আজকের বিশ্ব : মার্ক্সবাদের প্রাসঙ্গিকতা

  অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ২২ মে ২০১৮, ১৭:০৫

ডাঃ কিউ.এম. অহিদুল আলম, ২২ মে, এবিনিউজ : সম্প্রতি কার্লমার্ক্সের দ্বি শততম জন্ম বার্ষিকী পালিত হচ্ছে পৃথিবীর সর্বত্র। আমাদের দেশেও পালিত হচ্ছে। নব্বই এর দশকে রাশিয়াসহ পূর্ব ইউরোপের পতনের পর এবং গত ৫ বছরে ভারতের কমিউনিস্ট শাসিত রাজ্য ত্রিপুরা, পশ্চিম বাংলা ও কেরালায় মার্ক্সবাদীদের পরাজয় হয়। বাংলাদেশের শাসনতন্ত্রে চার মূলনীতির অন্যতম স্তম্ভ সমাজতন্ত্র। আমরা ছাত্রজীবনে স্লোগান শুনতাম–

হোচিমিনের চিন্তাধারা

এশিয়াকে দিচ্ছে নাড়া।

মার্ক্সীয় দর্শনের রাজনীতি ও অর্থনীতি পৃথিবীর অনেক দেশে বিভিন্ন সময়কাল বাস্তবায়িত ছিল। এসব দেশের সার্বিক উন্নয়ন বিশেষ করে মানবসূচক উন্নয়ন সমস্ত বিতর্কের ঊর্ধ্বে ছিল। একদিকে ৭০ বছরের সোভিয়েত সমাজতন্ত্রের পতন অন্যদিকে একই সময় ধনতন্ত্রের ঈর্ষণীয় আর্থিক চাক্ষুষমান উন্নয়ন অনেককে স্বীকার করতে হয়েছিল–ধনতন্ত্রের জয় বোধ হয় হয়ে গেছে। পাশ্চাত্যে প্রচারণার ভূতে দশ চক্রে ভগবানও ভূত বনে যায়। এমনিভাবে ফ্রান্সিস ফুকুয়ামা ১৯৯২ সালে The end of History লিখে অর্থনীতির জগতে হৈ চৈ বাধিয়ে দিল। আজকে মাত্র পঁচিশ বছর পর মনে হয় ফুকুয়ামার মেধা–নিঃসৃত সব কথা সত্যি হয়নি।

আজকে যে কথাটি নতুন করে ভাবনা যোগাচ্ছে তা হচ্ছে মার্ক্সবাদ কি এখনো প্রাসঙ্গিক? মার্ক্সবাদের বিরোধীরা তো এই মতবাদকে বরাবরই মৃত মনে করে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে ধনবাদের আভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব গুলোই মার্ক্সবাদকে প্রাসংগিক করে রাখবে। যতদিন ধনবাদ থাকবে ততদিন মার্ক্সবাদের প্রাসঙ্গিকতাও থাকবে। এই মার্ক্সবাদীয় প্রাসংগিকতা ১৯১৭ র রাশিয়া বা ১৯৪৫ পরবর্তী পূর্ব ইউরোপ, কিউবা, চীন এর প্রতিচ্ছবি পূর্ণ অর্থনীতি নাও হতে পারে। মার্ক্স কোনদিন আশা করেনি যে রাশিয়ায় মার্ক্সীয় অর্থনীতির রাষ্ট্র ও সমাজ গড়বে। বিপ্লব সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে মার্ক্সবাদ প্রতিষ্ঠিত হবে এটাও মার্ক্স আশা করেননি।

মার্ক্সীয় রাজনৈতিক ও প্রায়োগিক রাষ্ট্রগুলো ব্যর্থ হওয়ার কারণ মার্ক্সবাদের ব্যর্থতা নয়–বরং সমাজের যে কোন স্তরে বিদ্যমান দ্বন্দ্বগুলো না বুঝে চলারই ফল। যারা মার্ক্সবাদ শেষ মনে করেন তাদের মতে–ধনতন্ত্রে শ্রমিক শ্রেণী অষ্টাদশ শতাব্দীর মতো এখন নেই। শ্রমিক শ্রেণীও এত বেশী রূপান্তরিত হয়েছে যে যা মার্ক্সের কল্পনায় ছিল না। তবে মার্ক্স যেখানে এখনো প্রাসংগিক তা হচ্ছে এখন বিশেষতঃ ২০০৮ সালের অর্থনৈতিক বিশ্ব বিপর্যয়ের পর গোটা বিশ্ব ভাবতে শুরু করেছে ধনতন্ত্র বোধ হয় শেষ। তাহলে তারপর কি?

ধনতন্ত্রের সংকটই ধনতন্ত্রকে ধ্বংস করতে যথেষ্ট। মার্ক্সীয় দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ অর্থাৎ কিছু সামাজিক দ্বন্দ্ব, কিছু অর্থনৈতিক দ্বন্দ্ব আজকের বিশ্বে অত্যন্ত প্রকট। যার ফলশ্রুতি আয় বৈষম্য, পুঁজির Drifting অর্থাৎ অন্য দেশে বিনিয়োগ। এসবই পুঁজিবাদের সংকট।

২০০৮ সালের পর থেকে মুক্ত বাজার অর্থনীতি ও নিও কনজারভেটিভদের যে সংকট তা একযুগেও সারছে না। সারা বিশ্বে কিছু সংখ্যক মানুষ ধনী হয়েছে। বাকীদের প্রকৃত অর্থনৈতিক অবস্থা অর্থাৎ ক্রয় ক্ষমতা আজকের তুলনামূলক অর্থনীতির ভাষায় মার্ক্সীয় আমলের শ্রমিকদের সমান হয়ে গেছে। পুঁজিবাদের স্বর্ণযুগে ও দেশে দেশে বেকারত্ব, পরিবেশ দূষণ ও পরিবেশ ধ্বংস, জ্বালানির ক্রমবর্ধমান ধ্বংস। এসবের সাথে যুক্ত হয়েছে ক্লাইমেট চেঞ্জ বা জলবায়ু পরিবর্তন জনিত সমস্যা। ওসব সমস্যা সত্ত্বেও ধনবাদীদের একমাত্র লক্ষ্য মুনাফা এবং কেবল মুনাফা (Profit and profit only) । এই তত্ত্বও মার্ক্সের।

অপরদিকে মানুষের সামনে এখন বাস্তবায়িত ৭০ বছরের সমাজতন্ত্র ও তিনশ বছরের ধনতন্ত্রের তুলনা সহজ হয়ে গেছে। ২০০৮ সালের পর থেকে আমেরিকাসহ সমস্ত ধনবাদী দেশে মার্ক্সের ‘ডাস্‌ কেপিট্যাল’ এর বিক্রি বেড়ে গিয়েছে, বাইবেল থেকেও বেশী কপি বিক্রি হচ্ছে মার্ক্স এর লেখা বই। বিলাতের সোশালিস্ট ওয়ার্কার্স পার্টি ৫ দিন ব্যাপী ‘বামমেলা’ আয়োজন করে। প্রতি বছরই প্রায়োগিক মার্ক্সবাদ জানতে তরুণদের উপস্থিতি ৫–৬ গুণ বেড়ে যাচ্ছে।

একত্রীভূত জার্মানির ৫২% জনগণ মনে করে মুক্তবাজার অর্থনীতি আম জনতার জন্য যুৎসই নয়। ৪৩% জনগণ আবারো সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রে ফিরে যেতে চায়। আমেরিকায় ১৮ থেকে ৩০ বছরের তরুণদের মধ্যে এক সমীক্ষায় দেখা গেছে যে ৫৭% সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি ও জীবন ভাল মনে করে। সমস্যা হচ্ছে ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বর্তমানে আমজনতা নিজেদেরকে এক্সক্লুসিভ বা বৃত্তের বাইরে মনে করে। এখানেও আবার মার্ক্সবাদের প্রাসংগিকতা ফিরে আসে। আম জনতাকে সম্পৃক্ত করা, প্রতিটি স্তরে গণতন্ত্র চর্চা, পরিবেশ ও প্রকৃতি বান্ধব উন্নয়ন এসবই মার্ক্সীয় দর্শনের ও অর্থনীতির সারকথা, দুর্ভাগ্য হচ্ছে–কি পূর্ব ইউরোপ কি ভারতীয় কম্যুনিস্ট শাসিত রাজ্য বা কম্বোডিয়ায় শাসক ও জনগণের মধ্যে একটা প্রাচীর তৈরি হয়ে গিয়েছিল যা আভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব পাকাপোক্ত করেছিল। এই দ্বন্দ্বেই মার্ক্সবাদীদের বিদায় হয়।

পৃথিবীর বড় বড় চিন্তাবিদরা বারবার প্রশ্ন করছে ধনতন্ত্রের ভবিষ্যৎই কি? অথবা এর বিকল্পই বা কি? প্যারিস ভার্সিটির অধ্যাপক ও ফ্রেন্স মার্ক্সবাদী জ্যাক রানসিয়ের এই প্রশ্নের সংক্ষিপ্ত জবাব দিয়েছেন। তার মতে–ধনতন্ত্রের গর্ব আমেরিকাকে এখন ীধতণ ্রলযযমর্র এ রেখেছে চীনের টাকা। বিশ্বব্যাংক দেউলিয়া। মার্কিন ক্যাপিটাল না ঢাললে সব আন্তর্জাতিক সংস্থা অচল হয়ে পড়ে। ধনতন্ত্রের সমস্ত নেতিবাচকতাকে বাদ দিয়ে পৃথিবী নতুন ষ্ট্রাকচারে দাঁড়াতে চাইছে। যেখানে বৈষম্য কমবে, চাকরি সংস্থান হবে, মুনাফাই অর্থনীতির সব কথা হবে না, মানুষ ও পরিবেশের বাস্তু সম্পর্ক ১ টাকায় বিক্রি হবে না। (বহু করপোরেটকে ভারতসহ অনেক দেশ নামমাত্র মূল্যে মানুষের জমি দিয়েছে–তাদের অনেকে চাকরি সৃষ্টি করতে পারেনি)। এ সবই মার্ক্সের দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের সূত্র। কাজেই যতদিন শ্রেণী বৈষম্য থাকবে ততদিন মার্ক্সবাদও থাকবে।   

[email protected]
(সংগৃহীত)

এই বিভাগের আরো সংবাদ