কাল আজ কাল

  কামরুল হাসান বাদল

১৫ নভেম্বর ২০১৮, ১৩:০৬ | অনলাইন সংস্করণ

রাজনীতি কি সবসময় নীতির মধ্যে চলে? চলে না। রাজনীতি যেহেতু প্রধানত ক্ষমতার জন্য করা হয়ে থাকে কিংবা রাজনীতি ক্ষমতাকেন্দ্রিক সেহেতু রাজনীতির সঙ্গে অধিকাংশ সময়ে হত্যা ষড়যন্ত্র ইত্যাদি সমান্তরালভাবে চলে। সামন্তবাদী ব্যবস্থায় এ চিত্র ছিল প্রকট নিষ্ঠুর ও ভয়াবহ। আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার প্রবর্তনের পর এবং বিশেষ করে গণতন্ত্র চর্চা শুরুর পর রাজনীতি সে চোরাবালি থেকে, অন্ধ গলি থেকে, ষড়যন্ত্র আর হত্যার পথ থেকে সরে এসেছে। মানবিক সহনশীল ও পরমতসহিষ্ণুতার পথে এসেছে। ফলে রাজনীতিতে কিছুটা স্বস্তি, সভ্যতা, শোভনা এবং নীতিবোধের প্রতিষ্ঠা হয়েছে। বেশ কিছু দুর্বলতা থাকা সত্ত্বেও গণতন্ত্রই আজ শ্রেয়তর রাষ্ট্রব্যবস্থা বলে স্বীকৃত। পশ্চিমা বিশ্বে গণতান্ত্রিক রীতিনীতি অনেক আগে থেকে প্রতিষ্ঠিত ও চর্চিত হলেও আমাদের দেশে চর্চার ইতিহাস দীর্ঘদিনের নয়। তারপরও মাঝে মধ্যে হোঁচট খাওয়ার কারণে ৪৭ বছরে গণতন্ত্র তার অভিযাত্রা অবিচ্ছিন্ন রাখতে পারেনি, সঠিক গন্তব্যে পৌঁছাতেও পারেনি। উত্তরাধিকার সূত্রে অবশ্য বাংলাদেশ সে ঐতিহ্যও পায়নি। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজ্যগুলো একত্রে করে ভারতকে সম্পূর্ণ একটি রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার কাজটি ব্রিটিশরাই করেছিল। ব্রিটিশদের আগে মোগল তার আগে সুলতানি আমল কিংবা তারও আগে থেকে সামন্তবাদী শাসনব্যবস্থাই চলে এসেছে ভারতবর্ষে। রাষ্ট্রভাষা সে সময় জন্মলাভও করেনি এসব অঞ্চলে। রাজা-বাদশাহদের আমলে রাজনীতি ঘুরপাক খেয়েছে ক্ষমতা আর রাজপরিবারকে কেন্দ্র করে। সেখানে সাধারণ প্রজাদের কোনো অংশগ্রহণ ছিল না। প্রজারা শুধু শাসিত হতো। রাজ্যশাসনে কে এলো কে গেলো এ নিয়ে বেশি মাতামাতি করার সুযোগ ও সদিচ্ছাও ছিল না তাদের। আমত্যবর্গ পরিবেষ্টিত রাজা-বাদশাহ প্রজাদের মতামতকে গুরুত্ব দিতেন না তেমন। আমত্য বা রাজা-বাদশাহদের ঘিরে রাখা অভিজাত ব্যক্তিরা রাজনীতি করতেন তবে তা রাজপরিবার বা সে পরিবারের কারো কোনো পক্ষ হয়ে। সৌদি রাজপরিবারে এখনো কিছুটা বজায় আছে সেই ধারা। সে সময়ের রাজনীতিতে প্রাসাদ ষড়যন্ত্র, বিশ্বাসঘাতকতা এবং নিষ্ঠুরতাই ছিল মূলত রাজনীতি। ১৭৫৭ সাল এই উপমহাদেশের রাজনীতিতে একটি বিশ্বাসঘাতকতার বড় ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। বাংলা বিহার উড়িষ্যার নবাব সিরাজউদ্দৌলাহর বিরুদ্ধে তার সেনাপতি মীর জাফর এবং রাজ বল্লভসহ অন্যান্যের বিশ্বাসঘাতকতার কাহিনী ইতিহাসের কালো অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির লর্ড ক্লাইভ সিরাজের গুরুত্বপূর্ণ সভা সদদের অনৈতিক সুবিধার লোভ দেখিয়ে প্রাসাদ ষড়যন্ত্র ও বিশ্বাসঘাতকতায় উদ্বুদ্ধ করেছিলেন। ফলে নিহত হয়েছিলেন নবাব সিরাজ এবং তার মৃত্যুর পথ ধরে মূলত ভারতে ব্রিটিশদের আগ্রাসন এবং শাসন শুরু হয়। এই উপমহাদেশে রাজনীতিকদের বিশ্বাসঘাতকতার বড় একটি উদাহরণ ১৭৫৭ সালে ২৩ জুনে সিরাজের পতন।
এই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হলো ২১৮ বছর পর স্বাধীন বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় ১৯৭৫ সালে ১৫ আগস্ট জাতির জনককে হত্যার মধ্য দিয়ে। সেদিন তা সংঘটিত হয়েছিল রাজনীতিকদের বিশ্বাসঘাতকতার কারণে। বাঙালি প্রথম স্বাধীন রাষ্ট্রে ক্লাইভের পথ অনুসরণ করে রাজনীতিকদের পদ ও অর্থের লোভ দেখিয়ে কেনাবেচার সংস্কৃতি চালু করেছিলেন সামরিক শাসক ও পরে বিএনপি নামক রাজনৈতিক দলের প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান। বাঙালির দীর্ঘ মুক্তি সংগ্রামের মধ্য দিয়ে যে সুষ্ঠু রাজনৈতিক বাতাবরণ তৈরি হয়েছিল এ দেশে তাকে প্রথম বাধাগ্রস্ত করে ৭৫ এর হত্যাকাণ্ড এবং তৎপরবর্তী ক্ষমতায় আসা রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ। রাজনীতিকে কলুষিত করার প্রক্রিয়ার শুরু তখন থেকেই। রাজনীতিতে নীতিহীনতা, আপসকামীতা, ভণ্ডামী এবং রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় সন্ত্রাস ও দুর্নীতির প্রসার লাভ হয় সে সময় থেকে। অর্থ, ক্ষমতার লোভ এবং সরকারি গোয়েন্দা সংস্থা দিয়ে ভয়ভীতি দেখিয়ে দলভাঙা, অন্যদল থেকে নেতা ভাগিয়ে আনার কাজটি শুরু করেছিলেন জিয়াউর রহমান নিজেই। তার পথ ধরে আরেক সামরিক শাসক এরশাদ সে ধারা বজায় রেখেছিলেন। আজ রাজনীতিতে যে নীতিহীনতা, দুর্নীতি ও আপসকামীতা চলছে তার চর্চাই শুরুই করেছিলেন জিয়া এবং তার ভাবশিষ্য জেনারেল এরশাদ।
তথাকথিত ‘বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবক্তা’ কীভাবে গণতন্ত্রের ক্ষতিসাধন করেছিলেন তা বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি দেখে অনুমান করা কঠিন কিছু নয়। আজ দেশে যে সাম্প্রদায়িক ও ধর্মভিত্তিক রাজনীতির প্রসার, বিস্তার ও প্রভাব বেড়েছে তাও সম্পন্ন করেছিলেন তিনি। বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার পর দেশে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ করেছিলেন। স্বাধীনতাবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোকে নিষিদ্ধ করেছিলেন। ক্ষমতায় এসে জিয়াউর রহমান তা চালু করেছিলেন। রাজাকার শাহ আজিজকে প্রধানমন্ত্রী বানিয়েছিলেন। তিনি রাজনীতিবিদদের কেনা-বেচা শুরুর পাশাপাশি দম্ভ করে উচ্চারণ করতেন “আই উইল মেইক পলিটিঙ ডিফিকাল্টি ফর পলিটিশিয়ান”। তিনি সত্যি সত্যি রাজনীতিকদের জন্য রাজনীতি কঠিন করে তুলেছিলেন।
জিয়াউর রহমান কেমন ছিলেন তার কিঞ্চিত তুলে ধরেছেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম, যার অধীনে জিয়া সেনা প্রধান ছিলেন। তিনি রাষ্ট্রপতিকে কী ধরনের ব্যবহার করতেন তা বিচারপতি সায়েমের আত্মজৈবনিক বই অ্যাট বঙ্গভবন: লাস্ট ফেজ বইটিতে উল্লেখ আছে। বিচারপতি সায়েম লিখেছেন, “জিয়া বঙ্গভবনে আসতেন মধ্যরাতে। অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে। তাঁর সাঙ্গপাঙ্গরা অস্ত্র উঁচিয়ে রাখতো। আমি প্রায়ই মনে করতাম এটাই বোধহয় আমার শেষ রাত। সংবিধানের মূল চার স্তম্ভ বাতিল সংক্রান্ত একটি সামরিক ফরমান আমার কাছে স্বাক্ষরের জন্য আসে। আমি ওই ফরমানের স্বাক্ষর না করে রেখে দিই। পরদিন রাত ১১ টায় বুটের শব্দে আমার ঘুম ভাঙে। সেনা প্রধান জিয়া অস্ত্রসহ বঙ্গভবনে আমার শয়নকক্ষে প্রবেশ করেন। জিয়াউর রহমান আমার বিছানায় তাঁর বুটসহ পা তুলে দিয়ে বলেন, সাইন ইট। তাঁর এক হাতে ছিল স্টিক, অন্য হাতে রিভলভার। আমি কাগজটা পড়লাম। আমার পদত্যাগপত্র। যাতে লেখা, “অসুস্থতার কারণে আমি রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগ করলাম। আমি জিয়াউর রহমানের দিকে তাকালাম। ততক্ষণে আট দশজন অস্ত্রধারী আমার বিছানার চারপাশে অস্ত্র উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। জিয়া আবার আমার বিছানায় পা তুলে আমার বুকের সামনে অস্ত্র উঁচিয়ে বললেন, সাইন ইট। আমি কোনোমতে সই করে বাঁচলাম।” বইটি ১৯৮৮ সালে প্রকাশিত হয়। ১৯৯১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসার সাতদিনের মধ্যে বইটি বাজেয়াপ্ত ও নিষিদ্ধ করে। খন্দকার মোশতাককে পদচ্যুত করার পর বিচারপতি সায়েমকে রাষ্ট্রপতি করা হয়েছিল। সে সময় প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক ছিলেন মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান। বইটির মুখবন্ধে লেখক লিখেছেন, ১৯৭৭ সালের শেষ ও ১৯৭৮ সালে শুরুর সময়ে এই সংক্ষিপ্ত লেখা তৈরি হয়। আমার মৃত্যুর পর তা প্রকাশের ইচ্ছা ছিল। বইতে সম্ভবত এমন কিছু লেখা ছিল যা তিনি জীবদ্দশায় প্রকাশ করতে চাননি। মুখবন্ধে তিনি রাজনীতি ও রাজনীতিকদের নিয়ে বলতে গিয়ে লিখেছেন “সাধারণ মানুষ রাজনীতিবিদদের প্রতি সর্বদাই উচ্চাশা পোষণ করেন। কিন্তু রাজনীতিবিদগণ রাজনৈতিক প্রতিজ্ঞার সঙ্গে খুব সামান্যই পরিচিত। রাজনীতিবিদগণ যদি তাদের নিজেদের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষালাভের এতটুকু চেষ্টা করতেন তাহলে আমরা অনেক উপকৃত হতাম। অস্বীকার করা যাবে না যে, এই অঞ্চল, এখনকার বাংলাদেশ অধিকাংশ সময় শাসন করেছে সশস্ত্র বাহিনী জেনারেলগণ সেনাপ্রধানগণ। অবশ্য মাঝে মাঝে কিছু সামান্য বিরতি ছিল। এই অঞ্চলের মানুষ যুগ যুগ ধরে শৃঙ্খল ও দাসত্বের শিকার হয়েছে। নিজেদের লোকদের দ্বারা শাসিত হবার সুযোগ তারা পায়নি বললেই চলে। আবু সাদত মোহাম্মদ সায়েম আরও অনেককিছুই লিখেছেন সে সময়ের টালমাটাল রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে, রাজনীতিবিদদের নিয়ে। জিয়া তখনও রাজনৈতিক দল গঠন করেননি। তিনি তখন প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক। সে সময়ের কথা বিচারপতি সায়েম লিখেছেন, রাজনীতিকরা আলাপ-পরামর্শের জন্য সেনানিবাসে যেতেন, বঙ্গভবনে থাকতেই আমি তা দেখেছি। অবশ্য আওয়ামী লীগ সেখানে যেত না। যখন আমি বঙ্গভবন থেকে চলে আসি, তখন জানতে পারি যে বিশেষ সহযোগীও (যিনি প্রতিটি বিকেল আমার সঙ্গে হাঁটতেন) সেনানিবাসে যেতেন। আমি বঙ্গভবন থেকে বেরিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে বিশেষ সহযোগীর একটা পদোন্নতি ঘটে। তিনি ভাইস প্রেসিডেন্ট নিয়োজিত হন। প্রতিশ্রুত নির্বাচনের আগেই প্রেসিডেন্ট পদ থেকে আমার ইস্তফা এমনিতেই বিভ্রান্তির কারণ হয়েছিল। বিশেষ সহযোগীর পদোন্নতি সেই বিভ্রান্তি আরও ঘোলাটে করে তোলে। জল্পনা-কল্পনা হয়েছিল যে, সেই পদোন্নতি অবশ্যই একটা কৃতকর্মের পুরস্কার ছিল।” পাঠকদের নিশ্চয়ই সেই ভাইস প্রেসিডেন্টের নাম মনে আছে। বিচারপতি সাত্তার, যাকে মাত্র কয়েকমাসের ভেতর জেনারেল এরশাদ তার গুরু জিয়াউর রহমানের মতো পদত্যাগে বাধ্য করেছিলেন।
এরশাদও ক্ষমতায় এসে তার গুরু জেনারেল জিয়ার মতো দল গড়েছেন। এবং সে দল গড়তে গিয়ে অন্য দলগুলো ভেঙেছেন। ভয়ভীতি পদ-পদবি ও ক্ষমতার লোভ দেখিয়ে নিজের দলে টেনে এনেছেন। ফলে বিভিন্ন দল থেকে জড়ো হওয়া এই দুই দলের নেতাদের মধ্যে আদর্শের কোনো বালাই নেই। ক্ষমতার ভাগ আর দুর্নীতি করে সম্পদের পাহাড় গড়ার অভিপ্রায়ে তারা বিএনপি ও জাতীয় পার্টির মতো রাজনৈতিক দলগুলো করে থাকেন। অনেকে প্রশ্ন করতে পারেন আদর্শ না থাকলে তারা এতদিন একটি রাজনৈতিক দলই ধরে রাখবেন কী করে? তার উত্তর হবে প্রথমত এরা ভারতবিরোধী, ধর্মনিরপেক্ষতার বিরোধী এবং প্রচণ্ডভাবে আওয়ামী লীগ বিরোধী। অন্য কোথাও এদের ঐক্য না থাকলেও আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনার বিরোধিতায় এদের রয়েছে প্রবল ঐক্য।
নিষ্কলুষ রাজনীতি বা রাজনীতিতে শিষ্টাচার কেমন ছিল তার ছোট্ট একটি উদাহরণ দিই। পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান পিপিপির প্রধান জুলফিকার আলী ভুট্টোর হুমকিতে মার্চের প্রথমার্ধে অনুষ্ঠেয় জাতীয় পরিষদ অধিবেশন আহবান না করে অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষণা করলেন। সারা বাংলা তখন স্বাধীনতার অগ্নিচেতনায় ফুঁসে উঠছে। তারা নেতার সিদ্ধান্ত জানার অপেক্ষায় আছে। সেই উত্তেজনাকর সময়ে বঙ্গবন্ধু সোহরাওয়ার্দি উদ্যানে তার ঐতিহাসিক ভাষণ দিতে এলেন। সে ভাষণে তিনি জাতির সামনে সংক্ষেপে পাকিস্তানের ২৩ বছরে ইতিহাস তুলে ধরতে গিয়ে এক পর্যায়ে বললেন তিনি (প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান) আমার কথা রাখলেন না। তিনি রাখলেন ভুট্টে সাহেবের কথা। অথচ তখন ইয়াহিয়া খান ও জুলফিকার আলী ভুট্টো তাঁর সবচেয়ে বড় শত্রু, সবচেয়ে ভয়ংকর প্রতিপক্ষ। কিন্তু ভাষণে তিনি তাঁদের বিষয়ে একটি অশোভন বাক্য ব্যবহার করেননি। তাঁর অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে তিনি যতবার ফজলুল কাদের চৌধুরীর প্রসঙ্গ এনেছেন ততবার চৌধুরী সাহেব বলে সম্বোধন করেছেন। স্বাধীনতার পর মাওলানা ভাসানী তাঁর পত্রিকা হককথায় সর্বদা বঙ্গবন্ধু ও তার সরকারের বিরুদ্ধে বিষোদগার করে গেলেও তিনি ভাসানীর প্রতি কখনো অশ্রদ্ধাপূর্ণ আচরণ করেননি। এমনকি স্বাধীনতার পর জাসদ গঠিত হলে প্রকাশ্য জনসভায় আ স ম রব বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে অশালীন বক্তব্য দিতে থাকলেও তিনি কখনো তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিতে উদ্যত হননি।
আজ ড. কামাল হোসেন রাজনৈতিক শিষ্টাচারের কথা বলে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের কথা বলে বাহাত্তরের সংবিধান চালুর কথা বলে, বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন বাস্তবায়নের কথা বলে এমন রাজনৈতিক দলের হাল ধরেছেন যারা গণতন্ত্রের কোনো রীতিনীতি কখনো মানেনি। যাদের হাতে কবর রচিত হয়েছিল বাহাত্তরে সংবিধানের। রাষ্ট্রের মৌলিক চারনীতির। ড. কামাল হোসেনসহ দেশের সুশীল শ্রেণির একটি অংশ বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার পদত্যাগ, দেশত্যাগ ইত্যাদি নিয়ে সোচ্চার হয়েছিলেন। তারা বলেছিলেন, এস কে সিনহাকে সরকার বাধ্য করেছে পদত্যাগে। তাদের আমি অনুরোধ করব দেশের প্রথম প্রধান বিচারপতি আবু সাদত মোহাম্মদ সায়েমের প্রতি মেজর জিয়া কী ধরনের ব্যবহার করেছিলেন তা একবার হলেও মনে করতে।
শেখ হাসিনাকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দিতে বিএনপির সঙ্গে যারা কাঁধ মিলিয়েছেন তাদেরও কোনো রাজনৈতিক ঐক্য নেই। আদর্শিক ঐক্য নেই। তারা অর্থাৎ ড. কামাল, রব, মান্না, মনসুর, কাদের সিদ্দিকী সবাই ব্যক্তিগত ইগো থেকে হাসিনার পতন কামনা করছেন। তারা ভালই জানেন যে ঐক্যফ্রন্ট জয়লাভ করা মানে বিএনপি-জামায়াত জোট জয়লাভ করা যাতে তাদের কোনো ফায়দা হবে না তবে শেখ হাসিনাকে নামিয়ে ফেলতে পেরেছে এটাই হবে তাদের সবচেয়ে বড় স্বস্তি। তারা ভালোই জানেন শেখ হাসিনার চেয়ে খালেদা জিয়ার শাসনকাল কখনোই ভালো ছিল না। ভবিষ্যতেও ভালো হবে না।
তাই এবার জনগণকে সঠিক সিদ্ধান্তটি নিতে হবে তারা কিছু ব্যক্তির ব্যক্তিগত আক্রোশ চরিতার্থ করতে ব্যবহৃত হবে কিনা। দেশকে আবার হাওয়া ভবন আর বাংলা ভাইয়ের স্বর্গরাজ্য গড়তে দেবে কি না।
জনগণের সত্যিকার কল্যাণ কামনা করলে এরা অনেক আগে থেকে আরেকটি তৃতীয় রাজনৈতিক শক্তির উত্থান ঘটাতে পারতেন। সিপিবির সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম কথায় কথায় বলেন আওয়ামী লীগের দুঃশাসন, বিএনপির দুঃশাসন। যদি দুদলেরই শাসন দুঃশাসনই হবে তাহলে তারা সবাই মিলে সুশাসনের জন্য গত দশ বছর ধরে একটি রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম গড়ে তুলতে পারলেন না কেন? কারণ তারা ভালো করেই জানে সে শক্তি ও সামর্থ্য তাদের নেই। পরগাছার মতো আরেকজনের সাহায্য ছাড়া তারা বেঁচে থাকতে পারবে না। জনগণ তাদের ডাকে সাড়া দেবে না। তাই নির্বাচন ঘনিয়ে আসার পর তারা একত্রে বিএনপি নামক দলটির কাঁধে সওয়ার হয়েছেন। যে দলে শীর্ষ দু ব্যক্তি উচ্চ আদালত কর্তৃক দুর্নীতির দায়ে সাজাপ্রাপ্ত।
রাজনীতিকে কলুষিত করা দলের সাথে ভিড়ে ড. কামালরা রাজনীতিকেই কি কলুষমুক্ত করবেন ইতিমধ্যে নিজেরাই নিমজ্জিত হয়েছেন ভ্রান্তি, মিথ্যা এবং হটকারী রাজনীতির চোরাবালিতে। চোরাবালিতে তারা ডুবুক কোনো সমস্যা নেই। দেশের মানুষকে সতর্ক থাকতে হবে তারা নিজেরা যেন সেই চোরাবালিতে ডুবে না যায়। (দৈনিক আজাদী থেকে নেয়া)

Email : [email protected]

এই বিভাগের আরো সংবাদ