পোশাক শিল্পে নারী শ্রমিক : নবজাগরণের সূচনা যাদের হাতে

  ফেরদৌস আরা রীনু

১২ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১২:২৮ | অনলাইন সংস্করণ

আমাদের জনসংখ্যার অধিকাংশ নারী হলেও উন্নয়নের সব সূচকে নারীর অংশ গ্রহণ সমান নয়। কিন্তু পোশাক শিল্প কারখানায় ইতিবাচক এবং নেতিবাচক সব কিছুর বিরুদ্ধে লড়াই করে নারীরা আজ এই খাতকে শুধু বাঁচিয়ে রাখেনি উত্তরোত্তর সমৃদ্ধির দিকে নিয়ে যাচ্ছে। তারাই আমাদের পোশাক শিল্পের চালিকা শক্তি হয়ে কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিকে শিল্পভিত্তিক অর্থনীতিতে রূপান্তরিত করেছে। শিল্পায়নের মাধ্যমেই অর্থনীতির অপরাপর খাত, উপখাতের বিকাশে সুযোগ সৃষ্টি হয়। ফলে দেশের অগ্রগতি তরান্বিত হয়। দরিদ্র পরিবারের অনেক মেয়েই আগে বাড়ি বাড়ি ঝিয়ের কাজ করতো কিংবা দারিদ্র্য মেনে নিয়ে স্বামী বা বাবার আয়ের ওপর নির্ভর করে মানবেতর জীবন–যাপন করতো। কিন্তু পোশাক শিল্প কারখানাগুলো নারীকে কাজের সুযোগ করে দিয়েছে। ফলে গ্রামীণ অর্থনীতিতে একটি ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। গ্রাম থেকে এসে যে সব নারী পোশাক শিল্পে কাজ করে তারা প্রতিমাসে গ্রামের বাড়িতে টাকা পাঠায়। তাদের এই টাকার উপরে পারিবারিক একটা নির্ভরশীলতা তৈরি হয়। গ্রামের এই সহজ সরল লাজুক মেয়েদের আয়ে হয়ত ভাই বোনের লেখা–পড়ার খরচ চলে। কিংবা তার বেতনের টাকা দিয়েই পরিবারের কেউ ছোট–খাট একটা ব্যবসা করে দারিদ্র্য ঘুচাতে সক্ষম হয়। এইভাবেই গ্রামীণ অর্থনীতিতে একটা ইতিবাচক প্রভাব রাখছে পোশাক শিল্পের নারী। অর্থনীতিতে নারীর অবদান নারীকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্র তৈরি করেছে এবং তার স্বাধীনতা বাড়িয়ে দিয়েছে। হয়েছে নারীর ক্ষমতায়ন শ্রমজীবী নারীদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন পরিবারে তাদের অবস্থানের পরিবর্তন সাধন করেছেন। আর্থিক সক্ষমতা অর্জনের কারণে এইসব নারী শ্রমিকদের সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি পেয়েছে। চাকরির সুবিধা ভোগকারি বাবা, ভাই এবং স্বামীর ঐতিহ্যগত পিতৃতান্ত্রিক কর্তৃত্বের ক্ষেত্রে পরিবর্তন সাধন করেছে। গ্রামীণ নারীর সিদ্ধান্ত গ্রহণের কোনো স্বাধীনতা নেই। কিন্তু যে সব মেয়ে বা মহিলা শহরে এসে পোশাক শিল্পে কাজ করছে তারা নিজের জীবনের ক্ষেত্রে অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত সে নিজে নিচ্ছে। তাছাড়া পারিবারিক ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণেও ভূমিকা রাখছে তারা। সমাজে বাল্য বিবাহের সংখ্যা কমেছে। সেই সাথে জন্মহারও হ্রাস পেয়েছে। শ্রমজীবী নারীরা ভাই–বোন কিংবা ছেলে–মেয়েদের স্কুলে পাঠাচ্ছে। ফলে শিক্ষার হার বাড়ছে। অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বিতা অর্জনের ফলেই সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে নারীর এই স্বাধীনতা এসেছে এবং তা সম্ভব করেছে পোশাক শিল্প প্রতিষ্ঠান। কেননা দেশের রপ্তানি আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস তৈরি পোশাক শিল্পে অধিকাংশ শ্রমিক নারী নিয়োগ করার মাধ্যমে তাদের স্বাবলম্বী হওয়ার পথ সৃষ্টি করে দিচ্ছে। জানা যায় বর্তমানে বাংলাদেশের পোশাক শিল্প কারখানাগুলোতে ৪৫ লাখের মত শ্রমিক নিয়োজিত আছে যার মধ্যে প্রায় ৭০ ভাগই নারী শ্রমিক। তারা তাদের জীবনযাত্রায় লক্ষণীয় পরিবর্তন সাধন করেছে এবং তারা দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। যে নারী ছিল সমাজে অবহেলিত এবং যারা এতদিন কৃষি, কুটির শিল্প, গৃহকর্মী হিসেবে নিয়োজিত থেকে পুরুষ শ্রমিকের সমান এবং ক্ষেত্র বিশেষে বেশি শ্রম দিয়েও কম মজুরীতে সন্তুষ্ট থাকতে হতো। কিংবা অনেক ক্ষেত্রে বিনা মজুরিতে কেবল মাত্র খাবারের বিনিময়ে দিনব্যাপী কাজ করতে হতো সেই অবহেলিত নারীদের সনাতন নিম্ন উৎপাদনশীল ক্ষেত্র থেকে তুলনামূলক উচ্চ উৎপাদনশীল পোশাক শিল্পে নিয়ে এসেছে। খুব কাছ থেকে দেখা একজন পড়ালেখা না জানা পোশাক শিল্পের নারী শ্রমিকের জীবন–যাপন দেখে জানতে পারি তিনি তার পরিবারকে পথে নামা থেকে বাঁচিয়েছেন। ছোট্ট বেতনের এই চাকরিটিই তার পাঁচ জনের পরিবারের পেটে ভাত জুগিয়েছেন। সন্তানদের মুখে হাসি ফুটিয়েছেন। তিনি তার এই চাকরির মাধ্যমে ছেলে–মেয়ের পড়ার খরচ চালান এবং বড় মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন। এমন কি নিজে সিদ্ধান্ত নিয়ে বড় মেয়েকে অপারেটরের কাজ জুটিয়ে দিয়েছেন। এই রকম আরও অদেখা অজস্র সাহসী নারী কাজ কাছে বাংলাদেশের পোশাক শিল্পে।

শুরুতে মেয়েদের পোশাক শিল্পে কাজ করাটা আমাদের সমাজে সুনজরে দেখা হয়নি এবং পরিবার তথা সমাজে নানা বিপত্তির সম্মুখীন হতে হয়েছে। কিন্তু পরিস্থিতি পাল্টেছে এবং পরিবারে তাদের মতামতকে এখন গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা হয়। পরিবর্তন এসেছে শ্রমিকদের শিক্ষা ক্ষেত্রেও। পোশাক শিল্পে যোগ দিয়েই তারা শিক্ষার মর্যাদা বুঝতে পেরেছে। দেশের প্রাথমিক শিক্ষার হার বৃদ্ধি পেয়েছে মেয়েরা পোশাক শিল্পে যোগদানের কারণে। নিজে ১০ থেকে ১২ ঘন্টা পরিশ্রম করেও ছেলে–মেয়েকে স্কুলে পাঠাচ্ছে তারা। পোশাক শিল্পের আশে–পাশে প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে তাদের ব্যাপক উপস্থিতিই তার প্রমাণ।

পোশাক শিল্প বাংলাদেশের অর্থনীতি বা সমাজ জীবনে যে পরিবর্তন এনেছে তা কোনোবভাবেই খাটো করে দেখার সুযোগ নেই। এই প্রসঙ্গে বলা যায় নারী শ্রমিকরা যদি পোশাক শিল্পে যোগদান করে তাদের শ্রম দিয়ে অবদান না রাখত তাহলে বাংলাদেশে নারীর ক্ষমতায়নের কথা বহির্বিশ্বে প্রচার পেত না। আর পোশাক শিল্পই নারীদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে তাদের স্বাবলম্বী করেছে এই কথা অনস্বীকার্য। পোশাক শিল্প কারখানায় নারীর সক্রিয় ভূমিকা পোশাক শিল্প খাতকে যে পর্যায়ে নিয়ে গেছে তা সত্যিই ঈর্ষণীয়। পোশাক শিল্প কারখানাগুলোতে নারী–পুরুষের শ্রম এবং সময়ের কোন তারতম্য না থাকলেও মজুরিতে বৈষম্য পরিলক্ষিত হয়। পোশাক শিল্পের নারী শ্রমিকদের ক্ষমাতায়ন এবং কর্তৃত্বের কাঠামোর এক ব্যাপক রদবদল পরিলক্ষিত হচ্ছে। বর্তমানে নারীরা সহিংস অবস্থায় নানা প্রতিকূলতার শিকার হলেও পারিবারিক উপার্জনক্ষম নারীর ক্ষমতায়নে ইতিবাচক প্রভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। বাড়তি শ্রমসহ দিনে গড়ে প্রায় ১৮ ঘন্টা শ্রম বিনোয়গের পোশাক শিল্পের নারী শ্রমিকেরা। তারা পোশাক শিল্পের প্রধান শ্রমশক্তি হলেও সামাজিকভাবে নারীর মূল্যায়ন কম বলে নারীর শ্রমও সস্তা। এক সময় মালিকেরা গ্রাম–গঞ্জ থেকে নারীদের সংগ্রহ করে এই শিল্পে নিয়োজিত করে। ফলে সস্তা শ্রম ক্রয় করে এই শিল্পটি উত্তরোত্তর বিকশিত হয় এবং নারীরা উৎপাদনে বিশেষ ভূমিকা রাখেন। কিন্তু তাদের জীবন চলে অতিশয় সংকটের মধ্যে। বাংলাদেশে পোশাক শিল্পের শ্রমিকের যে মজুরি তা জীবন ধারণের জন্য অপ্রতুল। তার মধ্যে নারী শ্রমিকের বেতন পুরুষ শ্রমিক অপেক্ষা অনেকাংশে কম। তারই সুযোগে শিল্প মালিকেরা স্বল্পমূল্যে নারী শ্রমিকদের দিয়ে পরিচালিত করে তাদের শিল্প কারখানা গড়ে তুলে। বাংলাদেশ এখন নারীদের নিয়ে সস্তা শ্রম বাজার গড়ে তুলে বাংলাদেশকে কৃষি নির্ভর অর্থনীতি থেকে উত্তরণ ঘটিয়ে পোশাক শিল্পে স্বনির্ভর অর্থনীতি গড়ে তুলেছে। সাফল্যের এমন সময় আমাদের জানতে ইচ্ছে করে আমাদের পোশাক শিল্পের চালিকা শক্তি নারী শ্রমিকের জীবন–জীবিকার মান এখন কোন অবস্থায় বিরাজমান। পোশাক শিল্পে শ্রমিক হিসেবে নারীর অংশ গ্রহণ বাড়লেও প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা সহ উচ্চপদে তাদের কোনো অবস্থান সৃষ্টি হচ্ছে না। ফলে বেতন–ভাতা সহ সব ক্ষেত্রে মেয়েরা বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। নারী শ্রমিকদের মধ্যে নেতৃত্বের বিকাশ হয় নি। সরাসরি উৎপাদনের বাইরে নেতৃত্বশীল পদে নারী শ্রমিক অত্যন্ত কম। পুরুষের চেয়ে নারীদের মজুরি ৩ শতাংশ কম। মাত্র ৪ থেকে ৫ শতাংশ নারী কিছুটা বড় পদ সুপারভাইজার এবং সমসংখ্যক লাইন চিফ হিসেবে কাজ করেন। বাকিরা শ্রমিক পদেই কাজ করেন। এই সময় নারী–পুরুষের বেতন বৈষম্য কমলেও নারী কর্মসংস্থানের হার কমেছে। যে শিল্পের কর্মীদের ৮০ ভাগ নারী কর্মী ছিল জানা যায় এখন তাদের অংশগ্রহণ ৬১ ভাগে নেমেছে।

পোশাক শিল্পখাতে যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্যের চিত্র দেশের সার্বিক চিত্র থেকে ব্যতিক্রম নয়। এখাতে কাজ করা নারীদের বেশিরভাগ ১৮ থেকে ৩৫ বছরের প্রজননক্ষম। সাম্প্রতিক সময়ে পোশাক শিল্প অধ্যুষিত এলাকায় সরকারি, বেসরকারি ও বিজি এম ই এর পক্ষ থেকে বেশ কয়েকটি ক্লিনিক পরিচালনা করা হচ্ছে। কিন্তু তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। পোশাক শিল্পে অধিকাংশ সুপারভাইজার পুরুষ হওয়ায় নারী শ্রমিক কোন শারীরিক সমস্যায় পড়লে সুপারভাইজারের সংগে কথা বলতে সংকোচবোধ করেন। তাই নারী সুপারভাইজার নিয়োগ বেশি হওয়া দরকার এইসব প্রতিষ্ঠানে। বাংলাদেশের পোশাক শিল্পে নারী শ্রমিকদের যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করার জন্য কোনো আইন নেই। পোশাক কারখানার ভবন অগ্নিনির্বাপণ সুবিধা, নিরাপত্তা সুবিধা নিশ্চিত করার পাশাপাশি নারী শ্রমিকের যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য নিশ্চিত করা জরুরি। ভালো উৎপাদন পেতে হলে শ্রমিকদের স্বাস্থ্য ভালো রাখার দায়িত্ব পোশাক শিল্পের। বেশিরভাগ নারী শ্রমিক পরিবারের সঙ্গে বাস করলেও কিছুসংখ্যক শ্রমিক আত্মীয়, বন্ধু এবং হোস্টেলে শেয়ার্ড একোমোডেশন ব্যবস্থায় বাস করে। অনেক নারী শ্রমিক অনাথ। মালিকদের উচিত নারী শ্রমিকের জন্য নিরাপদ বাসস্থানের ব্যবস্থা করা। পোশাক শিল্পে কাজ করতে হলে বেশি শিক্ষার প্রয়োজন হয় না। অশিক্ষিত বা অর্ধ শিক্ষিত নারীগণ এই শিল্পে কাজ করে পরিবারে তাদের মর্যাদা বৃদ্ধি করছে। তবে নারী শ্রমিকদের নিজেদের অধিকার আদায়ে সোচ্চার হওয়ার জন্য লেখা–পড়া জানা থাকা প্রয়োজন।

এই শিল্পে নারীদের চাকরির স্থায়িত্ব বা বেতনের নিশ্চয়তা থাকে না। মালিকের ইচ্ছার ওপর নির্ভর করে চাকরি থাকবে কি থাকবে না। এই শিল্পে নারীদের শ্রমের অবমূল্যায়ন করা হয়। একই কাজে নারীদের তুলনায় পুরুষের বেতন বেশি ধরা হয়। পেটের দায়ে চাকরি করতে এসে ইজ্জত–আবরু রক্ষা করতে হিমশিম খেতে হয়। এই উজ্জ্বল শিল্পে নারী শ্রমিকেরা ছুটি পায় রাত ৮টার পর। অনেক সময় রাস্তা–ঘাটে এরা বিপদগ্রস্ত হয়। এই শিল্পে ছুটির নিয়ম সরকারি নিয়মনীতির বাইরে। এ অবস্থা কর্মজীবী নারীর পরিবারের মধ্যে অশুভ পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। নির্ধারিত সময়ে ছুটি পাওয়া তাদের ন্যায়সঙ্গত অধিকার। কিন্তু সঠিক আইন নাই বলে চাকরি যাওয়ার ভয়ে কেউ মুখ ফুটে কিছু বলে না। ফলে নারী শ্রমিকরা নির্যাতন, বৈষম্যের শিকার হন। অথচ পুরুষ শ্রমিকের চেয়ে নারী শ্রমিকেরা মনোযোগী এবং কাজও ভালো করেন। তাদের কম পারিশ্রমিকে কাজ করানো যায়। তাছাড়া পোশাক শিল্পে নিয়োজিত নারীরা আর কোনো কাজ জানেনা বলে এইটিতেই থাকার চেষ্টা করে। তাই নানা নির্যাতনের শিকার হলেও তা প্রকাশ করেনা। তাই সব দিক থেকে মালিকরা তাদের দিয়ে কাজ করিয়ে সুবিধা পান। অভিযোগ আছে বাংলাদেশে এই শিল্প কারখানায় কর্মরত শতকরা ১৩ ভাগ নারী যৌন হয়রানির শিকার হয়। শারীরিক নির্যাতনের শিকার ২০ ভাগ। আর মানসিক নির্যাতনের শিকার ৭১ ভাগেরও বেশি। নারী সুপারভাইজার থাকলেও অনেক সময় কোনো কাজ হয় না। কারণ তারাও মালিকের আদেশ বাস্তবায়ন করে মাত্র। এক্ষেত্রে প্রয়োজন মালিকের মানসিকতার পরিবর্তন আর ট্রেড ইউনিয়নকে শক্তিশালী করা।

জানা যায় পোশাক শিল্প কারখানায় ৩১ দশমিক ৩ ভাগ নারী শ্রমিকের কোনো নিয়োগপত্র নেই। অনেকের সার্ভিসবুক নেই। কিন্তু হাজিরা কার্ড আছে। শ্রম আইন লঙ্ঘন করে ৯ থেকে ১০ ঘণ্টা কাজ করতে বাধ্য করা হয়। ওভার টাইম করাও বাধ্যতামূলক এবং তা ২ ঘণ্টারও বেশি। অনেকেই সাপ্তাহিক ছুটিও পান না। বেশিরভাগ নারী শ্রমিক কর্মক্ষেত্রে মৌখিক হয়রানির শিকার হন। বেশির ভাগ নির্যাতনের শিকার হন সুপারভাইজার কর্তৃক। নির্যাতনের শিকার হওয়া নারী কর্মীরা জানেন না এর বিরুদ্ধে কোথায় অভিযোগ করতে হবে। কর্মস্থলে ডে কেয়ার সেন্টার ও বিশ্রামের জায়গা না থাকায় রাতের সময় নিরাপত্তার সংকটও রয়েছে। এই শিল্পে নারী শ্রমিক বেশি হলেও সব সিদ্ধান্ত নেয় পুরুষেরা। ফলে নারী শ্রমিকেরা নানা ধরনের প্রতিকূল পরিবেশের সম্মুখীন হন। নারীকে সস্তা শ্রমিক হিসেবে বিবেচনা করে থাকে বলে নারী নানা সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়। তাই এ বিষয়ে সচেতন হওয়া উচিত।

দেশের প্রচলিত শ্রম আইন শ্রমিকদের অধিকার সম্পর্কে যা বলুক না কেন সেই সুযোগ লাভের পরিবেশ আমাদের পোশাক শিল্পে বর্তমান নয়। সরকার আইন করে মেয়েদের মাতৃত্বকালীন ছুটি প্রদান করলেও আমাদের পোশাক শিল্পের নারী কর্মীর তা ভোগ করার থেকে বেশিরভাগ বঞ্চিত হন। কারণ যখন মালিকরা জানতে পারে নারী শ্রমিক অন্তঃসত্ত্বা তখনই তাকে চাকরিচ্যুত করার সকল কৌশল তারা গ্রহণ করেন। শ্রম আইনে নারী শ্রমিকের জন্য ওভার টাইম করানোর নির্দিষ্ট সময়সীমা থাকলেও নারী শ্রমিকদের নির্বিচারে ওভার টাইম করানো হয়। এই বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো নিয়ম মানার বালাই পোশাক শিল্পে নেই। অনেক সময় ওভারটাইম করানোর পর মজুরি পরিশোধ করা হয়না বলে অভিযোগ পাওয়া যায়। এইক্ষেত্রে মালিক পক্ষের ম্যানেজমেন্ট সততার পরিচয় দেন না বলে শুনা যায়। ফলে একজন নারী শ্রমিক তার আইনানুগ অধিকার পাওয়া থেকে বঞ্চিত হয়। এই বিষয়ে কোনো প্রতিবাদ করলে কোনো কোনো ক্ষেত্রে গালাগালি এমন কি দৈহিক নির্যাতন পর্যন্ত সইতে হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে চাকরিও চলে যায়। এইছাড়া কাজের স্বল্পতা দেখিয়ে অভিজ্ঞ শ্রমিকদের ছাঁটাইয়ের ব্যবস্থাতো আছেই। এই হীন পরিস্থিতি নারী শ্রমিকদের জীবনে যে দুর্ভোগ আনছে তা পোশাক শিল্প ও বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর।

নারী উন্নয়নের মতো চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় জেন্ডার বাজেটে বরাদ্দের পরিমাণ বাড়ানো এবং পোশাক শিল্পের চাকরির বিধানমালা পরিবর্তন করা প্রয়োজন। প্রয়োজন নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির প্রবর্তন। পোশাক শিল্প যেন না হয় শ্রমিক শোষণ। এ দিকে সরকারের দৃষ্টি থাকা প্রয়োজন। স্বাধীন বাংলাদেশের সর্বত্র কর্মক্ষেত্রে নারীদের উপস্থিতি এক নবজাগরণের সূচনা করেছে। প্রতিটি উন্নয়নমূলক কাজে পুরুষের পাশাপাশি নারীদের অবদান অপরিহার্য। পোশাকখাতে যেহেতু শুরু থেকেই বেশিরভাগ শ্রমিক নারী তাই এই খাতে নারী শ্রমিকদের সব ধরনের বৈষম্য দূর করতে ট্রেড ইউনিয়নের পাশাপাশি সকল স্তরে নারীর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা দরকার। ন্যায্য মজুরিসহ সব পোশাক কারখানায় নারী কর্মীদের জন্য প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য সেবা, শিশু পরিচর্যা কেন্দ্র এবং ব্রেস্ট ফিডিংয়ের জন্য নির্ধারিত স্থান চালু করা সময়ের দাবি। দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে গেলে নারী–পুরুষ সবাইকে তার শ্রম, সময়,অর্থ ব্যয় এবং অভিমত ব্যক্ত করার উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করতে হবে। নারীদের আর্থিক নিরাপত্তা জোরদার করে পোশাক শিল্পকে দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ডে পরিণত করলেই দেশেত অগ্রগতি বৃদ্ধি পাবে।  (দৈনিক আজাদী থেকে সংগৃহীত)

লেখক : প্রাবন্ধিক ও শিক্ষক

এই বিভাগের আরো সংবাদ