ভোটের রাজনীতি: চাই কার্যকর মন ছোঁয়ানো স্লোগান

তপন কুমার রায়

  অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ০৪ ডিসেম্বর ২০১৮, ১৭:২৫

শুরুতেই বলা আবশ্যক, আমি সভ্য সমাজের কোনো স্বনামধন্য লেখকের কাতারের নই। যা লিখছি বা লিখব অনেকেই বাক্যগুলোকে অখাদ্য হিসেবেই আখ্যায়িত করতে পারেন। কেননা, শিরোনামে ‘রাজনীতি’ নামক যে শব্দটি ব্যবহার করেছি তার ধারের কাছেও আমার অবস্থান নেই। দেশের একজন সাধারণ মানুষ হিসেবেই এই অখাদ্য লেখার দু:সাহস। নির্বাচনে অংশগ্রহনকারী দলগুলোর নির্বাচনী ইশতেহারের সারমর্ম স্লোগান আমার মত আর দশজন সাধারণ মানুষকে কতটুকু বদলে দিতে কিংবা হৃদয়কে ছুঁয়ে যেতে পারবে সে বিষয়ে আমার জানার আগ্রহ আছে। এটি অমূলক মনে হলেও আমার উৎসুক মনের একধরনের জিজ্ঞাসাও বটে।

শীতের তীব্রতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলার দুয়ারে ভোটের বার্তা কড়া নাড়ছে। গণমাধ্যমগুলোর খবর বলছে, ভোটারদের আকৃষ্ট করতে নির্বাচনী ইশতেহার প্রায় চূড়ান্ত করেছে রাজনৈতিক দলগুলো। ইশতেহারকে এক কথায় জনগণের কাছে তুলে ধরতেই দলগুলো ঠিক করছে ইশতেহারের প্রতিপাদ্য বা স্লোগান।

গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী এবারে নির্বাচনী ইশতেহারে আওয়ামী লীগ-মহাজোট চমক হিসেবে ডেল্টা প্ল্যান, ভিশন ২০৪১ আর সুশাসন প্রতিষ্ঠার উপর জোর দিয়ে ইশতেহারের খসড়া প্রায় চূড়ান্ত করেছে। যার সম্ভাব্য মূল প্রতিপাদ্য বা স্লোগান ‘দিন বদলের অভিযান অদম্য বাংলাদেশ’/ ‘গ্রাম হবে শহর।’

অন্যদিকে, বিএনপি-জোটের ইশতেহারে রেইনবো ন্যাশন, ভিশন ২০৩০ এবং ক্ষমতার ভারসাম্যকে সামনে রেখে ইশতেহার প্রায় চূড়ান্ত যার সম্ভাব্য প্রতিপাদ্য স্লোগান ‘দেশের মালিক জনগন, দেশ বাঁচাতে মানুষ বাঁচাতে আনবে পরিবর্তন’ (দৈনিক সংবাদ, ১ ডিসেম্বর-২০১৮)।

এখন অপেক্ষা আর দেখার পালা আদৌ কি এসব স্লোগান চূড়ান্ত রূপ নিয়ে ১৬ কোটি মানুষ কিংবা ১০ কোটি ৪১ লাখ ভোটারকে কতটুকু দোলা দিতে পারবে? আদৌ কি এসব স্লোগান আমাদের মনকে ছুঁয়ে যেতে পারবে? গ্রামের মানুষের কাছে শতশত নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির বইখানি না পৌঁছলেও স্লোগানের সুর তাদের কানে পৌঁছানো অতি সহজ। কিংবা যে মানুষটির সকালটা শুরু হয় দিনের আহার খোঁজার চিন্তা বা বেসরকারী ক্ষুদ্রঋণের কিস্তির টাকার চিন্তা করে তার আগামীর ভিশন-২০৪১/২০৩০ কিংবা রেইনবো ন্যাশন বা রঙধনু জাতির চিন্তা করাও কল্পনাতীত হতে পারে।

তাই ইশতেহার যাই হোক, পরিবর্তনের মহাপ্লাবনের জন্য চাই দলগুলোর কার্যকর মন ছোঁয়ানো স্লোগান। বইমেলায় প্রকাশযোগ্য পুস্তকের ন্যায় ইশতেহারের মোটা বইখানি জনগন কতটুকু গ্রহন করে সে নিয়ে প্রশ্ন আছে। তার চেয়ে ভোটারদের এক কথায় আকৃষ্ট করতে একটি স্লোগানের মূল্য যে হাজারগুণ তা বলার অপেক্ষা রাখেনা।

এবার একটি কল্প কাহিনী সিনেমার কথায় আসি। ২০১৪ সালে মুক্তি পাওয়া কলকাতার রঙ্গন চক্রবর্তীর পরিচালনায় একটি সিনেমা ‘বাড়ি তার বাংলা’। অবাক হচ্ছেন তাই না? ভাবছেন ‘ধান ভাঙতে শীবের গীত’ গাইছি কেন? পাঠক, শুরতেই বলে নিয়েছি কিছু অখাদ্য লিখছি। সিনেমায় মূল চরিত্রে অভিনয় করেছেন শ্বাশত চট্টোপাধ্যায়। পেশায় চটি লেখক, বিজ্ঞাপন আইডিয়াদাতা।

সিনেমায় বিজ্ঞাপন আইডিয়াদাতা রূপম (শ্বাশত চট্টোপাধ্যায়) এর বাবা মেরুন পাটির নেতা। দীর্ঘদিন রাজনীতি-পাটি করলেও কখনো নির্বাচনে জিততে পারেনি মেরুন পাটি। বাবা এসে পুত্রের কাছে অনুরোধ করলো নির্বাচনের স্লোগান ঠিক করে দিতে। রূপম বাবু ঠিক করে দিলেন, ‘হয় মেরুন, নয় মরুন’ যা ভোটের মাঠে ময়দানে কম্পিত হতে লাগলো ‘আগামী ভোটে ঠিক করুন, হয় মেরুন, নয় মরুন। জিতে গেল মেরুন পাটি। ক্ষমতায় এলো। দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার কারণে এবার জনগণ অতিষ্ঠ হয়ে উঠলো।

২০ বছরেও ক্ষমতার দেখা না পাওয়া এবার হলুদ পার্টি পেশাদার রূপম বাবুর কাছে এসে স্লোগান চাইলো। সম্পর্কের টানাপোড়নে মেরুন পাটির প্রতি বিরাগ রূপম বাবু হলুদ পাটির জন্য ঠিক করে দিলেন স্লোগান এবার বাংলার ‘গায়ে হলুদ।’

প্রেক্ষাপট দরিদ্র বাংলার যৌতুক প্রথার পিষ্ঠ আয়-বুড়ো মেয়েদের কপাল খুলে যাবে হলুদ পাটির জয়ে। হবে গ্রামে গ্রামে গায়ে হলুদ, বিয়ের উৎসব। শেষ পর্যন্ত হয়েছে তাই। সিনেমায় কল্প কাহিনী হলেও আমাদের গল্পটা থেকে শিক্ষা নেয়া উচিত। স্লোগানের গুরুত্বটা উপলব্ধি করা উচিত।
 
‘নতুন ভোটার, প্রথম ভোট-স্বাধীনতার পক্ষে হোক’ শিরোনামে গত ২২ নভেম্বর অনলাইন বিডিনিউজ২৪.কমে একটি মতামত কলাম পড়ার পর থেকে নিজের বিবেককে প্রশ্ন করতে থাকি। লেখনীর বিশ্লেষণে যাই থাকুক না কেন, এই স্লোগানটি যার মাথা থেকেই আসুক না কেন আসন্ন নির্বাচনে স্লোগানটি বেশ সাড়া ফেলতে পারে বৈকি?

নানান সমীকরণ আর বিশ্লেষণ বলছে এবার ভোটের ফলাফলে প্রভাব ফেলবে তরুণ ও নতুন ভোটাররা। তাই বর্ণিত শিরোনামটিকে একটু পরিমার্জিত করে ‘তরুণ ভোটার, প্রথম (নতুন) ভোট- স্বাধীনতার পক্ষে হোক’ এমনটিই দলীয়ভাবে ব্যবহার করতে পারে নির্বাচনে অংশগ্রহনকারী যেকোন জোট। তবে এমন স্লোগান ব্যবহারে বিএনপি-জোট ব্যবহার করতে কিছুটা বেগ পেতে পারে। আদর্শের জায়গায় বাধা পেতেও পারে।
 
কেননা, গণমাধ্যমের খবর অনুুসারে যদি ‘বদির বদলে বধূ, যেই লাউ সেই কদু’ হয় তবে আদর্শ-নীতি ঠিক রেখে নির্বাচনের প্রতীক পরিবর্তন করলেই কিন্তু শুদ্ধ হওয়া যায়না। এমন স্লোগান ব্যবহারে আওয়ামী লীগ জোট অগ্রাধিকারে এগিয়ে থাকতে পারে।  শেষ করার আগে আবারও নিজের সাফাই গাই। কোনো রাজনৈতিক দলের গুণকীর্তন বা সমালোচনা করার প্রয়াস আমার নেই। এমনকি দু:সাহস। প্রত্যাশা কার্যকর হৃদয় নিংড়ানো স্লোগানের। ভোটের রাজনীতিতে জিততে এই স্লোগানই হোক মূখ্য ভূমিকা।

লেখক- সাবেক সভাপতি, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতি।

 এবিএন/রাজ্জাক/জসিম/এআর

এই বিভাগের আরো সংবাদ