বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি ক্রান্তিকাল

  অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ২২ মে ২০১৮, ১৩:৩৩

আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী, ২২ মে, এবিনিউজ : হ্যারি ও মেগানের বিয়ে উপলক্ষে লন্ডন শহর এখন উৎসবমুখর। রাজনৈতিক অনৈক্য, ব্রেক্সিটকে কেন্দ্র করে অনৈক্য ভুলে ব্রিটেনের মানুষ একটি বিয়েকে উপলক্ষ করে যে ঐক্যের পরিচয় দেখিয়েছে তা অতুলনীয়। ব্রিটিশ জনগণের এটাই বৈশিষ্ট্য, তারা সংকটেও উৎসবে ঐক্যবদ্ধ হতে জানে। ঢাকাও কিছুদিন আগে উৎসবমুখর হয়ে উঠেছিল বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইট আকাশে উৎক্ষেপণ উপলক্ষে। বাংলাদেশের এটা একটা বড় সাফল্য। তাতে সাধারণ মানুষ উল্লসিত হয়েছে, উৎসব করেছে। কিন্তু দলীয় রাজনীতি এই উৎসবকে জাতীয় ঐক্যে পরিণত হতে দেয়নি।

বিএনপি নেতারা স্যাটেলাইট নিক্ষেপের এই সাফল্যেও আনন্দিত হতে পারেননি। তাঁরা এর মধ্যেও আওয়ামী লীগ সরকারের ত্রুটি ও ব্যর্থতা খুঁজে পেয়েছেন, কোনো কোনো সাফল্য যে দলীয় সরকারের সাফল্য নয়, গোটা দেশের সাফল্য এবং জাতীয় গৌরব এটা বুঝতে বিএনপি নেতারা অপারগ। ফলে ভারতের কাছ থেকে গঙ্গার পানির হিস্যা আদায় অথবা পার্বত্য শান্তিচুক্তি সম্পাদনের মতো বিরাট সাফল্যেও বিএনপি ও তার সমগোত্রীয় দলগুলো আনন্দিত হতে পারে না বা চায় না। তাদের ভয়, তারা বুঝি হেরে যাবে।

পার্বত্য শান্তিচুক্তি দ্বারা অব্যাহত রক্তপাত ও লোকক্ষয় বন্ধ করার জন্য ব্রিটেনের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার শেখ হাসিনাকে শান্তির দূত আখ্যা দিয়েছিলেন। কিন্তু বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া বলেছিলেন, ‘ভারতের কাছে বাংলাদেশের এক-দশমাংশ বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে।’ তারপর দীর্ঘকাল কেটে গেছে। পার্বত্য এলাকায় যেতে বাংলাদেশের মানুষের ভারতের ভিসা লাগে কি না, এই প্রশ্নে বিএনপি নেতারা এখন লা-জবাব। কারণ মিথ্যাবাদীদের স্মরণশক্তি খুব কম।

দেশের রাজনীতির এই অনৈক্য ও বিভক্তি এখনো বজায় আছে। আর তাকে সামনে নিয়েই একটি সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। কিন্তু জাতীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে না। বিএনপি নানা অজুহাতে এই নির্বাচন যাতে তাদের পছন্দের পদ্ধতিতে হয়, সে জন্য গোঁ ধরে আছে। এখন তাদের নতুন দাবি, দুর্নীতির দায়ে কারাদণ্ডে দণ্ডিত খালেদা জিয়াকে মুক্তি দিতে হবে। তারা তাদের নেত্রীকে ছাড়া নির্বাচনে যাবে না। সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ যদি তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলা চলাকালে নির্বাচনে তাঁর দলকে নেতৃত্ব দিতে পারেন এবং নিজে একাধিক আসনে নির্বাচিত হতে পারেন, তাহলে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম রাজনৈতিক দলের নেত্রী তা পারবেন না কেন?

বিএনপি নেতাদের দাবি, দেশের মানুষ বিএনপিকে ভোট দেওয়ার জন্য এক পায়ে খাড়া রয়েছে। নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ভরাডুবি অনিবার্য। তাঁদের এই দাবি যদি সত্য হবে, তাহলে তাঁরা নানা অজুহাত তুলে নির্বাচনে না যাওয়ার কথা বলছেন কেন? ১৯৭০ সালে তো বঙ্গবন্ধু ইয়াহিয়া খানের কড়া এলএফও (লিগ্যাল ফ্রেম অর্ডার) মেনে নির্বাচনে গিয়েছিলেন। অনেকেই তাঁকে ভয় দেখিয়েছিল ইয়াহিয়ার শর্ত ও এলএফও মেনে নির্বাচনে গেলে আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে কারসাজির দ্বারা হারিয়ে দেওয়া হবে। পাকিস্তানের জান্তা সরকারও সেটাই আশা করেছিল।

কিন্তু সে নির্বাচনে বাংলার মানুষ জাগল সামুদ্রিক প্লাবনের মতো। সেই প্লাবনের মুখে সামরিক জান্তার সব কৌশল ব্যর্থ হয়ে গিয়েছিল। আওয়ামী লীগ ইতিহাস সৃষ্টিকারী জয়ের অধিকারী হয়েছিল। বিএনপি এখন তাদের নেত্রী খালেদা জিয়ার মুক্তি দাবি করছে। তিনি দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত হয়ে আদালতের বিচারে দণ্ডিত হয়েছেন। কোনো রাজনৈতিক কারণে জেলে যাননি। তা সত্ত্বেও কি তাঁকে মুক্তি দিতে হবে? ভারতে শীর্ষস্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের অনেকের দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহারের দায়ে আদালতের বিচারে জেলে যেতে হয়েছে। কই, তাঁদের দল তো এগুলো মিথ্যা মামলা—এই রব তুলে রাস্তায় আন্দোলনে নামেনি বা আদালতে গিয়ে তাণ্ডব সৃষ্টি করেনি। আদালতের রায়ের প্রতি সম্মান দেখিয়েছে।

পাকিস্তান আমলে আইয়ুব-মোনেম সরকার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ১৯টি দুর্নীতির মামলায় জড়িয়েছিল। তাঁর দল এই মামলাগুলো সাজানো জেনেও রাস্তায় নেমে হৈচৈ করেনি বা আদালত গৃহে ঢুকে তাণ্ডব সৃষ্টি করেনি। বঙ্গবন্ধু সাহসের সঙ্গে ১৯টি মামলায়ই লড়েছেন এবং আদালতের বিচারে নির্দোষ প্রমাণিত হয়ে কারাগার থেকে বেরিয়ে আসেন। কিন্তু তাঁর বিরুদ্ধে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা ছিল একটি রাজনৈতিক মামলা। উদ্দেশ্যমূলকভাবে এই মামলা তিনিসহ ৩৯ জন সিভিল ও মিলিটারি (বাঙালি) ব্যক্তির বিরুদ্ধে করা হয়েছিল। বাংলার মানুষ এটা বুঝতে পেরে বিদ্রোহী হয়। এই গণবিদ্রোহের মুখে আইয়ুব-মোনেম সরকারকে মামলা তুলে নিয়ে ক্ষমতা ছেড়ে পালাতে হয়। বর্তমানে দুর্নীতির দায়ে খালেদা জিয়ার দণ্ড যদি রাজনৈতিক কারণে হতো এবং দেশের মানুষ তা বিশ্বাস করত, তাহলে বিএনপির আইনজীবীদের আদালতে ঢুকে মারদাঙ্গা করতে হতো না। সাধারণ মানুষই রাস্তায় নেমে প্রতিবাদের ঝড় তুলত। সরকার বাধা দিলেও তা মানত না। কিন্তু খালেদা জিয়ার কারাদণ্ড হওয়ায় গাছের একটি পাতাও নড়েনি। বিএনপির মুষ্টিমেয় নেতাকর্মী রাস্তায় নামার চেষ্টা করেছেন। সাধারণ মানুষকে রাজপথে নামাতে পারেননি।

ফলে খালেদা জিয়ার মুক্তির ব্যাপারে দেশে কোনো আন্দোলন গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়ে বিএনপি নেতারা এখন কোনো কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের মুখাপেক্ষী হয়েছেন, যদি তাদের দ্বারা চাপ সৃষ্টি করে তাঁদের নেত্রীকে জেল থেকে মুক্ত করা যায়। এ ব্যাপারে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের প্রতিনিধিরা ঢাকা সফরকালে সরাসরি অপারগতা প্রকাশ করেছেন। আর কোনো দেশ টুঁ শব্দটি করেননি। পাকিস্তানের একটি দৈনিক লিখেছে, ‘আমরা যেখানে দুর্নীতির দায়ে আদালতের বিচারে দোষী সাব্যস্ত নেওয়াজ শরিফকে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে সরিয়েছি, এমনকি ভবিষ্যতে তাঁর প্রধানমন্ত্রী হওয়া নিষিদ্ধ করেছি, সেখানে বাংলাদেশে দুর্নীতির দায়ে খালেদা জিয়ার কারাদণ্ডের সমালোচনা করি কিভাবে?’ বিএনপির পরম মিত্র পাকিস্তানের একটি সংবাদপত্রের এই হচ্ছে অভিমত।

খালেদা জিয়া তাঁকে কারা মুক্ত করার ব্যাপারে ব্যর্থতার জন্য বিএনপির মওদুদ আহমদসহ জাঁদরেল সব আইনজীবীকে ভর্ত্সনা করেছেন এবং তাঁর কারাদণ্ডের বিরুদ্ধে ‘শান্তিপূর্ণ আন্দোলনও’ গড়ে তুলতে অক্ষমতার জন্য ফখরুল-রিজভী গংকে ধমক দিয়েছেন। এই ধমকের মুখে ওই নেতারা আর কী করেন? তাঁরা নেত্রীকে ‘দেশমাতা’ টাইটেল দিয়ে সান্ত্বনাদানের চেষ্টা করছেন?

‘দেশমাতা’ আসলে তারেকের মাতা। এই অন্ধ সন্তান স্নেহে তিনি প্রকৃত দেশমাতা হতে পারেননি। বরং দেশের মাথায় সিন্দাবাদের দৈত্যের মতো তাঁর ছেলেকে বসিয়ে দিয়েছেন। তাঁর অনুপস্থিতিতে তারেক রহমানকে করেছেন দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান। এই ভুলটি জাতীয় পার্টির নেতা জেনারেল এরশাদও করেননি। তিনি জেলে যাওয়ার পর প্রথমেই তাঁর স্ত্রী রওশন এরশাদ কিংবা ভাই জি এম কাদেরকে দলের নেতৃত্ব দেননি। দিয়েছিলেন আওয়ামী লীগ থেকে জাতীয় পার্টিতে আসা প্রয়াত মিজানুর রহমান চৌধুরীকে। ফলে জাতীয় পার্টি বহু ভাঙনের মুখে টিকে গেছে এবং এখনো রাষ্ট্রক্ষমতায় অংশীদার।

এ ক্ষেত্রে বিএনপি নেত্রীর অদূরদর্শিতা লক্ষণীয়। তিনি জেলে যাওয়ার পর বিদেশে পলাতক পুত্রকে করেছেন দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান। মাতা জেলে, পুত্রও বিদেশে। তিনিও দেশের আদালত কর্তৃক দুর্নীতির দায়ে ১০ বছরের জন্য কারাদণ্ডে দণ্ডিত। প্রায় ১০ বছর তিনি দেশে অনুপস্থিত। এ অবস্থায় তিনি আরেক মহাদেশে বসে দেশে দলকে সঠিক নেতৃত্ব দেবেন কিভাবে? খালেদা জিয়া কি তাঁর অনুপস্থিতিতে দলকে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য দলের ভেতরে একজনও যোগ্য নেতা খুঁজে পাননি? নাকি তিনি কোনো নেতাকেই বিশ্বাস করে সাময়িকভাবেও দলের কর্তৃত্বে বসাতে চাননি।

বিএনপির অস্তিত্বই এখন টলটলায়মান। আমার বিশ্বাস, নির্বাচনে অংশগ্রহণের ব্যাপারে শীর্ষ নেতারা দর-কষাকষিতে ব্যস্ত থাকলেও সাধারণ নেতাকর্মীরা যোগ দিতে উন্মুখ। বর্তমানের দর-কষাকষি সত্ত্বেও দলের অস্তিত্বও দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম দল হিসেবে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখার জন্য বিএনপিকে শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে আসতে হবে। বিদেশের বা স্বদেশের বাকসর্বস্ব একটি সুধীসমাজের মুখাপেক্ষী হয়ে নির্বাচন বর্জন হবে বিএনপির জন্য দ্বিতীয় দফা আত্মঘাতী ভ্রান্তি।

শেখ হাসিনার নেতৃত্বে একটি ছোট ও তদারককারী সরকারের অধীনেই নির্বাচন হবে। তবে নির্বাচনের তারিখ ঘোষিত হওয়ায় সঙ্গে সঙ্গে বর্তমান পার্লামেন্ট ভেঙে দেওয়া হবে সংগত কাজ। নির্বাচনে কারচুপি হওয়ার অভিযোগ যাতে বিএনপির কণ্ঠে শোনা না যায় এবং ‘তাদের জয় ছিনতাই করা হয়েছে’—এই হাস্যকর প্রচার না চলে, সে জন্য দেশি-বিদেশি শক্তিশালী পর্যবেক্ষকদলের সাহায্য গ্রহণ করা উচিত। বলছিলাম জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে নির্বাচন হওয়ার কথা। বাংলাদেশেও তা হওয়া উচিত। এবারের নির্বাচনেও তা হবে বলে মনে হয় না। দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতাকে মেনে নিয়েই আওয়ামী লীগ সরকারকে একটি সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন করতে হবে। এ ধরনের অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন কয়েক দফা অনুষ্ঠিত হলে আশা করা যায়, দেশে গণতান্ত্রিক পন্থায় একদিন রাজনীতি বহুদলীয় থাকলেও জাতীয় স্বার্থের ক্ষেত্রে একটা জাতীয় ঐকমত্য গড়ে উঠবে। (কালের কণ্ঠ)

লন্ডন, রবিবার, ২০ মে ২০১৮

এই বিভাগের আরো সংবাদ