাকিস্তান, বাংলাদেশ; সার্চ ফর নিউ রিলেশনশিপ’ গ্রন্থে অধ্যাপক মুহম্মদ আইউব লিখেছেন, ‘ভুট্টো জানতেন তার, দেশে আটক যুদ্ধবন্দি ভারতের জন্যে বোঝাস্বরূপ। আজ বা কাল হোক, ভারতকে সব যুদ্ধবন্দি ছেড়ে দিতেই হবে। ফলে এই প্রশ্নে দেন দরবার করে কোনো বাড়তি ফায়দা আদায় হবে না।

ভুট্টো বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন ও হেনস্তা করার জন্য উঠে পড়ে লাগেন। পুরো ১৯৭২ সাল তাই তিনি বাংলাদেশকে ভারতের অধিকৃত অঞ্চল বলে ঘোষণা করতেন। ১৯৭২ সালের ১০ আগস্ট এক সংবাদ সম্মেলনে ভুট্টো বলেন, বাংলাদেশ ভেবেছে যে, আমাদের বন্দিদের মুক্ত করার ব্যাপারে তাদের ভেটো ক্ষমতা আছে। ভেটো আমাদের হাতেও একটা আছে।’

ভুট্টো জানান, পাকিস্তানের অনুরোধে চীন জাতিসংঘে বাংলাদেশের সদস্যপদ লাভের বিষয়ে ভেটো দিত। অর্থাৎ সদ্যস্বাধীন যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ হিসেবে বাংলাদেশের জন্য বৈদেশিক সাহায্য উন্নয়ন সহযোগিতা অত্যন্ত জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই জাতিসংঘের সদস্যপদ লাভ গুরুত্ববহ হয়ে ওঠে। বাংলাদেশ সাহায্য পাবার জন্য আবেদন করে। ২৫ আগস্ট চীন নিরাপত্তা পরিষদে বাংলাদেশের সদস্যপদ লাভের বিষয়ে ভেটো দেয়।

বাংলাদেশের অপরাধ তখন যুদ্ধাপরাধীদের বিচার দাবি করা। তদুপরি বাংলাদেশ বিচারের অবস্থান থেকে সরে আসেনি। দূতিয়ালির জন্য বঙ্গবন্ধু চীনেও প্রতিনিধি পাঠিয়েছেন গোপনে। চীন তখন পাকিস্তানের বিষয়ে অন্ধ এবং গণহত্যাকারীদের বিচারের বিপক্ষে দৃঢ় অবস্থান নেয়। ফলে বাংলাদেশের দূতিয়ালি সফল হতে পারেনি। চীন বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে পাকিস্তানের পক্ষাবলম্বন করেছিল পুরো একাত্তর সালে।

১৯৭২ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর ভুট্টো ওয়াশিংটন পোস্ট পত্রিকায় এক সাক্ষাৎকারে উল্লেখ করেছেন, ‘কয়েকশ’ পাকিস্তানি বন্দিদের য্দ্ধুাপরাধী হিসেবে বিচার করার জন্য রেখে বাকিদের ছেড়ে দেয়া হলে তার আপত্তি নেই।’ কিন্তু  ১৯৭৩ সালে ভুট্টো তার মত পরিবর্তন করে বলেন, ‘পাকিস্তানি বন্দিদের বিচার করা হলে সে আটকেপড়া বাঙালিদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।’ (হু কিল্ড মুজিব, এএল খতিব)।

১৯৭২ সালের নভেম্বরে ভারত আটক পাকিস্তানি সেনাদের পরিবারের প্রায় ৬ হাজার সদস্যকে মুক্তি দেয়। বিপরীতে পাকিস্তানও আটকেপড়া ১০ হাজার বাঙালি নারী ও শিশুর একটি দলকে বাংলাদেশে প্রত্যাবাসনে সম্মত হয়। কিন্তু পাকিস্তানে আটক অধিকাংশ বাঙালির কী হবে, সে নিয়ে উৎকন্ঠা বাড়তে থাকে।

যুদ্ধবন্দি ও আটকেপড়া বাঙালিদের বিনিময় নিয়ে কূটনৈতিক তৎপরতার আড়ালে চাপা পড়ে যেতে থাকে আটকেপড়া পাকিস্তানিদের ফেরত যাবার বিষয়টি। জাতিসংঘ শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশন এদের শরণার্থী হিসেবে মর্যাদা দেয়। এরা যেসব ক্যাম্পে আশ্রয় নেয়, তা জেনেভা ক্যাম্প নামে পরিচিত হয়ে ওঠে।

প্রায় ৬ লাখ বিহারি পাকিস্তানের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে সেদেশে ফিরে যাবার জন্য তালিকাভুক্ত হয়। এদের একটা অংশ ১৯৭২ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত মীরপুর দখল করে রেখেছিল। আল শামস বাহিনীর সদস্যও ছিল এরা।

১৯৪৭ সালের পূর্ব হতেই ব্রিটিশদের কূটকৌশলে বিহার থেকে এরা এদেশে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সৃজনে এরাই প্রধান নৃশংস ভূমিকা রেখেছিল। প্রচন্ডভাবে বাঙালি বিদ্বেষী বিহারিরা দেশের বিভিন্ন এলাকায় জায়গা-জমি দখল করে গোত্রভুক্ত হয়ে থাকত।

১৯৭১ সালের মার্চে এরা বিভিন্ন স্থানে বাঙালির ওপর হামলা চালায়। আর পুরো নয়মাস গণহত্যা, ধর্ষণ, লুটপাটে এরা পাকিস্তান বাহিনীর বিশ্বস্ত হিসেবে নৃশংস হয়ে উঠেছিল। এদের একটি  বড় অংশ অর্থাৎ বিত্তবানরা ডিসেম্বরের আগেই পাকিস্তান চলে যায়। দরিদ্র বিহারিরা আর তাদের পথ পায়নি। পাকিস্তানি হানাদাররাও এদের সঙ্গে নিয়ে যায়নি। এই আটকেপড়ারা পাকিস্তান যাবার জন্য চারদশকেরও বেশি সময় ধরে অপেক্ষমান।

যুদ্ধাপরাধী বিচারের পথ বন্ধ করতে পাকিস্তানের কূটনৈতিক তৎপরতা এগিয়ে যেতে থাকে। ১৯৭৩ সালের ১০ জানুয়ারিতে ওয়াশিংটন পোস্ট পত্রিকায় লেখা হয় যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেন বাংলাদেশের সরকার প্রধান শেখ মুজিবকে পরামর্শদান উপলক্ষে জানিয়ে দিয়েছে যে, একটি বিপুলসংখ্যক যুদ্ধবন্দি ও বেসামরিক ব্যক্তিদের বিচার করা হলে পাকিস্তানের হতোদ্যম জনগণের মধ্যে যে ক্ষোভের সৃষ্টি হবে প্রেসিডেন্ট ভুট্টো তা সামলাতে পারবে না এবং এর ফলে উপমহাদেশে শান্তি স্থাপন সম্পর্কিত আলাপ-আলোচনা গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। যুদ্ধাপরাধীর বিচার প্রত্যাহারের জন্য এটাই প্রথম বিদেশি চাপ, তা নয়।

১৯৭১সালে যখন পাকিস্তানি হানাদাররা বাংলাদেশে গণহত্যায় লিপ্ত, তখন যেসব মুসলিম দেশ ক্ষমতাসীন ও প্রতিবাদ করেনি, তারা ১৯৫ জন পাকিস্তানি যুদ্ধাপরাধীর জন্য গুরুতর উদ্বেগ প্রকাশ করে। বিশেষত মধ্যপ্রাচ্যর ধনী দেশগুলো। এরমধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, পাকিস্তানে আটকেপড়া বাঙালিদের ভাগ্যের সঙ্গে পাকিস্তানি যুদ্ধাপরাধীদের ভাগ্য বিজড়িত।

তখন ১৭ এপ্রিল ১৯৭৩ সালে টানা চারদিনের আলোচনা শেষে বাংলাদেশ ও ভারতের যৌথ ঘোষণায় যুগপৎ প্রত্যাবাসনের প্রস্তাব রেখে বলে, যুদ্ধবন্দি আটক সব নাগরিককে একযোগে নিজ-নিজ দেশে পাঠানো হবে। তার আগে দেশ তিনটি নাগরিকদের সাতটি ক্যাটাগরি প্রণয়ন করেছিল। এই তালিকায় আটকেপড়া বাঙালি ও বিহারি ছাড়াও পাকিস্তানের যুদ্ধবন্দি ও যুদ্ধাপরাধীরা অন্তর্ভুক্ত ছিল।

পাকিস্তান এই প্রস্তাবের বিরোধিতা করেনি। তাই প্রস্তাব অনুসারে ভারত সেদেশে আটক প্রায় ১০ হাজার বন্দিকে পাকিস্তানের কাছে হস্তান্তর করবে। বিনিময়ে পাকিস্তান সেদেশে আটকে থাকা বাঙালিদের মধ্যে দু’লাখ ৬৩ হাজার অবাঙালি তথা  বিহারিকেও পাকিস্তান ফেরত নেবে। তারপরও বাংলাদেশ যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবি হতে সরে আসেনি।
এমনকি অভিযুক্ত পাকিস্তানি যুদ্ধাপরাধীদের এই প্রত্যাবাসন প্রস্তাবের বাইরে রাখে।

যুগপৎ এই প্রত্যাবাসনে ভুট্টো সায় দিলেও মাত্র ৫০ হাজার বিহারিকে ফেরত নিতে রাজি হয়। তবে ভুট্টো বাংলাদেশে পাকিস্তানি সেনাদের বিচারের তীব্র প্রতিবাদ জানায়। সদম্ভে ঘোষণা করেন, ‘বাংলাদেশ যদি অভিযুক্ত পাকিস্তানিদের বিচার করে, তাহলে তিনি পাকিস্তানে আটক বাংলাদেশের নাগরিকদের একইরকম ট্রাইব্যুনালে বিচার করবেন।’

১৯৭৩ সালের ২৭ মে নিউইয়র্ক টাইমসকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে ভুট্টো বলেন, ‘বাঙালিদের এখানে বিচার করার দাবি জনগণ করবে। আমরা জানি, বাঙালিদের যুদ্ধের সময় তথ্য পাচার করেছে। তাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আনা হবে। কতজনের বিচার করা হবে, তা এখনই বলতে পারছি না।

বাংলাদেশ যদি পাকিস্তানি সেনাদের বিচার করে, তাহলে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী ক্যু’র মাধ্যমে পাকিস্তানের রাজনৈতিক সরকারের পতন ঘটাবে এবং দুই দেশের পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণের বাইরে নিয়ে যাবে। এই চক্রান্তের জন্য ইতোমধ্যেই পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তাকে গ্রেফতারও করা হয়েছে।

ভুট্টোর এসব বাগাড়ম্বরের প্রতিবাদ করেন বঙ্গবন্ধু। ১৯৭৩ সালের ৭ জুন নিউইয়র্ক টাইমস পত্রিকায় দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ ভোলা সম্ভব নয়। এই হত্যা, ধর্ষণ, লুটের কথা জানতে হবে। যুদ্ধ শেষের মাত্র তিনদিন আগে তারা আমার বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করেছে। তারা প্রায় ২ লাখ নারীকে নির্যাতন করেছে, এমনকি ১৩ বছরেও মেয়েকেও। আমি এই বিচার প্রতিশোধের জন্য করছি না। আমি এটা করছি মানবতার জন্য।

বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানে বাঙালিদের বিচারের হুমকি প্রতিবাদ করে বলেন, এটা অবিশ্বাস্য। এই মানুষগুলো চিকিৎসক, বিজ্ঞানী, সরকারি ও সামরিক কর্মকর্তা; যারা বাংলাদেশে ফেরত আসতে চায়, ওরা কী অপরাধ করেছে? এটা ভুট্টোর কী ধরনের প্রতিহিংসা পরায়ণতা।’ কিন্তু ভুট্টোর, কুমন্ত্রণা তার আদ্যোপান্ত জীবনজুড়ে। তিনি ষড়যন্ত্রের জাল ছড়াতে থাকেন। ১৯৫ শীর্ষ বাঙালি কর্মকর্তাকে বিচারের জন্য গ্রেফতার করে বলে ১৯৭৩ সালের ২৬ আগস্ট নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

বঙ্গবন্ধু ১৯৭৩ সালের জুলাই মাসের শেষ সপ্তাহে রাষ্ট্রীয় সফরে যান যুগোশ্লাভিয়ায়। এ সময় পাকিস্তানি নোবেল জয়ী পরমাণু বিজ্ঞানী প্রফেসর আবদুস সালাম এক পত্রে বঙ্গবন্ধুর জামাতা ড. এম ওয়াজেদ মিয়াকে জানান, তিনি বেলগ্রেডে গিয়ে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে ভুট্টোর একটা বৈঠকের আয়োজন করতে। পাকিস্তান তখনও বাংলাদেশকে স্বীকৃতি না দেয়ায় বঙ্গবন্ধু প্রস্তাব নাকচ করে দেন।

প্রফেসর সালাম বঙ্গবন্ধুর উদ্দেশে পত্রে অনুরোধ জানান, ‘শেখ সাহেবের কাছে আমার বিশেষ অনুরোধ যে, তিনি যেন ৯৩ হাজার পাকিস্তানি যুদ্ধবন্দিদের মধ্যে শুধুমাত্র ১৯৫ জন কর্মকর্তাকে বাদ দিয়ে বাকিদের বিনাশর্তে মুক্তি দেন। পরবর্তীতে ১৯৫ জনের বিচার করে ওদের থেকে শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তাদের ফাঁসি দেয়া যেতে পারে।’

বাংলাদেশ ১৯৫ জন পাকিস্তানি যুদ্ধাপরাধী ও তাদের দেশীয় সহযোগীদের বিচারের জন্য আইন প্রণয়ন করে। রাজাকার, আলবদর, আলশামস, দালালদের বিচারের জন্য ‘বাংলাদেশ দালাল (বিশেষ ট্রাইব্যুনাল) অধ্যাদেশ ১৯৭২ জারি করে। ১৯৭৩ সালের ১৫ জুলাই বাংলাদেশের নয়া সংবিধানের প্রথম সংশোধণী আনা হয়। এতে ৪৭(৩) ধারা সংযুক্ত করা হয়। যাতে ‘গণহত্যাজনিত অপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ বা যুদ্ধাপরাধ এবং আন্তজার্তিক আইনের অধীনে অন্যান্য অপরাধের জন্য কোন সশস্ত্র বাহিনী বা প্রতিরক্ষা বাহিনী বা সহায়ক বাহিনীর সদস্যে কিংবা যুদ্ধবন্দিকে আটক, ফৌজদারিত্বে সোপর্দ কিংবা দ-দান করার বিধান’ অন্তভুর্ক্ত করা হয়।

২০ জুলাই জারি করা হয় আন্তজার্তিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন ১৯৭৩। এর ফলে মানবতাবিরোধী অপরাধ বা যুদ্ধাপরাধের জন্য পাকিস্তানি এবং দেশীয় যুদ্ধপরাধের বিচারের ব্যবস্থা নেয়ার পথ সহজ হয়। বাংলাদেশ যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে অনড় অবস্থানে থাকে। তবে ভারতের শিবিরে থাকা অন্য যুদ্ধবন্দিদের পাকিস্তানে ফেরত পাঠাতে অগ্রগতি ছিল বঙ্গবন্ধুর। পাকিস্তানি সেনাদের বিচারের বিপরীতে চীনের অবস্থান ভারতকে বিপাকে ফেলে। চীনের সঙ্গে দ্বন্দে জড়াতে ভারত তখন আগ্রহী নয় পারিপার্শ্বিক অবস্থার কারণে।

আন্তজার্তিকভাবে যেমন, তেমনি অভ্যন্তরীণভাবেও ইন্দিরা সরকারের ওপর চাপ তৈরি হতে থাকে, যাতে ভারত দ্রুত সব যুদ্ধবন্দিদের পাকিস্তানে ফেরত পাঠায়। এরই  প্রেক্ষিতে সিমলা চুক্তির সূত্র ধরে ভারত পাকিস্তান দু’দফা বৈঠকে বসে। ১৯৭৩-এর জূলাইয়ে রাওয়ালপিন্ডিতে এবং আগস্টে দিল্লিতে অনুষ্ঠিত বৈঠকে ইন্দিরার বিশেষ উপদেষ্টা পিএন হাকসার এবং পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্র বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী আজিজ আহমদের মধ্যে বিস্তারিত আলোচনার পর একটি চুক্তি সই হয়। ভারত আটক পাকিস্তানি যুদ্ধবন্দি, পাকিস্তান আটক বাঙালি এবং বাংলাদেশ আটকেপড়া পাকিস্তানি নাগরিকদের স্ব-স্ব দেশে ফেরত পাঠানোর সিদ্ধান্ত ব্যক্ত করা হয়। এই লোক বিনিময় শেষ হওয়ার পর বাংলদেশ ভারত, ও পাকিস্তানের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে বাকি ১৯৫জন পাকিস্তানি যুদ্ধাপরাধীদের বাংলাদেশকে আলোচনায় না রাখায় চুক্তি জোরালো হয়ে উঠতে পারেনি।

বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে ঘোষণা করা হয়, একমাত্র সার্বভৌম সমতার ভিত্তিতেই বাংলাদেশ এ ধরনের কোনো আলোচনায় বসতে পারে। ভারত  পাকিস্তানের মধ্যে এই চুক্তি সই হওয়ায় স্বভাবতই আশা করা হয়েছিল যে, অতঃপর পাকিস্তান বাংলাদেশকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেবে। কিন্তু বাস্তবে স্বীকৃতিদান দূরের কথা, জাতিসংঘে বাংলাদেশের অন্তভুর্ক্তি ঠেকিয়ে রাখার জন্য পাকিস্তান ধরনা দেয় গণচীনের দরবারে।

পাকিস্তানের প্রতিমন্ত্রী আজিজ আহম্মদ পির্কিং (বেইজিং) ছুটে যান এবং বাংলাদেশ প্রমুখ নিয়ে চীনা নেতাদের সঙ্গে দেনদরবার করেন। অতঃপর আজিজ আহমদ এক সংবাদ সম্মেলনে ঘোষণা করেন, পাকিস্তানি ১৯৫ জন যুদ্ধবন্দির বিচারের সিদ্ধান্ত বাতিল না করা পর্যন্ত পাকিস্তান ও চীন বাংলাদেশের জাতিসংঘ সদস্য প্রাপ্তির বিরোধিতা করে যাবে।

১৯৭৩ সালের ২৮ আগস্ট যে দিল্লি চুক্তি সই হয়, তাতে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রশ্নে বাংলাদেশকে ছাড় দিতে হয়। চুক্তিতে বলা হয়, পাকিস্তান বাঙালি ‘গুপ্তচরদের’ বিচার করবে না। যে ১৯৫ জন য্দ্ধুাপরাধী বাংলাদেশ চিহ্নিত করেছে তাদেও বিচার হবে এবং বাংলাদেশেই হবে। তবে এ ব্যাপারে যদি পাকিস্তান ও বাংলাদেশ ঐক্যমত্যে পৌঁছাতে পারে, তবেই তা হবে।

বাংলাদেশ যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রশ্নে তাদের দৃঢ় অবস্থানের কথা এরপরও উল্লেখ করতে থাকে। কিন্তু, এই চুক্তির ফলে এক তরফা ভাবে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণের সুযোগ আর থাকেনি। দিল্লি চুক্তি স্পষ্ট করেছিল, যুদ্ধাপরাধীদের আর বিচার হচ্ছে না। কারণ, পাকিস্তান এ প্রশ্নে কখনোই বাংলাদেশের সঙ্গে সহমত ঘোষণা করবে না। দিল্লি চুক্তিকে পাকিস্তানি সংবাদপত্রে উপমহাদেশে নতুন সম্পর্কের সূচনা করবে বলে অভিমত জানায়।

নিউইউর্ক টাইমসের ২ সেপ্টেম্বর সংখ্যায় বলা হয়, নতুন সম্পর্ক হয়তো এখনই শুরু হচ্ছে না। কিন্তু এ কথায় কোনো ভুল নেই যে, এই তিন দেশের মধ্যে সম্পর্ক নতুন মোড় নিচ্ছে।

১৯৭৩ সালের ৬ সেপ্টেম্বর আলজেরিয়ায় অনুষ্ঠিত জোটনিরপেক্ষ সম্মেলন চলাকালে সৌদি বাদশাহর সঙ্গে বঙ্গবন্ধু বৈঠক করেন। বাদশাহ ফয়সাল দাম্ভিকতার সঙ্গে শর্তারোপ করেন। বাংলাদেশকে সৌদি আরবের স্বীকৃতি পেতে হলে দেশটির নাম পরিবর্তন করে ইসলামিক রিপাবলিক অব বাংলাদেশ রাখতে হবে।

দ্বিতীয় শর্ত হলো, অবিলম্বে সমস্ত পাকিস্তানি যুদ্ধবন্দিদের মুক্তি দিতে হবে। বঙ্গবন্ধু বাদশাহকে কড়া জবাব দিয়ে যুদ্ধবন্দি সম্পর্কে বলেন, ‘এটাতো বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের দ্বিপাক্ষিক বিষয়। এই দুটো দেশের মধ্যে এ ধরনের আরো অনেক অমীমাংসিত প্রশ্ন রয়েছে। যেমন ধরুন, বাংলাদেশ থেকে কয়েক লাখ পাকিস্তানি নাগরিকদের সে দেশে ফেরত নেয়া এবং পাকিস্তানে আটকেপড়া পাঁচ লক্ষাধিক বাঙালিকে বাংলাদেশে পাঠানো এবং বাংলাদেশের প্রাপ্য অর্থসম্পদ পরিশোধ করা।


এমন বেশকিছু অমীমাংসিত প্রশ্ন রয়েছে। আর এসবের মীমাংস কিছুটা সময় সাপেক্ষ ব্যাপার। শুধু বিনাশর্তে ৯৩ হাজার পাকিস্তানি যুদ্ধবন্দিদের ছেড়ে দেয়ার বিষয়টি আলাদাভাবে বিবেচনা করা বাঞ্ছনীয় হবে না। আর সৌদি আরবই বা এত উদগ্রীব কেন? বঙ্গবন্ধু কড়াভাষ্য শুনে সৌদি বাদশা একটু রূঢ়স্বরে বলেন, ‘শুধু এটুকু জেনে রাখুন, সৌদি আরব আর পাকিস্তান একই কথা। পাকিস্তান আমাদের সবচেয়ে অকৃত্রিম বন্ধু। যা হোক, আমার শর্ত দু’টি বিবেচনা করে দেখবেন। একটা হচ্ছে বাংলাদেশকে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ঘোষণা ও অপরটি বিনাশর্তে পাকিস্তানি যুদ্ধবন্দিদের বিচারের বিপরীতে অবস্থান নেয়। কিন্তু বাংলাদেশ তাদের বিচারের বিষয়ে তখনো অনড় অবস্থানে।

বাংলাদেশ যুদ্ধাপরাধীদের ছাড়া বাকি যুদ্ধবন্দিদের প্রত্যাবাসনে আপত্তি তোলেনি। কিন্তু যুদ্ধাপরাধীদের ছাড়া যুদ্ধবন্দিদের ফেরত নিতে আপত্তি বজায় রাখেন। ভুট্টো জানতেন যুদ্ধবন্দিদের ভারত এমনিতে ফেরত দিতে বাধ্য হবে। কারণ বেশিদিন ভরণপোষণ দিতে পারবে না। আটকেপড়া বাঙালিদের নিরাপত্তা বা সুরক্ষার দায়িত্ব তার নেই। যদিও বেশির ভাগ বাঙালিই যুদ্ধের সময় থেকেই চাকরি হারাতে থাকেন। বেকারত্বের কারণে সম্পদ সবই বিক্রি করতে বাধ্য হন।

এসব তথ্য জেনে বঙ্গবন্ধু ১৯৭৩ সালের ৮ মার্চ জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তজার্তিক প্রতিষ্ঠানকে এই করুণ অবস্থার অবসানে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।  ১৯৭৩ এর ২৮ আগস্ট দিল্লিতে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে বৈঠক হয় বাংলাদেশের সম্মতিতে। বৈঠকে উভয় দেশ, ‘দিল্লি চুক্তি’ সই করে। দ্বিপাক্ষিক চুক্তিতে যুগপৎ প্রত্যাবাসন নিয়ে উভয়পক্ষ সম্মত হয়।

অপরদিকে শর্তরোপ করা হয়। পাকিস্তান গুপ্তচর বৃত্তির দায়ে আটক বাঙালিদের বিচার করবে না। তবে বাংলাদেশ সেদেশে ১৯৫জন যুদ্ধাপরধীদের যে বিচার করতে চায় সে বিষয়ে বাংলাদেশ ও পাকিস্তান ঐক্যমত্য হলেই তবে বিচার হবে না।

বঙ্গবন্ধু যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য তার সরকারের দৃঢ়তার কথা বিভিন্ন পর্যায়ে বিবৃত করেছেন। কিন্তু এই চুক্তির ফলে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের পথ সংকীর্ণ হয়ে পড়ে। ১৯৭৩ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর শুরু হওয়ায় প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার নামে সপ্তাহেই ১,৪৬৮ জন বাঙালি এবং ১,৩০৮ জন পাকিস্তানি যুদ্ধবন্দির প্রত্যাবাসন ঘটে। বাংলাদেশ ১৯৫জন যুদ্ধপরাধী ফেরত না দেয়ার সিদ্ধান্তে অটল থাকায় পাকিস্তান দুই শতাধিক বাঙালিকে পণবন্দি হিসেবে জিম্মি করে রাখে। এসব সিদ্ধান্তের আগে ১৯৭৩ সালের এপ্রিলে ভুট্টো একটি ঠিকানা প্রস্তাবও রেখেছিল।

এতে বলা হয়েছিল, পাকিস্তার তার যে কোনো যুদ্ধবন্দির বিচার ঢাকায় অনুষ্ঠানের বিরোধিতা করে কারণ অভিযুক্ত অপরাধ পাকিস্তানের একটি অংশেই ঘটেছে। সুতরাং পাকিস্তান নিজে বিচার বিভাগীয় ট্রাইব্যুনাল গঠন করে এদের বিচারে আগ্রহী। যা আন্তজার্তিক আস্থা অর্জনে সক্ষম হবে। (পাকিস্তান অ্যাফেয়ার ১ মে ১৯৭৩)।

বাংলাদেশ সন্দেহ প্রকাশ করে যে, টিক্কা খান পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর প্রধান থাকাবস্থায় এসব যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে পাকিস্তানি প্রস্তাবে সন্দেহ পোষণ করে। তবে বাংলাদেশে যে বিচার করা সম্ভব হবে না তা বঙ্গবন্ধু পরিষ্কার উপলব্ধি করতে পারে। কারণ তখন আটকেপড়া নির্যাতিতসহ সাধারণ বাঙালিদের দেশে ফেরত আনা জরুরি হয়ে পড়েছে। অথচ এই বাঙালিদের ভাগ্য জড়িয়ে গেছে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের সঙ্গে। এক দোটনায় পড়ে যায় বাংলাদেশ। তথাপি যুদ্ধাপরাধীদের ছেড়ে দেয়ার আগে পাকিস্তানের কাছে চারটি বিষয়ে নিশ্চিত হতে চায়।

প্রথমত. যুদ্ধাপরাধের জন্য বাংলাদেশের কাছে পাকিস্তানের নিঃশর্ত ক্ষমা চাওয়া, দ্বিতীয়ত. ভবিষ্যতে পাকিস্তানে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের পথ খোলা রাখা এবং তৃতীয়ত. সৌদি আরব, মধ্যপ্রাচ্য, চীনসহ অন্যান্য দেশে পাকিস্তানের বাংলাদেশ বিরোধী প্রচার না বন্ধ করা এবং সর্বোপরি বাংলাদেশকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দান। পাকিস্তানের পার্লামেন্টে ১৯৭৩ সালের ১০ জুলাই বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদানের শর্তসাপেক্ষে ভুট্টোকে একক ক্ষমতা তুলে দেয়। ভুট্টো সংসদে বলেন, পাকিস্তানি সেনাদের বিচারের দাবি পরিত্যাগ না করা পর্যন্ত কোনো স্বীকৃতি নয়।

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ১৯৭৩ সালের ২০ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত অধিবেশনে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ভুট্টো ভাষণে বলেন, ১৯৫ জন যুদ্ধবন্দির মুক্তি দিয়ে পাকিস্তানে ফেরত না পাঠানো পর্যন্ত নিরাপত্তা পরিষদ ও সাধারণ পরিষদের প্রস্তাবের শর্ত অপূর্ণই থেকে যাবে। আর জাতিসংঘের প্রস্তাব বাস্তবায়িত না হওয়া পর্যন্ত বাংলাদেশকে পাকিস্তানের স্বীকৃতি এবং বাংলাদেশের পক্ষে জাতিসংঘের সদস্যপদ লাভের প্রশ্নই উঠে না। এর ১২ দিন পর ৩ অক্টোবর চীনের উপ-প্রধানমন্ত্রী চিয়ানজিয়ান হুয়া অধিবেশনে বলেন, জাতিসংঘের প্রস্তাব কার্যকরী করার পরেই বাংলাদেশ জাতিসংঘের সদস্যপদ লাভ করতে পারে। তার আগে কোনোক্রমেই নয়।

দিল্লিতে ১৯৭৩ সালের ১২ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ ভারতও পাকিস্তানের মধ্যে ত্রিপক্ষীয় বৈঠক বসে। বৈঠক শেষে তিন দেশীয় প্রতিনিধিরা এক যুক্ত ঘোষাণায় বলেন যে, উপমহাদেশে স্থায়ী শান্তি ও সম্প্রীতির পরিবেশ গড়ে তোলার স্বার্থে পাকিস্তানি যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বাতিল করে দেয়া হবে। অবশ্য এই যুক্ত ঘোষণার পর আন্তর্জাতিক রেডক্রসের তত্ত্বাবধানে পাকিস্তানে আটক বাঙালিদের প্রথম সেপ্টেম্বর। কিন্তু এরপর থেমে যায়।

পাকিস্তান এ ব্যাপারে টালবাহানা শুরু করে। অথচ যুক্ত ঘোষণায় ত্রিমুখী লোক বিনিময় যুগপৎ পরিচালিত হওয়ার কথা উল্লেখ রয়েছে। এরই প্রেক্ষিতে বঙ্গবন্ধু ২২ অক্টোবর টোকিও’তে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, বাংলাদেশ পাকিস্তান থেকে প্রতিটি বাঙালি ফেরত দিচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশ থেকে পাকিস্তানি নাগরিকদের বিপুল সংখ্যককেই পাকিস্তান নিচ্ছে না।’

এর ক’দিন পরই ভুট্টো ঘোষণা করেন যে, ‘পাকিস্তান বাংলাদেশে অবস্থানরত পাকিস্তানি নাগরিক বিহারিদের ফেরত নেবে না।’ অথচ প্রায় পাঁচ লাখ বিহারী মধ্যে অধিকাংশই পাকিস্তানের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে সে দেশে ফেরত যেতে আগ্রহী বাংলাদেশের পক্ষে এদের ভরণপোষণ ভারবাহী হয়ে দাঁড়ায় গোড়াতেই।  

১৯৭৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে লাহোরে অনুষ্ঠিত ইসলামিক শীর্ষ সম্মেলনকালে পাকিস্তানি যুদ্ধবন্দি ও আটকেপড়া বাঙালিদের সম্বন্ধে বঙ্গবন্ধু ও ভুট্টোর মধ্যে প্রাথমিক আলোচনা হয়। বঙ্গবন্ধু বৈঠক চলাকালে সাংবাদিকদের জানান, ‘পাকিস্তানি যুদ্ধাপরাধীদের বিচার এবং বাঙালিদের দেশে ফেরাসহ আরো অনেক বিষয়ে কথা বলার প্রয়োজন হবে।

এই সম্মেলন শুরুর আগে অর্থাৎ ১৯৭৪ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি ভুট্টো বলেন, আমরা বাংলাদেশেকে স্বীকৃতি দিচ্ছি। আল্লাহর নামে এবং দেশের জনগণের পক্ষ থেকে এই ঘোষণা করছি।... আমি বলছি না যে, এটি আমি পছন্দ করছি।  আমি বলছি না আমার হৃদয় আনন্দিত। এটি আমার জন্য একটি আনন্দের দিন নয়, কিন্তু বাস্তবতাকে আমরা বদলাতে পারব না। ভুট্টোর ঘোষণার আগের রাত অর্থাৎ ২১ ফেব্রুয়ারিতে লাহোর সৌদি আরব, মিশর, ইন্দোনেশিয়াসহ ৩৭টি মুসলিম দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের এক বৈঠকে উভয় দেশকে চাপ প্রয়োগ করা হয়। শেষ পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিশ্রুতি ছাড়াই পাকিস্তানের স্বীকৃতি আদায়ে সমর্থ হয়। তবে বাংলাদেশ তখনো ১৯৫ যুদ্ধাপরাধীর বিচার থেকে সরে আসার কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়নি।

লাহোর সম্মেলন থেকে ফেরার পথে বঙ্গবন্ধু জানালেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার তিনি আপাতত স্থগিত রেখেছেন। তবে বিষয়টি সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণে বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তান শিগগিরই আলোচনায় বসবে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

২৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৪ পাকিস্তানের ডন পত্রিকায় লেখা হয়, শেখ মুজিব বলেছেন, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের পারস্পরিক স্বীকৃতির দলে যে নতুন যুগের সূচনা হলো, তার দলে আমাদের সব সমস্যা সমঝোতার ভিত্তিতে সমাধান সম্ভব হবে।’

যুদ্ধাপরাধী নিয়ে সম্মেলন মুসলিম বিশ্বের চাপ, অন্য দেশগুলোরও চাপ প্রয়োগ একদিকে, অপরদিকে পাকিস্তানে আটকেপড়া বাঙালির উদ্ধার, জাতিসংঘের সদস্যপদ লাভ, আন্তজার্তিক সাহায্য নিমিত্তে করার বিষয়গুলো বাংলাদেশের সামনে এসে দাঁড়ায়। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ। দেশের ভেতর পাকিস্তান ও চীনপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোর যাত্রা। গাড়ি ও অস্ত্রলুট, গুদামে অগ্নিসংযোগ, গলাকাটা ও শ্রেণিশত্রু পতনের সমাপ্ত তৎপরতা চলছে। নানাবিধ কারণে বাংলাদেশে তখন প্রায় একলা চলোর অবস্থা ভারত ও আন্তর্জাতিক অভ্যন্তরীণ নানা চাপে যুদ্ধবন্দিদের ফেরত পাঠাতে চাইছিল।

যে কারণে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিষয়ে প্রায় আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। বাংলাদেশ আগে বিচারের ব্যাপারে প্রকাশ্যে আগ্রহ ব্যক্ত করে যাচ্ছে। বাংলাদেশের কারণে আগে যুদ্ধাপরাধীরা দেশে ফিরতে পারছিল না। বঙ্গবন্ধু দেশে ফেরার মাসখানেকের মধ্যে ১৯৭৪ সালের ২৪ মার্চ পাকিস্তানে জিম্মি থাকা সর্বশেষ ২০৬ জন বাঙালিকে ছেড়ে দেয়।

পাকিস্তানের পক্ষে তবে স্বীকৃতি দেয়া রাষ্ট্র বাংলাদেশের নাগরিককে আটক রাখার কোনো সুযোগ ছিল না। দ্রুত সমাধানের আশায় ভিনদেশে সিদ্ধান্ত নেয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকের। যেখানে বিষয়গুলো আলোচনার পর সমঝোতা হবে।

দিল্লীতে তিন দেশ অবশেষে সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে আলোচনায় বসে। ১৯৭৪ সালের ৫ এপ্রিল থেকে ৯ এপ্রিল পর্যন্ত পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা বৈঠক করেন। বৈঠকের শুরুতে বাংলাদেশ একাত্তরের ঘটনার জন্য পাকিস্তানের কাছ থেকে ক্ষমা প্রার্থনার ওপর চাপ দেন। ড. কামাল হোসেনের আহ্বানে আজিজ আহমদ সরকারের পক্ষ থেকে ওরফে ‘দুঃখ’ প্রকাশ করেন। যা যৌথ ঘোষণায় শেষ অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ভারতের নারায়ণ সিংহ এজন্য ক্ষমা চাওয়ার কথা বলেছিলেন।

৬ এপ্রিল ড. কামাল হোসেন ঘোষণা করেন, পাকিস্তান যদি তার একাত্তরের কৃতকর্মের জন্য জনসম্মুখে ক্ষমা প্রার্থনা করে এবং অ-বাঙালি বিহারীদের প্রত্যাবাসনসহ পাকিস্তানের সম্পদ বন্টনে রাজি হয়, তাহলেই শুধু ১৯৫ যুদ্ধাপরাধীর ওপর আনীত অভিযোগ তুলে নেয়া হবে। জবাবে আজিজ আহমদ বলেছিলেন, সম্পদ বন্টন হলে বাংলাদেশকে পাকিস্তানের আন্তর্জাাতিক দেনার ভারও নিতে হবে।

তিনি আরো বলেন, প্রেসিডেন্ট ছাড়া অনানুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশ বিষয়ে একাধিকবার দুঃখ প্রকাশ করেছেন, তাই ক্ষমা চাওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। তবে বাংলাদেশকেও মার্চ পূর্ব কৃতকর্মের জন্য ক্ষমা চাইতে হবে। তাছাড়া, ২২ ফেব্রুয়ারিতে মিশরের রাষ্ট্রপ্রধান আনোয়ার সাদাতের মধ্যস্থতায় যে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছিল, তাতে বাংলাদেশ পাকিস্তানি বন্দিদের প্রত্যাবাসনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল।

৯ এপ্রিল বাংলাদেশ, ভারত পাকিস্তানের মধ্যে ত্রিপক্ষীয় চুক্তি সই হয়। যৌথ ঘোষণায় পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন যে, পাকিস্তান সরকার মনে করে পাকিস্তানে যে অপরাধ হয়তো সংঘটিত হয়েছে তার প্রতি নিন্দা ও গভীর দুঃখ প্রকাশ করে।

ঘোষণায় উল্লেখ করা হয় পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ভুট্টো বাংলাদেশের জনগণের কাছে এই বলে আহ্বান করেছেন যে, সমঝোতার স্বার্থে তারা যেন বিগত ঘটনা ভুলে যায় ও ক্ষমা প্রদর্শন করে।

চুক্তিতে ড. কামালকে উদ্ধৃত করে উল্লেখ করা হয় যে, পাকিস্তানের ওইসব বন্দি যে মাত্রাতিরিক্ত ও বহুধা অপরাধ করেছে তা জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সংশ্লিষ্ট প্রস্তাবনা এবং আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী যুদ্ধাপরাধ, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ এবং গণহত্যা হিসেবে চিহ্নিত এবং এই ১৯৫ জন পাকিস্তানি বন্দি যে ধরনের অপরাধ করেছ, সে ধরনের অপরাধের অপরাধীদের দায়ী করে আইনের মুখোমুখি করার বিষয়ে সর্বজনীন ক্ষমতা রয়েছে।

চুক্তিতে বলা হয়, স্বীকৃতি দানের পর পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর আহ্বানে বাংলাদেশ সফরে করবেন এবং বাংলাদেশের জনগণের কাছে ক্ষমা চেয়েছেন এবং অতীতের ভুলত্রুটি ভুলে যাবার জন্য আহ্বান করেছেন।

এ প্রসঙ্গে ড. কামাল উল্লেখ করেছেন, ‘বাংলাদেশ সরকার ক্ষমাশীলতার পরিচয় দিয়ে বিচার চালিয়ে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বাংলাদেশ সম্মত হয় যে, ১৯৫ জন যুদ্ধাপরাধীকে দিল্লি চুক্তির অধীন প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার সঙ্গে ফেরত পাঠানো যেতে পারে। অর্থাৎ বাংলাদেশ ১৯৫ জনকে ক্ষমা করেছে তা বলেনি। শুধু ভারত থেকে পাকিস্তান ফিরে যাবার কথা বলেছে।

১৯৭৪ সালের ১১ এপ্রিল নিউইর্য়ক টাইমস শিরোনাম করেছিল, ‘বাংলাদেশের কাছে পাকিস্তানের ক্ষমা প্রার্থনা।’ সাংবাদিক বার্নার্ড উইনরবের লিখেছিলেন, ‘যদিও পাকিস্তানের ক্ষমা প্রার্থনা সরাসরি ছিল না, যতটা সরাসরি বাংলাদেশ দাবি করেছিল।’ কিন্তু ভারতীয় ও বাংলাদেশী কর্মকর্তারা মনে করেন, পাকিস্তান একথা স্বীকার করেছে যে, তাদের সেনাবাহিনীর কেউ-কেউ মাত্রাতিরিক্ত কাজ করেছে। এমনকি পাকিস্তান যে এই চুক্তি সই করে তাও এক ধরনের ক্ষমা প্রার্থনা বলে বিবেচনা করা হচ্ছে।

চুক্তিপত্রে এই মর্মে বাংলাদেশের একটি বিবৃতি অন্তর্ভুক্ত হয় যে, যুদ্ধাপরাধী হিসেবে অভিযুক্ত ১৯৫জন সেনা নানা অপরাধ করেছে। যার অন্তর্গত হলো ‘যুদ্ধাপরাধ, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ ও গণহত্যা মৈত্রীর বৃহত্তর স্বার্থে তাদের প্রতি তার দেশ ক্ষমা প্রদর্শন করেছে বলে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী কামাল হোসেন জানালেন। বাংলাদেশ এই ত্রিপক্ষীয় চুক্তিতে ‘গণহত্যা’ শব্দটি অন্তর্ভুক্ত করেছিল।

১৯৭৪ সালের এপ্রিলে যখন দিল্লি চুক্তি হয়, বঙ্গবন্ধু তখন মস্কোতে চিকিৎসারত। ফেরার পথে দিল্লিতে অবস্থানকালে যুদ্ধপরাধীদের বিচার সম্পর্কে এক প্রশ্নের জবাবে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘আমি জানি, আমাকে কেউ কেউ ভুল বুঝবে। কিন্তু আমি নিরুপায়। এদেরকে না ছাড়লে ভুট্টো আমার চার লাখ বাঙালিকে ছাড়বে না।

বঙ্গবন্ধু আরো বলেন, ‘ভুট্টো লাহোরে আমাকে বলে, পাকিস্তানি সেনাদের সে দেশে ফিরিয়ে নিতে না পারলে, ভুট্টোকে সেনাবাহিনীর লোকেরা মেরে ফেলবে। (পরবর্তীকালে তা হয়েও ছিল) ভুট্টো তার জীবন বাঁচানোর জন্য চার লাখ বাঙালিকে ছাড়বে না। আর বাঙালিদের ফিরিয়ে আনার জন্য আমি ওয়াদাবদ্ধ। চার লাখ অসহায় নর-নারীর জীবন বাঁচানোর জন্যই আমাকে বাধ্য হয়ে অনিচ্ছা সত্ত্বেও ওদেরকে ছেড়ে দিতে হচ্ছে।

আর দিল্লিতে যখন মন্ত্রীদের বৈঠক চলছিল, ভুট্টো তখন সরকারি সফরে ফ্রান্সে। প্যারিস থেকে হুমকি দিয়ে ঘোষণা করলেন এই চুক্তি সই না হলে উপমহাদেশে সমঝোতার পথ সুদূরপরাহত হবে। পাকিস্তানি কতিপয় সংবাদপত্র এই চুক্তির বিরোধিতা করে ভুট্টোকে দায়ী করেন। তিনি শক্ত অবস্থানে ছিলেন বলেই শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবি তুলে নিয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশ যুদ্ধাপরাধীদের দেশে ফেরত যাবার বিষয়ে আপত্তি প্রত্যাহার করলেও গণহত্যার অপরাধের জন্য ক্ষমা করেনি। কারণ চুক্তির ১৩ ধারায় বাংলাদেশের ভাষ্য ছিল: পাকিস্তানি বন্দিরা যে ধরনের অপরাধ করেছে, সে ধরনের অপরাধের অপরাধীদের দায়ী করে আইনের মুখোমুখি করার বিষয়ে সর্বজনীন ঐকমত্য রয়েছে।

বাংলাদেশ বিচার ঢাকায় হবে বলে যে ঘোষণা দিয়েছিল, তা থেকে সরে এলেও পাকিস্তানের আদালতে বা আন্তর্জাতিক আদালতে এদের বিচার হবে চুক্তি অনুযায়ী সবাই আশা করেছিল। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবি বাংলাদেশ অব্যাহত রাখে।

১৯৭৪-এর ২৮ জুন ভুট্টোর ঢাকা সফরের সময় বঙ্গবন্ধু তার কাছে যুদ্ধাপরাধের বেশকিছু ডকুমেন্টস হাজির করেছিলেন। এরমধ্যে রাও ফরমান আলীর বুদ্ধিজীবী হত্যার তালিকাও ছিল এবং ডায়েরিতে লেখা ‘পূর্ব পাকিস্তানের সবুজ রঙ, লালে লাল করে দিতে হবে।’

 বাংলাদেশের চাপে পাকিস্তান হামুদুর রহমান কমিশন গঠন করে। এই কমিশনে যুদ্ধাপরাধীরাও জবানবন্দি দেয়। কমিশন পাকিস্তানি সেনা ও তাদের সহযোগী রাজাকার, আলবদরদের যুদ্ধাপরাধের বিস্তারিত জিজ্ঞেস করে। সুপারিশে কর্তব্যে অবহেলার জন্য বেশকিছু সামরিক কর্মকর্তার শাস্তির কথা বলা হয়। কমিশন আরো সুপারিশ করেছিল ১৯৭১-এর মার্চ থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত পাকিস্তানি সেনাদের নৃশংসতা, অবাধ নিষ্ঠুরতা ও অনৈতিকতা তদন্তে একটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন আদালত বা কমিশন গঠন করার জন্য।

কমিশন প্রয়োজনীয় প্রমাণাদির জন্য বাংলাদেশ সরকারের সহযোগিতা চাওয়ার কথাও উল্লেখ করে। বাংলাদেশ গণহত্যার প্রমাণাদিও কমিশনে যোগ করেছিল। যা কমিশনের প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। ১৯৫ যুদ্ধাপরধীর অনেকের বক্তব্য কমিশনের প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। যেখানে পরস্পর পরস্পরকে হত্যা ধর্ষণ, লুটপাটের জন্য অভিযোগ করেছে।

ভুট্টো এই কমিশনের প্রতিবেদন যেমন প্রকাশ করেননি, তেমনি ১৯৫ জনকে বিচারের মুখোমুখি করেননি। কারণ, ভুট্টো বলেছিল চুক্তির আগে যে, পাকিস্তান নিজে তার জাতীয় আইনের ভিত্তিতে তাদের বিচার করবে।  ভুট্টো তো ‘৭২ সাল থেকেই নিজে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের কথা নীতিগতভাবে মেনে নিয়েছিলেন। কিন্তু কথা রাখেননি। সময়টা ছিল বাংলাদেশের প্রতিকূলে।

আন্তর্জাতিক বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান অনেকটা নাজুক ছিল। সমাজতান্ত্রিক দেশগুলো ছাড়া আর কেউ সাহায্যের হাত বাড়ায়নি। এমনকি মুসলিম দেশগুলোও নয়। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করার মতো বাস্তব অবস্থা এবং উপকরণগত সহায়তাও বাংলাদেশের ছিল না।

সে সময় বিভিন্ন সূত্রে বলা হয়, দুটি কারণে বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানি যুদ্ধবন্দিদের ছেড়ে দিতে রাজি হন।

প্রথমত. পাকিস্তানে আটকেপড়া প্রায় চার লাখ বাঙালি সামরিক ও বেসামরিক ব্যক্তিদের মধ্যে এমন অনেকেই রয়েছেন, যারা তার প্রশাসন ও সামরিক বাহিনীতে ‘সম্পদ’ হিসেবে গণ্য হবেন। তাছাড়া যুদ্ধবন্দি বিচারের ওপর প্রায় চার লাখ আটকেপড়া বাঙালি ও তাদের আত্মীয়-স্বজনের জীবনমরণ ও সুখ-দুঃখ নির্ভর করছে।

দ্বিতীয়ত. যেসব দেশ বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে সহায়তা করেছে এবং সাহায্য দিয়েছে, তাদের মধ্যে ভারত ছাড়া আর প্রায় সব ক’টি দেশ যুদ্ধাপরাধীদের বিচার না করার অনুরোধ জানিয়েছিল।

পাকিস্তানে আটকেপড়া বাঙালিদের ভুট্টো জিম্মি করে রেখেছিল। আন্তর্জাতিক বিশ্ব এ বিষয়ে সেভাবে এগিয়ে আসেনি। ভারত এ ব্যাপারে পাকিস্তানের ওপর চাপ রেখেছিল। কিন্তু বাঙালিদের ফেরত আনার জন্যই সেদিন যুদ্ধাপরাধীদের বিচার না করেই ছেড়ে দিতে হয়েছিল। দিল্লি চুক্তি অনুযায়ী তাদের বিচারের পথ রুদ্ধ হয়ে যায়নি। যদিও তাদের প্রায় জনই আর জীবিতা নেই। কিন্তু মরণোত্তর বিচার কাজটি পাকিস্তানের করা উচিত তাদের নিজেদের স্বার্থে যেমন তেমিন বিশ্বের স্বার্থে।

যুদ্ধাপরাধ করে পার পেয়ে যাওয়ার নজির আর নেই। কূটনৈতিক লড়াইটা খোদ পাকিস্তান বিজয়ী হয়েছিল। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ এবং পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ বাংলাদেশে আটকেপড়া পাকিস্তানিদের একটি নির্দিষ্ট গন্ডির মধ্যে আবদ্ধ করে ফেলে। মুক্তিযুদ্ধের পর জাতিসংঘ ও শরণার্থী কমিশন এবং রেডক্রস তাদের নিয়ে কাজ করে।

জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী তাদের শরণার্থী মর্যাদা দেয়া হয়। রেডক্রস তাদের পুনর্বাসনের চেষ্টার অংশ হিসেবে নাগরিকত্ব পরিচয় লিপিবদ্ধ করলে, তারা নিজেদের পাকিস্তানি নাগরিক পরিচয় দিয়ে সে দেশে ফেরত যেতে চায়। সে সময় থেকে বাংলাদেশে অবস্থানরত বিহারিদের আটকেপড়া পাকিস্তানি বলে অভিহিত করা হয়।

এদের পাকিাস্তানে ফেরত পাঠাতে আন্তর্জাতিক রেডক্রস ১৯৭২ সালে বাংলাদেশের ৬৬ টি ক্যাম্পে আশ্রয় নেয়। এর মধ্যে ঢাকায় মীরপুর ২৫টি, মোহাম্মদপুরে ৬টি ক্যাম্প। ১৯৭৩ সালে ইন্টারন্যাশনাল কমিটি অব রেডক্রস বিদায় নিলে বাংলাদেশে রেডক্রিসেন্ট সোসাইটি এদের তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব নেয়। আটকেপড়া পাকিস্তানিদের ফেরত নিতে জেদ্দাভিত্তিক সংগঠন রাবেতা আল আলম ইসলাম প্রচেষ্টা চালায়। তারা তালিকাও প্রণয়ন করে।

সর্বশেষ ২০০৩ সালে পরিচালিত জরিপে দেখা যায়, প্রায় ২লাখ ৭৫ হাজার উর্দুভাষী পাকিস্তানি ৮১ টি ক্যাম্পে বসবাস করছে। এদের ফেরত নিতে পাকিস্তানের সামরিক শাসক জিয়াউল হক সত্তর দশকে একটি তহবিল গঠন করেছিলেন, কিন্তু তা ব্যবহার করা হয়নি। অর্থাৎ পুনর্বাসন থমকে থাকে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর ক্যাম্পগুলো বাংলাদেশ সরকারের ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে চলছে।

১৯৭২ সালে আন্তর্জাতিক রেডক্রস  ও রেডক্রিসেন্ট সোসাইটি পরিচালিত সমীক্ষা অনুযায়ী ৫ লাখ ৩৯ হাজার ৬৬৯ জন বাংলাদেশের নাগরিকত্ব প্রত্যাখ্যান করে নিজেদের পাকিস্তানি নাগরিক দাবি করে সে দেশে ফিরে যেতে চায়। ১৯৭৩ এবং ১৯৭৪ সালে ভারত, পাকিস্তান এবং বাংলাদেশে এই মানবিক সমস্যা মোকাবেলায় একাধিক চুক্তি করে।

ইন্দো-পাক এগ্রিমেন্ট ১৯৭৩, জেদ ট্রাইপাটাইটা এগ্রিমেন্ট অব বাংলাদেশ, পাকিস্তান, ইন্ডিয়া, ১৯৭৫-এই চুক্তিগুলোর অন্যতম। ১৯৭৪ সালে তিন দেশের মধ্যে সম্পাদিত ত্রিপক্ষীয় চুক্তিতে পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ মাত্র তিন শ্রেণিভুক্ত ব্যক্তিদের পাকিস্তানে ফেরত নিতে সম্মত হয়। চুক্তির আওতায় পাকিস্তান ১ লাখ ৪৭ হাজার ৬শ ৩৭জনকে ফেরত নেয়ার পক্ষে মত প্রকাশ করে। তবে মাত্র ১ লাখ ২৬ হাজার ৯শ ৪১জনকে ফেরত পাঠায়। বাকি চার লাখ ফেরত নেয়নি।

বাংলাদেশে উর্দুভাষীদের মূল সমস্যাটি নাগরিক সংক্রান্ত। তারা বাংলাদেশী না পাকিস্তানি? ব্রিটিশ শাসনামলের শেষ দশকগুলোতে ব্রিটিশ প্রশাসনের অধীনে কাজ করার জন্য অনেক উর্দূভাষী বিহার, উড়িষ্যা ও উত্তর প্রদেশ থেকে পূর্ববঙ্গে আসে। এদের বেশিরভাগই বিহারের। যারা প্রধানত রেল পুলিশ, বিচার ব্যবস্থা ও অন্যান্য বেসামরিক পদগুলোতে যোগ দিয়েছিলেন।

সৈয়দপুরে বৃহৎ রেলওয়ার্কশপে কাজ করার জন্য ব্রিটিশরা বিহার থেকে সাত হাজার জনকে নিয়ে এসেছিল। ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগ ও দাঙ্গার ফলে ১৩ লাখ মুসলিম অধিবাসী পূর্ববাংলায় আসে। এর মধ্যে ১০ লাখ বিহারি। এদের মোহাজির অভিহিত করা হয়। পূর্ববঙ্গের সাংস্কৃতিক ও ভৌগলিক ভিন্নতার পাশাপাশি ভাষাগত ভিন্নতার মুখোমুখি হয়। বাংলাভাষা বা লিপি তাদের কাছে গ্রহণযোগ্য ছিল না। এ কারণেও রাজনৈতিক নীতির কারণে এরা বাংলাভাষা এবং বাঙালিকে এড়িয়ে চলে এবং দৃঢ়গোষ্ঠীগত বন্ধনে আবদ্ধ থাকে। এবং বৃহত্তর জনগোষ্ঠী হতে বিচ্ছিন্ন থাকে। এরাই জমিজমা দখল করার জন্য ঢাকাসহ অন্যান্য স্থানে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা-হাঙ্গামা ঘটায়। মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের সহযোগী হয়ে গণহত্যায় অংশ নেয়।


১৯৯২ সালে পাকিস্তান সরকার ঘোষণা দেয় যে, তিনশ’ বিহারি পরিবারকে পাকিস্তানে ফেরত নেয়া হবে। কিন্তু ১৯৯৩ সালে মাত্র ৫০ পরিবারকে ফেরত নেয়ার পর প্রক্রিয়াটি অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করা রয়েছে। পরবর্তীতে বিভিন্ন ফোরামে বাংলাদেশ বিষয়টি উত্থাপন করলে সন্তোষ জনক কোনো সুরাহা হয়নি। আটকেপড়া সবাইকে ফেরত দেয়ার বাংলাদেশের অনুরোধ পাকিস্তান উপেক্ষা করে আসছে। একাত্তরে পাকিস্তানি হানাদারের সহযোগী বিহারিদের বাংলাদেশ জিম্মিও করেনি কিংবা যুদ্ধাপরাধের দায়ে তাদের বিচারের আওতায় আনেনি। এরা ১৯৭২ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত মিরপুর দখলে রেখেছিল। মুখোমুখি সশস্ত্র প্রতিরোধে বাংলাদেশের সেনাবাহিনী তা মুক্ত করে। চিত্রনির্মাতা, সাহিত্যিক জহির রায়হান ওখানেই গুলি বিনিময়ের সময় নিহত হন।

পাকিস্তান আটকেপড়া পাকিস্তানিদের বিদেশ প্রত্যাবাসনের জন্য যে কমিটি করেছে, তারা সম্প্রতি সুপ্রীম কোর্টে বলেছে, বাংলাদেশে বর্তমানে চার থেকে পাঁচ লাখ পাকিস্তানি আটকে পড়ে আছে। পাকিস্তান এদের ফেরত এবং দায়দায়িত্ব নেবে না। বাংলাদেশকেই এদের দায়দায়িত্ব বহন করতে হবে।  বাংলাদেশ অবশ্য বলে দিয়েছে ৭১-পূর্ব সময়ে জন্মগ্রহনকারী পাকিস্তানিদের ফেরত নিতে হবে।

১৯৯২ সালের ১৫ এপ্রিল বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে গোলাম আযমের বিচার সম্পর্কে বিতর্ক হয়। বিএনপির মন্ত্রী জমিরউদ্দিন সরকার, রফিকুল ইসলাম মিয়াসহ, বিএনপি সরকার পক্ষের কতিপয় সদস্য বঙ্গবন্ধু সরকারের সময় রাজাকার ও পাকিস্তানি যুদ্ধাপরাধীদের ক্ষমা প্রদর্শন সম্পর্কে প্রশ্ন উত্থাপন করেন।

বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনা তাদের স্মরণ করিয়ে দেন, ‘ যেসব রাজাকারের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট হত্যা, লন্ঠন, ধর্ষণ ও অগ্নিসংযোগের অভিযোগ ছিল, তাদের ক্ষমা করা হয়নি।

১৯৫ জন যুদ্ধাপরাধীদের কেন ছেড়ে দেয়া হয়েছিল তার ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা সংসদে আরো বলেন, পাকিস্তানে আটকেপড়া চার লাখ বাঙালিকে ফিরিয়ে আনার জন্যই সরকারকে বাধ্য হয়ে এই পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হয়েছিল।’

শেখ হাসিনা এমনও বলেন, ‘সেনাপতি নূরউদ্দিন খান, বিডিআর প্রধান আবদুল লতিফ, জেনারেল সালাম, মন্ত্রী মোস্তাফিজুর রহমান, মাজেদুল হক সহ চার লাখ বাঙালি পাকিস্তানে বন্দি অবস্থায় ছিল, তাদের পরিবার-পরিজনদের মাতমে সাড়া দিয়েই বঙ্গবন্ধু সেদিন যুদ্ধাপরাধী ও পাকিস্তানি যুদ্ধবন্দি সেনাদের ছেড়ে দিয়ে আটকেপড়া বাঙালিদের ফিরিয়ে এনেছিলেন। (সংবাদ, ১৬ এপ্রিল ১৯৯১)।

পাকিস্তানে আটকেপড়া বাঙালিরা শেষ পর্যন্ত দেশে ফিরতে পেরেছিল। তেমনি ১৯৫ যুদ্ধাপরাধীসহ ৯৩ হাজার যুদ্ধবন্দির পাকিস্তান ফিরেছিল বিনিময়ে মাধ্যমে। কিন্তু বিহারিদের বিনিময় হয়নি। দিল্লি চুক্তি রক্ষা করে পাকিস্তান ১৯৫ যুদ্ধাপরাধীকে বিচার করেনি যেমন, তেমনি বিহারিদের যেতে দিচ্ছে না। বিশ্ব জনমতই পারে এ সমস্যার সমাধান করতে।

 

এই বিভাগের আরো সংবাদ