অকপট এক নেতা

  সুভাষ সিংহ রায়

২৮ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১৮:২৬ | অনলাইন সংস্করণ

শেখ হাসিনা আজ সারাবিশ্বের বিস্ময়, বাংলাদেশের অহংকার। শেখ হাসিনা জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর কন্যা। জননেত্রী, দেশরত্ন নানা বিশেষণে তাঁকে ভূষিত করা হয়। পুরোনো দিনের মানুষরা একান্ত নিজের মতো করে বলেন—‘শেখের বেটি’। মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে জনপ্রিয় পত্রিকা ‘খালিজ টাইমস্’ ২০১৭ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর সংখ্যায় এক বিশেষ প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে— ‘শেখ হাসিনা : নিউ স্টার অফ্ দ্য ইস্ট’।

বাংলাদেশের বিদগ্ধজনেরা যারা তাঁর রাজনীতির সাথে যুক্ত নন, তাঁরাও ব্যক্তিগতভাবে শেখ হাসিনাকে পছন্দ করেন। বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের পর কেউ কি কখনো ভাবতে পেরেছিল যে, বাংলাদেশ এই আত্মমর্যাদার জায়গায় দাঁড়াতে পারবে? বাংলাদেশে এখন অতি দরিদ্রের সংখ্যা ১১ শতাংশ এবং শেখ হাসিনার নেতৃত্বের কারণেই তা সম্ভব হয়েছে। কবি নির্মলেন্দু গুণ বলেছিলেন, শেখ হাসিনা যখনই বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সিঁড়িতে পা রেখেছিলেন তখনই বুঝে নিয়েছিলেন—‘দুর্গম গিরি কান্তার মরু পথ’। তাঁর পথে পথে পাথর ছড়ানো ছিল। শুধু পাথর নয়; এক পর্যায়ে দেখা গেলো ‘পথে পথে গ্রেনেড ছড়ানো’। শেখ হাসিনা জেনে গিয়েছিলেন, চলার পথে অনেক বাঁক থাকে, চোরাস্রোত থাকে, অনির্দিষ্ট আর অলক্ষ্য অনেক উপাদান জড়িয়ে থাকে ইতিহাসের অনির্ধারিত গতিপথে। তিনি হোঁচট খেয়েছেন, কিন্তু মুখ থুবড়ে পড়েননি। কোনো কোনো ক্ষেত্রে হয়তো আগের সিদ্ধান্ত পরে নিয়েছেন; আবার অনেক পরের সিদ্ধান্ত আগে নিয়ে ফেলেছেন। বিকল্প পথের চিন্তা তিনি সবসময় করে রাখেন এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ঝুঁকিও নিয়েছেন।

শেখ হাসিনা বোধহয় একমাত্র নেতা যিনি জীবনবোধের কথা বলতে গিয়ে অকপটে নিজেকে মেলে ধরেছেন। কোনো বাঁধাধরা তত্ত্বে নিজেকে তিনি আটকে রাখেননি। গোপালগঞ্জে ২০ মে (১৯৮১) তারিখে শেখ হাসিনার গণসংবর্ধনার আয়োজন করা হয়েছিল। সেই সংবর্ধনা সভায় শেখ হাসিনা বলেছিলেন, ‘... আমি সামান্য মেয়ে। সক্রিয় রাজনীতির দূরে থেকে আমি ঘর-সংসার করছিলাম। আপনাদের ডাকে সবকিছু ছেড়ে এসেছি। বাংলার দুঃখী মানুষের সেবায় আমি আমার এ জীবন দান করতে চাই।...’ [দৈনিক ইত্তেফাক, ২১ মে ১৯৮১]।

আজ শেখ হাসিনার ৭২তম জন্মদিন। সুখে থাকবার, স্বাচ্ছন্দ্য উপভোগ করার আকর্ষণ মানুষের জন্য খুবই স্বাভাবিক। সাধারণের জন্য এটাই কাঙ্ক্ষিত জীবন যাপন। ত্যাগের কথা শাস্ত্রে আছে, মনীষীদের জীবনগ্রন্থে আছে, চলমান জীবনাচরণে থাকাটা অস্বাভাবিক। শেখ হাসিনার চরম শত্রুও বলবেন শেখ হাসিনা এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। একজন বিদেশি লেখক আমাকে জানিয়েছিলেন, ‘বিকল্পেরও বিকল্প আছে ; কিন্তু শেখ হাসিনার কোনো বিকল্প নেই।’

একজন বিশিষ্টজন একবার শেখ হাসিনার জন্মদিনের লেখায় বলেছিলেন, শেখ হাসিনা বোধহয় খুব ভালো করে আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের চিলেকোঠার সিপাই এবং খোয়াবনামা উপন্যাস পড়েছেন, খুব ভালো করে শওকত ওসমানের বনী আদম এবং জননী উপন্যাস পড়েছেন এবং পড়েছেন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের দুর্ভিক্ষবিষয়ক গল্প। পড়তে পড়তে ভেবেছেন মানুষ, গ্রামবাংলার হতদরিদ্র মানুষ কীভাবে ভাতের জন্যে লড়াই করে, সুযোগ পেলেই ভাতের লড়াইকে ভোটের লড়াইয়ের দিকে নিয়ে আসে। তারা লড়াকু মানুষ, অজেয় মানুষ, অমর মানুষ, এই মানুষজনের কাছে শেখ হাসিনার দায়ভাগ আছে। এই দায়ভাগই শেখ হাসিনার রাজনীতি কিংবা তাঁর নিয়তি।

শেখ হাসিনা ১৯৮১ সালে ১৭ মে দেশে প্রত্যাবর্তন করেন। কুর্মিটোলা বিমান বন্দরে সেদিন জনসমুদ্রে শেখ হাসিনা বলেছিলেন, ‘সবকিছু হারিয়ে আমি আপনাদের মাঝে ফিরে এসেছি। বাংলার মানুষের পাশে থেকে মুক্তি সংগ্রামে অংশ নেওয়ার জন্য আমি এসেছি। আমি আওয়ামী লীগের নেত্রী হওয়ার জন্য আসিনি। আপনাদের বোন হিসেবে মেয়ে হিসেবে বঙ্গবন্ধুর আদর্শে বিশ্বাসী আওয়ামী লীগের একজন কর্মী হিসেবে আমি আপনাদের সাথে থাকতে চাই।’

এর মাত্র পাঁচ দিন আগে ১১ মে তারিখে বিশ্বখ্যাত ‘নিউজউইক’ পত্রিকা বক্স আইটেম হিসেবে শেখ হাসিনার সাক্ষাত্কার প্রকাশ করে। শেখ হাসিনা যখন দেশে ফেরেন তখন সময়টা খুব খারাপ ছিল। বলতে গেলে যে কোনো সময় একটা বড় দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে, খুনিরা যেন সব জায়গায় ওত পেতে আছে। শেখ হাসিনা স্পষ্ট করে বলেছিলেন, তিনি নিহত হওয়ার আশঙ্কায় শঙ্কিত নন; এমনকি যে সরকারের মোকাবিলা করবেন তার শক্তিকে তিনি বাধা বলে গণ্য করবেন না। জীবনে ঝুঁকি নিতেই হয়। মৃত্যুকে ভয় করলে জীবন মহত্ত্ব থেকে বঞ্চিত হয়।

শেখ হাসিনা ভনিতা করেন না। যা কিছু বলেন সোজা-সাপটা বলেন। শেখ হাসিনা বাংলার মানুষকে ভালোবাসেন পিতা শেখ মুজিবের মতো করে। শেখ হাসিনা এখন বিশ্ব নেতৃত্বেও সম্মান পেয়েছেন। যেখানে বাধা পেয়েছেন, সেখান থেকে তিনি সাফল্যের পথ সৃষ্টি করেছেন। ‘পদ্মা সেতু সাফল্য’ তত্ত্ব আমাদের সব সময় মনে করিয়ে দেবে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনাকে। শেখ হাসিনা বাঙালির স্বাধীনতা ও জাতীয়তাবাদের এখন শব্দব্রহ্ম। লোকায়ত বাংলার ইহজাগতিকতার বীজমন্ত্র। শেখ হাসিনার এই জন্মদিনে মনে পড়ে প্রয়াত কবি ত্রিদিব দস্তিদারের কবিতার লাইন, আপনিইতো বাংলাদেশ।

শেখ হাসিনার শতায়ু প্রার্থনা হোক বাংলার ঘরে ঘরে।

লেখক : সাবেক ছাত্রনেতা ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

এই বিভাগের আরো সংবাদ