বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবস

  অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ০৩ এপ্রিল ২০১৮, ১৬:৫৫

২ এপ্রিল বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবস। ২০০৮ সালে প্রথমবারের মতো এ দিবস পালন শুরু হয় জাতিসংঘের উদ্যোগে। জাতিসংঘের সকল সদস্যভুক্ত রাষ্ট্র এ দিবসটি বিশেষভাবে উদযাপন করে আসছে। উদ্দেশ্য সকল জনগণের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি করা যাতে করে সকল অটিজম আক্রান্তদের জীবনমান উন্নত হয় যা তাদের নাগরিক অধিকার। পরিবার, সমাজ তথা রাষ্ট্রের দায়িত্ব তাদের উন্নয়নে সচেতন হওয়া। আমাদের দেশও জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্র। যদিও এখন পর্যন্ত ১৬ কোটি মানুষের এদেশে সত্যিকারভাবে কতজন প্রতিবন্ধী এবং কতজন অটিজম আক্রান্ত তার কোন পরিসংখ্যান নেই, বিশ্ব ব্যাংকের এক সমীক্ষা অনুযায়ী প্রায় ১৫% মানুষ কোন না কোন প্রতিবন্ধীতায় আক্রান্ত। এদের এক বিশেষ অংশ অটিজম আক্রান্ত। যদিও সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছেন প্রতিবন্ধীদের কল্যাণে। এরপরও প্রতিবন্ধীরা তাদের অধিকার বাস্তবায়নে অনেক পিছিয়ে আছে সামগ্রিকভাবে। এদের মধ্যে অটিজম আক্রান্ত নারী এবং বালিকারাও অন্তর্ভুক্ত। তারা পিছিয়ে আছে শিক্ষা, প্রশিক্ষণ এবং মৌলিক অধিকার থেকে। বঞ্চিত যেমন মৌলিক অধিকার থেকে তেমনি বিভিন্ন পর্যায়ে নানারকম নির্যাতন ও অত্যাচারের শিকার হচ্ছে প্রতিনিয়ত। প্রতিবন্ধী পুরুষদের চেয়ে নারী/বালিকারা বৈষম্যের শিকার বেশি। পরিবারে ও সমাজে যেমন নিগৃহীত তেমনি শারীরিক ও বিভিন্ন যৌন নির্যাতনেরও শিকার হয় বেশী নারী/বালিকারাই। পরিবারে তাদের কোন মূল্য নেই, তাদেরকে মনে করা হয় পরিবারের বোঝা। তাই তারা শিক্ষা–দীক্ষা থেকে বঞ্চিত, স্বাধীন–স্বনির্ভর হওয়া থেকে বঞ্চিত এবং বিভিন্ন নির্যাতনের শিকার হয় সহজেই। শিকার হয় মানসিক, শারীরিক এবং যৌন নির্যাতনের। পরিবারেও তারা নিরাপদ নয়– নিকটাত্মীয় দ্বারাও তারা বিভিন্ন শারীরিক এবং যৌন নির্যাতনের শিকার হয়। এসব ক্ষেত্রে তারা কোন সঠিক বিচারও পায় না। সমাজে প্রতিবন্ধী নারী/বালিকাদের মতো অটিজম আক্রান্তরাও নির্যাতনের পর হত্যার শিকার হয়। যদিও আমাদের দেশে আইন আছে কিন্তু আইনের সঠিক প্রয়োগ নেই।অনেক ক্ষেত্রে আইনের দুর্বলতার কারণেও নারী/বালিকারা সঠিক বিচার পায় না। আইনের প্রয়োগ না থাকার কারণে আইনী অধিকার থেকে এরা বঞ্চিত। বাংলাদেশ প্রতিবন্ধী ব্যক্তির মানবাধিকার সংশ্লিষ্ট জাতিসংঘের সিআরপিডি –এ অনুস্বাক্ষরিত দেশ। তারিখ–৯ মে ২০০৭ এবং ৩০ নভেম্বর ২০০৭ এ অনুস্বাক্ষরের পূর্বে বাংলাদেশে প্রতিবন্ধী সংশ্লিষ্ট একমাত্র আইন ছিলো ‘Bangladesh Persons with Disabilities Welfare Act, 2001’ –যাতে অটিজম সংশ্লিষ্ট কোন নীতিমালা ছিলো না। পরবর্তীতে সামাজিক, মানবাধিকার কর্মী, বিশেষ প্রতিবন্ধী ব্যক্তি এবং প্রতিবন্ধী উন্নয়ন সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থার উদ্যোগের কারণে নতুন আইন ”প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন ২০১৩” বাংলাদেশে গৃহীত হয়, এটাও পুরোপুরি অটিজম বান্ধব নয়। এরপর ‘নিউরো– ডেভেলপমেন্টাল প্রতিবন্ধী সুরক্ষা আইন ২০১৫’ অটিজম এবং অন্যান্য নিউরো–ডেভেলপমেন্টাল সুরক্ষা আইন প্রণয়ন হয়। নীতিমালা প্রণীত হচ্ছে– এনডিডি (Neuro Development Disabilities) সম্পর্কিত বিশেষ/সমন্বিত শিক্ষা নীতিমালা–২০১৮। বিগত দেড় দশকে আমূল পরিবর্তন হয়েছে অটিজম এবং নিউরো ডেভেলপমেন্টাল প্রতিবন্ধীদের মানবিক অধিকার বাস্তবায়নে। ২০১১ সালে অটিজম এবং নিউরো ডেভেলপমেন্টাল ডিসঅর্ডার এর উপর আন্তর্জাতিক সম্মেলনের মাধ্যমে এ বিষয়ে নতুন মাত্রা যোগ হয় এবং সকল স্তরে সচেতনতা বৃদ্ধি পায়। বাংলাদেশ সরকার ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগের কারণে সকল ক্ষেত্রে অটিজম আক্রান্তদের জীবনমান উন্নয়নের পথ প্রসারিত হচ্ছে। বিভিন্ন পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, আমাদের দেশে ০.১৫৫% অটিজম আক্রান্ত, যা প্রায় ২৫২০০০জন। প্রতিবন্ধী নারী/বালিকার অন্যতম সমস্যা আর্থিক এবং নিরাপত্তা। নারী হওয়ার কারণে তারা বিভাজিত কম সুবিধাভোগী পুরুষ প্রতিবন্ধীদের তুলনায়। সারাবিশ্বের পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২.৮ মিলিয়ন কোন না কোন ভাবে অটিজম এবং অন্যান্য নিউরো ডেভেলপমেন্টাল প্রতিবন্ধকতায় আক্রান্ত, আর এর মধ্যে এক বিশাল অংশ নারী/বালিকা। সামাজিক প্রেক্ষাপটে সকল ভেদাভেদের ঊর্ধ্বে উঠে নারী/ বালিকা ও পুরুষ/বালকের মতো সে যে হোক না কেন স্বাভাবিক/প্রতিবন্ধী– সকলের সমাধিকার প্রতিষ্ঠিত হোক এ প্রত্যাশা সকলের। আসুন, সবাই এগিয়ে আসি সম্মিলিতভাবে আইনের সঠিক বাস্তবায়ন ও প্রয়োগের মাধ্যমে। কেউ যেন অবহেলা বা অত্যাচারের শিকার না হয় কোন স্তরে, বঞ্চিত না হয় মৌলিক অধিকার থেকে। সফল হোক বিশ্ব অটিজম সতেনতা দিবস। তাই আজকে প্রয়োজন সকল নারী এবং বালিকা যারা অটিজম আক্রান্ত বা প্রতিবন্ধী একতাবদ্ধ হয়ে তৃণমূল থেকে শহর তথা সমগ্র দেশের সবাই একসাথে নিজেদের অধিকারের কথা বলা এবং বাস্তবায়ন করা। সরকার, স্থানীয় প্রশাসন, সাধারণ জনগণ, বেসরকারি সংস্থা, সংশ্লিষ্ট সরকারি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান তথা সমাজকে সচেতন করা। যাতে করে একটি সমন্বিত নারী এবং প্রতিবন্ধী বান্ধব সমাজ প্রতিষ্ঠা হয়। সকল প্রতিবন্ধী এবং অটিজম আক্রান্ত নারী ও বালিকাদের কোন লিঙ্গের ভেদাভেদ না রেখে সমভাবে সকল সুযোগ দেয়া শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও পুনর্বাসনে। বাংলাদেশ সরকার প্রতিবন্ধী বান্ধব সরকার। অনেক উদ্যোগ নিয়েছে এবং অনেক সুযোগ সৃষ্টি করেছে প্রতিবন্ধী ও অটিজম আক্রান্তদের জীবনমান উন্নয়নে এবং সমাজের মূলস্রোতধারায় একীভূত করার লক্ষ্যে। সকল কুসংস্কারের ঊর্ধ্বে উঠে এগিয়ে আসতে হবে নারী/বালিকাদের উন্নয়নে। সকলের নিরাপত্তা ও সমঅধিকার নিশ্চিত করতে হবে পরিবারে, সমাজে, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, চাকরি ও পুনর্বাসনের ক্ষেত্রে, তবেই এবারের আন্তর্জাতিক অটিজম সচেতনতা দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয় সার্থকতা পাবে। উল্লেখ্য, এবারের স্লোগান ‘নারী ও বালিকাদের ক্ষমতায়ন হোক না সে অটিজম বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন ’।

এই বিভাগের আরো সংবাদ