আজকের শিরোনাম :

পানশিরে মেঘ দেখার সাধ কি পূরণ হবে

  খান মাহবুব

১৩ সেপ্টেম্বর ২০২১, ২০:৩৬ | অনলাইন সংস্করণ

আফগানিস্তানে তালেবানদের ক্ষমতায় আরোহণে গোটা বিশ্বের আন্তর্জাতিক রাজনীতি তপ্ত লোহার মতো গরম হয়ে উঠেছে। নানা পক্ষ এই পটপরিবর্তনে নিজেদের স্বার্থের অঙ্ক কষছে এবং স্বার্থরক্ষার নতুন ছক আঁকছে। আফগান জনগণের ভাগ্য পোড়ার মধ্যেও কেউ কেউ আলু পোড়া দিয়ে খাওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে। এটাই রাজনীতি, এটাই কূটনীতি। দালান ওঠা যেমন রাজনীতি, দালান ভাঙাও রাজনীতির বাইরে কিছু নয়।

ভারতের কিংবদন্তি অভিনেতা নাসিরুদ্দিন শাহ সম্প্রতি বলেছেন- ‘তালেবানের ক্ষমতায় আসা নিয়ে গোটা বিশ্ব চিন্তায়। এ দেশে ভারতীয় মুসলমানদের একাংশের উৎসব করাও কম চিন্তা নয়। এই হচ্ছে প্রেক্ষাপট।’ ইউটিউবে নিজে শুনেছি আমাদের বাংলাদেশের ওয়াজ মাহফিলে বলতে ‘আবার কীসের ভয়, তালেবান তো আফগান জয় করে নিয়েছে।’ দক্ষিণ এশিয়ার একটি দেশে ইসলামি শরিয়া আইনের ধুয়া তুলে তালেবান দখল করেছে এই বিষয়টা শুধু আফগানিস্তানের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয় বরং প্রতিবেশী দেশের ভূরাজনীতির মানচিত্রে বড় বাঁক পরিবর্তন এনেছে।


 
যদি তালেবানদের তা-ব থামানো না যায় তা হলে তাদের স্বপ্নের বুননে যোগ হতে পারে প্রতিবেশী মধ্য এশিয়ার সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের অংশ ও আরব জাহান থেকে বঙ্গোপসাগর অবধি। আইএস-এর (ইসলামি স্টেট) সঙ্গে তাদের যোগসূত্র একাট্টা হলে অবশ্যই শুধু এশিয়া নয়, বিশ্বরাজনীতির জন্য মন্দ খবর অপেক্ষমাণ।

বিগত শতকের নব্বইয়ের দশকে আফগান থেকে সোভিয়েত সৈন্যের পশ্চাদপসরণের পর আফগান সীমান্তঘেঁষা পাকিস্তানি মাদ্রাসায় তালেবানদের অঙ্কুর। মূলত পশতুনভাষীদের প্রাধান্যে জন্ম নেওয়া তালেবান এখন শুধু পশতুনদের জাতীয়তাবাদী আন্দোলন নয়, পুরো আফগানের বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীকে একত্র করে আফগান মুসলিমদের নবজাগরণের চেষ্টা চালাচ্ছে। গত ১৫ আগস্ট কাবুল জয় করে তালেবান সবচেয়ে বড় শিক্ষা নিচ্ছে ১৯৯৬ সালে বুরহানউদ্দিন রাব্বানীর সরকার উৎখাত করে তালেবান নিয়ন্ত্রণ নিলেও পরে টিকতে না পারার কারণগুলো। তাই তালেবানদের মনে যাই থাকুক দীর্ঘমেয়াদি টিকে থাকার নতুন কৌশল নিয়ে প্রথমেই সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেছে। তালেবানদের অধিকাংশ জাতিগত পশতুন ও কট্টর সুন্নি ওয়াহাবি ভাবধারার একটি গোষ্ঠী হলেও গত কয়েক বছর ধরে তারা অন্য জাতিগোষ্ঠীকে কাছে টানার চেষ্টা করছে। তাদের সুদূর পরিকল্পনার অংশ সম্পর্কে ইসলামাবাদের সিনিয়র সাংবাদিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক জাহিদ হোসেন বলেন- ‘শুধু সাধারণ যোদ্ধাই নয়, তালেবানের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের প্রায় এক-চতুর্থাংশই তাজিক, উজবেক, তুর্কমেন ও হাজরা সম্প্রদায়ের।’

ইতিপূর্বে ক্ষমতা নিয়ে ২০০১ সালের ৭ অক্টোবর মার্কিন জোটের হামলায় তালেবানরা শাসন ক্ষমতা থেকে সরে গেলেও আফগানিস্তানের সামাজিক অর্থনীতিতে তালেবান তৃণমূল পর্যায়ে শক্তি ও গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে থাকে। তালেবান যখন ক্ষমতায় ছিল তখন নারীদের চলাফেরার অধিকার, শিক্ষাগ্রহণের অধিকারহরণসহ আফগানদের মৌলিক মানবাধিকার হরণ করে তারা সমালোচনায় ছিল। কিন্তু শাসনব্যবস্থায় তালেবানদের দুর্নীতি দমন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি, ব্যবসা-বাণিজ্যের সম্প্রসারণ ঘটিয়ে আফগান নাগরিক জীবনে কিছুটা গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছিল। তবে শরিয়া আইনের কঠোরতা, গানবাজনা, টিভি নিষিদ্ধ ইত্যাদি নাগরিক জীবনে বিরূপ প্রভাব ফেলেছিল। ২০০১ সালে তালেবান আফগান মধ্যাঞ্চলে বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ বামিয়ান বুদ্ধের মূর্তি ধ্বংস করে বিশ্ববাসীর ধিক্কার অর্জন করে। সেই সময় আফগান তালেবান সরকারকে পাকিস্তান, সৌদ আরব ও আরব আমিরাত- এই তিনটি রাষ্ট্র স্বীকৃতি দিয়েছিল এবং ২০০১ সালে আমেরিকার হামলার পর সৌদি আরব ও আরব আমিরাত তালেবানের ওপর সমর্থন প্রত্যাহার করে নেয়।

বর্তমান আফগানিস্তানে তালেবানের উত্থানের পরিপ্রেক্ষিত ভিন্ন। প্রায় ৮০ হাজার নিয়মিত যোদ্ধার তালেবান বাহিনী আমেরিকার সৈন্য প্রত্যাহারপর্বে ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে কাতারের রাজধানী দোহায় যুক্তরাষ্ট্র-তালেবানের মধ্যে অনাক্রমণ চুক্তি হয়। কিন্তু তালেবান কৌশল করে মার্কিন সৈন্যদের ওপর সরাসরি হামলা না চালালেও মার্কিন সমর্থনপুষ্ট আফগান নিরাপত্তা বাহিনী ও তালেবানের টার্গেট বেসামরিক মানুষের মাঝে হামলা চালিয়ে মনোবল ভেঙে দিয়েছিল। সে কারণেই ৩ লাখ আফগান সৈন্য থাকা সত্ত্বেও তালেবানরা অল্প কয়েক দিনে একের পর এক আফগানিস্তানের প্রদেশগুলো দখল করে নেয় এবং বিনাযুদ্ধে কাবুল জয় করে। মিডিয়ায় দেখা গেছে, অনেক আফগান সৈন্য যুদ্ধ না করেই অস্ত্র ও রসদ তালেবানদের হাতে তুলে দিয়েছে।

আফগানিস্তানের নবপরিপ্রেক্ষিতে বিশ্বমোড়লরা এখন তালেবানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা না করে অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে মোলায়েম সুরে তালেবানকে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে রাষ্ট্র পরিচালনার হেদায়েত করছে। ইতোমধ্যে আফগানিস্তানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বোর্ডের একজন ঊর্ধ্বতন সদস্য বলেছেন, যেন আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কাছে তালেবান নেতৃত্বাধীন সরকারকে যেন তারা দেশটির জন্য সঠিক তহবিলের ব্যবহারের অনুমতি দেয়। তা না হলে আফগানিস্তান অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের ঝুঁকিতে পড়বে। জো বাইডেন বলেছেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকে আফগান সরকারের যে পরিমাণ সম্পদ গচ্ছিত আছে তা তালেবানকে ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হবে না, মূলত আমেরিকা সময় নিয়ে অবস্থা পর্যবেক্ষণ করছে। গত ২০ বছরে আফগান যুদ্ধে দুই ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি ব্যয় করেছে তারা। এই যুদ্ধের ফল নিয়ে আমেরিকার জনগণ রাষ্ট্রযন্ত্রের ওপর রুষ্ট। সম্প্রতি রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিন বলেছেন, আফগানিস্তানে আমেরিকার যুদ্ধের ফল শূন্য। এই বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে আমেরিকার তালেবানদের ওপর রণহুঙ্কার সঙ্কুচিত। আফগানিস্তানে আমেরিকার পরাজয় এবং বিশৃঙ্খল পশ্চাদপসরণ তাদের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতাকে মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। এই সুযোগে রাশিয়া বলে দিয়েছে, তারা তালেবানদের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক রক্ষা করে চলবে। চীন বলছে, আফগানিস্তানকে তাদের বিধিসম্মত স্বার্থরক্ষা করা উচিত। এদিকে তালেবানরা বিদেশি শক্তি আফগান মাটি থেকে না যাওয়া পর্যন্ত সরকার গঠন করবে না জানিয়ে দিয়েছে। আফগান জাতীয়তাবাদী ঐক্যের দাওয়াই খাওয়াতে চাচ্ছে জনগণকে। মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে কাতার ও তুরস্ক বর্তমানে তালেবানদের সঙ্গে বহির্বিশ্বের যোগসূত্রের মধ্যস্থতাকারী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। কাতার ও তুরস্ক চাচ্ছে সৌদি আরব, মিসর ও আমিরাতকে পেছনে ফেলে আফগান ইস্যুতে বিশ্বরাজনীতির সামনের কাতারে দাঁড়াতে। সত্যিই রাজনীতিতে শেষ কথা বলে কিছু নেই, তাই আজ কমিউনিস্ট চীন ও সুন্নি তালেবানের অপূর্ব মিলনদৃশ্য বিশ্বরাজনীতির রঙ্গমঞ্চে প্রদর্শিত হচ্ছে।

তালেবান জানে দীর্ঘমেয়াদি টিকে থাকতে অর্থ ও শক্তির প্রয়োজন, এজন্য আফিম চাষ থেকে শুরু করে যারপরনাই কাজ তারা করেছে। ধর্মীয় লেবাসে তাদের কর্ম ও বিশ্বাস যাই থাক বর্তমানে টিকে থাকতে তাদের আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ ও ত্রাণ দরকার, এজন্য বিশ্বমোড়লদের সঙ্গে লৌকিক সখ্য হয়তো তালেবান গড়বে কিন্তু উপযুক্ত পরিবেশ পেলে ‘ইসলামিক আমিরাত অব আফগানিস্তান’ গঠনে এক পা পিছু হটবে না তারা। তালেবানের সরকার কাঠামোও ভিন্ন। তারা জানিয়েছে সরকার তাদের সুপ্রিম লিডার হাইবাতুল্লাহ আখুন্দজাদার পরামর্শে চলবে।

বেড়ে ওঠার বয়সে শুনেছি আফগান কমান্ডার গুলবুদ্দিন হেকমতিয়ার, আহমাদ শাহ মাসুদের নাম। ভেবেছিলাম আহমাদ শাহ মাসুদের ছেলে হয়তো পানশির উপত্যকার নর্দার্ন অ্যালায়েন্সের মাধ্যমে তালেবানবিরোধী নবশক্তির উত্থান ঘটাতে পারবে কিন্তু সে আশায়ও গুড়েবালি। রক্ষা পেল না বাংলা সাহিত্যের অমর সৃষ্টি সৈয়দ মুজতবা আলীর আফগান কাহিনিনির্ভর গল্পের নায়ক আবদুর রহমানের পানশির উপত্যকা। আমি আফগানিস্তানে গিয়ে জাফরান, আখরোট, বাদামের সঙ্গে হেরাত থেকে মেয়েদের জন্য আধুনিক পোশাক কিনেছি কয়েক বছর আগেও। দেখেছি দেহ আবৃত হলেও অনাবৃত মুখম-লের আফগান রমণীদের অপরূপ শ্রীমহিমা। বড় ইচ্ছে ছিল মুজতবা আলীর দেশ-বিদেশের বর্ণনার সেই পানশির গিয়ে পূর্ণিমার রাতে তুলোর মতো মেঘের গলে পড়া দেখব। তালেবানদের আফগানে কি পানশিরে বরফের তুলোর মতো মেঘ দেখা যাবে?

খান মাহবুব : প্রাবন্ধিক ও খ-কালীন শিক্ষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

এই বিভাগের আরো সংবাদ