পদ্মার ভয়াবহ ভাঙন : চরম বিপন্ন রাজবাড়ী

  দেবাহুতি চক্রবর্তী

০১ আগস্ট ২০২১, ১৭:৪১ | অনলাইন সংস্করণ

গোদার বাজার ভাঙন কবলিত এলাকা। ছবি: সংগৃহীত
একই শিরোনামে ২০০৮ সনে -"ভোরের কাগজ "-- দৈনিক পত্রিকায় আমার একটা লেখা বেরিয়েছিল। একযুগ পেরিয়ে দুটো শব্দ নতুন সংযোজন করেছি --ভয়াবহ আর চরম। 

পদ্মা নদীর সাথে আবহমান কালের বাংলার ইতিহাস -ভূগোল -অর্থনীতি -সমাজনীতি -রাজনীতি জড়িত। বাংলা শিল্প -সাহিত্য -সংস্কৃতিতে এই পদ্মা বিশেষ স্থান জুড়ে আছে। রাজবাড়ী জেলারও অবিচ্ছিন্ন সত্তা এই পদ্মা।  প্রমত্তা পদ্মা ক্রমশ  নানাভাবে তার গভীরতা হারিয়েছে।  সম্ভবত ফারাক্কা বাঁধ তার অন্যতম  কারণ।  বাংলাদেশ স্বাধীনের পরেও গোয়ালন্দ -আরিচা ছিল ঢাকা যাওয়ার নৌ-পথ। কয়েক বছরের মধ্যে সেই পথের দূরত্ব কমে দৌলতদিয়া -পাটুরিয়া ঘাট চালু হয়। আশি দশকের প্রথম থেকেই পদ্মার স্বাভাবিক প্রবাহ ঠিক রাখার জন্য ড্রেজিং জোরদার করার বিষয়ে কথা শোনা যায়।  প্রয়োজন অনুযায়ী কতটা হয়েছে বা হয়নি আমার জানা নেই।রাজবাড়ী জেলা পদ্মার ভাঙনের দৃশ্যমান শিকার হয়েছে সেও অনেকদিন আগে থেকেই।রাজবাড়ীর নাগরিক সমাজ এবং পদ্মা নদী ভাঙন প্রতিরোধ কমিটির মিলিত উদ্যোগে  ২১মার্চ,২০০৮ একটি বড়সড় আকারের মতবিনিময় সভা রাজবাড়ীতে অনুষ্ঠিত হয়। ঐ সভায়  স্থানীয়দের সাথে জাতীয় পর্যায়ের অনেক নেতা, সাংবাদিক, নদীবিশেষজ্ঞরা উপস্থিত ছিলেন। প্রাক্তন তথ্য ও পানি সম্পদ মন্ত্রী মিজানুর রহমান শেলী, ভোরের কাগজের সম্পাদক শ্যামল দত্ত, দৈনিক ইত্তেফাকের নির্বাহী সম্পাদক হাসান শাহরিয়ার, বিশিষ্ট সিনিয়র সাংবাদিক আমিনুর রহমান, মো রওশনউজ্জামান এমন অনেকেই সেদিন উপস্থিত থেকে মতামত দেন যে, রাজবাড়ী জেলাকে পদ্মার ভাঙন থেকে রক্ষা করতে গেলে সুপরিকল্পিত ভাবে দ্রুত কাজ সম্পন্ন করতে হবে। এই আলোচনার সময় তথ্য হিসেবে শোনা গিয়েছিল পাংশা উপজেলার হাবাসপুর বাঁধ এলাকা থেকে নদী ৩২৬ মিটার, আর রাজবাড়ী শহরের গোদারবাজার বাঁধ এলাকা থেকে নদী ৫৫০ মিটার দূরে রয়েছে। 

রাজবাড়ী চিরকালই বন্যা প্রবণ আর নদী ভাঙন কবলিত এলাকা।  ১৯৮৭-৮৮'র ভয়াবহ বন্যা পরবর্তীতে ফরিদপুর -বরিশাল এফ সি ডি প্রকল্প রাজবাড়ী ইউনিটের আওতায় ৪৫ কি মি বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ প্রথম তৈরি হয়। নদী বিশেষজ্ঞদের মতে ২০০৪ থেকে নদীর গতিপথ ও মারফোলজ্যিকাল পরিবর্তনের ফলে ভাঙনের তীব্রতা বাড়ে। ২০০৭ সালে ৯২৫ মিটার নদীতীর সম্পূর্ণভাবে নদীগর্ভে বিলীন হয়। হাজার হাজার পরিবার ভূমিহীন হয় এবং সরকারি বেসরকারি বহু অবকাঠামো  নদীগ্রাসে হারিয়ে যায়। মানুষের কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে রাজবাড়ী। সেইসময় রাজবাড়ীর সর্বস্তরের নাগরিক সমাজ অনেক বেশি উদ্বিগ্ন এবং বিষয়টি সুরাহায় কর্তৃপক্ষের ওপর চাপ সৃষ্টিতে যথেষ্ট তৎপর ছিল। ফলে সেই মতবিনিময় সভায় এই সমস্যাটিকে জাতীয় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিতকরণ ,  পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রস্তাবনার বিপরীতে জাতীয় বাজেটে সুনির্দিষ্ট অর্থ সংযোজন, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে পরিকল্পনা সুনির্ণয়, এবং অপরিকল্পিত বালি উত্তোলন বন্ধে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া'র ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। 

এই গুরুত্বগুলো ক্রমেই কমে আসতে থাকে। বছর বছর ভাঙন বাড়ে। নদী যত কাছে আসছে প্রত্যক্ষ ভুক্তভোগীরা ছাড়া ততই যেন বৃহৎ জনসাধারণ ও নাগরিক সমাজের নিস্পৃহতা বাড়ছে।  অপরিকল্পিত বালু ব্যবসা, অগণিত বালুর চাতাল, বালু বাহী বার্জ এর আনাগোনা, আর নানাবিধ মাসোহারা -উৎকোচ -উপহারের মাঝ দিয়ে কিছু কিছু ব্যক্তি, সরকারি -বেসরকারি  কর্তাব্যক্তি -কর্মচারী ও রাজনৈতিক  নেতা - পাতিনেতার  অবিশ্বাস্য  উত্থান হয়েছে মর্মে লোকমুখে শোনা যায়। 

২০১৬ তে এই অঞ্চলের ভাঙন ঠেকানোর জন্য নদী শাসনের নকশা  অনুযায়ী পানি উন্নয়ন বোর্ড কাজ শুরু করে। খুলনা শিপইয়ার্ড প্রতিষ্ঠান এই কাজে ঠিকাদারি পান মর্মে জানা যায়।  প্রথমে ৭৬ কোটি টাকার এবং ২০১৮ থেকে ৩৭৬ কোটি টাকার কাজ চলতি বছরের ৩১ মে শেষ হয় বলে স্থানীয় ও জাতীয় বিভিন্ন প্রচার মাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে। চলতি জুলাই মাসের মধ্যভাগ থেকেই এলাকায় এলাকায় ভাঙনের সৃষ্টি হয়। ২৭ জুলাই থেকে তা মারাত্মক আকার ধারণ করে। শহর রক্ষা বাঁধ সংলগ্ন ৩০০ মি এলাকা নদীগর্ভে চলে গেছে। মিজানপুর, বরাট বিভিন্ন এলাকায় ভাঙন তীব্র হয়ে উঠছে।  ভাঙনের স্থায়ী সংরক্ষণের নামে যে কাজগুলো এতদিন ধরে হয়েছে তা চোখের সামনে ধ্বসে যাচ্ছে। একের পর এক সিসি ব্লকের সারি মুহূর্তের মাঝে নদীর আগ্রাসনের শিকার হচ্ছে। পাড়ের মানুষদের নানা ধরণের বক্তব্য আর অভিযোগ রয়েছে এই সদ্য সমাপ্ত প্রকল্পের কাজ নিয়ে। অভিযোগ রয়েছে নিয়মিত অপরিকল্পিত বালু ব্যবসা নিয়ে। এসব অভিযোগ আমলে নেওয়ার মত কে কোথায় আছে জানা নেই। পানি উন্নয়ন বোর্ড হাজার হাজার বালুর বস্তা নদীতে ফেলে ভাঙন ঠেকানোর জন্য খুব তৎপরতা দেখাচ্ছে। সাময়িক হয়তো কিছু সুফল পাওয়া যেতে পারে।  পানি উন্নয়ন বোর্ড এর জনৈক নির্বাহী প্রকৌশলী প্রকল্প কাজে কোনো গাফলতি বা ত্রুটির কথা অস্বীকার করেন। ঘটনাস্থলে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তিনি বলতে চান যে ২০১৬ সালে যে ডিজাইন করা হয় সেই ডিজাইন অনুযায়ী ২০২১ অবধি কাজ হয়েছে। ইতিমধ্যে  নদীর গতিপথ পরিবর্তন বা জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে নদীর উচ্চতা বেড়ে যাওয়ায় সমস্যা হতে পারে। আরও বালুর বস্তা ফেলা হচ্ছে, হবে এবং তার জন্য টাকা অনুমোদন ও প্রাপ্তির জন্য তাদের চেষ্টা চলছে। আমাদের প্রশাসন ও বিভিন্ন  নেতৃবর্গ বিষয়টি নিয়ে সরকারের উচ্চ পর্যায়ে যোগাযোগ রাখছেন বলেও বিভিন্ন খবরে প্রকাশ হচ্ছে।

অতঃপর  এই পর্যায়ে  আবার আশ্বস্ত হওয়া সাধারণের দায়িত্বে পড়ে। নদীশাসন কঠিন কাজ। তারপর সে নদী যদি পদ্মা হয়। কিন্তু এই পদ্মা নদীকে বাগে এনেই পদ্মা ব্রিজ প্রায় সম্পন্ন হতে চলেছে।  দেশের নদী গবেষণা ইন্সটিটিউট রাজবাড়ীর নিকটতম ফরিদপুরে অবস্থিত। বিশাল আর মনোরম অবকাঠামো নিয়ে  প্রতিষ্ঠানটি দায়িত্ব পালন করছে। প্রতিষ্ঠান টি পানি উন্নয়ন বোর্ডের অধীনস্থ নেই বছর ত্রিশ হলো। স্বশাসিত প্রতিষ্ঠান। কিন্তু দেশে নদীর নাব্যতা, গতিপ্রকৃতি, তীর সংরক্ষণ ইত্যাদি কাজে নিয়মিত গবেষণা লব্ধ ফলাফল কী শুধু  ফাইলবন্দী করে  মন্ত্রণালয়ে প্রেরণের  জন্য? নাকি পাউবি কে মতামত দিয়ে সময়ে সময়ে সহযোগিতা করা তাদের দায়িত্ব?  পাউবি ও কী পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে তাদের পরামর্শ চেয়েছে?  নদীপাড়ের সাধারণ মানুষ যারা নদীর সাথে লড়াই করে বেঁচে থাকে তাদের বাস্তব অভিজ্ঞতাও কম নয়।  কখনও কি সেসব অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগানো হয়েছে?  পানি উন্নয়ন বোর্ড সেক্ষেত্রে  সরেজমিনে কাজ চলার সময় নদীর পরিবর্তিত গতি প্রকৃতির ওপর কোন লক্ষ না রেখেই বিশাল অংকের টাকা শুধুই কী স্রোতে ভাসিয়েছে? আমাদের দেশের  ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব শুধুই কী ডিজাইন অনুযায়ী কাজ সম্পন্ন দেখিয়ে বিল তুলে নেওয়া? টেণ্ডারের শর্ত অনুযায়ীও  পাউবি নক্সা পরিবর্তন করতে পারে। কিন্তু পারল না কেন?  এই এত কেন'র  উত্তর পাওয়া কঠিন। নদী পাড়ের মানুষদের বা সাধারণ জনগণের বিশ্বাস শত শত কোটি টাকার কাজ গুণগত মানেও সঠিক হয়নি। এবং যে অংকের টাকা বরাদ্দ ছিল তার খরচও সঠিক ভাবে হয়নি। ড্রেজিং এর বিষয়ে মানুষ নিয়তই প্রশ্ন তুলেছে।খরার সময় বাদ দিয়ে বর্ষা ঋতুতেই রাস্তাঘাট, নদীনালার কাজ বেশি হওয়াটা আমাদের দেশের রীতি বটে। যেহেতু বাজেট বরাদ্দ হয় জুন মাসে। 

কথা তারপরেও থেকে যায়। নদী ভাঙন থেকে রাজবাড়ীকে বাঁচানোর প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব যাদেরই থাকুক, তা তদারকির দায়িত্ব জেলার সংসদ সদস্যগণ সহ জনপ্রতিনিধিরা এড়িয়ে যেতে পারেন কি?  যে  অ-বিজ্ঞানসম্মত বালু ব্যবসা নদী ভাঙনের অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে তা নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব কার? নদী ভাঙন প্রতিরোধে এই বড় অংকের বরাদ্দকৃত টাকার বিনিময়ে রাজবাড়ী কী পেল বা পেতে যাচ্ছে তা দেখভালের দায়িত্ব জেলা প্রশাসনের কী নেই?  নদীর বাৎসরিক ভাঙনের স্বরূপ নির্ণয় এবং সঠিকভাবে তদারকি থাকলে দায়সারা কাজ সেরে ঠিকাদার বিল বুঝে নেওয়ার জন্য উৎসাহী হতে পারে না। আমাদের দুর্ভাগ্য, এই দেশের দুর্ভাগ্য এমনতর নমুনাই সর্বক্ষেত্রে। এসব অনেক প্রশ্নের উত্তর হয়তো আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় আবদ্ধ। যা থেকে বেরোনো কঠিন। 

আসলে, এই ভাঙন এখন যেভাবে বালুর বস্তা দিয়ে ঠেকানোর চেষ্টা চলছে এর কার্যকারিতা সাময়িক। কিন্তু সার্বিক ভাবে রাজবাড়ী জেলার মানুষের দুর্ভোগ  কতদিনের আর কতদূর অবধি তা কেউ জানে না। ২০০৮ সালে শহর রক্ষা বাঁধ থেকে নদীর দূরত্ব ছিল ৫৫০ মিটার। এখন শুধু ৫০ মিটারের অনেক কম সেই দূরত্ব। আজ --

"ফাটলের ভেতর থেকে ভয়াবহ জলের গর্জন শোনা যাচ্ছে। --ক্রুদ্ধ, উন্মত্ত এবং ক্ষুধার্ত জল মাটি খাওয়ার জন্য মাটির দিক এগিয়ে আসছে। ভয়ে মাটি কাঁপছে, মাটি কাঁদছে "-- আর সেই ভয়ার্ত মাটির পাশে  সত্যিই আজ বিপন্ন রাজবাড়ী। 

লেখক : আবোল-তাবোল শিশু সংগঠনের সভাপতি।

এই বিভাগের আরো সংবাদ