সাম্প্রতিক সময়ের উপলব্ধি

  আমিরুজ্জামান পলাশ

২৮ আগস্ট ২০১৮, ২১:১৬ | অনলাইন সংস্করণ

ধরুণ আপনি এদেশের একজন শিক্ষক এবং অভিভাবক। আপনি জাতির বিবেক হয়ে দায়িত্ব নিয়েছেন আগামী প্রজন্মকে নৈতিকতা, জ্ঞান-বিজ্ঞান, দর্শন, সাহিত্য, কলা ও সামাজিক বিজ্ঞানে সমৃদ্ধ করে একটি মেধা নির্ভর সমাজ ও দেশ বির্নিমাণের। আপনার নিকট কোমলমতি সন্তানকে পাঠানো হয়  জ্ঞানের মশাল জ্বালাতে। আর আপনি সেই সন্তানকে শেখাচ্ছেন জ্ঞান নির্ভরতার পরিবর্তে জীবিকা অর্জনের হাতিয়ার হলো শিক্ষা!

ধরুণ আপনি মুখে বলছেন, জাতির পিতার স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়তে হবে, অথচ আপনি আপনার শিক্ষার্থীকে শেখাচ্ছেন কোচিং, প্রাইভেট অতঃপর বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার জন্য কিভাবে প্রশ্ন পত্র সংগ্রহ করে এবং নকল করে উত্তীর্ণ হতে হয় সে সকল পদ্ধতি।

কিন্তু আপনাকে তো  জাতির পিতা বলেছিলেন, ‘সোনার বাংলা বিনির্মাণে চাই সোনার মানুষ’। তিনি বলেছিলেন, কর্মমুখী কারিগরি এবং উৎপাদনমুখী শিক্ষার কথা। তিনি বলেছিলেন, ছাত্র- যুবক ভাইয়েরা ফুল প্যান্টটা একটু হাফ প্যান্ট করো আর ক্ষেতে খামারে গিয়ে উৎপাদন বাড়াও। আমরা সে শিক্ষা কি দিয়েছি আমাদের সন্তানদের?

ধরুণ, আপনি কথায় কথায় রবীন্দ্র চর্চায় নিয়োজিত। আপনি রবীন্দ্রনাথ থেকে কোটেশন দিতে ছাড়েন না অংক ক্লাস থেকে শুরু করে ধর্ম ক্লাস পর্যন্ত। কিন্তু আপনি কি কখনো আপনার সন্তান/শিক্ষার্থীকে বলেছেন, রবীন্দ্রনাথের পুত্র রথীন্দ্রনাথ বিলেত থেকে উচ্চ শিক্ষা নিয়ে শাহজাদপুর আর শিলাইদহে কৃষি কাজে নিয়োজিত থেকে উৎপাদন নির্ভর পেশা বেছে নিয়েছিলেন আমলা বা কেরানী হতে চান নি।

আপনি কি কখনো ওদের বলেছেন, বিলগেটস, স্টিফেন হকিং, মাশরাফি, সাকিব আল হাসান- এরা কেউ আমলা বা কেরানী হননি অথবা জিপি এ-৫ পান নি। আপনি কি কখনো আপনার শিক্ষার্থীকে বলেছেন যে সোস্যাল মিডিয়া ব্যবহার করে দিনের পর দিন হিংসা, বিদ্বেষ, পরশ্রীকাতরতা আর গুজব ছড়ানো হচ্ছে। সেই ফেসবুকের আবিস্কারক জুকারবার্গ কখনো সরকারি চাকুরি করেনি বা জিপিএ- ৫ পান নি। অথচ তাঁরা সফল মানুষ।

ধরুণ, আপনি মার্চ, আগস্ট, ডিসেম্বর আসলেই জাতির পিতার স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ার অঙ্গীকারে ফেনা তুলেন (অবশ্য বঙ্গবন্ধুর অনুসারীরা সরকারে না থাকলে আপনাকে গোয়েবলসীয় তত্ত্বে  ড্রামের উপরের ঘোষক আর খাল কাটার গল্প করতে হয়)। কিন্তু আপনি কি কখনো জাতির পিতার নির্দেশ মোতাবেক মানুষ তৈরি করেছেন? আপনাকে তো জাতির পিতা বলেছিলেন, ‘আমলা নয়, মানুষ তৈরি করুন’। অথচ আপনি যে মানুষ তৈরি করলেন, সে মানুষ এখন আপনাকে বা আপনার ভাই/বোনকেই ‘চ’ বর্গীয় গালি দিয়ে আমলা হতে চায়!

ধরু, আপনার দায়িত্ব রয়েছে নৈতিকতার শিক্ষা দেওয়া। কেন মনে নাই- আপনি পড়েছিলেন, কবি কৃষ্ণ চন্দ্র মজুমদারের কবিতা, ‘যে জন দিবসে মনের হরষে, জ্বালায় মোমের বাতি.....",  অথবা, ‘মহাজ্ঞানী মহাজন যে পথে করেছে গমন, স্বীয় পথ লক্ষ্য করে আমরাও হবো বরনীয়’, অথবা কবি কুসুম কুমারির কবিতা, ‘মুখে হাসি, বুকে বল, তেজে ভরা মন,
মানুষ হইতে হবে মানুষ যখন, কৃষকের সন্তান কিংবা রাজার কুমার, সবারই রয়েছে কাজ এ বিশ্ব মাঝার, হাতে - প্রাণে খাটো  সবে - শক্তি করো দান, তোমরা মানুষ হলে দেশের কল্যাণ’। অথচ আপনার সন্তান মহাজ্ঞানী - মহাজনদের ‘চু’ দিয়ে মানুষ হওয়ার পরিবর্তে আমলা হওয়ার খপ্পরে পড়েছে।

ধরুণ, কোনো আন্দোলনের দাবি পুরণের জন্য যখন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষ আপনাকে বললো, ‘ঠিক আছে তোমরা যা চাও, তা ই হবে, তবে আমিও একজন অবিভাবক। আমারও অধিকার রয়েছে সন্তানের মঙ্গল ভাবনার। তাই একটু সময় নিয়ে চিন্তা ভাবনা করে দেখি কোথায় মঙ্গল নিহিত আছে।’ তখন আপনি এবং আপনার সন্তান উভয়ে মিলে ভাবনার নূন্যতম সময়টুকু না দিয়ে এবার পুরো জাতিকেই ‘চু’ শুরু করলেন! কি অদ্ভুদ আপনাদের খচ্চর প্রিয়তা।

যেখানে এডওয়ার্ড সাঈদ হেরে যান- সেখানে থেকেই যাত্রা শুরু করেন সুবিধার চেয়ারে বসা মেরুদন্ডের ক্ষয় আক্রান্ত আপনারা ভালো নাপিতগণ (সুশীল)। আপনাদের প্রিয় পাখির তালিকায় থাকে উট পাখি, তাই আপনারা ঘোড়া অথবা গাধার চাইতে অধিক পছন্দ করেন খচ্চর। আপনাদের খচ্চর প্রিয়তার কারণ খচ্চরের জন্ম যেমন ঘোড়া আর গাধার মিলনে- আপনাদের মনোজগতের বিকাশও তেমনই খচ্চর জন্মের মতোনই কিছুটা মুক্তিযুদ্ধ, কিছুটা রাজাকারতন্ত্র, কিছুটা জাতীয়তাবাদ, কিছুটা আন্তর্জাতিককতাবাদ, কিছুটা দালালীর মোড়ক (গোপনে মনের গহীনে) এবং পুরোটাই সুবিধাবাদের মিশ্রনে.... ’। তাই, আপনারা গায়ের রং বদলিয়ে গিরগিটি হয়ে যান!

কি দারুণ বায়স্কোপের নেশা আমায় ছাড়ে না!

লেখক : সাহিত্যিক

এই বিভাগের আরো সংবাদ