‘পশ্চাতে রেখেছ যারে সে তোমারে পশ্চাতে টানিছে’

  অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ২১ মে ২০১৮, ১৩:৩৯

ড. আতিউর রহমান, ২১ মে, এবিনিউজ : ‘যারে তুমি নিচে ফেল সে তোমারে বাঁধিবে যে নিচে

পশ্চাতে রেখেছ যারে সে তোমারে পশ্চাতে টানিছে।

অজ্ঞানের অন্ধকারে

আড়ালে ঢাকিছ যারে

তোমার মঙ্গল ঢাকি গড়িছে সে ঘোর ব্যবধান।

অপমানে হতে হবে তাহাদের সবার সমান।’

(রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর : ‘দুর্ভাগা দেশ’)

 
সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্য বা এমডিজি ছিল মূলত সামাজিক উন্নয়ন সম্পর্কিত। নয়া সহস্রাব্দের শুরুতে বিশ্বসভা বঞ্চিতজনদের আশার আলো দেখানোর জন্য লক্ষ্যভেদী বেশ কিছু কর্মসূচি চালুর পক্ষে ঐক্যবদ্ধ অবস্থান গ্রহণ করে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ক্ষুধা, দারিদ্র্য সম্পর্কিত এমডিজি অর্জনে বাংলাদেশ ব্যাপক সাফল্য অর্জন করেছে। এসব অর্জনকে পাটাতন হিসেবে নিয়েই বাংলাদেশ টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যগুলো বা এসডিজি অর্জনে বিশ্বসভায় অঙ্গীকারবদ্ধ হয়েছে। এসডিজিতে অর্থনীতি, সমাজ ও ধরণীর পক্ষে একযোগে অঙ্গীকার করা হয়েছে। এক লক্ষ্য আরেক লক্ষ্যের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। এর বাস্তবায়নেও স্থানীয় সমাজ ও অর্থনীতির ভূমিকা প্রবল। সরকার, ব্যক্তি খাত ও এনজিও হাতে হাত রেখে এসডিজি বাস্তবায়নে উদ্যোগী হওয়ার সংকল্প প্রকাশ করেছে। অন্য অনেক দেশ থেকে এসডিজি বাস্তবায়নে বাংলাদেশ অনেকটাই অগ্রগামী। সৌভাগ্যক্রমে বাংলাদেশের সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার প্রথম বছরের সঙ্গে এসডিজি বাস্তবায়নের প্রথম বছর মিলে গেছে। সে কারণে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক উন্নয়ন কৌশল দুটি অভিন্ন মাত্রা পেয়েছে। এরই মধ্যে প্রশাসনের প্রতিটি দপ্তরে এসডিজি বাস্তবায়ন সেল গঠন করা হয়েছে। কেন্দ্রে তো আছেই। মাঠ প্রশাসনকেও সমান্তরালভাবে যুক্ত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। ব্যক্তি খাতকেও অন্তর্ভুক্তিমূলক এই উন্নয়ন কৌশলে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক খাদ্য সংস্থার (ফাও) সহযোগিতায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগ সরকারি কর্মকর্তাদের এসডিজি বাস্তবায়নে উদ্বুদ্ধ করার এক বিশাল প্রশিক্ষণ কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। মূলত ক্ষুধা ও দারিদ্র্য নিরসনের সঙ্গে সম্পৃক্ত লক্ষ্যগুলোর বাস্তবায়নের ওপর জোর দিলেও এই প্রশিক্ষণ কর্মশালায় আমরা এসডিজির পটভূমি ও বৃহৎ ক্যানভাসের কথা তুলে ধরার চেষ্টা করছি।

ম্যাক্রো অর্থনীতির প্রেক্ষাপটে এসব লক্ষ্য পূরণের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থায়ন, ব্যক্তি খাতের অবদান, মাঠ প্রশাসনের ভূমিকাসহ নানা বিষয়েই প্রশিক্ষণার্থীদের সঙ্গে সংলাপ স্থাপনের চেষ্টা করেছি আমরা। ঢাকায় বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগীয় কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাপ শেষ করেই আমরা বিভাগীয় কমিশনারদের উদ্যোগে আয়োজিত প্রশিক্ষণ কর্মশালায় মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বসেছি। এরই মধ্যে সিলেট, রাজশাহী, বরিশাল বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় শেষ করেছি। সর্বত্রই স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সম্পৃক্ত কর্মকর্তাদের বহুমাত্রিক উন্নয়ন ভাবনা নিয়ে যে আগ্রহ লক্ষ করেছি, তা সত্যি উল্লেখ করার মতো। সুযোগ পেলেই তাঁরা যেসব প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন তাও উৎসাহজনক। বিশেষ করে তরুণ সরকারি কর্মকর্তাদের স্বদেশের উন্নয়নের জন্য যে গভীর আগ্রহ ও অঙ্গীকার লক্ষ করেছি তা সত্যি আশাজাগানিয়া। এভাবে যদি মাঠ প্রশাসনকে এসডিজি বাস্তবায়নের বিভিন্ন ধাপে সম্পৃক্ত রাখা যায় তাহলে আমি নিশ্চিত, এমডিজি পূরণের মতো এসডিজি বাস্তবায়নেও বাংলাদেশ বিশ্বসভায় দারুণ প্রশংসিত হবে। আমার সৌভাগ্য হয়েছিল স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এসডিজি প্রণয়নের প্রস্তুতি পর্বে অংশগ্রহণের। বিশেষ করে ‘রিও প্লাস টুয়েন্টি’ ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বারে বারে রবীন্দ্রনাথের কবিতার শুরুতে উল্লিখিত লাইনগুলো উদ্ধৃত করে বলেছি ‘পশ্চাতে রেখেছ যারে সে তোমারে পশ্চাতে টানিছে।’ আমার খুব ভালো লাগে, যখন দেখি এসডিজি প্রণেতারা এই কথাগুলোই তাঁদের টেকসই উন্নয়নের মূল স্লোগানে তুলে এনেছেন। উল্লেখ্য, ‘কাউকে পেছনে ফেলা যাবে না’ স্লোগানসহ এসডিজি প্রণীত হয়েছে।

এই স্লোগানের মর্ম ধরা পড়েছে প্রথম লক্ষ্যেই। তাতে বলা হয়েছে, ‘সর্বত্রই সব ধরনের দারিদ্র্য নিরসন করতে হবে’। এর পরের লক্ষ্যে আছে ক্ষুধা নিবারণ, খাদ্য নিরাপত্তা ও পুষ্টিমান নিশ্চিত করা। টেকসই কৃষির মাধ্যমেই তা করতে হবে। এসডিজির ১৭টি লক্ষ্য আর ১৬৯টি টার্গেট নিয়ে বিচারের সুযোগ এ ছোট্ট নিবন্ধে নেই। তাই প্রথম লক্ষ্যটি নিয়েই খানিকটা আলাপ করা যাক। এই লক্ষ্যে সব ধরনের দারিদ্র্য নিরসনের অঙ্গীকার করা হয়েছে। বাংলাদেশ এ লক্ষ্য পূরণে যথেষ্ট পারদর্শিতা দেখিয়ে চলেছে। কল্পনা করুন সত্তরে দশকের শুরুর যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশের কথা। প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষই গরিব। ৪০ শতাংশেরও বেশি মানুষ অতিদারিদ্র্য। চাল-চুলো কোনোটাই নেই তাদের। অভাব অনটন নিত্যসঙ্গী। গায়ে জামা নেই। পায়ে স্যান্ডেল নেই। গড়ে বাঁচে ৪৮ বছর। কম করে হলেও পাঁচ-ছয়জন সন্তান এক দম্পতির। বেঁচে থাকার এক কঠিন সংগ্রামে লিপ্ত এই মানুষগুলোর বুভুক্ষু চিত্র প্রায়ই তখন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে আসত। সারা বিশ্ব আফ্রিকার কয়েকটি দেশ ও বাংলাদেশকে ক্ষুধার্ত মানুষের আবাসভূমি বলে চিহ্নিত করত। বৈরী প্রাকৃতিক পরিবেশ। ঝড়-বৃষ্টি-বন্যা লেগেই থাকত। খাদ্য সাহায্য ছাড়া চলতই না। তাই দাতারা প্রায়ই নীতি সংস্কারের নামে বাংলাদেশের হাত মুচড়ে দেওয়ার চেষ্টা করত। সেই বাংলাদেশ যেন আজ ফিনিক্স পাখির মতো ডানা ঝাপটা দিয়ে উঠে দাঁড়িয়েছে। তথাকথিত ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ আজ উপচে পড়া এক সম্ভাবনাময় দেশের নাম। আজ বাঙালির গড় আয়ু ৭২ বছর। প্রতি দম্পতির গড়ে সন্তান দুটি। ছেলে-মেয়েরা সবাই স্কুলে যায়। অনেকে স্কুলে টিফিনও পায়। কমিউনিটি হাসপাতাল রয়েছে গ্রামে গ্রামে। দারিদ্র্যের হার প্রতিনিয়তই কমছে। অতিদারিদ্র্যের হারও কমতির দিকেই। বাংলাদেশে কঙ্কালসার বুভুক্ষু মানুষ আজ আর খুঁজে পাওয়াই ভার। ২০০৭ সালেও অতিদারিদ্র্যের হার ছিল ২২.৬ শতাংশ। ২০১৬ সালে তা কমে প্রায় ১২ শতাংশে নেমে এসেছে। ২০৩০ সালে এই হার আমরা ‘শূন্যে’ আনার পরিকল্পনা করছি। আর সে জন্যই আমাদের সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় ‘অতিদারিদ্র্য’ নিরসনের বিষয়টিকেই একেবারে উন্নয়ন কৌশলের কেন্দ্রে নিয়ে আসা হয়েছে। ২০২০-২১ অর্থবছরে এই হার হবে ৯ শতাংশ। এভাবে চললে ২০৩০ সালে প্রায় কার্যত ‘শূন্য’ পর্যায়ে আনা যাবে এই হারকে। তবে উন্নত দেশেও ৩-৪ শতাংশ মানুষ অতিদরিদ্রই থেকে যায়। এই পর্যায়ে এলেই কার্যত শূন্য দারিদ্র্যের হারের দেশ বলা যাবে। তাদের সামাজিক নিরাপত্তা দিয়ে বাঁচিয়ে রাখা হয়। আমাদেরও হয়তো সে রকমটিই করতে হবে। অতিদারিদ্র্যসহ দারিদ্র্য নিরসনের এই সাফল্যের পেছনে সরকার ও দেশি-বিদেশি উন্নয়ন সহযোগী অংশীদারদের হাতে হাত রেখে এগিয়ে চলার বিষয়টি অস্বীকার করার উপায় নেই। বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির ধরনটিও ছিল দারিদ্র্য-সহায়ক। অন্তর্ভুক্তিমূলক। বৈষম্য ততটা না বাড়িয়েই বালাদেশের প্রবৃদ্ধি ঘটেছে। সংখ্যার বিচারে হলেও শিক্ষার প্রসার এ ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রেখেছে। বিশেষ করে নারীর শিক্ষা ও প্রাতিষ্ঠানিক কর্মে যুক্ত হওয়ার কারণে বাংলাদেশের উন্নতি এক নয়া মাত্রা পেয়েছে। রাস্তাঘাট উন্নয়নের পাশাপাশি শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের অবকাঠামো উন্নয়নেও বাংলাদেশ বেশ সাফল্য দেখিয়েছে। আমাদের দেশের অসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকাও ছিল ইতিবাচক। সরকারের সহায়ক ভূমিকার কারণেই তারা একেবারে দূর-দূরান্তের চরে, হাওরে কাজ করার সুযোগ পেয়েছে। সুযোগ পেলেই সরকার ও তারা দারিদ্র্য নিরসনের জন্য জোট বেঁধেছে। ডায়রিয়া থেকে মুক্তির জন্য খাওয়ার স্যালাইন তৈরি শেখানো, শিশুদের রোগবালাই থেকে মুক্ত রাখার জন্য টিকা দেওয়া, প্রাথমিক শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় গরিবদের যুক্ত করা, সুবিধাবঞ্চিতদের আয়-রোজগারের বাড়তি সুযোগ সৃষ্টি করাসহ তারা ঐক্যবদ্ধভাবে সমাজ ও রাষ্ট্র কাজ করেছে বলেই বাংলাদেশের দারিদ্র্য নিরসন এতটা গতি পেয়েছে। বিশেষ করে বিগত এক দশক ধরে অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন কৌশল ও অর্থায়নের যে উদ্যোগ বর্তমান সরকার নিয়েছে তার সুফল আমাদের গরিব মানুষগুলো পেতে শুরু করেছে। ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ গড়ার প্রত্যয়ের কারণে সাধারণ মানুষ প্রযুক্তির সুফল হিসেবে অর্থায়নসহ নানামুখী প্রশাসনিক সেবা ভোগ করছে।

এসবের সুদূরপ্রসারী প্রভাব তাদের জীবনমানের ওপর পড়তে শুরু করেছে। আগেই বলেছি, তাদের গড় আয়ু বেড়েছে। তাদের সন্তানরা এখন বেশি বেশি লেখাপড়ার সুযোগ পাচ্ছে। মায়েরাও ভাতা পাচ্ছেন। মোবাইল ব্যাংকিংয়ের কল্যাণে শহর থেকে প্রতিদিন হাজার কোটি টাকা গ্রামে যাচ্ছে। গ্রামের অর্থনীতি তাই আরো চাঙ্গা হচ্ছে। গ্রাম থেকে মেয়েরা শহরে এসে গার্মেন্ট ও অন্যান্য শিল্প ইউনিটে কাজ পাচ্ছে। অনেক তরুণ বিদেশে গিয়ে নিয়মিত ডলার পাঠিয়ে গ্রামেগঞ্জে ছোটখাটো ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটাচ্ছে। গ্রামে পুকুর কেটে মাছের চাষ করছেন অনেকেই। সবজির চাষে বিপ্লব ঘটেছে। ফুলের বাণিজ্যিক চাষ হচ্ছে। গ্রাম আর শহরের মাঝে সংযোগ দ্রুতই বাড়ছে। আর বাড়ছে গ্রামীণ উদ্যোক্তার সংখ্যা কাজকর্মের সুযোগ। সব মিলিয়ে গ্রামের গরিব মানুষ এখন দুবেলা দুমুঠো খেয়ে-পরে ভালোই আছে।

তবে শহরের অতিদারিদ্র্য সমস্যা এখনো বেশ প্রকট। শহরের বস্তিতে তাদের থাকতে হয়। বিদ্যুৎ, পানি, স্যানিটেশনের সমস্যা তাদের স্বাস্থ্যের জন্য হুমকি সৃষ্টি করছে। শহরের গরিবদের জন্য গ্রামের মতো বয়স্ক ভাতা ও বিধবা ভাতা তথা সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিগুলো সক্রিয় নয়। তাই শহরের অতিদরিদ্র মানুষ নিয়ে নীতিনির্ধারকদের দুর্ভাবনা থেকেই যাচ্ছে। শহরের দারিদ্র্যদের একটা বড় অংশ নদীভাঙন, জলবায়ু পরিবর্তনের মতো প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের শিকার। তাই গ্রামীণ উেস পর্যাপ্ত সমর্থন দিয়ে তাদের দারিদ্র্য বিমোচন  না করা গেলে শহরের চৌহদ্দিতে তা করা বেশ কষ্টসাধ্যই বটে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার জন্য তাই অধিক কর্মসংস্থান তৈরির কৌশলে সরকারকে সদাই সক্রিয় থাকতে হবে। সঙ্গে নিতে হবে ব্যক্তি খাতের উদ্যোক্তাদের। কর্মসংস্থানমুখী শিল্পায়নের পাশাপাশি বেশি বেশি খুদে ও মাঝারি উদ্যোক্তা সৃষ্টির কৌশল গ্রহণেও নীতিনির্ধারকদের উদ্যোগী হতে হবে। সে জন্য সরকারি খরচকে আরো বিচক্ষণ ও লক্ষ্যভেদী হতে হবে। সামাজিক পিরামিডের নিচের অংশের মানুষগুলোকে দক্ষ ও উদ্যোগী করে তোলা গেলেই বাংলাদেশ সার্বিকভাবে এগিয়ে যাবেই। সে জন্য গরিবের হাতে বেশি করে অর্থ যায় এমন আর্থিক নীতি কৌশল আরো জোরদার করতে হবে। তাদের সন্তানদের লেখাপড়া ও প্রশিক্ষণে বেশি করে যুক্ত করে একদিকে কর্মোপযোগী জনশক্তি তৈরি করে যেতে হবে, অন্যদিকে তাদের মধ্য থেকে আরো বেশিসংখ্যক খুদে উদ্যোক্তা তৈরির কাজটি চালু রাখতে হবে। বেশি বেশি নারী উদ্যোক্তা তৈরির উদ্যোগ নিতে হবে। তাদের জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থায়নের কৌশলটিও সদা সচল রাখতে হবে।

আজকের দিনে প্রযুক্তিনির্ভর নয়া উদ্যোগ নেওয়ার জন্য তরুণরা উদ্গ্রীব হয়ে আছে। তাদের জন্য উপযুক্ত উদ্ভাবনের প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়েই চালু করতে হবে। সবাই কাজ খুঁজলে কাজ কে দেবে? উদ্যোক্তারাই শুধু কাজ দিতে পারেন। তাই শিক্ষালয়েই খুদে উদ্যোক্তা তৈরির প্রক্রিয়া জোরদার করতে হবে।

আমরা একটি গবেষণায় দেখেছি যে মাত্র ৫০০ ডলার (৪৫ হাজার টাকা) দিয়েই একটি অতিদরিদ্র পরিবারকে দারিদ্র্যমুক্ত করা সম্ভব। দুই কোটি অতিদরিদ্র মানুষের পরিবারের সংখ্যা বড়জোর ৫০ লাখ। প্রতিটি পরিবারকে এই পরিমাণ অর্থ দিতে প্রয়োজন হবে মাত্র আড়াই বিলিয়ন ডলার। এই পরিমাণ অর্থ কি জোগাড় করা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়? সে জন্য চাই উপযুক্ত বাস্তবায়ন কাঠামো। সরকার একা এ কাজটি করতে পারবে না। সামাজিক দায়বদ্ধ ব্যক্তি খাত, এনজিও এবং সরকার একযোগে কাজ করলে এদের সহজেই দারিদ্র্যমুক্ত করা সম্ভব। আর দারিদ্র্য থেকে এদের মুক্ত করা মানেই তারা আরো বেশি অর্থ খরচ করবে। অভ্যন্তরীণ বাজার আরো বড় হবে। ব্যক্তি খাতের জন্য তা ইতিবাচক সুফল বয়ে আনবে।

বাংলাদেশ এ ক্ষেত্রে এরই মধ্যে যথেষ্ট সাফল্য দেখিয়েছে। সারা বিশ্ব অবাক বিস্ময়ে বাংলাদেশের অতিদারিদ্র্য নিরসনের লড়াই থেকে শিক্ষা নিচ্ছে। আমাদের কয়েকটি সফল উন্নয়ন সংগঠন আফগানিস্তান ও আফ্রিকার অনেক দেশে দারিদ্র্য নিরসনের কাজে ব্যস্ত রয়েছে। আমাদের সেনাবাহিনী ও পুলিশের শান্তিকর্মীরাও অভ্যন্তরীণ যুদ্ধে বিধ্বস্ত অনেক দেশে শান্তি রক্ষার পাশাপাশি আর্থ-সামাজিক পুনর্গঠনের কাজে নিয়োজিত রয়েছে। এসব দেশের গরিব মানুষের কাছে তারা আশার আলো ছড়াচ্ছে। আমরা কাউকে পেছনে ফেলে সামনে যাব না—এই সংকল্প মাথায় নিয়ে নিবিষ্ট মনে এগিয়ে গেলেই এসডিজির প্রথম লক্ষ্য অনায়াসেই অর্জন করতে পারব বলে আমার বিশ্বাস। তবে সে জন্য নীতিনির্ধারক, সামাজিক সংগঠনের নেতারা এবং ব্যক্তি খাতকে সমানভাবে সক্রিয় ও অঙ্গীকারবদ্ধ থাকতে হবে। একই সঙ্গে তরুণ উদ্যোক্তাদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণ ও অর্থায়ন দিয়ে এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে উৎসাহী করে যেতে হবে। (কালের কণ্ঠ থেকে নেয়া)

লেখক : অর্থনীতিবিদ, অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও সাবেক গভর্নর, বাংলাদেশ ব্যাংক
[email protected]

এই বিভাগের আরো সংবাদ