আমার বিজ্ঞান-ভাবনা

  আবু এন এম ওয়াহিদ

০৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১৬:০৪ | অনলাইন সংস্করণ

আমরা এমন এক জমানায় বাস করছি, বিজ্ঞানী হই বা না হই, তবু বিজ্ঞান নিয়ে ভাবতে হয়। দিনে দিনে আমাদের জীবন এমনভাবে বিজ্ঞান মুখাপেক্ষী হয়ে উঠছে যেন, আমরা সচেতন অথবা অবচেতন মনে প্রতিনিয়ত গভীর বিজ্ঞানসায়রে ডুবে হাবুডুবু খাচ্ছি, অথচ কিছুই টের পাচ্ছি না। এমতাবস্থায় মনের অজান্তে কেউ কেউ অতিরিক্ত বিজ্ঞানবান্ধব ও বিজ্ঞানপ্রেমী বনে গেছেন। বিজ্ঞান যা-ই বলুক তারা তাই সঠিক মনে করেন এবং বুঝে না বুঝে সেসব অন্ধের মতন অনুসরণ করেন। তারা ভাবেন, বিজ্ঞান মানেই আধুনিকতা, বিজ্ঞান মানেই অগ্রগতি, বিজ্ঞান মানেই নিষ্কলুষ কল্যাণ। পক্ষান্তরে, অনেকে আবার বিজ্ঞানবিরূপও হয়ে উঠছেন। এসব মানুষ বিজ্ঞানের নিত্যনতুন ধারণা ও নতুন নতুন উপকরণের সাথে নিজেদের খাপ খাওয়াতে পারেন না।

তারা মনে করেন, বিজ্ঞানকে না মানাটাই যেন বলিষ্ঠ চরিত্র ও ব্যক্তিত্বেরই বহিঃপ্রকাশ। এই দুই কিসিমের মাঝখানে যে আরেক দল মানুষ আছেন, সে-কথা অনেক সময় আমরা বেমালুম ভুলে যাই। তারাও আছেন এবং তাদের ভারসাম্যপূর্ণ চিন্তাশক্তি এবং পরিমিতিবোধসম্পন্ন জীবন ধারণ সমাজ ও সভ্যতার জন্য একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয় বটে। এ পর্যায়ে আপনারা ভাবতেই পারেন, আমি নিজেকে মাঝখানের কাতারে ফেলে বুঝি বাহাদুরি নেব; কিন্তু সত্যি বলতে কি এই তিন দলের মাঝে আমার অবস্থানটি কখন কোথায় গিয়ে ঠেকে তা আমি নিজেও জানি না। এমনি এক পটভূমিতে আজ আমি বিজ্ঞান নিয়ে আমার জানা, বোঝা ও মনের দুটো কথা অকপটে আপনাদের উদ্দেশে নিবেদন করতে চাই। ভুলত্রুটি পেলে ধরিয়ে দেবেন। খুশিমনে শুধরে নেব।

আমরা জানি, বিজ্ঞান প্রধানত দুটো শাখায় বিভক্ত- তাত্ত্বিক ও ফলিত। তাত্ত্বিক বিজ্ঞানের তামাম তত্ত্ব ও সূত্র আসে খোদ বিজ্ঞানীর মাথা থেকে, আর এসবের পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও যাচাই-বাছাইয়ের কাজ চলে- কতক গবেষণাগারে- চার দেয়ালের ভেতরে, আবার কতক হয়ে থাকে সরেজমিনে- বাইরের বাস্তুব জগতে। পরীক্ষিত সূত্রগুলো ব্যবহার করে ফলিতবিজ্ঞান মানবসমাজকে উপহার দিচ্ছে নিত্যনতুন প্রযুক্তি। কালের পরিক্রমায় এই প্রযুক্তির পরিসর বিস্তৃত হচ্ছে, নতুন নতুন ডালপালা মেলছে, গুণেমানে সমৃদ্ধ হচ্ছে।

পৃথিবীব্যাপী ছোট-বড় অসংখ্য কোম্পানি নিরন্তর নব নব প্রযুক্তিকে লুফে নিয়ে, নাড়াচাড়া করে, মানুষের জীবন ও জীবনযাত্রাকে সুন্দর, সহজ ও সহনীয় করে তোলার জন্য প্রত্যহ নানা জাতের প্রযুক্তিজাত যন্ত্রপাতি, উপকরণ ও উপাদানের ডালি নিয়ে ভোক্তা সাধারণের দুয়ারে এসে কড়া নাড়ে। এর মাঝে যেমন নিহিত আছে মানবসেবা ও মানবকল্যাণ, তেমনি আছে ব্যবসা-বাণিজ্য, কেনাবেচা ও তাগড়া মুনাফা হাসিলের তাগাদা। কোনটার চেয়ে কোনটা বড়, সেও এক রসালো বিতর্কের অনুষঙ্গ। সেদিকে আজ আর যাব না।

বাজারে নিত্যনতুন জিনিসপত্রের আমদানি-রপ্তানির ডামাডোলে হাজারো জাতের ছোট-বড় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান তাদের লাভের কঠিন ও জটিল অঙ্কগুলো সহজেই মিলিয়ে নেয়। ভোক্তা হিসেবে আমরাই বা কম কী। প্রয়োজন ও খায়েস মেটানোর উদ্দেশ্যে আমরা রং বেরঙের উপকরণগুলো দেওয়ানা হয়ে কিনি, এস্তেমাল করি, উপভোগ করি, উপকার পাই। একটা বিকল হওয়ার আগেই ছুড়ে ফেলে দিই, তারই উন্নত সংস্করণ আরেকটি কিনি। এভাবে দিনে দিনে আমাদের জীবন- বৈচিত্র্যে, আনন্দে আর উত্তেজনায় ভরপুর হয়ে উঠছে।

আজকাল প্রযুক্তির ওপর আমরা এমনভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়ছি যে, নিজেদের অন্নটা পর্যন্ত নিজ হাতে উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাত করে খাবার টেবিলে হাজির করতে পারি না। পরনের কাপড়- সেও তো প্রযুক্তিরই ফসল। বসবাসের জন্য ঘরবাড়ি বানাতে গেলে বিশাল বিশাল যন্ত্রপাতির আঞ্জাম দিতে হয়। চিকিৎসাসেবা ও ওষুধপত্রের কথা কী আর বলব! বিমার যখন শরীরে এসে আছর করে, তখন অসহায় হয়ে ডাক্তারের কাছে গিয়ে করুণা মাগি। প্রযুক্তির কাছে আত্মসমর্পণ করি। চিড়ে-মুড়ির মতো ওষুধ গিলি- দামি দামি ওষুধ। জীবনের আরেকটি অতি প্রয়োজনীয় অনুষঙ্গ- ছেলেমেয়েদের পাঠদান ও জ্ঞানদান। প্রযুক্তির কোমল স্পর্শ ছাড়া সেটিও আজ অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। এভাবে বিজ্ঞান ও যান্ত্রিক উৎপাদনব্যবস্থা আমাদের জীবনকে অর্থপূর্ণ করছে কি না জানি না। তবে আমরা মনে করি, প্রযুক্তির কারণে আমাদের যাপিত জীবন হয়েছে অনেক সহজ, সুন্দর ও আরামদায়ক। এই মনে করাটাও কতটা নির্ভুল ও যৌক্তিক তাও যুক্তিতর্কের ঊর্ধ্বে নয়।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অন্য আরেকটি দিকও আছে। বিজ্ঞান জলে, স্থলে ও মহাশূন্যে বিরামহীন গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছে এবং নব নব অভিনব বিষয় আবিষ্কার করে মনুষ্য সমাজকে একের পর এক তাক লাগিয়ে দিচ্ছে! কোষ জীববিজ্ঞান এমন সব গবেষণা ও আবিষ্কার করে চলেছে যে, অনেকে এখন মনে করতে শুরু করেছেন, বিজ্ঞানের গতি অপ্রতিরোধ্য, শক্তি ও ক্ষমতা অসীম! তারা বলে থাকেন, ‘সেদিন আর বেশি দূরে নয়, যেদিন বিজ্ঞান মানুষকে অমর প্রাণীতে পরিণত করে দেবে। মানুষ আকাশযানে চড়ে গ্রহ থেকে গ্রহান্তরে ঘুরে বেড়াবে। পৃথিবী নামক এই সবুজ গ্রহের বাইরে গিয়ে বসতবাড়ি গড়বে’ ইত্যাদি, ইত্যাদি। বিজ্ঞানের এমন সাফল্য মানুষের চিন্তাজগৎকে প্রতিনিয়ত নতুনভাবে ঝাঁকুনি দিচ্ছে।

ইদানীং বিজ্ঞানমনষ্করা আরও ভাবতে শুরু করেছেন যে, ‘বিজ্ঞান পারে না, এ জগতে এমন কিছু নেই। আজ হোক, কাল হোক, বিজ্ঞান মানুষের যাবতীয় সমস্যার সমাধান দেবে। মানুষের সকল কৌতূহল ও সওয়ালের জবাব বের করে আনবে। মহাসৃষ্টির তামাম অজানা রহস্যের সব দুয়ার খুলে দেবে।’ এতক্ষণ যা বললাম, তা বিজ্ঞানের সাফল্য, বিজ্ঞানের অবদান এবং আগামী দিনে বিজ্ঞানকে নিয়ে মানুষের আশা-আকাক্সক্ষার কথা।

মানুষের সঙ্গে পশুর হাজারো মিল থাকতে পারে; কিন্তু তাদের মাঝে ৩টি মৌলিক পার্থক্য আছে। প্রথমত; পৃথিবীতে মানুষই একমাত্র প্রাণী যার চাহিদা সীমাহীন। পশু-পাখির চাহিদা তার পেট ভরাবার মধ্যেই সীমাবদ্ধ; কিন্তু মানুষের চাহিদার কোনো চৌহদ্দি নেই। একটি বিশেষ সময়ে মানুষ একটি বিশেষ চাহিদা পূরণ করে ফেলতে পারে এবং এই পূরণ করে ফেলাটাই সঙ্গে সঙ্গে তার জন্য আরও হাজারো চাহিদার দুয়ার খুলে দেয়। এখানে লক্ষ করার মতো আরেকটি মজার ব্যাপার আছে। দুটো কঠিন বস্তবতা নিরন্তর মানুষের এই ‘অসীম চাহিদা’র লাগাম টেনে ধরে রেখেছে। তার একটি বস্তুতান্ত্রিক এবং আরেকটি নৈতিক। এক. মানুষ যত বিত্তশালীই হোক না কেন, দিনের শেষে তার সম্পদ সীমিত।

সীমিত সম্পদের কারণে সে তার সব চাহিদা মেটাতে পারে না। চাহিদার মাঝে তার জন্ম এবং অসংখ্য অপূর্ণ চাহিদা নিয়েই সে দুনিয়া থেকে বিদায় নেয়। প্রাণীকুলের বেলাও এ-কথা সত্য। তাদের বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন খাদ্য ও পানীয়। তাদের জন্যও জগতে এ দুই বস্তুর জোগান সীমিত। দুই. মানুষ তার জীবনে এই সীমিত সম্পদ আহরণের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে আরও একটি কঠিন ও কঠোর বস্তবতাকে সঙ্গে নিয়ে। এই বাস্তবতা আর কিছু নয়, সমাজ, রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রীয় আইন-আদালত, সর্বোপরি নিজের বিবেকের কাছে তার দায়বদ্ধতা ও জবাবদিহিতা। অর্থাৎ সে যেনতেন তরিকায় সম্পদ আহরণ করতে পারে না।

প্রাচীন কালে যখন সমাজ এবং রাষ্ট্র ছিল না, তখনও মানুষের দায়বদ্ধতা ছিল গোত্র, পরিবার ও আপন বিবেকের কাছে। তাহলে এ পর্যন্ত আমরা পশুর সাথে মানুষের দুটো মৌলিক তফাৎ পেলাম। প্রথমত ‘অসীম চাহিদা’ এবং দ্বিতীয়ত ‘দায়বদ্ধতা ও জবাবদিহিতা’। তৃতীয়ত যে বৈশিষ্ট্য মানুষের মর্যাদাকে পশুর চেয়ে যোজন যোজন উপরে তুলে ধরে সেটি হলো- মানুষ বিচার-বিবেচনাসম্পন্ন প্রাণী। দুজন মানুষের মধ্যে ঝগড়াঝাটি ও মারামারি হলে তৃতীয়জন বুদ্ধি-বিবেচনা ও ন্যায়নীতির ভিত্তিতে বিচার ফয়সালা করে দিতে পারে। পক্ষান্তরে পশুর এই যোগ্যতা নেই। এই ৩টি বিশেষ বৈশিষ্ট্য মানুষ ও পশুর মাঝে যে বিভাজনের দেয়াল তুলেছে সে দেয়াল ‘বিবর্তনবাদে’র হাত ধরে ক্রমে ক্রমে কীভাবে টপকানো যায়, তা আমার জানা নেই।

সবশেষে, সৃষ্টি রহস্য নিয়ে কৌতূহলী মানুষের চূড়ান্ত প্রশ্নে বিজ্ঞানের অবস্থান নিয়ে সংক্ষেপে কয়েকটি কথা বলে আজকের লেখাটির ইতি টানব। অবিজ্ঞানী সাধারণ মানুষের পক্ষে আলোচ্য বিষয়টি সমঝে নেওয়া একেবারে সহজ না হলেও কঠিন নয়। এবার দেখা যাক, মহাবিশে^র মহাসৃষ্টি কেন ও কীভাবে হয়েছিল? এ প্রশ্নে বিজ্ঞান কী উত্তর দেয়। বিজ্ঞানের মতে সৃষ্টির সূচনা হয়েছে ‘বিগ ব্যাঙ্গ সিঙ্গুলারিটি’তে। ওই পর্যায়ে মহাবিশে^র যাবতীয় বস্তু ক্ষুদ্রাতি ক্ষুদ্র, সীমাহীন ক্ষুদ্র একটি বিন্দুতে জমাট বাঁধা ছিল। ওই বিন্দুর ঘনত্ব ছিল অসীম, বক্রতাও ছিল অসীম এবং তার আকার ছিল এতই ছোট যেন শূন্যেরই নামান্তর। ১০ থেকে ২০ বিলিয়ন বছর আগে, ওই জমাট বাঁধা বিন্দুতে ‘বিগ ব্যাঙ্গ’ বিস্ফোরণ ঘটে, যার মধ্যদিয়ে সৃষ্টি হয় স্থান (স্পেস) ও তার নিরন্তর সম্প্রসারণ প্রক্রিয়া এবং কাল (টাইম) ও তার নিরন্তর পথ চলা।

গেল ১০০ বছরে বিজ্ঞানী ও মহাবিজ্ঞানীরা অনেক জটিল ও কঠিন তত্ত্ব ও সূত্র আবিষ্কার করেছেন, যা দিয়ে মহাবিশে^র যে কোনো সময়ের অবস্থা পর্যালোচনা করে আগামীতে কী হতে পারে সেই মর্মে ভবিষ্যদ্বাণী করছেন এবং সেগুলো মোটামুটি সঠিকই হচ্ছে; কিন্তু সৃষ্টির ‘বিগ ব্যাঙ্গ’ রহস্য উন্মোচনের জন্য ওইসব তত্ত্বজাত সমীকরণগুলোকে যখন অসীম ঘনত্ব ও বক্রতাসম্পন্ন এবং অসীম ক্ষুদ্রকায় ওই জমাট বাঁধা বিন্দুতে নিয়ে প্রয়োগ করা হয় তখন গোটা তত্ত্ব ভেঙে খান খান হয়ে ধসে পড়ে। সসীমে যা কাজ করে, অসীমে তা অচল! তাই সৃষ্টি রহস্যের মূল প্রশ্নে (জমাট বাঁধা বিন্দুটি কেন বিস্ফোরিত হলো?) মহাবিজ্ঞানীরা অনাথ শিশুর মতোন অসহায়!

বি. দ্র. : এই লেখায় যদি কোনো কৃতিত্ব থেকে থাকে তবে তার দাবিদার জাকির মাহদিন এবং মাহবুুবুর রহমান চৌধুরী। ভুল-ভ্রান্তি যা আছে তার দায়বার আমার, একান্তই আমার।

লেখক : অধ্যাপক, টেনেসি স্টেট ইউনিভার্সিটি; এডিটর, জার্নাল অব ডেভোলাপিং এরিয়াজ

এই বিভাগের আরো সংবাদ