‘যন্ত্রণাহীন মানব মৃত্যু চাই’

  অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ০৭ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১১:৪৩

তপন কুমার রায়: মৃত্যু। আবেগতারিত একটি শব্দ। যে আবেগ মানুষকে কাঁদায়, যে আবেগ বিবেককে ভাবায়। ক্ষুদ্র এই শব্দটির মর্মার্থ ব্যাখা-বিশ্লেষণ করতে মহাজগতে কতই না বিতর্ক। বিজ্ঞান, স্ব-স্ব ধমীয় গ্রন্থের কত বিচিত্র ব্যাখা? বিচার-বিশ্লেষণের মূলভাব সকল রঙ্গলীলার সমাপ্তি।

উইকিপিডিয়ার বলছে, ‘মৃত্যু বলতে জীবনের সমাপ্তি বুঝায়।’ জীববিজ্ঞানের ভাষায় প্রাণ আছে এমন কোনো জৈব পদার্থের (জীবের) জীবনের সমাপ্তিকে মৃত্যু বলে। অন্য কথায়, মৃত্যু হচ্ছে এমন একটি অবস্থা যখন সকল কর্মকান্ড যেমন শ্বসন, খাদ্য গ্রহন, পরিচলন ইত্যাদি থেমে যায়। মৃত্যু নিয়ে বিজ্ঞানের আরেকটি খুব চমকপ্রদ তথ্য, ‘মৃত্যু একটি সিরিজের সমন্বিত ফলাফল। একটি দিন পার করি আর আমরা মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাই। প্রতিনিয়ত আমাদের দেহের কোনো না কোনো কোষগুচ্ছ ক্ষয়প্রাপ্ত বা ধ্বংস হচ্ছে। প্রতিদিনের এই ঘটনাকে বলা হয় ‘মিনি ডেথ’।

অন্যদিকে প্রত্যেকে ধর্মীয়ভাবে নিজ নিজ ধর্ম অনুসারে মৃত্যু নামক তাৎপর্যপূর্ণ বিষয়টি ব্যাখা করতে সক্ষম। মুসলিমদের আল-কোরান-হাদিস, হিন্দুধর্মালম্বীদের গ্রন্থ কোথাও বাদ নেই। হিন্দুদের শিব পুরাণে রীতিমত মৃত্যু পথযাত্রী ব্যক্তিদের লক্ষণ কি হবে তাও বর্ণনা করা হয়েছে। আহা! মৃত্যুর কি বাহারি স্বাদ।

স্বাদ যাই হোক অবস্থাটা যে কষ্টের। কোনো মুত্যুই আনন্দ বয়ে আনেনি। চারদিকে মৃত্যুর মিছিল। গন্তব্যে যেতে কতই না বাহারি আয়োজন। কেউ রোগে, কেউ শোকে, খুনাখুনি, অকস্মাৎ দুর্ঘটনা। রাস্তা ভিন্ন হলেও গন্তব্য অভিন্ন। যে গন্তব্যে যেতে হবে সবাইকে। এক কথায় কবির ভাষায়, 

‘জন্মিলে মরিতে হবে অমর কে কথা কবে?
চিরস্থির কবে নীর হায়রে জীবন নদে?’

মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের এমন অমর বাণীর বিরোধিতা করার প্রয়াস আমার নেই। তবে এতটুকু প্রার্থনা তো করতেই পারি, আমি যন্ত্রণাহীন মৃত্যু চাই। যে মৃত্যু অপেক্ষার, যে মৃত্যু নীল কষ্টের সে মৃত্যু আমি চাইনা। হে মানবপ্রভু আমি স্বাভাবিক মৃত্যু চাই। লিখতে গিয়ে আমার ব্যক্তিগত কয়েকটি ঘটনা তুলে না ধরে আর পারলাম না। কথাগুলো লিখতে গিয়ে হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হচ্ছে বটে। আট বছর আগে আমরা তিন ভাই (আমি উচ্চ মাধ্যমিকের ছাত্র, আর আমার দুই অনুজ নিতান্তই ছোট) আমার মায়ের নিথর দেহ ঘাড়ে নিয়ে শশ্মানে চলছি। ঘুমন্ত মায়ের ভার বয়ে চলা কি এত সহজ? কি নিদারুণ কষ্ট। হাহাকার। অবুঝ-নিষ্পাপ ছোটভাই দুটোর সামনেই ধর্মীয় রীতি আর অধিকার বলে মুখাগ্নি করে প্রিয় মাকে ছাই করে দিলাম। এই কষ্টের চেয়ে বড় কষ্ট মৃত্যুর আগে বিগত ১৪ বছর আমার মা হৃদরোগে তিলে তিলে যন্ত্রণা সহ্য করে আসছিল। ছোট সংসারের সাধ্যমত চিকিৎসাশাস্ত্রে অনেকটাই উন্নত রংপুরে এনে চিকিৎসা করানোও হয়েছে। ছোট হলেও অতটা অবুঝ ছিলাম না। ডাক্তারের ইঙ্গিত ছিল সাধ্য থাকলে মাদ্রাজ (ভারতে) নিয়ে যেতে পারেন। কয়েক টুকরো জমির উপর এতবড় সিদ্ধান্ত নেয়াটা বেশ কঠিন। হয়তো আমাদের (তিন ভাই) মুখের দিকে তাকিয়ে ভবিষৎতের কথা ভেবেই বাবা-মা এগোয়নি। নিয়মিত ওষুধ সেবন চলত। অনেকটাই বুঝতে পারতাম মা আমার অসহ্য যন্ত্রণা নিয়ে গন্তব্যে যেতে অপেক্ষা করছে বৈকি। অত:পর এক মধ্যেরাতে মায়ের অপেক্ষার পালা শেষ হলো।

২. ‘বাঁচতে চায় লিটন।’ মৃত্যু নামক ধ্রুবসত্য কষ্ট থেকে বাঁচার আকুতি কান পেতে শুনেছেন কখনো? গত কয়েকেদিন থেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের আনজির লিটন (হিসাববিজ্ঞান বিভাগ, ২য় বর্ষ) নামের এক ছাত্রের দুরারোগ্য ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার খবর ভাসছে। চাই সাহায্য। বাঁচার আকুতি। লিটনকে বাঁচাতে অঢেল অর্থ প্রয়োজন। বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজনরা যে যেভাবে পারছে অর্থ সংগ্রহ করছে। বুকে একরাশ স্বপ্ন নিয়ে বেঁচে থাকা ভার্সিটি পড়ুয়া ভাইটিকে বাঁচাতে হয়তো এগিয়েও আসছে অনেকে। কিন্তু এই বয়সে তো লিটনের  এমন যন্ত্রণা পাওয়ার কথা না। যে লিটনকে এসময় ক্যাম্পাস-ক্লাসে সময় দেয়ার কথা সে বাাঁচার আকুতি নিয়ে হাসপাতালে কাতরাচ্ছে। লিটনের প্রসঙ্গে, কবি গুরু রবি ঠাকুরের ‘প্রাণ’ কবিতার চারটি পঙক্তি মনে পড়ে গেল-

‘মরিতে চাহি না আমি সুন্দর ভুবনে,
মানবের মাঝে আমি বাঁচিবারে চাই।
এই সূর্যকরে এই পুষ্পিত কাননে
জীবন্ত হৃদয়-মাঝে যদি স্থান পাই।’

কবি গুরুর এই প্রার্থনা নিছক মিথ্যা নহে। হয়তো কবি কবিতায় মহাজগতে স্মরণীয় কর্মের মাধ্যমে বেঁচে থাকতে চেয়েছেন। কিন্তু আমি মনে করি লিটন, আমি,  আমরা আগে তো বয়সের মাপকাঠিতে বেঁচে থাকি। তারপর না হয় ভালো কর্ম করার সুযোগটা পাব। সত্যি তাই নয় কি? আমি যখন লেখাটি লিখছি (৬ সেপ্টেম্বর-২০১৮), ততোক্ষণে আমার স্কুল পড়ুয়া এক সহপাঠী ইমরানের দাফন সম্পন্ন হয়েছে। ক্যান্সারের সাথে দীর্ঘদিন যুদ্ধ করে ইমরান জিততে পারেনি। উন্নত চিকিৎসার জন্য ভারতেও নিয়ে যাওয়া হয়েছে তাকে। পাঁচদিন আগে সেখানেই মারা যায় সে। আজ নিজভূমে এনে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হলো তাকে। হ্যাঁ, সে আমার সহপাঠি বটে। একসাথেই উচ্চবিদ্যালয়ে পড়েছি। কত স্মৃতি, শত স্বপ্ন। ব্যথায় মলিন বটে।

অন্য আরেকটি ঘটনা বলি, গত দেড় মাস আগে স্বল্পবয়স্ক যতীন নামের এক বড়ভাই মাথার সমস্যা নিয়ে রংপুরে আমার কাছে আসে ডাক্তার দেখানোর জন্য। বাড়ি আমার গ্রামের পাশেই। আমি যেহেতু দীর্ঘদিন থেকে রংপুরে থাকি গ্রামের লোকেদের ধারণা আমি ডাক্তারদের সম্বন্ধে মোটামুটিভাবে জানি। অন্য প্রসঙ্গে যাচ্ছিনা। পপুলার ডায়াগনোস্টিক সেন্টার-২ তে নিউরোমেডিসিন এক ডাক্তারকে দেখানোও হলো। রিপোর্টে যা আসলো তা দেখে আমার হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হতে লাগলো। ব্রেন টিউমার জাতীয় কিছু একটা ধরা পড়ছে। রোগীকে বাদে ডাক্তার আমাকে সব খুলে বললো। পরামর্শ হিসেবে নিউরোসার্জনকে দেখাতে বললেন। নিউরো সার্জনকে দেখানোর পর বললেন, অপারেশন করতে দেড় লক্ষ টাকা প্রয়োজন। তবে উন্নতি কিছু একটা হবে কিনা সন্দেহ। ডাক্তারের কথা বার্তা আর আমাদের চাহনিতে যতীনদা বুঝতে পারলো তার বড় কোনো সমস্যা হয়েছে। বাসে উঠে দিতে এগিয়ে দেয়ার সময় যতীনদাকে বললাম, তার সম্পত্তি কিংবা জমানো টাকা পঁয়সা আছে কিনা? উত্তর- সর্বসাকুল্যে ২০ হাজার টাকার মতো হাতে আছে। আর স্থায়ী সম্পত্তি বলতে বাড়ির ভিটে। দিনে এনে দিনে খেটে খাওয়া যতীনদার  মুখে তাকিয়ে থাকতে পারিনি। যতীনদাও বুঝতে পারছে তার সময় শেষ। আমার হাত দুটো ধরে মেডিকেল মোড়ে সেকি কান্না। আমি তখন ভাবছি তার ৫ম শ্রেণিতে পড়ুয়া মেয়ে আর দুধের ছেলে সন্তানটির কথা। চোখে জল আটকিয়ে রাখতে পারিনি। অত:পর ১৩-১৪ দিন পর খবর এলো যতীনদা....। 

অনেকেই ভাববে আমি মৃত্যুকে ভয় পাই। ভুল। প্রয়াত পদার্থবিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং এর মুখ দিয়েই কথাটি বলি। তাঁর ভাষায়, ‘মুত্যু নিয়ে আমি ভীত নই। কিন্তু মরার জন্য তাড়াও নেই আমার। তার আগে করার মতো অনেক কিছু আছে আমার।’ সত্যি আমাকে-আমাদেরকে সময় দিতে হবে। ভালো কিছু করার সুযোগ দিতে হবে। যন্ত্রণাবিহীন মৃত্যু উপহার দিতে হবে। সবশেষে কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘মৃত্যুর পরে’ নামক একটি কবিতার অংশ দিয়ে শেষ করছি-

‘আজিকে হয়েছে শান্তি
জীবনের ভুলভ্রান্তি
সব গেছে চুকে।
রাত্রিদিন ধুক্ধুক্
তরঙ্গিত দু:খসুখ
থামিয়াছে বুকে।
যত কিছু ভালোমন্দ
যত কিছু দ্বিধাদন্দ্ব
কিছু আর নাই।
বলো শান্তি, বলো শান্তি,
দেহ-সাথে সব ক্লান্তি
হয়ে যাক ছাই।’

 

লেখক: গণমাধ্যমকর্মী,  
সাবেক সভাপতি, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতি।

এই বিভাগের আরো সংবাদ