শিক্ষার মাধ্যমিক স্তরের কিছু বাস্তব অবস্থা ও আমাদের করণীয়

  সঞ্জয় চৌধুরী

০১ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১৩:২৪ | অনলাইন সংস্করণ

মানুষের ভেতর ঘুমন্ত সত্তাটিকে জাগিয়ে তোলার নামই শিক্ষা। আর শিক্ষার্থীদের মাঝে এটিকে জাগিয়ে তোলার দায়িত্ব অভিভাবক–শিক্ষক–শিক্ষিকা ও সর্বোপরি রাষ্ট্রের। এটি যদি বাস্তব প্রতিফলিত হয় তাহলে শিক্ষার ফল সোনালী সূর্যের মত আমাদের জীনকে সুখ শান্তিতে ভরে দেবে।
আমরা কি সেই সুখ শান্তি চাই না? নিশ্চয়ই চাই। কতবার বর্তমান হয়ে গেছে ব্যথিত অতীত। এখন সমৃদ্ধ ভবিষ্যতের কথা ভেবেই বর্তমানে মাধ্যমিক শিক্ষার কথা ভাবতে হবে। এ শিক্ষার আলো প্রবাহিত হবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে, যার মধ্য দিয়ে আমরা পাব একটি দক্ষ মানবসম্পদ, যাদেরকে নিয়ে আমরা দাঁড়াব পৃথিবীর কাছে মাথা উঁচু করে।
আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা অনেকটা বেশ কয়েক তলা বিশিষ্ট একটি অট্টালিকা বা ইমারতের মতো, যার মধ্যে আছে প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক, স্নাতক বা ডিগ্রি এবং স্নাতকোত্তর বা পোস্ট গ্র্যাজুয়েট স্তর। তার গোড়া বা ভিত্তি হচ্ছে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তর। ভিত্তি দূর্বল হলে যেমন গোটা ইমারতটি দূর্বল এবং নড়বড়ে হয়ে পড়ে, তেমন অবস্থা শিক্ষারও।
বর্তমানে আমাদের দেশে প্রাথমিক ও উচ্চমাধ্যমিকের মাঝখানে স্তর হল মাধ্যমিক শিক্ষা ২০১০ সালে প্রণীত শিক্ষানীতিতে নবম থেকে দ্বাদশ পর্যন্ত মাধ্যমিক স্তর হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। যদিও এখনো পর্যন্ত আমাদের দেশে ষষ্ঠী থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত মাধ্যমিক স্তর হিসেবে চালু আছে। প্রাথমিক স্তরে একজন শিক্ষার্থীর জীবনে বাস্তবতার সঙ্গে মিল খোঁজার ধারণা খুবই কম থাকে। মাধ্যমিকে ঐ শিক্ষার্থী পদার্পণ করার পর আস্তে আস্তে সে জীবনের বাস্তবতার সঙ্গে কিছু কিছু মিল খোঁজার চেষ্টা করে। এরপর নবম শ্রেণিতে সে যখন উত্তীর্ণ হয় তখন বিভাগ নির্ধারণের ক্ষেত্রে তাকে চিন্তা করতে হয়, ভবিষ্যতে কোন পেশায় নিয়োজিত হলে সেটা তার জীবনের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ হয়। এ কারণে একজন শিক্ষার্থীর জন্য এ স্তরটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
এ ব্যাপারে একজন মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষক তার মেধা ও কর্মস্পৃহার বিষয়টুকু বিবেচনায় এনে বিভাগ নির্ধারণের ক্ষেত্রে তাকে গুরুত্বপূর্ণ সহযোগিতা প্রদান করতে পারেন। এ ক্ষেত্রে অষ্টম শ্রেণি থেকে তাকে যদি তার মেধানুসারে বিভাগ নির্বাচনের বিষয়টুকু মাথায় একবার ঢুকানো যায় তখন সে এ ব্যাপারে মানসিকভাবে প্রস্তুতি নিয়ে ভবিষ্যতে পছন্দের বিভাগ নেয়ার আশায় জে.এস.সিতে ভাল ফল অর্জন করে নবম শ্রেণিতে বিভাগ নির্বাচনের ক্ষেত্রে ভুল সিদ্ধান্তটুকু হাতে নেবে না একটি আমার দৃঢ় বিশ্বাস।
আমাদের দেশে এখনো দেখা যায় বিজ্ঞান বিভাগ থেকে একজন শিক্ষার্থী এস.এস.সি পাস করে উচ্চ মাধ্যমিকে মানবিক কিংবা ব্যবসায় শিক্ষায় অথবা ব্যবসায় শিক্ষা থেকে মানবিক কিংবা মানবিক থেকে ব্যবসায় শিক্ষায় ভর্তি হয়। হয়তো বা কোন রকমে এইচ.এস.সি পাস করে সে বৈতরণী পার হল।
কিন্তু এর পর আমরা দেখি উচ্চ শিক্ষার জন্য যখন সে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির নিমিত্ত প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে তখন ঐ পরীক্ষাসমূহে সে আর টিকে থাকতে পারে না। এটিই বর্তমানে আমাদের দেশের বাস্তব অবস্থা। এক্ষেত্রে একজন অভিভাবক যদি নবম শ্রেণিতে শিক্ষকের পরামর্শক্রমে তাঁর সন্তানের বিভাগ নির্ধারণ করতো হয়তো বা ঐ শিক্ষার্থীর জীবনে এতবড় বিপর্যয় হত না।
সাধারণত বিদ্যালয় সমূহে দেখা যায় যে, আর্থিক অস্বচ্ছলতাজনিত কারণে তীক্ষ্ম মেধাবী অনেক শিক্ষার্থী বিজ্ঞান বিভাগে লেখাপাড়া করতে অনীহা প্রকাশ করে। এ ক্ষেত্রে অভিভাবকদের বদ্ধমূল ধারণা বিজ্ঞান বিভাগ নিয়ে লেখাপড়া করতে হলে বিভিন্ন কোচিং সেন্টার ও শিক্ষকদের বাসায় গিয়ে প্রাইভেট পড়তে হয়। একজন বিজ্ঞান শিক্ষককে অভিভাবকদের এই ভ্রান্ত ধারণাকে দূরীভুত করে আর্থিক অস্বচ্ছল পরিবারের মেধাবী শিক্ষার্থীরাও যেন বিজ্ঞান শিক্ষার প্রতি আকৃষ্ট হয় সে ব্যাপারে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে।
একজন বিজ্ঞান শিক্ষক যদি বিজ্ঞানাগারে বিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয়গুলোকে পাঠ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন উপকরণের মাধ্যমে তত্ত্বীয় দিকের সাথে সাথে ব্যবহারিক দিকটাও ভালভাবে একজন শিক্ষার্থীকে অনুধাবন করাতে পারেন তাহলে আমি মনে করি ঐ শিক্ষার্থী কোচিং সেন্টার কিংবা শিক্ষকের বাসায় প্রাইভেট পড়ার উপর নির্ভরশীল না হয়ে সে স্ব–উদ্যোগে বিজ্ঞান শিক্ষার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে এস.এস.সি–তে কৃতিত্বের স্বাক্ষর বহন করবে তাতে কোন সন্দেহ নেই। যদিও সাম্প্রতিক শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন সেসিপ বিজ্ঞান শিক্ষার প্রসারের লক্ষ্যে ‘হাতে কলমে বিজ্ঞান শিক্ষা’ নামে একটি প্রশিক্ষণ শিক্ষকদের ইতিমধ্যে প্রদান করেছেন।
এটি সরকারের যুগোপযোগী প্রশংসনীয় একটি উদ্যোগ। এছাড়া ক্ষীণ মেধাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের ভোকেশনালে এস.এস.সি পাসের পর তাদেরকে পরবর্তীতে টেকনিক্যাল শিক্ষায় উদ্বুদ্ধ করতে হবে। এখান থেকে তারা নিজের পছন্দশই একটি বিষয়কে বেছে নিয়ে পরবর্তীতে সে ঐ বিষয়ের উপর দক্ষতা অর্জন করে এদেশের মানবসম্পদ উন্নয়নে নিজের অংশগ্রহণের মাধ্যমে দেশের অর্থনৈতিক ভিত্তিকে সুদৃঢ় করার ক্ষেত্রে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখতে পারে।
এজন্য আমি বলব আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা এরূপ হওয়া উচিত যে ব্যবস্থায় কেউ ইচ্ছা হলেই বিজ্ঞান কিংবা ব্যবসায় শিক্ষা বা মানবিক পড়বে তা নয়। প্রতিটি শিক্ষা স্তরেই শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ হয়ে যাওয়া উচিত। শিক্ষা ব্যবস্থা থেকেই একজন শিক্ষার্থী প্রয়োজনীয় দিক নির্দেশনা পাবে। সেখানে অন্য কারো কিছু করার থাকবে না। শিক্ষাব্যবস্থাই শিক্ষার্থীদের মেধা ক্রমানুসারে তাদের স্ব স্ব গন্তব্যে নিয়ে যাবে।
এরূপ একটি ব্যবস্থায় আমরা যদি আমাদের মাধ্যমিক শিক্ষাব্যবস্থাকে নিয়ে যেতে পারি তাহলে দেশ বেকারত্ব নামক শনির রাহু থেকে মুক্ত হয়ে অচিরেই বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশ সমূহের কাতারে সামিল হবে। পরিশেষে, আমি বলব ২০১০ সালে প্রণীত আমাদের জাতীয় শিক্ষানীতির আলোকে একটি মানসম্মত শিক্ষা ব্যবস্থা বাস্তবায়নের মাধ্যমে এদেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সুশিক্ষায় শিক্ষিত করে দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নের মাধ্যমে বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশসমূহের কাতারে বাংলাদেশ উঁচু করে দাঁড়াবে আমি সেই দিনের অপেক্ষায় রইলাম। (দৈনিক পূর্বকোণ থেকে সংগৃহীত)

লেখক : শিক্ষক ও কলামিস্ট

এই বিভাগের আরো সংবাদ