যে সব কারণে এবছরের সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার বাতিল করা হলো

  অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ২৫ মে ২০১৮, ১১:৩২

ইসমত আরা জুলী, ২৫ মে, এবিনিউজ : যৌন নিপীড়ন, অর্থ কেলেঙ্কারি এবং ক্রমাগত তথ্য ফাঁসের অভিযোগের মুখোমুখি হয়ে নিজেদের মধ্যে সৃষ্ট দ্বন্দ্ব সংঘাত ও স্বপদ থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘটনায় সুইডিশ একাডেমি বলেছে, এবছর সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার প্রদান করা হবে না ।

সূইডিশ একাডেমি ঘোষণা করেছে, পৃথিবীর সবচেয়ে সম্মানজনক সাহিত্য পুরস্কার যা নির্ধারিত হয় এক গোপন জুরী বোর্ডের সিদ্ধান্তে তা প্রবর্তনের পর অর্থাৎ ১৯৪৯ সালের পর প্রথমবারের মতো এই শরতে তারা সাহিত্যে নোবেল বিজয়ীর নাম ঘোষণার পর্দা উন্মোচন করছেন না ; এর পরিবর্তে ২০১৯ সালে সাহিত্যে নোবেল বিজয়ী দুজনের নাম একসাথে ঘোষণা করা হবে। এক ঘোষণাপত্রে সংস্থাটি জানিয়েছে, এই সময়ে একাডেমির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হওয়া এবং এর ওপর জনগণের আস্থা কমে যাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে বর্তমানে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হতে হয়েছে । রাজা তৃতীয় গুস্তাভ ১৭৮৬ সালে এ সংস্থাটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন যা এখনও রাজকীয় আর্থিক সহায়তা পেয়ে যাচ্ছে ।

সংস্থাটির অন্তর্বর্তীকালীন স্থায়ী সেক্রেটারি এনডারস ওলসন বলেছেন, আমরা মনে করি জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনার জন্য সময়ের প্রয়োজন…পরবর্তী বিজয়ীর নাম ঘোষিত হবার আগে। তিনি আরও বলেছেন, পূর্ববর্তী ও ভবিষ্যতের সাহিত্যে নোবেল বিজয়ীদের, নোবেল ফাউন্ডেশনের এবং সাধারণ জনগণের প্রতি সম্মান জানিয়েই এটি করা হয়েছে।

প্রতিষ্ঠানটির নজিরবিহীন এই সংকটের মূলে রয়েছে আলোকচিত্রী ও সুইডেনের অগ্রগণ্য সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব জিয়ান–ক্লড আরনল্টের বিরুদ্ধে বড়সড় রকমের অভিযোগ, যিনি আবার একাডেমির সদস্য ও লেখক ক্যটারিনা ফ্রসটেনসনের সাথে বিবাহসূত্রে আবদ্ধ। গত নভেম্বরে সুইডেনের সংবাদপত্র ‘ডগিনস নুহিয়াততে’ এ ১৮ জন নারী যাঁরা আরনল্টের বিরুদ্ধে ফ্রান্স, সুইডেন এমনকি একাডেমির নির্ধারিত জায়গায়ও ২০ বছরের বেশি সময় ধরে যৌন নিপীড়ন ও শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগ করেছেন তা বিস্তারিতভাবে প্রকাশিত হয় ।

আরনল্ট এবং ফ্রসটেনসন বহুবছর ধরে ফোরাম নামে স্টকহোমের একটি ক্লাব পরিচালনা করে আসছিলেন, যে ক্লাবটি নোবেল বিজয়ীসহ বিখ্যাত সব সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের নিয়ে প্রদর্শনী, বইয়ের প্রচার ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করত। একাডেমির আংশিক অর্থসহায়তাপ্রাপ্ত এই ক্লাবটি এখন বন্ধ রয়েছে এবং এর বিরুদ্ধে স্বার্থ সাংঘর্ষিক কার্যকলাপের অভিযোগ রয়েছে। ক্রমবর্ধমান কেলেঙ্কারির ঘটনা উন্মোচিত হবার পর সংবাদপত্র ‘ডগিনস নুহিয়াততে’ প্রতিবেদন প্রকাশ করে এইভাবে–একাডেমি কর্তৃক পরিচালিত একটি অভ্যন্তরীণ তদন্তের সমাপ্তি টানা হয় যে আরনল্ট হয়তবা সাহিত্যে সাতজন নোবেল বিজয়ীর নাম আগেভাগে ফাঁস করেছে যার মধ্যে ২০১৬ সালের বব ডিলান ও ২০০৫ সালের হ্যরল্ড প্রিন্টারও রয়েছেন এবং যেটি একটি বড়ধরনের জুয়ার বিষয় ছিল। ফাঙ্কো– সুইডিশ আলোকচিত্রীর আইনজীবী ইয়র্ন হার্টিক বারবার বলেছেন, তাঁর মক্কেল তাঁর বিরুদ্ধে আনীত সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করেছেন । তিনি আরও বলেছেন, আরনল্টের সুনাম নষ্ট করাই হচ্ছে এ অভিযোগগুলোর মূল উদ্দেশ্য এবং তিনি অপপ্রচারণার শিকারে পরিণত হয়েছেন। অনমনীয় এবং ঐতিহ্যগতভাবে ভীষণ কর্তৃত্বপরায়ণ এই একাডেমির আরনল্টের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের ব্যাপারে যথাযথভাবে সাড়া দেওয়ার অক্ষমতা তিক্ত অন্তর্কলহের সলতে জ্বালিয়ে দিয়েছে। এর ফলশ্রুতিতে সদস্যরা মিডিয়াতে পরস্পরের সাথে বাকবিতন্ডায় লিপ্ত হয়েছে। ফ্রসটেনসনকে বহিষ্কার না করার সিদ্ধান্তে ১৮ জন সদস্যের শক্তিশালী একাডেমি থেকে তিনজন সদস্য পদত্যাগ করেছেন। পুরুষদের দুর্ব্যবহারের বলি হবার জন্য যেন নারীদের জন্ম হয়েছে এরকম একটি ধারণার বিরুদ্ধে প্রতিবাদমুখর পরিস্থিতিতে কয়েকদিন পর একাডেমির স্থায়ী সেক্রেটারি সারা ডেনিয়াস , যিনি এই সংস্থাটিকে ঠিকঠাক করার আপ্রাণ চেষ্টায় ব্যর্থ হয়েছেন এবং ফ্রসটেনসন নিজেই পদত্যাগ করেন ।

পদ্ধতিগতভাবে একাডেমির সদস্যরা সারাজীবনের জন্য নিয়োগ পেয়ে থাকেন এবং তাঁরা পদত্যাগ করতে পারেন না কিন্তু তাঁদের আসন খালি করার অনুমতি রয়েছে। কিন্তু এখন সংস্থাটির সদস্য সংখ্যা কমে ১০ জন সক্রিয় সদস্য রয়েছেন এবং নতুন একজনকে নিয়োগ দিতে গেলে ১২ জনের দরকার । এরকম পরিস্থিতিতে রাজা কার্ল ষোড়শ গুস্তাফ এ সপ্তাহে সংস্থাটি টিকিয়ে রাখার জন্য এর পদমর্যাদায় পরিবর্তন আনার কথা ঘোষণা করেছেন।

২০১৮ সালের পুরস্কার স্থগিতের ঘোষণাকে বিপুলভাবে স্বাগত জানানো হয়েছে। ‘ডগিনস নুহিয়াততে’ এর সাহিত্য সমালোচক মারিয়া শটেনিয়াস বলেছেন, আমি মনে করি এটি একটি বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত এবং এটি তাঁদের পক্ষে নেওয়া সর্বোত্তম সিদ্ধান্ত। ‘সংস্থাটিকে রক্ষা করার জন্য তাঁরা এবছর একটি সুযোগ পাবে, খালি আসন পূরণ করতে পারবে এবং একটি শক্তিশালী একাডেমির ভাবমূর্তি নিয়ে আবার ফিরে আসবে যা পুরস্কার প্রদান করতে সমর্থ হবে।’

গোরান মালকিভিস্ট নামে একজন একাডেমি সদস্য সুইডেনের টিটি নিউজ এজেন্সিকে বলেছেন, সংস্থাটি সংকটের মধ্যে পড়েছে এবং এটি পুনর্গঠনের জন্য সময়ের প্রয়োজন। কিন্তু এক্সপ্রেশন নিউজপেপারের জেনস লিলজেসস্ট্রেন্ড টিটিকে বলেছে, সুইডিশ একাডেমির সুনামের জন্য এটি একটি বিপর্যয় … যেটা তাঁরা এরচেয়ে ভালোভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারত না । ডাইনামাইট আবিষ্কারক আলফ্রেড নোবেলের স্টেট পরিচালনাকারী নোবেল ফাউন্ডেশন এক বিবৃতিতে বলেছে , এই বিপর্যয় সাহিত্য পুরস্কার ও এর বিচারকদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। তাঁদের এই সিদ্ধান্তের ফলে পরিস্থিতির গভীরতা সম্পর্কে আঁচ করা যাচ্ছে এবং এটি এই পুরস্কারের দীর্ঘদিনের খ্যাতিকে অক্ষুণ্ন রাখতে সাহায্য করবে।

পাবলিক প্রসিকিউটররা বলেছেন, তাঁরা তাঁদের তদন্তের কিছু অংশ আরনল্টের বিরুদ্ধে উপযুক্ত প্রমাণের অভাবে বাদ দিয়েছেন কিন্তু তদন্তের একটি বিশাল অংশের কাজ চলছে। সুইডেনের ইকনমিক ক্রাইম ব্যুরো গত সপ্তাহে বলেছে, তাঁরা একাডেমির সাথে সংশ্লিষ্ট একটি মামলার তদন্ত করছে যাতে মনে করা হচ্ছে যে এ সংস্থাটি আরনল্টকে আর্থিক সহায়তা ভর্তুকি হিসেবে দিয়েছে। একাডেমির সাহিত্যে নোবেল বিজয়ী নির্ধারণ করার প্রক্রিয়া দশকের পর দশক গভীর কুয়াশাচ্ছন্ন রয়েছে। প্রতিবছর ফেব্রুয়ারিতে একাডেমির সদস্যরা প্রায় ২০০ নমিনেশন পর্যালোচনা করেন; মে মাসের মধ্যে একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা তৈরি হয় এবং গ্রীষ্মের শেষেও পাঁচজন সম্ভাব্য সাহিত্যিক দৌড়ে থাকেন। বিজয়ী হন সেই সাহিত্যিক যিনি আলফ্রেড নোবেলের ইচ্ছানুযায়ী “সবচেয়ে ভালো কাজ যা একটি আদর্শগত দিকে ধাবিত করে” –এই ধারণাটি সবচেয়ে ভালোভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারেন। ১৯০১ সালে এই সম্মানজনক পুরস্কার প্রবর্তনের পর থেকে সাতবার এ পুরস্কার প্রদান বন্ধ রাখা হয় কিন্তু আগে কখনও কোন কেলেঙ্কারির ঘটনায় এটি বন্ধ হয়নি। পুরস্কার প্রদান বন্ধ ছিল প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে ১৯১৪, ১৯১৮, ১৯৪০ , ১৯৪১, ১৯৪২ এবং ১৯৪৩ সালে। ১৯৩৫ সালে পুরস্কার প্রদান বন্ধ থাকার কারণ এখনও অজানা। উপযুক্ত বিজয়ী না পাওয়ার কারণে ১৯১৫, ১৯১৯, ১৯২৫, ১৯২৭, ১৯৩৬ এবং ১৯৪৯ সালে এ পুরস্কার “সংরক্ষিত” রাখা হয়। ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান কার্ল– হেনরিক হেলডিন আলাদাভাবে বলেছেন, ২০১৮ সালের অন্য বিষয়ের উপর নোবেল পুরস্কার প্রদান এতে ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। ফাউন্ডেশন আশা করছে যে একাডেমি তার “সর্বোচ্চ চেষ্টা” চালিয়ে এর বিশ্বাসযোগ্যতা অক্ষুণ্ন রাখবে। হেলডিন বাকি সদস্যদের আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, ভবিষ্যতে তাঁরা যেন বাইরের পৃথিবীর কাছে নিজেদের স্বচ্ছতাকে আরও জোরালোভাবে দাঁড় করানোর ব্যাপারে প্রত্যয়ী হন। (সূত্র: দি গার্ডিয়ান থেকে অনূদিত)।

লেখক : কবি ও অনুবাদক
(সংগৃহীত)

এই বিভাগের আরো সংবাদ