নির্বাচন ও মানুষের জান কোনটা বেশি জরুরি?

  অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ১৮ মে ২০১৮, ০৯:৩৫

অজয় দাশগুপ্ত, ১৮ মে, এবিনিউজ : খুলনা সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচন ও ফলাফল নিয়ে মিডিয়ার উত্তেজনা ছিলো মানুষের চেয়ে বেশী। মানুষ দেখছে কি হচ্ছে আর মানুষ জানে কি হতে যাচ্ছে। এখন দেশের যে বাস্তবতা তাতে চাইলেই কোন প্রার্থী বিজয়ী হয়ে বেরিয়ে আসবেন এটা প্রার্থী নিজেও বিশ্বাস করেন না। বিএনপি স্মরণকালের সবচেয়ে বড় বিপদসীমার নীচে। তাদের কপাল খারাপ এবং এটা ছিল তাদের প্রাপ্য । আমি বুকে হাত দিয়ে বলতে পারি দেশের সাথে বেঈমানী বঙ্গবন্ধুর রক্তের সাথে বেঈমানী এবং মুক্তিযুদ্ধের সাথে গাদ্দারীর ফল ভোগ করছে তারা। যারা স্বপ্নেও ভাবেননি তারা চোখে দেখছেন খালেদা জিয়া কারাগারে। এই কারাবাস সম্মানের কিছু নয়। আর একটা কথা, কেবল রাজনৈতিক একমুখিতায় কোন বিশিষ্ট বা দেশবরেণ্য কোন নেতাকে সেভাবে জেলে রাখা যায়না। আসলে দেশের মানুষের মনে রাজনৈতিক নেতাদের এমন কি শীর্ষ নেতাদের বেলায়ও যে কতটা ভক্তি আর শ্রদ্ধা আছে এটা তার বড় প্রমাণ। খালেদা জিয়ার নীরব সমর্থক কত জানিনা তাঁর ধানের শীষে জোয়ার নামলেও অবাক হবো না। তবে এটা প্রমাণ করে মাঠে নামার মানুষ নাই। মাঠে মানুষ আসলে কারো জন্যেই নামবে না।

কারণ রাজনীতি তার পথ হারিয়েছে। না হারালেও রাজনীতিবিদ আর মিডিয়া তাকে পথভ্রষ্ট করছে। দেশের মানুষকে একবারের জন্যও এলার্ট করছেনা মিডিয়া। কারো মাথা ব্যথা নাই, মানুষ মারা গেলো অকালে প্রাণ ঝরালো। কত কারণে যে মন খারাপ হয় আমাদের। ভালো বিষয়গুলো ঢাকা পড়ে যায়। উঠে আসে শুনতে না চাওয়া জানতে না চাওয়া অপবিত্র মন বিষিয়ে দেয়ার মত খবর। চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায় ইফতার সামগ্রী নিতে যাওয়া নারীদের পদদলিত মৃত্যুর খবরটি মূলত হত্যাকাণ্ড। এটি কোন স্বাভাবিক ঘটনা না। এর ভেতর যে বার্তা সেটি আমরা আগেও পেয়েছিলাম । চট্টগ্রাম শহরের প্রাণকেন্দ্রে ঘটে যাওয়া পদদলিত পুরুষদের মৃত্যুর সময় আমি নিজেই ছিলাম সে শহরে। অবাক হয়ে দেখেছি কত দ্রুত মানুষ ভুলে যায়। আগে মাসাধিক এমনকি বছরব্যাপী মাতম করতো। পরে তা নেমে এলো কয়েকদিনে। এখন দেখি কয়েকঘন্টার ভেতর ই ভুলে যায় মানুষ। এটা তাদের দোষ নয়। সমাজ সংসার দেশ ও মিডিয়া এখন এগুলো নিয়ে মাথা ঘামায় না।

আমি যখন চট্টগ্রামে তখন সেখানে এমন আরও একটি হৃদয়বিদারক ঘটনার জন্ম হয়েছিল। সেটা ছিলো শখের দাওয়াত বা সৌজন্যের আমন্ত্রণ। কয়েকবারের মেয়র আওয়ামী লীগের অন্যতম নেতা এ বি এম মহিউদ্দীন চৌধুরীর মৃত্যুর পর তাঁর পরিবার বা দলের আয়োজনে যে কাঙালি ভোজ অথবা খাবারের আয়োজন সেখানে পদপিষ্ট হয়ে মরেছিলেন বেশ কিছু মানুষ। এরা সবাই দু একটি বিশেষ ধর্মের ছিলেন এই কারণে সে আয়োজনে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের জন্য ছিলো আলাদা ব্যবস্থা। হিন্দুরাই মূলত সেই মৃত্যুর শিকার হয়েছিলেন। দেখেছি এবং জেনেছি এরা কেউই হতদরিদ্র বা হাভাতে ছিলেননা। ভাতের অভাবে যাননি সেখানে। যেকারনেই যাক না কেন ফিরেছিলেন লাশ হয়ে। আজকাল তেমন আহাজারি বা ক্রন্দন ও নাই দেশে। ঘনবসতি জনসংখ্যার চাপে মানুষের মৌলিক আবেদন বা মানবিক দিকগুলো চাপা পড়ে আছে প্রায়। দু একদিন হৈ চৈ বা শোকের প্রলাপ তারপর সব আবার আগের মতো। সে কাহিনীর পেছনে কেউ রাজনৈতিক ইন্ধন খুঁজলেও পরে বোঝা গেছিল তার মূল কারণ অব্যবস্থাপনা আর মানুষের নিয়ম না মানার উগ্র প্রতিযোগিতা। কিন্তু মুশকিল হলো না আছে সুষ্ঠু তদন্ত না সুষ্ঠু বিচার। জানিনা সে বিচার আদৌ হয়েছে বা হবে কি না। হলে হয়তো এই যে নতুন ঘটনা তার জেরে আরও কিছু প্রাণ ঝরে পড়তোনা।

আজ যখন এ লেখা লিখছি সকালে বাংলাদেশের মিডিয়া বিশেষত টিভি চ্যানেলগুলো খুলে দেখি খুলনার নির্বাচনই মূল খবর। শুধু খবর না এটাই মুখ্য বিষয়। মানি এর গুরুত্ব আছে। কিন্তু খুলনা শহরের নির্বাচন তো দেশের সাধারণ নির্বাচন না। এটি সেখানকার সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচন। তাতেই মশগুল আমাদের দেশ ও সমাজ। এর কারণ হয়তো এখন আর নির্বাচন হয়না। হলেও তাতে কোন উত্তেজনা বা রহস্য থাকেনা। ফলাফলও জেনে যাওয়া যায় আগেভাগে। ফলে মানুষ নির্বাচন নিয়ে আনন্দ উত্তেজনা হারিয়েছে আগেই। সে কারণে কি না জানিনা দলীয় প্রতীকে এই নির্বাচনে মানুষের অংশগ্রহণ যাই হোক মিডিয়া বলছে শান্তিপূর্ণভাবেই চলছে এই নির্বাচন। ফলাফল কি হবে তার বিচারক ভোটার ও সময়। কিন্তু মানতেই হবে এসব খবরের পেছনে পড়ে থাকা খবরগুলো আমাদের সমাজকে নিয়ে যাচ্ছে অন্ধকারের অতল গহ্বরে।

এসব নির্বাচন আসলে তেমন কোন অর্থ বহন করে না। এই নির্বাচনে বিএনপি জিতলেই বা কি? কে নিশ্চয়তা দেবে যে বিজয়ী মেয়র কদিন পর মামলায় পড়ে পদ হারাবে না? কে জানে কোনদিন সকালে উঠে শুনতে হবে নির্বাচনের বিরুদ্ধে এমন এক অভিযোগ পাওয়া গেছে যে পুরো বিষয়টাই বাতিল। আবার অন্যদিকে আওয়ামী লীগ জিতলে সুখের নহরধারা বয়ে যাবে? কিংবা সেখানে শান্তি আসবে কোনো ধরনের ঝামেলা বা অশান্তি হবেনা? এসব প্রশ্নের উত্তর আমাদের জানা। তবু মিডিয়া জুড়ে আজ নির্বাচন। ওদিকে? শুধু কি সাতকানিয়ায় মৃত্যু? তারাতো অবলা নারী। সাধারণ মানবী। ইফতার সামগ্রী বা যাকাত আনতে গিয়ে প্রমাণ করেছেন এতদিনের উন্নয়ন বেলুন এখনো ফাঁপা। তারচেয়েও মারাত্মক একটি ঘটনা আজ কোথাও পাত্তাই পায়নি।

মাদ্রাসার একজন টিচার আবু হানিফ। তাঁর কি দোষ কি অপরাধ জানি না। সামাজিক মিডিয়ায় দেখলাম তাঁর মাথায় মল ঢেলে তাঁকে অপমান করা হচ্ছে। অসহ্য সেই দৃশ্য। খুব বেশীদিন হয়নি মাস্টার শ্যামলকান্তি কে কান ধরে দাঁড় করিয়ে রেখেছিল ওসমান পরিবার। তখন আমরা কান ধরে সে অপমানের প্রতিবাদ করেছিলাম। হানিফ সাহেবও মাস্টার। মাদ্রাসার বলে কি তাঁর ব্যাপারে দেশের সুশীল বা সাধারণ মানুষের কিছু করার নাই? এই অপমানতো জাতির বিবেকের অপমান। এর একটা যোগ্য উত্তর বা প্রতিবাদ না হলে সমাজের মাথায় ঢালা মল বন্ধ করবে কে?

হায় ডিজিটাল সমাজ এ নিয়ে কারো চিন্তায় কারো মগজে কিছু আসে না। উল্টো মাথায় মল নিয়ে সমাজ মিডিয়া দেশ ছুটছে নির্বাচনের দিকে। বাপরে বাপ রাজনীতির কি শক্তি কি ক্যারিশমা।

লেখক : কবি, প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক
(সংগৃহীত)

এই বিভাগের আরো সংবাদ