মেধা, বিচক্ষণতা ও সুষ্ঠু পরিকল্পনার বিজয়

  কামরুল হাসান বাদল

০৩ জানুয়ারি ২০১৯, ১২:৩৬ | অনলাইন সংস্করণ

১। একটি ঝলমলে রাত। উচ্ছ্বল রাত। প্রাণোৎসবের মাঝে ক্যান্ডল ডিনার। ইউরোপের ছিমছাম একটি শহরে বাংলাদেশ থেকে যাওয়া দুই বোনের সেটিই ছিল জীবনের প্রাণ খুলে আনন্দ উদযাপন করার ক্ষণ। এই রাতের পর তাদের জীবনে আর কখনো প্রকৃত অর্থে ভুবন দোলানো আনন্দ আসেনি। ওই দুইবোন জার্মানির বনে থাকা অবস্থায় সেই রাতে অবারিত আনন্দে মেতে উঠেছিলেন যখন তখন তারা ভাবতেই পারেননি রাত পোহালেই জীবনের চরম দুঃসংবাদটি তাদের জন্য অপেক্ষা করছে। ভোর হতে হতে তারা সংবাদটি শুনলেন। দেশে ঘটে যাওয়া সেই মর্মান্তিক ঘটনাটির খবর শোনা মাত্র বড় বোন আবেগে আতঙ্কে জার্মানে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতকে জিজ্ঞেস করেন ‘কেউ কি বেঁচে নেই’? উত্তরে মাথা নাড়েন রাষ্ট্রদূত। এরপর শুরু হলো দু’বোনের উদ্বাস্তু জীবন। যারা এক সময় এই পরিবারের কারো সাথে সামান্য পরিচয় বা কথা বলতে পারলেই বর্তে যেতেন তাদের বেশিরভাগই সে সময় ওই দু’বোনের মুখের ওপর দরজা বন্ধ করে দিয়েছেন। কোথাও ঠাঁই না পেয়ে ইন্দিরা গান্ধীর আহবানে ভারতে যাওয়ার পথে বিমানে খবরের কাগজে বিশদ ঘটনা জানতে পারেন তাঁরা। সে হতভাগ্য দু’বোন শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা।
রাজকন্যার জীবনযাপন করেননি তারা কখনো। সে অভিধায়ও অভিষিক্ত হতে চাননি কখনো। কিন্তু ১৫ আগস্ট, ১৯৭৫ সালের নির্মম হত্যাকাণ্ডটি তাদের একেবারে নিঃস্ব করে, রিক্ত করে পথের ধূলায় নামিয়ে দিয়েছিল। এরপর শুরু হয়েছিল তাদের উদ্বাস্তু জীবন যা শেষ হয়েছিল ১৯৮১ সালের ১৭ মে, শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের মধ্য দিয়ে।
২। শেখ হাসিনাকে যখন দেশে ফেরার অনুমতি দেওয়া হয় তখন দেশের ক্ষমতায় বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা, ১৫ আগস্ট ইতিহাসের বর্বরতম সময়ে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর উপপ্রধানের দায়িত্ব পালনকারী এবং সংসদে বঙ্গবন্ধুর হত্যার বিচার বন্ধে ইনডেমনিটি বিল পাশকারী জেনারেল জিয়াউর রহমান। অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে অনেক আবেদন নিবেদন করে শেখ হাসিনা সে সময় দেশে, নিজ মাতৃভূমিতে ফিরে আসার অনুমতি পেয়েছিলেন।
বাংলাদেশের দীর্ঘ মুক্তি সংগ্রামের ইতিহাসে, বাঙালির আন্দোলন সংগ্রামের সূতিকাগার ৩২ নম্বর ধানমন্ডি বাড়িটি তখন জিয়া সরকার তালাবদ্ধ করে রেখেছেন। দেশে ফিরে পিতামাতাসহ পরিবারের সবাইকে হারানো শেখ হাসিনা সরকারের কাছে অনুমতি চেয়েছিলেন সে বাড়িতে বাবা মা ও নিহত সকল আত্মীয়ের রুহের মাগফেরাত কামনার্থে দোয়া মাহফিল করতে। কিন্তু সে সময় জিয়াউর রহমান এবং তার সরকার শেখ হাসিনাকে সে অনুমতি দেয়নি।
দেশছাড়া, বাস্তুহারা, ঠিকানাহারা রোহিঙ্গাদের শেখ হাসিনা বাংলাদেশে আশ্রয় দিয়েছেন। পরম মমতায় তাদের বুকে জড়িয়ে ধরেছেন। সে সময় শেখ রেহানা বড় বোন শেখ হাসিনাকে বলেছিলেন, বুবু ১৭ কোটি মানুষের অন্ন সংস্থানের ব্যবস্থা করতে পারলে এই দশ লাখ মানুষকে খাওয়াতে পারবে না?
একজন নিপীড়িত মানুষ, আশ্রয়হীন হয়ে পড়া মানুষ আরেকজন আশ্রয়হীন অসহায় মানুষের কষ্ট বুঝতে পারে। রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেবারকালে এই মর্ম ব্যথাটিই কাজ করেছিলো হাসিনার। তখন তাঁর জানার কথা ছিল না, এই কাজের জন্য ‘মাদার অব হিউম্যানিটিতে’ ভূষিত হবেন তিনি।
৩। নির্বাচন পরবর্তী প্রতিক্রিয়ায় বিদেশি পর্যবেক্ষক ও সাংবাদিকদের শেখ হাসিনা বলেছেন, ঐক্যফ্রন্টের পরাজয়ের কারণ তাদের দল ও নির্বাচন পরিচালনায় অনভিজ্ঞতা। প্রকৃত সত্যটিও হলো তাই। নির্বাচনে ঐক্যফ্রন্ট তথা বিএনপি-জামায়াত হেরেছে শেখ হাসিনার বিচক্ষণ, দূরদর্শি রাজনৈতিক প্রজ্ঞার কাছে। ঐক্যফ্রন্টের নেতা ড. কামাল হোসেন যাদের নিয়ে বিএনপি জামায়াতকে ক্ষমতার বলয়ে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেছিলেন তাদের অধিকাংশই ছিলেন এক সময়ের আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত। আওয়ামী লীগ থেকে বেরিয়ে বা বিতাড়িত হয়ে তারা কক্ষচ্যুত গ্রহের মতো হয়েছেন যারা অতীতে বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনার মতো উজ্জ্বল তারার আলোর বিভায় আলোকিত হয়েছিলেন। প্রকৃত পক্ষে তাদের নিজস্ব কোনো আলো ছিল না। এরা সবাই মিলে একজন শেখ হাসিনার কাছেই হেরেছেন। কারণ এরা হারার জন্যই একত্রিত হয়েছিলেন এবং পরাজয় বরণের সকল আয়োজন নিজেরাই তৈরি করেছিলেন।
বহুল বিতর্কিত নির্বাচনের মাধ্যমে জয়ী হওয়া ট্রাম্প প্রশাসনের নিয়ন্ত্রিত এবং প্রভাবিত কিছু মিডিয়া বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে, শেখ হাসিনার শাসন নিয়ে কিছু কিছু ক্ষেত্রে বিরূপ মন্তব্য করেছে। তা নিয়ে আমাদের কোনো মাথা ব্যথা নেই। কারণ বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ জানে এদেশের গণতন্ত্র কোন দল বা রাজনৈতিক শক্তির হাতে অধিকতর নিরাপদ। যে রাজনৈতিক শক্তি দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বে বিশ্বাসী নয়, যে দল দেশের সংবিধানকেই অমান্য করে, আধুনিক ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থাকেই অস্বীকার করে তাদের হাত থেকে রাষ্ট্র বা দেশকে রক্ষা করাই গণতন্ত্রের প্রথম লড়াই, প্রথম ধাপ। বর্তমান বাংলাদেশ সে ধাপ অতিক্রম করেছে এবং গণতন্ত্রের অভিযাত্রায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এটি গণতন্ত্রেরই বিজয়। বাংলাদেশের রাজনীতি বাংলাদেশের মতোই পরিচালিত হবে অন্য কোনো দেশের ফর্মুলায় নয়। যারা বাংলাদেশে বাস করে, এ দেশীয় আচরণ করে ইউরোপীয় গণতন্ত্রের স্বপ্ন দেখেন তারা এখনো বোকার স্বর্গে বাস করেন। তাদের নিজেদেরই আগে ইউরোপের মানুষের মতো আধুনিক ও সভ্য হয়ে উঠতে হবে তারপর সে সমাজের স্বপ্ন দেখতে হবে।
৪। স্বাধীনতার পর থেকে বর্তমান পর্যন্ত একটি রাজনৈতিক শক্তি বঙ্গবন্ধু, শেখ হাসিনা, সজীব ওয়াজেদ জয় তথা বঙ্গবন্ধু পরিবারকে ছোট করার, বিতর্কিত করার নানা ধরনের চেষ্টা করেছে। মৌলবাদী-জঙ্গিবাদী-ডান-বাম-মধ্য মিলে বারবারই কোনো কোনো ব্যক্তিকে বঙ্গবন্ধুর সমতুল্য করার চেষ্টা করেছে। শেখ হাসিনার সাথে খালেদার এবং তারেকের সাথে জয়কে একই ভাবে বিচার করেছে। একই মাত্রায় নামিয়ে আনার চেষ্টা করেছে। শেখ হাসিনাকে খালেদার স্থানে নামাতে না পেরে জয়কে তারেকের জায়গায় নামিয়ে আনার চেষ্টা করেছে। সফল হয়নি। তারা একইভাবে বিএনপির জায়গায় নামিয়ে আনার চেষ্টা করে আওয়ামী লীগকে। তারা আওয়ামী লীগকে দিয়ে বিএনপির মতো বিতর্কিত কাজগুলো করিয়ে নিতে চায়। না পারলে তেমন দায় ও দুর্নাম চাপিয়ে দিতে চায়।
২০০১ সালে নির্বাচনে জয়লাভ করে বাংলাদেশে সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিল বিএনপি-জামায়াত জোট। সে সময়ে পূর্ণিমার ধর্ষণের ঘটনাটি বিশ্বব্যাপী নিন্দিত হয়েছিল। বিএনপি-জামায়াতের রাজনীতির একটি বিশাল ক্ষতের নাম পূর্ণিমার ঘটনাটি। সে দাগ খানিকটা মুছতে এমন একটি ঘটনা চায় বিএনপি-জামায়াত এবং তাদের নতুন মিত্র বাম ঘরানার দলগুলো।
নোয়াখালীর সুবর্নচরে উপজেলার চরজুবলি ইউনিয়নের এক গ্রামে স্বামী-সন্তানকে বেঁধে রেখে এক নারীকে মারধর ও গণধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেকে অভিযোগ করেছেন, ধানের শীষে ভোট দেওয়ার কারণে ওই নারীকে গণধর্ষণ করা হয়েছে। কিছু বামপন্থি সংগঠনের কর্মীসহ বিএনপি-জামায়াত ঘরানার অ্যাক্টিভিস্টরা ঘটনাটিকে পূর্ণিমার ঘটনার সাথে তুলনা করে সরকারের তুলোধুনা করছেন। ঘটনায় মামলা হয়েছে। তিনজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশন থেকে বিষয়টি তদারকী করা হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্তদের বক্তব্যে কিছু অসামঞ্জস্য থাকলেও ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দায়ীদের দ্রুত বিচার দাবি করছি। এই ঘটনাটিকে কোনোভাবেই ইস্যু করতে দেওয়া যাবে না। যে বা যারা জড়িত থাক, তার রাজনৈতিক পরিচয় যা থাক তাকে দ্রুত গ্রেপ্তার করতে হবে। আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে তার সামান্যতম সম্পৃক্ততা থাকলে তার বিচার সবার আগে করতে হবে এবং সে বিচার দৃষ্টান্তমূলক করে প্রমাণ করতে হবে এদেশে আর কখনো পূর্ণিমার মতো কোনো ঘটনা ঘটবে না। ঘটতে দেওয়া হবে না। (দৈনিক আজাদী থেকে নেয়া)

Email: [email protected]

এই বিভাগের আরো সংবাদ