বাংলাদেশের উপকূলীয় পরিবেশ ও সংরক্ষণ ভাবনা

  সুলতান মোহাম্মদ গিয়াসউদ্দীন

০৭ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১২:৫৩ | অনলাইন সংস্করণ

বাংলাদেশ বহমান নদী ও সমুদ্রজলে সর্বাধিক বিধৌত ও প্রভাবিত একটি দেশ। মূলতঃ বাংলাদেশ নামক এই ছোট দেশটি গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনার মতো বৃহৎ তিনটি নদীর মোহনায় দাঁড়িয়ে আছে। তাই, এটা ব-দ্বীপ অঞ্চল। বাংলাদেশে প্রায় ৩ কোটি মানুষ এই সমুদ্র উপকূলবর্তী অঞ্চলে বাস করে। উন্নয়ন, পরিবেশ ও সমাজ এই তিনটি পরস্পর সম্পর্কযুক্ত শব্দ বর্তমান গতিময় বিশ্বে আলোচনার সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারে যেমনি রয়েছে, তেমনি এই ব-দ্বীপ বাংলাদেশেও এই তিনটি বিষয় সর্বাধিক আলোচ্য।
উন্নয়ন, পরিবেশ ও সমাজ এই তিনটির মধ্যে পরিবেশ হচ্ছে সবচেয়ে বেশী ব্যাপক ও জটিল বিষয়। কারণ এই বিশ্ব ব্রহ্মান্ডের আলো-বাতাস, জল-স্থল, উদ্ভিদ-প্রাণী সব কিছুর ওতপ্রোত বেষ্টনী নিয়ে এই পরিবেশ। এ উপাদানগুলো আবার একটি অন্যটির সম্পূরক। পরিবেশের কোন ভৌগোলিক সীমারেখাও নেই। আর তাই এক অঞ্চলের বায়ু দূষণ অন্য অঞ্চলকে প্রভাবিত করে। বাংলাদেশে পরিবেশ দূষণের মাত্রা বাতাসের চেয়ে পানিতেই বেশী। বিপুল পরিমাণ আবর্জনা ও রাসায়নিক বর্জ্য দ্রব্য নদীবাহিত হয়ে সমুদ্রে এসে পড়ছে। ফলে, বাংলাদেশের জৈব ভূ-রাসায়নিক পদ্ধতি, মৎস্য উৎপাদন এবং উপকূলীয় পরিবেশের উপর মারাত্মক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করছে।
বাংলাদেশের উপকূলবর্তী অঞ্চল এমনিতে উচ্চতায় সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে ১০ ফুটেরও কম । ফলে ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস এই অঞ্চলের নিত্য সহচর। পরিবেশ দূষণ বা বিপর্যয়ের কারণে উপকূলবর্তী এই সব অঞ্চলের পরিবেশ দিন দিন আরো শোচনীয় রূপ নিচ্ছে। ফলে এখানকার অধিবাসীদের জন্য তথা বাংলাদেশের জন্য বর্তমান পরিবেশ হুঁমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পরিবেশ দূষণে বদলে যাচ্ছে জলবায়ু : ঢাকায় অনুষ্ঠিত জলবায়ু বিষয়ক একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে পরিবেশ ও জলবায়ু সংক্রান্ত বিভিন্ন গবেষণা পত্র উপস্থাপিত হয়। তাতে দেখা যায় যে, ১৯৬১ সাল থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত ৪০ বছরে বাংলাদেশে প্রতি বছর গড়ে তাপমাত্রা বেড়েছে ০.০০৭২ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা পূর্বোক্ত ৩০ বছর কালের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। অপরদিকে, এ সময়ে বার্ষিক গড় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ পাওয়া গেছে ৪.৬৯০৯ মিলিমিটার, যা আগের ৩০ বছরের তূলনায় কম।
এতে প্রমাণিত হয় যে, ১৯৯১ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত ১০ বছরে তাপমাত্রা বেড়েছে অনেক বেশি হারে এবং বৃষ্টিপাত কমেছে। আবহাওয়া বিশেষজ্ঞদের মতে বাংলাদেশে গত কয়েক বছর যাবৎ বেশ কিছু পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। যেমন শীতকালে তাপমাত্রা কমছে না, বৃষ্টিপাতেও অনিয়ম হচ্ছে। বিজ্ঞানীদের মতে, বিশ্ব পরিবেশ গ্রীন-হাউস প্রতিক্রিয়ার ফলে আবহাওয়ায় তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছে। আশংকা করা হচ্ছে এ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময় নাগাদ বিশ্বের গড়পড়তা তাপমাত্রা ১.৫ থেকে ৪.৫ ডিগ্রী ফারেনহাইট বেড়ে যাবে এবং তা বাড়বে বায়ুম-লে কার্বন-ডাই অক্সাইডের মাত্রা বৃদ্ধিজনিত কারণে। ফলে সাগরে পানির উচ্চতা বৃদ্ধি পাবে ৮ হতে ১০ ফুট।
এতে দেখা যায়, বাংলাদেশের উপকূলবর্তী অঞ্চলসমূহ পানির নীচে তলিয়ে যাবে এবং লোনাপানিতে বিপুল আবাদী এলাকা ছেয়ে যাবে। এক তথ্য পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ১মিটার সমুদ্রতলের উচ্চতা বৃদ্ধি পেলে উপকূলীয় ৫৬.৮ লক্ষ একর (প্রায় ২২৮৮৯ বর্গ কিলোমিটার) পানির নীচে তলিয়ে যাবে। যা সমগ্র বাংলাদেশের ১৫.৮ শতাংশ। তলিয়ে যাওয়া এই ভূ-খ-ে থাকবে পটুয়াখালীর ১০০ শতাংশ, বৃহত্তর খুলনা জেলার ৬৫ শতাংশ, বরিশালের ৯৯ শতাংশ, নোয়াখালীর ৪৪ শতাংশ এবং ফরিদপুরের ১২ শতাংশ।
ইতোমধ্যে আমরা দেখতেও পাচ্ছি লবনাক্ততার কারণে সুন্দরবন অঞ্চলে বড় বড় গাছের ডগা বা কা- মরে যাচ্ছে। আবহাওয়ার এই পরিবর্তন উপকূলীয় বিস্তীর্ণ অঞ্চলকে অনুর্বর ও বসবাসের অনুপযোগী করে ফেলবে। বিষাক্ত বর্জ্য আর তেজস্ক্রিয়া দূষিত পদার্থ পানীয় জলের মারাত্মক ঘাটতি ঘটাবে।
উপকূলীয় পরিবেশ দূষণ ও স্বাস্থ্য হুমকি : পরিবেশ দূষণের ফলে প্রথম ধাক্কাটি আসে স্বাস্থ্যের উপর। তাই, পরিবেশ ও স্বাস্থ্য অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। দুর্যোগ, বন্যা, ঝড়-অনাবৃষ্টি ও খরতাপ বৃদ্ধি পেলে দেশের পত্র-পত্রিকায় ব্যাপক ভাবে যে খবরটি প্রথম আসে, তা হচ্ছে দেশের উপকূলীয় অঞ্চল বা দক্ষিণাঞ্চলে ডায়রিয়া, কলেরা, আমাশয় ইত্যাদি রোগের প্রাদুর্ভাব। দেখা গেছে, উপকূলীয় অঞ্চলের অধিবাসীদের সমুদ্র ও নদী ভাঙ্গনের কারণে বার বার আবাস স্থল বদলাতে হয় ও পেছনে সরে আসতে হয়। এতে, এসব অঞ্চলে জনসংখ্যার ঘনত্ব ব্যাপক ভাবে বৃদ্ধি পায় এবং জীবন-যাপন অস্বাস্থ্যকর ও অমানবীয় হয়ে পড়ে। নিরাপদ পানীয় জল, স্বাস্থ্য সম্মত পায়খানা ইত্যাদির তীব্র অভাব রয়েছে এ উপকূলীয় অঞ্চলে। বিশেষ করে বন্যা বা গোর্কীর সময় এসব অঞ্চলে পানি যখন ঢুকে পড়ে তখন দ্রুত বিভিন্ন রোগ ছড়ায়। বন্যা-দুর্যোগে যেখানে নিজ আবাসস্থল মানুষের থাকে না। সেখানে স্থায়ী স্বাস্থ্য-সম্মত পায়খানা গড়ে তোলা সম্ভবও হয় না। ফলে উপকূলবাসী সাধারণত উন্মুক্তভাবে যেখানে-সেখানে মল ত্যাগ করে, যা বন্যার পানিতে পরবর্তীতে মিশে গিয়ে মানবদেহের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়।
ইউনিসেফের এক পরিসংখ্যাণ অনুযায়ী, এই দূষিত পানির কারণে ৫০টিরও বেশী রোগ ছড়ায়। অনেক সময়, লবনাক্ত পানিতে কলেরার জীবাণু বেঁচে থাকে। মনে করা হয়, এ জন্য দেশের দক্ষিণাঞ্চল উপকূলে ডায়রিয়ার পাশাপাশি কলেরাও বিস্তার লাভ করে প্রতিবছর।
উজাড় বনাঞ্চল : বাংলাদেশের মোট বনাঞ্চল ৮,৮৯৮ বর্গমাইল অর্থাৎ মোট এলাকা শতকরা ১৫.৭ ভাগ। এর মধ্যে উপকূলীয় বনভূমির আয়তন হচ্ছে ২৪০০ বর্গমাইল। এ দেশে গড় মাথা পিছু বিদ্যুৎ উৎপাদন অত্যন্ত কম হওয়ায় এবং স্থানীয় জৈব জ্বালানীর ভা-ার সীমিত হওয়ায় এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে, অপ্রতুল বনাঞ্চল উজাড় হয়ে চলেছে, এছাড়া দরিদ্র জনগোষ্ঠী জীবিকার তাগিদে বন কেটে চলেছেন। আর্থ-সামাজিক কারণে আমরা বনাঞ্চল ও বন্যপ্রাণীদের আবাসন নষ্ট করে নিজেদের আবাসস্থল গড়ে তুলছি। নদীর ভাঙ্গনে আশ্রয়হীন অসংখ্য পরিবার বন পরিষ্কার করে বাঁধের জঙ্গল কেটে হাতিয়া ও মহেশখালীতে আবাসস্থল গড়ে তুলেছে।
এ কথা সত্য যে, দরিদ্র মানুষরা যতো না বনাঞ্চল নিধন করছে, তার চেয়ে ঢের বেশী এই বনাঞ্চল ধ্বংসের জন্য দায়ী মুনাফালোভী কাঠ ব্যবসায়ীরা। এভাবে বাংলাদেশ গ্রীন হাউজ প্রতিক্রিয়াজনিত কারণে বিশ্বের তাপ বৃদ্ধিতে অবদান রাখছে। উপকূলীয় এলাকায় ব্যাপক চিংড়ি চাষ, গেঁওয়া ও সুন্দরীবনের উপর হুমকি সৃষ্টি করছে। অপরদিকে বনাঞ্চল ধ্বংসের সাথে সাথে সামুদ্রিক ভাঙ্গনও দিন দিন বিস্তৃত হচ্ছে। ছিন্নমূল মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি করছে।
সামুদ্রিক ঝড় ও দুর্যোগ : সমুদ্র তীরবর্তী অঞ্চলে গোর্কীবাহিত সামুদ্রিক ঝড় বাংলাদেশে এক বড় সমস্যা। তথ্য পরিসংখ্যান থেকে প্রতীয়মান হয় যে, বিশ্বের ভয়াবহতম সামুদ্রিক ঝড় বঙ্গোপসাগরেই সৃষ্টি হয়। এই উপকূলীয় অঞ্চলে গড়ে বছরে ১৫ থেকে ২০টি সামুদ্রিক ঝড়ের উৎপত্তি হয়, যার ভেতর ৫টি ভয়াবহ রূপ নিয়ে থাকে।
উত্তরণ ও পরিবেশ সংরক্ষণ ঃ
পরিবেশগত ভাবে বাংলাদেশ এক চরম সংকটময় অবস্থায় বিরাজ করছে, আর এটাও স্পষ্ট যে, এই সংকটের উম্মুক্ত দ্বার পথ হচ্ছে সমুদ্র উপকূলীয় অঞ্চল। তাই সর্বাগ্রে উপকূলীয় পরিবেশ সংরক্ষণ নীতি কৌশল অবলম্বন করতে হবে। বাংলাদেশ সরকার জাতীয় পরিবেশ নীতি, জলবায়ু পরিবর্তনে করণীয় কর্ম-পরিকল্পনা ২০০৮. জাতীয় সংরক্ষণ নীতি ও পরিবেশ পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন। এই সব পরিকল্পনা ও নীতি বাস্তবায়ন সর্বস্তরের জনগনের সহযোগিতা ও সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমেই সম্ভব এবং তা করতে হলে, জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করতে হবে। তাদের মাঝে সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। সর্বোপরি পরিবেশ রত্শায় ও জলবায়ূ পরিবর্তনে নিজেদের খাপ খাইয়ে নেওয়ার যোগ্যতা অর্জনে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।  দৈনিক পূর্বকোণ থেকে সংগৃহীত)

লেখক : উন্নয়নকর্মী, [email protected]

এই বিভাগের আরো সংবাদ