সড়ক দুর্ঘটনা ও পরিবহন নৈরাজ্য

  অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ২৬ মে ২০১৮, ১৪:৪২

বাসুদেব খাস্তগীর, ২৬ মে, এবিনিউজ : সড়ক দুর্ঘটনার ভয়াবহতা ইদানীং এতো বেশি বেড়ে গেছে যে, তা প্রাত্যহিক জীবনের অন্য সাধারণ সংবাদের মত একটি সাধারণ সংবাদ হিসাবে আমাদের সামনে আসছে প্রতিনিয়ত। প্রতিদিন সকালের পত্রিকার পাতা উল্টালেই বা টিভির সামনে বসলেই টিভি পর্দায় ভেসে উঠছে কোন না কোন সড়ক দুর্ঘটনার সংবাদ। কতো প্রাণ অকালে ঝরে যাচ্ছে, কতো মানুষ পঙ্গ হচ্ছে, কতো পরিবার মানবিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি হচ্ছে তার হিসেব কে রাখে ? একটি দুর্ঘটনা মানে সারা জীবনই এর দুঃসহ স্মৃতি বয়ে বেড়ানোর এক বেদনাময় জীবন। একটি দুর্ঘটনা ঘটলেই বেশ কিছুদিন পত্রপত্রিকায় লেখালেখি,মিডিয়ায় হই চই,তারপর এগুলো নিয়ে কেউ তেমন মাতামাতি করেন বলে মনে হয় না। পৃথিবীর প্রত্যেক দেশে সড়ক দুর্ঘটনা আছে, কিন্তু এর মাত্রা বা পরিমাণ কীরূপ তা নিয়েও বেশ আলোচনা আছে। আমাদের মত দেশগুলোতো সড়ক দুর্ঘটনার ভয়াবহতা উল্লেখ করার মত। সড়ক পরিবহনে ‘পরিবহন নৈরাজ্য’ নামে একটি কথা চালু আছে। এই নৈরাজ্য সৃষ্টিতে আছে বিভিন্ন পক্ষ । যেমন ধরুন মালিক পক্ষ , চালক শ্রেণি,শ্রমিক পক্ষ , চাঁদাবাজদের সিন্ডিকেট, কালোবাজারিদের সিন্ডিকেট, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ইত্যাদি ইত্যাদি। এ বিভিন্ন পক্ষকে সামাল দিতে সরকার পর্যন্ত হিমশিম খেয়ে যায়। কিছু দিন আগে ঢাকা শহরে‘সিটিং সার্ভিস’ নিয়ে তুলকালাম কাণ্ড ঘটে গেলো তা তো আমরা দেখেছি। সরকার ওদের সাথে না পেরে শেষ পর্যন্ত পিছু হটে ছিলো একটা সময় বেঁধে দিয়ে। কিন্তু ঐ সময়ের পরে আর কোন কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যায় নি। যে কথা বলতে চাই, সড়ক পরিবহনে নানামুখী নৈরাজ্য বন্ধ হওয়া দরকার। এই উভয় পক্ষের যাঁতাকলে পিষ্ট হচ্ছে সাধারণ জনগোষ্ঠী। সড়ক দুর্ঘটনাতো আছেই,আছে আরো নানা ধরনের নিপীড়ন। যাত্রীদের নানা ধরনের হয়রানি, নারীদের যৌন নিপীড়নের মত বিষয়ও এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। সম্প্রতি দু,একটি ঘটনা যেমন ঢাকা চট্টগ্রামের দুটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী চলন্ত বাসে যে নিপীড়নের শিকার হয় তা তো পত্রিকায় দেখেছি। এ অভিযোগের প্রেক্ষিতে তাদের গ্রেফতারও করা হয়েছে। চলন্ত বাসে নারী ধর্ষণের ঘটনাও আছে। আমরা এগুলোর শেষ পরিণতি দেখতে চাই। ঢাকায় দুটি বাসের রেশারেশিতে তিতুমীর কলেজের ছাত্র রাজীবের হাত আটকে যাওয়ার দৃশ্য এবং এ প্রেক্ষিতে তার হাত হারানোর বীভৎস রূপতো আমাদের চোখে দেখা। প্রায় চৌদ্দ দিন মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ে শেষ পর্যন্ত না ফেরার দেশে চলে যায় রাজীব । মা বাবা হারানো এতিম রাজীব এসেছিলো পড়ালেখা করে একটি চাকুরি নিয়ে ছোট দুটো ভাইকে মানুষ করার দায়িত্ব নেবে। কিন্তু দুটো বাসচালকের কাণ্ডজ্ঞানহীন অসুস্থ প্রতিযোগিতা তার স্বপ্নকে ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছে। তার হাত হারানো এবং মৃত্যুর পর দেশে পরিবহন সেক্টরে যেনো চলে এসব ঘটনা ঘটার প্রতিযোগিতা। গোপালগঞ্জে একজন এরকম নৈরাজ্যে হাত হারায় এক যুবক। ঢাকায় রেজিনা নামক একটি মেয়ে রাস্তা পার হতে গিয়ে পা হারিয়ে শেষ পর্যন্ত মৃত্যুকেই বরণ করে নেয়। তারপর সামান্য তর্কাতর্কির জেরে এক কার ড্রাইভারের উপর গ্রীন লাইন পরিবহনের একটি গাড়ি চালিয়ে দিলে তিনিও পা হারান। ঢাকায় লালবাগ জোনের ট্রাফিক পুলিশ ইন্সপেক্টর দেলোয়ারও পা হারান চালকের উদ্ধত্য আচরণের কারণে। কমিউনিটি পুলিশ সদস্য আলাউদ্দিন সুমন নামে একজন তারাবো পরিবহনের একটি গাড়ির চাকায় পিষ্ট হয়ে পা হারান এবং পরে মারা যান। এরপর গত ১৭ মে ঢাকায় দুটি বাসের প্রতিযোগিতায় প্রাণ হারান ইংরেজি দৈনিক ঢাকা ট্রিবিউন এর বিজ্ঞাপন বিভাগের জ্যেষ্ঠ নির্বাহী নাজিম উদ্দিন। একই দিন প্রকাশনা ব্যবসায়ী নুরুল আমিন নামক একজন ব্যক্তির পায়ের উপর গাড়ি রেখে পালিয়ে যান চালক। দেশের সব কটি জাতীয় দৈনিকে ঘটনাগুলোর পরের দিন এ সংক্রান্ত সংবাদ গুরুত্ব সহকারে ছেপেছে। গত ১৮ মে চট্টগ্রামের জিইসি মোড়ে জয়নাল আবেদীন একজন ফ্লাইওভার কর্মী ট্রাকের ধাক্কায় পড়ে গেলে চালক তার উপর গাড়ি চালিয়ে দেন। যে কয়েকটি ঘটনার উল্লেখ করলাম, এ ঘটনাগুলো রাজীবের ঘটনা পরবর্তী কয়েকদিনের মধ্যে ঘটে যাওয়া ঘটনা। রাজীবের হাত হারানো এবং মৃত্যু যেনো আমাদের কোন ক্রমেই সচেতন করে তোলে না, বরং দেখি আরো এরকম দুঃখজনক ঘটনা ঘটার এক বীভৎস অঘোষিত প্রতিযোগিতা। এটা দেখে আমাদের আর দুঃখ রাখার জায়গা থাকে না। এর পরবর্তী পর্যায়ে ঢাকা চট্টগ্রামসহ সারাদেশে অনেক দুর্ঘটনা ঘটেছে, তার কথা নাইবা বললাম। সড়ক দুর্ঘটনা একেবারে নির্মূল করা হয়তো সম্ভব না, কিন্তু এর ঘটন মাত্রাটা কমিয়ে আনা দরকার। সড়ক দুর্ঘটনা কোন প্রাকৃতিক ঘটন বা প্রাকৃতিক পরিবেশের অংশ নয়। এটি অপ্রাকৃতিক বা মানবসৃষ্ট ঘটনা। মানুষের সচেতনতা, আইনের যথাযথ প্রয়োগসহ নানাবিধ কার্যক্রমের মাধ্যমে এর মাত্রা কমিয়ে আনা সম্ভব। এদেশে সড়ক দুর্ঘটনা বৃদ্ধি পাওয়ার নানাবিধ কারণ চিহ্নিত করা পূর্বক যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করলেই সড়ক দুর্ঘটনার মাত্রা অনেক কমিয়ে আনা যায়। আমাদের দেশে যত্রতত্র দেখি আইন অমান্য করার প্রবণতা। সড়ক পরিবহন সেক্টরে তা মাত্রায় অনেক বেশি। যারা নিয়মিত সড়ক পথে যাতায়ত করেন তাদের চোখে তা নিয়মিতই দৃশ্যমান একটি ঘটনা। যত্রতত্র গাড়ি পার্কিং, ট্রাফিক সিগন্যাল অমান্য করার প্রবণতা অযথা ওভার টেকিং করা, ডিভাইডার ক্রস করে উল্টোপথে আগে যাওয়ার প্রবণতা সহ নানা ধরনের আইন অমান্য কার্যকলাপ আমাদের সামনে প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনার জন্ম দিচ্ছে। জেব্রা ক্রসিং ব্যবহার না করা,ওভার ব্রিজ ব্যবহার না করা,তাড়াহুড়ো করে গাড়িতে উঠতে গিয়ে জনগণের অসচেতনতাই অনেক দুর্ঘটনা ঘটছে। আর এখন অনেক মূল সড়ক, অনেক বড় বড়বাজারেও রাস্তার উপরে বাজার বসে প্রশাসনের নাকের ডগায়। এখানে চলে নীরবে চাঁদাবাজি। এর সুবিধাভোগী আছে অনেক পক্ষ । এই নৈরাজ্য দেখার যেনো কেউ নেই। ফলে দুর্ঘটনা আর এ নৈরাজ্য যেনো আমাদের গায়ে সওয়া বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক চালক সারারাত জেগে গাড়ি চালান। দিনেও গাড়ি চালাতে গিয়ে তিনি ঘুমঘুম ভাব নিয়ে যদি গাড়ি চালান, তাহলে তার কারণে দুর্ঘটনা ঘটতেই পারে। এ কারনে বহু মারাত্মক দুর্ঘটনা ঘটেছে তার উদাহরণ দেয়া যাবে। আমাদের চালক, পরিবহন মালিকসহ সকলের এ ব্যাপারে সচেতনতা থাকা জরুরী। আর কার আগে কে যাবে এ ধরণের একটা অসুস্থতা প্রতিযোগিতাতো আছেই। রাজীবের ক্ষেত্রে ঘটে যাওয়া ঘটনা এরকম ঘটনারই একটি নিষ্ঠুর চিত্র। চালকদের সচেতনতাই এধরণের ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটাতে ভূমিকা রাখতে পারে। যে কেউ যে কোন ধরনের কাজে থাকুন না কেন তার নিজস্ব জায়গা থেকে একটি দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে হয়। গাড়ির চালকের সামান্য অসতর্কতা কতো বড় বড় দুুর্ঘটনারই না জন্ম দিচ্ছে। গাড়ি চালনার ক্ষেত্রে ক্রোধ বা পারস্পরিক প্রতিযোগিতা দমনে সচেতনতা জরুরি। আগে যাবার প্রতিযোগিতায় চারলাইনের সড়কে দেখা যায় এক লাইনে জ্যাম পড়লে ডিভাইডার ক্রস করে অন্য লাইন দিয়ে দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছার চেষ্টা। ফলে দেখা যায় বিপরীত দিক থেকে গাড়ি এসে সৃষ্টি হয়েছে যানজট। ফলে এদিকেও যাওয়া যায় না, ওদিকেও যাওয়া যায় না। বাড়ে জনদুর্ভোগ ও ঘটে দুর্ঘটনা। মহাসড়কে নির্দিষ্ট গতিতে গাড়ি চালানোর নিয়ম থাকলেও অনেক চালকই তা মানেন না। দ্রুত গতিতে গাড়ি চালানোর প্রবণতা দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। দেশে চালকদের প্রশিক্ষণের কোন শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান নেই। অথচ যেকোন পেশার ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। প্রশিক্ষণ ছাড়া কোন পেশাতেই দক্ষ জনশক্তি গড়ে ওঠে না। পরিবহন সেক্টরের মত গুরুত্বপূর্ণ সেক্টরে এই নিয়ে অবহেলা মানুষের জীবন নিয়ে খেলারই নামান্তর। দেখুন শিক্ষকতা পেশা,সাংবাদিকতা পেশা,ব্যাংকিং পেশা,প্রশাসনিক বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তাদের জন্য রয়েছে বিভিন্নমুখী প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা এবং এটি একটি অবিরাম প্রক্রিয়া। প্রশিক্ষণটা চাকরির শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত প্রয়োজনীয় সময়ে চলমান বা কার্যকর থাকে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি এদেশে গাড়ির চালকদের জন্য সরকারি বেসরকারি পর্যায়ে পর্যাপ্ত কোন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে উঠে নাই। এ চালক শ্রেণি হচ্ছে সমাজে শিক্ষাদীক্ষায় পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীরই অংশ। তারা প্রায় সকলেই গাড়িতে হেলপারের চাকরি করতে করতেই চালকের আসনে বসে গেছে। এরকম প্রকৃত প্রশিক্ষণবিহীন অদক্ষ চালকের গাড়ি চালানো মানেই দুর্ঘটনার ঝুঁকি। গাড়ি চালানোর যে আইন,নিয়ম কানুন– চালকের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা বা কোন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে অভিজ্ঞতা না নেওয়ার কারণে তার গুরুত্বই তারা বুঝেন না। প্রাতিষ্ঠানিক প্রশি ণের বিষয়টি নিয়ে ভাবা দরকার। আর দেশের বিভিন্ন মহাসড়কে রয়েছে বিপজ্জনক বাঁক। এই বাঁকগুলো চিহ্নিত করা দরকার। কয়েক বছর আগে এরকম একটি মহাসড়কে সড়ক দুর্ঘটনায় সাংবাদিক মিশুক মুনীর ও চলচ্চিত্র নির্মাতা তারেক মাসুদের মৃত্যুর কথা আমাদের সকলের মনে আছে। প্রতিভাবান এ মানুষগুলোর মৃত্যু আমাদের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি। এ মৃত্যুর জন্য এ সড়কে একটি বিপজ্জনক বাঁককেই চিহ্নিত করা হয়েছিলো। দেশের বিভিন্ন মহাসড়কে এই বিপজ্জনক বাঁকের কারণেই ঘটছে নানা দুর্ঘটনা। আর বিপজ্জনক বাঁকের আগে অনেক জায়গায় নেই কোন সতর্কীকরণ বিজ্ঞপ্তি। এখনো চলে ফিটনেস বিহীন গাড়ি। খোদ শহরেই এরকম গাড়ি আমাদের চোখে পড়ে। গাড়িতে দেখা মেলে অনেকই শ্রমিক হিসাবে কাজ করছে, যাদের বয়স আঠারো পার হয় নি। তাদেরকে বলা যায় শিশু শ্রমিক। আইএলও কনভেনশন অনুযায়ী পনের বছরের নিচে মানব সন্তানকে শিশু বলে। ঝুঁকিপূর্ণ কাজে আঠারো বছরের নিচে কাউকে ব্যবহার করা যায় না। বাংলাদেশে শ্রম আইন অনুযায়ী চৌদ্দ বছরের নিচের সন্তানকে শিশু বলে। কিন্তু এ ধরনের শ্রমিকের অহরহ দেখা মেলে পরিবহন সেক্টরে। পরিবহনে শিশু শ্রমিকের ব্যবহার কাম্য নয়। মহাসড়কে ছোট গাড়ির ব্যবহার ও নিয়ন্ত্রিত করা উচিত। কোন ভালো উদ্যোগেরই আমরা প্রথমে গুরুত্ব বুঝি না। ঢাকা– চট্টগ্রাম মহাসড়কে সিএনজি বন্ধের সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রেও নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতা দেখেছি। কিন্তু দেখা মহাসড়কে সিএনজি বন্ধের কারণে দুর্ঘটনার পরিমান অনেক কমে গেছে এটা সত্যি। গাড়িতে চালকের গাড়ি চালানো অবস্থায় মোবাইল ফোনের ব্যবহার নিষিদ্ধ করার কার্যকরী আইন থাকা দরকার। দেশে মোবাইল প্রযুক্তির এ যুগে শুধু মোবাইল ফোন ব্যবহারে কারণে কতো যে দুর্ঘটনা ঘটেছে তার হিসেব নেই। মোবাইলে কথা নিশ্চয়ই গাড়ি চালানোয় মনযোগ নষ্ট করে। চালক হেলপার উভয়েরই ক্ষেত্রে কথাটা প্রযোজ্য। প্রশিক্ষণের যে কথা বলছিলাম, প্রশিক্ষণ চালক,হেলপার পরিবহনের সাথে সংশ্লিষ্ট সকলের জন্য দরকার। এই নানা সচেতনতার খুঁটিনাটি বিষয়গুলো প্রশিক্ষণে উঠে আসতে পারে। গাড়িতে ধূমপান নিষিদ্ধ। এই সংক্রান্ত আইনও আছে। যাত্রীদের সচেতনতার কারণে হোক বা আইনের কারণে হোক আজকাল গাড়িতে কেউ সহজে ধূমপান করে না। গাড়িতে ধূমপান ঠিক নয়, যিনি ধূমপান করেন তিনিও বোঝেন। মোবাইল ফোন ব্যবহারে ক্ষেত্রেও আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সচেতনতা আনা জরুরি। এই সামান্য বিষয়গুলো নিয়ে যখন কোন বেদনাদায়ক দুর্ঘটনা ঘটে, তখন তার দুঃখ নিয়ে চিরকাল বয়ে বেড়ানো ছাড়া কিছুই করার থাকে না। সড়ক দুর্ঘটনা রোধে সাধারণ জনগণের সচেতনতাও গুরুত্বপূর্ণ। সড়ক দুর্ঘটনা ও পরিবহন নৈরাজ্যে সরকার কোন কোন সময় দেখি শুধু অসহায়ই নয়, বরং কোন যুক্তিসংগত সিদ্ধান্ত নিতেও পিছু হটেন। গত ১৯ মে ‘সড়কে নৃশংসতার মূলে চালকদের মাদকাসক্তি’ শীর্ষক দৈনিক ইত্তেফাকের এক প্রতিবেদনে ওঠে আসে ভয়াবহ চিত্র। এতে বলা হয়,অনেক মালিক চালকদের ইয়াবা আসক্তিতে বাধ্য করে,অনেকেই ইয়াবা আসক্ত, আবার কেউ মাদক পাচারেও জড়িত’। এই সেক্টরের রাঘব বোয়ালদের আধিপত্য চলছে দীর্ঘদিন। অনেকের মনে আছে চিত্রনায়ক ইলিয়াছ কাঞ্চনের স্ত্রী চট্টগ্রাম– কক্সবাজার সড়কে দুর্ঘটনায় নিহত হবার পর তিনি ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ নামে যে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন, সেখানেও তাঁকে যুক্তিসঙ্গত কথা বলতে গিয়ে পরিবহন শ্রমিকের কাছে তাঁকে নানা অপমান অপদস্থ হতে হয়েছিলো। মিরেরসরাই এর তোরাব আলী স্কুলের ছত্রিশজন স্কুল ছাত্রের ফুটবল খেলতে গিয়ে মর্মান্তিক মৃত্যুর মত দেশ কাঁপানো দুর্ঘটনার বিচার যে আইনের ফাঁক ফোকরে হলো, কেউ তাতে সন্তুষ্ট হতে পারে নি। আইনের দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করে যথোপযুক্ত শাস্তির ব্যবস্থা নিশ্চিত করা না গেলে অপরাধীরা ভয়ের মধ্যে থাকবে না। সড়ক দুর্ঘটনা কমানো ও পরিবহন সেক্টরে নৈরাজ্য কমাতে যথাযথ আইন প্রণয়ন সময়ের দাবি। এত কিছুর পরেও বেড়ে চলছে সড়ক দুর্ঘটনার মাত্রা। সামান্য কয়েকটি চিত্র দেখলেই বিষয়টি আঁচ করা যায়। ‘বিগত এক

বছরে মানে ২০১৭ সালে ঢাকা–চট্টগ্রাম মহাসড়কের সীতাকুণ্ডতে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছে ১৪২ জন এবং দুর্ঘটনা ঘটেছে ২১৯টি (তথ্যসূত্র–দৈনিক পূর্বকোণ ১০ এপ্রিল ২০১৮)। আর পরিবহন সেক্টরের নৈরাজ্য নিয়ে গত ২০ এপ্রিল ২০১৮ দৈনিক প্রথম আলোর ‘নেতাদের পরিবহন বাণিজ্য ও জনপরিবহনে নৈরাজ্য চলছেই’ শীর্ষক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে নৈরাজ্যের নানা দিক। বুয়েটের এক গবেষণায় যে চিত্র উঠে এসেছে তা আমাদের চিন্তা করার বিষয়। বুয়েটের সড়ক দুর্ঘটনা ইনস্টিটিউট(এ আর আই)এর হিসাব মতে ‘ ৯০% দুর্ঘটনা ঘটে অতিরিক্ত গতি ও চালকের বেপরোয়া মনোভাবের কারণে। দুর্ঘটনায় প্রাণ যাওয়া ৫৪%এর বয়স হচ্ছে ১৬–৪০ বছরের মধ্যে, ১৫ বছরের নীচে ১৮%। এরা সবাই দেশের ভবিষৎ অর্থনীতিতে কাজে লাগবে বা লাগছে এ রকমই মানুষ। বিআরটিএ এর হিসাব মতে, দেশে যানবাহন আছে ৩৩ লাখ,তৎমধ্যে লাইসেন্সধারী ২২লাখ, বাকিগুলোর লাইসেন্স নেই। পেশাদার চালকের মধ্যে প্রায় ২ লাখ লাইসেন্স পেয়েছে যোগ্যতা পরীক্ষা ছাড়াই’(সূত্র প্রথম আলো ১৮ এপ্রিল ২০১৮)। বুয়েটের এ গবেষণা তথ্যকে ধরে যে চিত্র আমাদের কাছে দৃশ্যমান তা হলো, এখানে দুর্নীতি চলছে, অযোগ্যরা লাইসেন্স পেয়ে যাচ্ছে, তাদের কাছে আমাদের জীবন দিন দিন অনিরাপদ হয়ে ওঠছে। আর কর্মক্ষম শ্রেণির মৃত্যু আমাদের অর্থনীতিতে সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। সড়ক দুর্ঘটনা রোধে চাই রাজনৈতিক সদিচ্ছা ,একটি নির্বাচনী অঙ্গীকারও। সড়ক দুর্ঘটনা সকল দেশে আছে এবং থাকবে,কিন্তু আমাদের দেশে দেখি ভিন্ন চিত্র এবং এর ঘটন মাত্রা অনেক বেশি। আমাদের মনে রাখতে হবে দুর্ঘটনা দুর্ঘটনাই, কিন্তু কারো অবহেলায় যেনো তা না ঘটে তার দিকে লক্ষ্য রাখা এবং যথাসম্ভব নিয়ন্ত্রণে রাখার উদ্যোগ গ্রহণ করা। সড়ক দুর্ঘটনার মাত্রা কমিয়ে আনার যথাযথ পরিকল্পনা প্রণয়ন ও পরিবহন সেক্টরে শৃংখলা আনয়ন সরকারেরই দায়িত্ব্‌। বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে বিবেচনার দাবি রাখে।

লেখক : অধ্যাপক, বি এম সি কলেজ, চট্টগ্রাম।
(সংগৃহীত)

এই বিভাগের আরো সংবাদ