কিছু বলবো বলে

  দেবাহুতি চক্রবর্তী

১০ জানুয়ারি ২০১৯, ১১:৩৩ | আপডেট : ১০ জানুয়ারি ২০১৯, ১১:৪০ | অনলাইন সংস্করণ

কতসময় কত কথা মনে এসেছে। বলাটা সময়ের প্রেক্ষিতে সঠিক কি সঠিক না ভেবেছি। এখন আর তেমন ভাবার কিছু নেই। একাদশ সংসদ নির্বাচন শেষ। সদস্যদের শপথ গ্রহণের আনুষ্ঠানিকতা শেষ। নতুন মোড়কে পুরানো সরকার মানে আগের মহাজোট সরকার তথা আওয়ামী লীগই  সরকার গঠন করছে। এই প্রক্রিয়ার মাঝ দিয়ে দেশে গণতন্ত্র কতটা স্বচ্ছ বা উজ্জ্বল হলো এই নিয়ে পক্ষ বিপক্ষের বক্তব্য পাল্টা বক্তব্য চলছে, চলবে। সেসব নিয়ে আপাতত আমার কথা নয়। তেমন কোন আকস্মিকতা না ঘটলে ধরে নেওয়া যায় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সরকার পরবর্তী মেয়াদে   ক্ষমতায় থাকবে ও পরিচালিত হবে। আমি কোন রাজনৈতিক বিশ্লেষক নই,  সাংবাদিক নই, সমাজতত্ত্ববিদ নই নিতান্তই   দেশের একজন সাধারণ নাগরিক। সাধারণ ভাবেই দেখে এসেছি যৌথ সংসারের গৃহকর্ত্রীর দায় -দায়িত্ব।  আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দিক তাকালে মনে হয় বিশাল এক সংসারের গৃহকর্ত্রীর ঘেরটোপে তিনি আবদ্ধ। এথেকে তাঁর রেহাই পাওয়ার অবকাশ খুবই কম। বিগত দশ বছরের অভিজ্ঞতা অন্তত তাই বলে। এই সময়কালে কোন বড় সংকট তাঁর প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপ ছাড়া উত্তরণ হয়নি। অথচ মন্ত্রীসভার সদস্য, সংসদ সদস্য, উপদেষ্টাবর্গ, সরকারের বিভিন্ন অঙ্গ প্রত্যঙ্গের দায়িত্বপ্রাপ্ত  কর্তাব্যক্তিবর্গ কোনখানেই কোন ঘাটতি নেই। তাদের লালন পালন করার জন্য সাধারণের ওপর নানা ধরণের করের বোঝা বেড়েই চলেছে। দেশ প্রবৃদ্ধি ও বিভিন্ন উন্নয়ন সূচকে নানাভাবে প্রশংসিত হচ্ছে। ২৬৪ কোটি টাকা অবধি সম্পদশালীদের তালিকায় আমাদের দেশ নাকি শীর্ষস্থানে পৌঁছে গেছে। নিঃসন্দেহে প্রবৃদ্ধির গড় হিসেবে তাদের আয় ও  যোগ হচ্ছে। দুর্মুখরা কাণাঘোষা করে, একবার এদেশে সংসদ সদস্য হলে কয়েক প্রজন্ম পায়ে পা তুলে বসে খেতে পারে। অধিকাংশ সরকারি আমলাদের নিয়ে নানা কথা বহু আগে থেকেই প্রচলিত। আমি এসব কথার তথ্য প্রমাণ দিতে পারবো না। বাতাস চোখে দেখি না বলে বাতাস নেই তাও বলতে পারি না। আমরাও আপাদমস্তক এক দূর্নীতিগ্রস্ত সমাজে ডুব দিয়ে আছি। দূর্নীতি প্রমাণের ক্ষমতা আমাদের মত সাধারণের নেই। তবু, কথা থেকে যায়। আর কিছু বলবো বলেই কথা বলা। খুব বড় কোন কথা নয়।  

বর্তমান অবস্থা ও ব্যবস্থায় নবগঠিত সরকারের কাছে বড় ধরণের বৈপ্লবিক কোন পরিবর্তন কেউ আশা করে না। আশা করে অপেক্ষাকৃত সমতার ভিত্তিতে উন্নয়ন ও প্রবৃদ্ধির ধারাবাহিকতার সূচক রক্ষা করা, এবং তাকে আরও অগ্রসরমান করা। এক্ষেত্রে যতদূর জানি, সবার আশা ভরসার প্রধান কেন্দ্র মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। ক্ষেত্রবিশেষে শুধু প্রধান নন, একমাত্র বললেও অত্যুক্তি হয় না। ব্যক্তি বিচারে বিষয়টা প্রধানমন্ত্রীর জন্য অবশ্যই বলিষ্ঠতা ও  সবলতার পরিচয় দেয় কিন্তু পাশাপাশি  পরিচালিত সরকারের ক্ষেত্রে তা একধরণের দুর্বলতার ইঙ্গিতবহ। আমার মত সাধারণ মানুষরা তাই আশা করে যোগ্য ব্যক্তির যোগ্য জায়গায় পদায়ন। আনুগত্য যোগ্যতার অন্যতম শর্ত হতে পারে,কিন্তু  মন্ত্রী প্রতিমন্ত্রী মনোনয়নের ক্ষেত্রে আনুগত্য যোগ্যতার  একমাত্র মাপকাঠি হতে পারে না।  সরকারের ভারসাম্য রাখতে বা স্থিতিশীল রাখতে অনেক কিছু মেনে নেওয়ার বাধ্যবাধকতাও হয়তো থাকে। তারপরেও অপেক্ষাকৃত যোগ্য এবং গ্রহণযোগ্য মন্ত্রীপরিষদ প্রধানমন্ত্রীর দায়ভার কিছুটা লাঘব করতে পারে।    
      
কার্যত বাংলাদেশে এই পর্যন্ত শক্তিশালী  বিরোধী দল কখনোই না থাকায় সংসদ সদস্যদের অনেকেই জানেন না সংসদ সদস্যদের সাংবিধানিক দায় দায়িত্ব কতটা। তারা যেভাবে অভ্যস্ত তাতে মনে হয় স্থানীয় সরকারের চেয়ারম্যানদের  উপরিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত হিসেবেই তাদের কর্মপরিধি। এদেশের রাজনীতিতে যে কোন দলের যত যোগ্যতাসম্পন্ন কর্মীই হোক, বিত্তহীনদের সংসদে যাওয়ার কোন সুযোগ নেই।  এবং এই বিনিয়োগ সংসদ সদস্য হিসেবে পরিচিতি পেয়ে ব্যতিক্রমীরা বাদে  অন্যরা মুনাফার খাত খুঁজে ফেরে। ফলে, পরবর্তী পর্যায় থেকে দেশে যা হবার তাই হয় এবং হতেই থাকবে এমনটাই যেন নিয়ম। সার্বিক পরিস্থিতিতে  সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। কিন্তু কিছুটা হলেও রাশ টানার প্রয়োজন আছে। কারণ      নিরঙ্কুশ ক্ষমতা নিয়ে   সরকারে থাকার একটা চ্যালেঞ্জ অবশ্যই রয়েছে। আর, সেজন্যই দরকার সংসদ সদস্যদের প্রধানত সংসদের দায় দায়িত্ব বুঝিয়ে দেওয়া। সংসদমুখী করা। আমাদের সংসদ সদস্য আর সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ যাওয়া-আসার একটা উদ্দেশ্য আছে। দেশের প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নে বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় যেতেই হবে। কিন্তু নিছক জ্ঞানার্জনের জন্য এখন মনে হয় দেশের টাকা এত খরচ না করলেও চলে। বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তি এতটাই এগিয়ে যে অনায়াসে একসাথে অনেকে এক ছাদের নিচে বসে বিদেশের সাথে যোগাযোগের মাধ্যমে নিজেদের সমৃদ্ধ করতে পারে। এবার আসি, সংরক্ষিত নারী আসন নিয়ে।  সংসদ সদস্য হওয়া যে কত  বড় গুরু দায়িত্বের বিষয় সেটা জানা বোঝার আগেই অধিকাংশ নারী এটা অন্যরকম একটা লাভজনক ক্ষেত্র হিসেবে জেনে গেছেন। আর তাই যে ধরণের প্রতিযোগিতায় এক শ্রেণী ও গোষ্ঠীর নারী সমাজ লিপ্ত তাকে আর যাই হোক নারীর ক্ষমতায়ন বা ক্ষমতাপ্রাপ্তি বলা যায় না। সংরক্ষিত এই পঞ্চাশ আসন সংসদে বাড়তি সূচক সংযোজনার দৃষ্টান্ত মাত্র আর সাধারণের জন্য বাড়তি বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ১৯৯৭সনে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি পিছে ঠেলে দেওয়ার নয়। ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে পারিবারিক-সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবনে  নারীকে কার্যত প্রতিষ্ঠা করা আর পদায়ন করা এক হতে পারে না। সংসদের সংরক্ষিত আসনে যে ধরণের তেল-খড় পুরিয়ে নারী সদস্যরা মনোনয়ন পান সেক্ষেত্রে তারা কখনই নারীর বৃহত্তর স্বার্থে নারী সমাজের দাবি দাওয়ার প্রতিনিধিত্ব করতে পারেন না। অতীত ইতিহাস তাই বলে। এক্ষেত্রেও মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকেই সময়ের দাবি পূরণে এগিয়ে আসতে হবে।  নারী বা পুরুষ নির্বিশেষে রাজনীতিকদের হাতে রাজনীতি ফিরিয়ে দিতে ছাত্র -ছাত্রী সংসদ কার্যকরী হওয়া জরুরি। তা না হলে নতুন নতুন কর্মী সংগঠকের জন্ম হবে না।  ক্ষমতাসীন দলের ছত্রছায়ায় যে সব ছাত্র নেতা কর্মী ঘোরাফেরা করে তাদের অধিকাংশই নেতিবাচক অর্থে ক্যাডার হিসেবে পরিচিত হয়। এই পরিচিতি জাতীয় পার্টি বা বিএনপির আমলেই ব্যাপক সমাদর কুড়োয়। গত দশ বছরে আওয়ামী বা মহাজোট সমর্থিত ছাত্র সংগঠনের  অনেক নেতারই ক্ষমতার পরিচয় সাধারণ জনগণ পেয়েছে। এখন তারাও যদি আবার  নিরঙ্কুশ ক্ষমতাধর হিসেবে নিজেদের ভাবতে শুরু করে তবে সমূহ বিপদ।  ঘরপোড়া গরুর মত সিঁদুরে মেঘ দেখলেই  --কতজনকে পালিয়ে বেড়াতে হবে কে জানে! এই আশঙ্কা যেন সত্য না হয়। 

নতুন প্রজন্মর সন্তানরা প্রকৃত শিক্ষা সংস্কৃতির মাঝে বড় হোক তাই চাই। কিন্তু চাওয়া পূরণ হবে কী করে? ইতিমধ্যে, আমাদের দেশে সবচেয়ে বড় ধ্বস শিক্ষা ব্যবস্থায় নেমে এসেছে। এর সাথেও অনেক ধরণের   প্রত্যক্ষ- পরোক্ষ রাজনীতি জড়িত বলে শোনা যায়। সেটাই হয়তো স্বাভাবিক। কোন কিচ্ছুই রাজনীতির বাইরে নয়। কিন্তু যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা পদে পদে, সেই চেতনা বিগত দশ বছরে একটু একটু করে শিক্ষা পাঠ্যক্রম আর শিক্ষা ব্যবস্থায় কতটা পর্যুদস্ত আর  বিপর্যস্ত তা ঘুরে দেখার সময় এসেছে।  তা না হলে ভবিষ্যত এই দেশ ও জাতিকে কোন দিকে নিয়ে যাবে সে প্রশ্ন থেকেই যায়। 

আমি- আমার মত যারা ঘরকুনো- যারা রাজনীতি, সমাজনীতি, অর্থনীতি কিছু বোঝে না, তারা এটুকু বোঝে তাদের জন্য বড় দুঃসময়। সাদামাটা ভাবে এক ধরণের শাসনামলে যে কথাগুলো উচ্চারণ করলে প্রগতিশীল আখ্যা পাওয়া যেত, তেমনই কোন পরিস্থিতিতে সেই একই কথা উচ্চারণ করলে আমাকে প্রতিক্রিয়াশীল বলে দূরে ঠেলে দেওয়া হয়। অথচ যা অন্যায় তাকে অন্যায় বলার মধ্যে কোন আপেক্ষিকতা থাকতে পারে না। দেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায় ভোটের রাজনীতিতে সংখ্যানুপাতে এখন কোন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে না। অথচ নির্বাচনের আগে বা পরে বা পরবর্তীতে সবসময়ই তারা বিপদের ঝুঁকিতে। আর নারীদের ওপর আক্রমণ , নির্যাতন আর হুমকির   তো কথাই নেই। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার চর্চার কোন পরিচয়ই এসব ক্ষেত্রে মেলে না। এই দিকগুলো অবশ্যই আমলে নেবার সময় এসেছে। 

যে কোন ধরনের বিজয়ের আনন্দ একটা থাকেই, কিন্তু একচ্ছত্র বিজয়ে আত্মসন্তুষ্টির অবকাশ নেই। বাইরের প্রতিপক্ষ কম শক্তিশালী হলে দলের ভিতরেই প্রতিপক্ষর জন্ম ও বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি হয়। আর সেটা হয় সব ধরণের লোভ আর ভাগাভাগি থেকে। এটাও বর্তমান সরকারের অন্যতম চ্যালেঞ্জ।  

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শুধু সরকার প্রধান নন, দলেরও প্রধান ব্যক্তি। সেক্ষেত্রে দলীয় সদস্যদের এই নিরঙ্কুশ ক্ষমতার ভার বহনের ক্ষেত্রে ভালো মন্দর দায় দায়িত্ব  তাঁকেই বুঝে নিতে হবে। যেহে, তাঁর বিচক্ষণতা, দূরদর্শীতা সর্ব জন বিদিত আর প্রশংসিত।  তাই, যারা যারা ধর্মীয় দিক থেকে, জাতিসত্তার দিক থেকে, লৈঙ্গিক  দিক থেকে, চিন্তা চেতনার দিক থেকে সংখ্যালঘু তারা যেন  অকারণে অসহনশীলতার শিকার না  হয়।  মানুষ যেন কথা বলতে পারে। নিজের কথা, তার চারপাশের কথা।   

লেখক : আইনজীবী

এই বিভাগের আরো সংবাদ
well-food