১৮টি গুলি লেগেছিল বঙ্গবন্ধুর গায়ে

  বিপ্লব বড়ুয়া

২৯ আগস্ট ২০১৮, ১২:৪৪ | অনলাইন সংস্করণ

বঙ্গবন্ধুর গায়ে ১৮টি গুলি লেগেছিল, তবে মুখে কোনো গুলি লাগেনি। দু’পায়ের গোড়ালীর ২টি রগই ছিল কাটা। মৃত্যুর পরেও গায়ের পাঞ্জাবীর বুক পকেটে চশমা, সাইড পকেটে তার প্রিয় পাইপ এবং গায়ে সাধারণ তোয়ালে জড়ানো ছিল। মিলিটারীরা রক্তাক্ত কাপড়সহ বিনা গোসলে লাশ কবর দেয়ার নির্দেশ দিয়েচিল। কথাগুলো বলেছিলন মৌলভী শেখ আবদুল হালিম।

তিনি বলেন, মর্মান্তক সংবাদটা শুনি ১৫ আগস্ট সকালে রেডিওতে। ঐ রেডিওতে ঘোষণা করা হয়, স্বেরাচারী শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করা হয়েছে। সমগ্র দেশবাসীর মতো আমরাও স্তম্ভিত হয়ে যাই। হতভম্ব হয়ে পড়ি, মনে হল অবিশ্বাস্য। এ যেন বিনা মেঘে বজ্রপাত। পরদিন দুপুর ১২টার সংবাতে জানায়, শেখ মুজিবের লাশ টুঙ্গীপাড়ায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। ১৬ তারিখ সকালেই থানার ওসি ডেকে বলেছিলেন, আপনি তেরটা কবরের বন্তোবস্ত করেন।

চলে এলাম, কবর খুড়লাম। তবে একটা নয় ভাবলাম তেরোটি খুড়ে কি হবে। আগে তো একটি খুড়ি। তারপর দেখা যাবে যা হয়। ৯টা সাড়ে ৯টায় কবর খোড়া শুরু করি আর ভাবি এখানেই বঙ্গবন্ধুর দাফন হবে। যদি তাই হয় এবং আমি যদি তাকে কবর দিতে পারি তবে ধন্য হই। দুপুর ১২টার আগেই কবর খোড়া শেষ হয়। তার পরপরই দ্বিতীয় ঘোষণাটা শুনি রেডিওতে। নিশ্চিত হই, বঙ্গবন্ধুকে এখানেই সমাহিত করা হবে।

বঙ্গবন্ধুর পারিবারিক গোরস্থানে প্রথমে রয়েছে তার মায়ের কবর, তারপর বাবার, বাবার কবরের পশ্চিমে সবদিকে একটু জায়গা ছেড়েই বঙ্গবন্ধুর কবর খুড়ি। অন্যান্যদের মধ্যে মদেল ফকিন (চৌকিদার) আবদুল মান্নাফ, ইমাম উদ্দিন গাজী কবর খোড়ায় সাহায্য করে। তারপর বেলা দেড়টার দিকে বঙ্গবন্ধুর লাশ হেলিকপ্টার যোগে টুঙ্গিপাড়া ডাক বাংলায় পৌঁছে। একজন মেজরের নেতৃত্বে ১৩ জন সৈনিক লাশের কফিন বয়ে আনে বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে। ডাকবাংলায় অবশ্য আরো ১২/১৩ জন সৈনিক ছিল। ইতিমধ্যেই বঙ্গবন্ধুর বাড়ির পাশে রাস্তায় ব্যাপক ভীড় জমে যায়। যদিও কাউকে ভেতরে ঢুকতে দেয়া হয়নি। মেজর সাহেব স্থানীয় মৌলভীকে ডেকে আনার সংবাদ দিলে আমি চলে আসি।

মেজর জিজ্ঞাসা করলেন, আপনি কি এখানকার মৌলভী? উত্তরে বললাম, জ্বি হ্যা। এরপর তিনি আমাকে লাশের জানাজার নামাজ পড়ার নির্দেশ দেন। মেজর সাহেবকে জিজ্ঞাসা করলাম, কার জানাজার ব্যবস্থা করবো? মেজর উত্তরে বললেন, শেখ মুজিবের ডেড বডি। তখন আমি ইংরেজীতে বললাম- ইজ দ্যা ডেড বডি অব শেখ মুজিব? উত্তর দিলো- হ্যা। উদ্দেশ্য ছিলো কফিন খুলবো। বঙ্গবন্ধুকে দেখবো তারপর মাটি দেব। কিন্তু মেজর সাহেব আমাকে বলেছিলেন, কফিনসহ জানাজা পড়ে মাটি দিতে। যদিও আমি তা চাইছিলাম না। মেজর সাহেবকে আবার বললাম, আই মাস্ট সী দ্য ডেড বডি। মেজর সাহেব বললেন, ডু ইউ নট বিলিভ আস? আমি বললাম, আই বিলিভ ইউ, বাট ওয়ান্ট টু সি ফর মাই স্যাটিসফেকশন। তারপর মেজর কফিনের তালা খুলে দেওয়ার নির্দেশ দেন। ২-৩ জন সৈন্য তা খুলে দেয়। প্রথমেই দেখলাম মুখ রক্তাক্ত। কফিনের বাহিরে অবশ্য কোনো রক্ত ছিলো না।

তারপর মেজর সাহেবকে বলি, ওনাকে তো গোসল দেয়া হয়নি। বিনা গোসলে কোনো মুসলমানের জানাজা পড়ার জায়েজ নেই। মেজর জিজ্ঞাসা করেন, বিনা গোসলে মুসলমানের জানাজা হয় না? বললাম, হয় কেবল মাত্র শহীদের লাম বিনা গোসলে জানাজা করা হয়। তবে সম্ভব হলে তাও গোসল করানো উচিত। মেজর তারপর লাশের গোসলের নির্দশে দিলেন। সময় দিলেন ২ মিনিট। আমি পুনরায় বললাম, গোসল করাতে আমার কজন লোক লাগবে। তিনি আমাকে বললেন, সর্বাধিক ৮ জন নিতে পারেন।

বেলা তখন ২টা। আমি ৮ জন লোক ডাকি। এদের মধ্যে পূর্বের ওরাও ছিলেন। সবাই মিলে কফিন থেকে লাশ নামাই। রাখি তক্তার উপর। তক্তা যোগাড় করি বঙ্গবন্ধুর বাড়ি থেকেই। একটা ছেলেকে পাঠাই টুঙ্গিপাড়া সাহেরা খাতুন হাসপাতালে। আমার দ্বিতীয় পূত্র ষ্টোর ইনচার্জ শেখ আব্দুল হাসিবের কাছে সাবান, গরম পানি ও কাফনের কাপড়ের জন্য। অল্পক্ষণের মধ্যেই একখানা ৫৭০ সাবান রেডক্রসের ৪ খানা সাদা পাড়ওয়ালা শাড়ী নিয়ে ছেলেটি ফেরত আসে তড়িঘড়ি। পেছনের কাজ সেরে আমরা কাপড় পড়ালাম। খালি গা উল্টে-পাল্টে সব দিকই দেখছি। পেটের নীচে পিছন দিক হতে একটি গুলি ঢুকে সামনের দিকে তলপেট দিয়ে বেরিয়ে গেছে। ৯টা গুলি বাঁ বুকের নীচ দিয়ে চক্রাকারে ঢুকেছে তবে বের হয়নি। বাঁ হাতের তর্জনীতে একটি গুলি লেগেছে এবং আঙ্গুলটি প্রায় ছিন্ন ও থেতলানো। দুই বাহুর উপরিভাগে আছে দুইটা ও আরেকটি সম্ভবতঃ ডান হাতের তালুতে। দুই পায়ে ৪টি, দুটি হাটুর এবং ওপরে নীচে দুটি অর্থাৎ ১৮টি গুলি বঙ্গবন্ধুর শরীরে লাগে। তাছাড়া দুই পায়ের গোড়ালীর দুটি রগই কাটা ছিল। মুখে বা বুকে কোনো গুলির চিহ্ন ছিলো না।

লাশ ঢাকা ছিল সাদা চাদর দিয়ে। পরনে চেক লুঙ্গি, গায়ে গেঞ্জী, সাদা পাঞ্জাবী গায়ে ছিল। তারপর জানাজা হয়। জানাজায় সর্বসাকুল্যে জন পঁচিশেক লোক অংশ নেয়। বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর তার কবর পাহারা দেয়ার জন্য সরকার ১০/১৫ জন পুলিশ মোতায়েন করেন। এরা দিবা-রাত্র পালা করে পাহারা দিত। বাড়ির লোক ছাড়া কাউকে বাড়িতে ঢুকতে দেয়া হত না। বঙ্গবন্ধুর দাফনের চারদিনের মাথায় বাড়ির মসজিদে মিলাদ পড়তে দেয়া হয়নি পুলিশ, বাধা দেয়। কেবলমাত্র বঙ্গবন্ধুর গৃহে একজন মৌলভী ডেকে মিলাদ পড়ানো হয়েছিল। টুঙ্গিপাড়ার অন্যান্য মসজিদে মিলাদের ব্যবস্থা হয়েছিল।

লেখক : মৌলভী শেখ আব্দুল হালিম, স্থানীয় মসজিদের ইমাম। ১৯৯৩ সালে তার মৃত্যুর পূর্বে পত্রিকায় সাক্ষাৎকারটি প্রকাশিত হয়েছিল

এই বিভাগের আরো সংবাদ