অসাম্প্রদায়িকতা ও নজরুল : রফিকুল ইসলাম

  অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ২৭ আগস্ট ২০১৮, ১৩:০৪

ঢাকা, ২৭ আগস্ট, এবিনিউজ : নজরুল ইসলাম তাঁর ‘আমার কৈফিয়ৎ’ কবিতায়     লিখেছেন : মৌ-লোভী যত মৌলবী আর ‘মোল্-লা’রা কন হাত নেড়ে’,/দেব-দেবী নাম মুখে আনে, সবে দাও পাজিটার জা’ত মেরে!/ফতোয়া দিলাম—কাফের কাজী ও, যদিও শহীদ হইতে রাজী ও!/‘আমপারা’ পড়া হাম্বড়া মোরা এখনো বেড়াই ভাত মে’রে।

বাঙালি মুসলমান সমাজের এক শ্রেণির গোঁড়াদের অসহনশীলতার প্রতি ওই উক্তি করা হয়েছিল। মধ্যযুগের শুরু থেকেই বাংলাদেশে মুসলমান কবি-সাহিত্যিকরা প্রতিক্রিয়াশীলদের আক্রমণের লক্ষ্য হয়েছিলেন।

মধ্যযুগে মুসলমানদের আগমনের ফলে বাংলাদেশে বাংলা ভাষায় সাহিত্যচর্চার পথ প্রশস্ত হয়েছিল সন্দেহ নেই; কিন্তু বাংলা ভাষায় সাহিত্য চর্চা করতে গিয়ে বাঙালি মুসলমান কবিরা মধ্যযুগেও গোঁড়াদের আক্রমণের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছিলেন।

মধ্যযুগে বাংলা ভাষায় সাহিত্যচর্চাকারী মুসলমান কবিদের ওপর ধর্মান্ধ, গোঁড়া, রক্ষণশীলদের আক্রোশের অন্ত ছিল না এবং বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের প্রতি তাদের বিরূপতাও নিশ্চয়ই অত্যন্ত উগ্র ছিল। তাই আবদুল হাকীম তাঁর ‘নূরনামা’ গ্রন্থে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যবিরোধীদের উদ্দেশে লিখেছেন :

যেসব বঙ্গেতে জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী।/সেসব কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি/দেশি ভাষা বিদ্যা যার মনে ন জুয়ায়।/নিজ দেশ ত্যাগী কেন বিদেশে ন যায়/মাতা-পিতামহ ক্রমে বঙ্গের বসতি।/দেশি-ভাষা উপদেশ মনে হিত অতি।

আবদুল হাকীম যাদের উদ্দেশে এই কথাগুলো বলেছিলেন, মধ্যযুগের পরেও বাঙালি মুসলমান সমাজ থেকে তাদের প্রাদুর্ভাব দূরীভূত হয়নি। আধুনিককালেও আমরা দেখেছি বাঙালি মুসলমানের মাতৃভাষা কি উর্দু, না বাংলা—এ নিয়ে পত্রপত্রিকায় হাস্যকর তর্কবিতর্ক।

কবি কাজী নজরুল ইসলামও গোঁড়া উগ্র প্রতিক্রিয়াশীলদের আক্রমণের বিষয়বস্তু হয়েছিলেন। নজরুল তাদের আঘাতের লক্ষ্য হয়েছিলেন। কারণ নজরুল মুসলমান হয়েও শুধু মুসলমানের জন্য লেখেননি, জাতি-ধর্ম-নির্বিশেষে সব মানুষের জন্যই লিখেছিলেন। নজরুলকে তারা ঘৃণা করত। কারণ নজরুল মুসলমান হলেও শুধু মুসলমানদের কথাই লেখেননি, সর্বমানবের কথা লিখেছেন। নজরুলকে তারা ধর্মচ্যুত করতে, জাতিচ্যুত করতে চেয়েছিল। কারণ নজরুল ইসলামী ঐতিহ্যের উত্তরাধিকারী হওয়া সত্ত্বেও তাঁর কাব্যের উপাদান বাংলাদেশে প্রচলিত আর্য, অনার্য সর্ব-ঐতিহ্য থেকেই গ্রহণ করেছিলেন। তারা নজরুলকে পছন্দ করেনি। কারণ বাংলাদেশের সব সম্প্রদায়ের মধ্যে নজরুলের কবিতা, নজরুলের গান, নজরুলের ব্যক্তিত্ব জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল।

গোঁড়া মুসলমানরা নজরুলকে পছন্দ করতে পারত, যদি নজরুল শুধু মুসলমানদের কথাই লিখতেন। যদি তিনি শুধু নিজের ঐতিহ্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতেন। কিন্তু নজরুল মহৎ প্রতিভার অধিকারী ছিলেন এবং কোনো মহৎ শিল্পীর পক্ষেই নিজের ধর্ম, সমাজ-সম্প্রদায়, দেশ ও কালের গণ্ডির মধ্যে আবদ্ধ হয়ে থাকা সম্ভব নয়, নজরুলও তা পারেননি, পারলে তিনি নজরুল হতে পারতেন না।

কাজী নজরুল কূপমণ্ডূক হতে পারেননি বলেই স্বসমাজের প্রতিক্রিয়াশীলদের আক্রমণের লক্ষ্য হয়েছিলেন। মধ্যযুগে বাঙালি মুসলমান কবি-সাহিত্যিকদের প্রতি যে আঘাত ও আক্রমণ এসেছিল, আধুনিক যুগে নজরুলের প্রতি স্বসমাজের গোঁড়া প্রতিক্রিয়াশীলদের যে বিরূপ আচরণ তার প্রকৃতিও একই প্রকার।

নজরুলের ধূমকেতু পত্রিকা প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ১৯২২ খ্রিস্টাব্দের ১২ জুলাই। এই ধূমকেতু পত্রিকার জন্যই নজরুলকে একদিকে ইংরেজ শাসকদের, অন্যদিকে গোঁড়া মুসলমানদের বিষদৃষ্টিতে পড়তে হয়েছিল। ওই পত্রিকার জন্যই শাসক নজরুলকে কারাগারে প্রেরণ করেছিল, অন্যদিকে স্বধর্মীরা তাঁকে কাফের, শয়তান ইত্যাদি আখ্যায় ভূষিত করেছিল। আজকের দিনে নজরুলের প্রতি স্বসম্প্রদায়ের এক শ্রেণির মানুষের হৃদয়হীন আচরণের ইতিহাস তুলে ধরার প্রয়োজন রয়েছে। কারণ তাদের উত্তরসূরিরা আজও সক্রিয়।

ইসলাম দর্শন পত্রিকায় ধূমকেতু প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই নজরুলের বিরুদ্ধাচরণ শুরু হয়।

নজরুল ধূমকেতু পত্রিকায় নব্যতুর্কি বীর কামাল পাশার প্রশস্তিসূচক একটি প্রবন্ধ ছাপেন। এতে নজরুল লিখেছিলেন :

দাড়ি রেখে, গোশত খেয়ে, নামাজ-রোজা করে যে খিলাফত উদ্ধার হবে না, দেশ উদ্ধার হবে না, তা সত্য, মুসলমান কামাল বুঝেছিলেন...সে (মোস্তফা কামাল পাশা) দেখলে যে বাবা, যত পেল্লায় দাড়িই রাখি আর উঠবোস করে যতই পেটে খিল ধরাই, ওতে আল্লার আরশ কেঁপে উঠবে না। আল্লার আরশ কাঁপাতে হলে হায়দারি হাঁক হাঁকা চাই,— ওসব ধর্মের ভণ্ডামি দিয়ে ইসলাম উদ্ধার হবে না, ইসলামের বিশেষত্ব তলোয়ার...

নজরুলের ‘কামাল’ প্রবন্ধের ওপরের অংশগুলো রক্ষণশীলদের কিরূপ ক্ষিপ্ত করে তুলেছিল তার পরিচয় পাই মিহির, সুধাকর, ইসলাম প্রচারক প্রভৃতি সাপ্তাহিক ও মাসিক পত্রের খ্যাতনামা সম্পাদক প্রবীণ সাহিত্যিক মুনশী মোহাম্মদ রেয়াজউদ্দিন আহমদের লেখা ইসলাম দর্শন পত্রিকায় প্রকাশিত ‘লোকটা মুসলমান না শয়তান’ প্রবন্ধে।

ইসলাম দর্শন পত্রিকায় মুনশী রেয়াজউদ্দিন আহমদের লেখা প্রকাশের আগেই নজরুলের বিদ্রোহী, কামাল পাশা ছাড়াও শাত-ইল-আরব, খেয়া পারের তরণী, কুরবানী, মহররম, ফাতেহা-ই-দোয়াজ দহম (আবির্ভাব ও তিরোভাব), আজান, আরবি ছন্দ এবং হাফিজের গজলের অনুবাদ পত্রপত্রিকায় বা পুস্তকাকারে প্রকাশিত হয়েছে।

১৯২৫-২৬ খ্রিস্টাব্দেও নজরুলের প্রতি এই আক্রমণ সমান উদ্যমে চলতে থাকে। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাসের উদ্দেশে লেখা ১৯২৫ খ্রিস্টাব্দের জুলাই মাসে নজরুলের ‘ইন্দ্রপতন’ কবিতাটি আত্মশক্তি পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। এই কবিতার জন্য মোসলেম দর্শন পত্রিকায় ‘ইসলাম বৈরী মুসলমান কবি’ শিরোনামে নজরুলের যথেষ্ট সমালোচনা করা হয়।

শুধু রক্ষণশীল ইসলাম দর্শন বা মোসলেম দর্শন পত্রিকায়ই নয়, নব্য মুসলমান সমাজের মুখপত্র মাসিক মোহাম্মদী পত্রিকায়ও একই ধারায় নজরুল নিধনযজ্ঞ চলতে থাকে। ১৯২৮ খ্রিস্টাব্দের শেষ দিকে, মাসিক মোহাম্মদীর মতো আধুনিক পত্রিকায় নজরুল সমালোচনার যে রীতি অনুসৃত হতে দেখি, তাতে আমাদের পূর্বসূরিদের এক দলের সাহিত্যবোধের অভাব আমাদের বিস্মিত না করে পারে না।

নজরুল প্রতিভার এই শক্তি অনুধাবনের ক্ষমতা শিল্প-সাহিত্য বোধহীন সংকীর্ণ চিত্ত গোঁড়া সমালোচকের না থাকাটাই স্বাভাবিক; কিন্তু অবাক হতে হয়—উচ্চশিক্ষিত বিদেশ প্রত্যাগত, আধুনিক দৃষ্টির দাবিদার এস ওয়াজেদ আলী বার-অ্যাট-লর নজরুল সমালোচনায় একই দৃষ্টিভঙ্গি দেখে।

নজরুল হিন্দু, মুসলমান উভয় ঐতিহ্য থেকেই কাব্যের উপাদান সংগ্রহ করেছেন, আর সে কারণেই তিনি একমাত্র মুসলমান সাহিত্যিক, যাঁর সাহিত্যকর্ম উভয় সমাজেই আদৃত হয়েছে। নজরুলকে গ্রহণ করতে হলে নজরুলকে সম্পূর্ণরূপেই গ্রহণ করতে হবে, খণ্ডিতরূপে নয়। নজরুল হামদ, নাত, মর্সিয়া, গজল যেমন লিখেছেন, তেমনি শ্যামা সংগীত, কীর্তনও লিখেছেন। যেমন তিনি হিন্দু পুরাণ থেকে গ্রহণ করেছেন, তেমনি তিনি মুসলিম ইতিহাসের উল্লেখযোগ্য সব ঘটনাকেই তাঁর কবিতা ও গানে স্মরণীয় করেছেন। সব মিলিয়েই নজরুল সত্যি আর সে কারণেই নজরুল সৃষ্টির বৈচিত্র্যে অপ্রতিদ্বন্দ্বী। এ সত্য ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের ১৪ আগস্টের আগে যেমন এক শ্রেণির মুসলমান অনুধাবন করতে সক্ষম হয়নি, তেমনি পরবর্তীকালে পূর্ব পাকিস্তানেও এক শ্রেণির মানুষ মুক্ত দৃষ্টিতে নজরুল সাহিত্যের বিচার করতে সক্ষম হয়নি। পাকিস্তান আমলে নওবাহার পত্রিকায় কবি গোলাম মোস্তফার নজরুল সমালোচনা এ প্রসঙ্গে স্মরণীয়। আমাদের মধ্যে এমন কেউ কেউ ছিলেন, যাঁরা নজরুল সাহিত্যের একটা অংশকেই গ্রহণ করে বাকি সব কিছু বর্জন করার পক্ষপাতী। যদি শুধু নজরুলের ইসলামী গান ও কবিতাকেই গ্রহণ করতে হয়, বাকি সব কিছু বর্জন করতে হয়, তাহলে নজরুল সাহিত্য ও সংগীতের অনেক সুন্দর অংশই বাদ পড়ে যায়। নজরুলকে শ্রদ্ধা জানানোর এটাই যথার্থ নিদর্শন নয়। পূর্ব পাকিস্তানে সুচারুভাবে নজরুলের বেশির ভাগ সৃষ্টিকে বর্জনের এক গোপন প্রয়াস চলছিল। তাই আমাদের প্রচারমাধ্যমগুলোতে আমরা নজরুলের অনেক উৎকৃষ্ট কবিতা ও গান আর শুনতে পাইনি, নজরুলের নামে প্রতিষ্ঠান গড়ে আমরা নজরুলের সাহিত্য ও সংগীতের অংশবিশেষকেই নজরুলের একমাত্র পরিচয় বলে তুলে ধরেছি।

শিল্প-সাহিত্য ক্ষেত্রে এই নেতিবাচক সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি ক্ষতিকর। নজরুল আজীবন এই ধর্মান্ধতা, গোঁড়ামি, সাম্প্রদায়িকতা আর সংকীর্ণতার বিরুদ্ধেই সংগ্রাম করে গেছেন। আমরা যেন নজরুলকে গ্রহণের ক্ষেত্রে এই সংকীর্ণ সাম্প্রদায়িকতার ঊর্ধ্বে উঠতে সক্ষম হই। শিল্প-সাহিত্যের প্রসারের জন্য গতিমান উন্মুক্ত প্রাণ, মুক্তবুদ্ধির, নবযৌবনের প্রয়োজন—নজরুলের সৃষ্টিতে আমরা তারই ইঙ্গিত পাই।

ওমর ফারুকের মানবপ্রীতি কবিকে কী অপরূপভাবে বিমুগ্ধ করেছে এবং ওপরের কবিতায় কী অপূর্বভাবে তা প্রকাশিত হয়েছে। হৃদয়ের মাধুর্য দিয়ে নজরুল সব উঁচু-নিচু সমান করে দিতে চান। তাঁর ধর্মই হৃদয়ের প্রেম-ধর্ম-যে প্রেম মানুষের কল্যাণে উৎসারিত হয়ে ওঠে। তাই তিনি লিখেছেন : তোমাতে রয়েছে সকল কেতাব সকল কালের জ্ঞান,/সকল শাস্ত্র খুঁজে পাবে সখা খুলে দেখ নিজ প্রাণ!.../এই কন্দরে আরব-দুলাল শুনিতেন আহ্বান,/এইখানে বসি’ গাহিলেন তিনি কোরআনের সাম-গান।/মিথ্যা শুনিনি ভাই,/এই হৃদয়ের চেয়ে বড় কোনো মন্দির-কাবা নাই।     (সাম্যবাদী : সাম্যবাদী)

মানবপ্রেমের ক্ষেত্রে সব ধর্ম এসে হৃদ্-কন্দরে মিলিত হয়েছে—বিশ্ব সেখানে কোলাকুলি করে। এই হচ্ছে কবির বাণী এবং ইসলামের মর্মের রূপ। আমাদের দেশের একটি প্রধান দোষ হচ্ছে সামাজিক বা কুলমর্যাদার মিথ্যা অহংকার। কবি এই ভেদাভেদ মিটিয়ে দিতে চান। তিনি ‘যুগবাণী’তে লিখেছেন, ‘সমাজ বা জন্ম লইয়া এই যে বিশ্রী উঁচু-নিচু ভাব, তাহা আমাদিগকে জোর করিয়া ভাঙ্গিয়া দিতে হইবে। আমরা মানুষকে বিচার করিব মনুষ্যত্বের দিক দিয়া, পুরুষকারের দিক দিয়া। এই বিশ্বমানবতার যুগে যিনি এমনি করিয়া দাঁড়াইতে পারিবেন তাঁহাকে আমরা বুক বাড়াইয়া দিতেছি।’ এখানে মনুষ্যত্বের অর্থ হচ্ছে মানবপ্রীতি আর পুরুষকারের অর্থ বীর-ধর্ম। নজরুলের মধ্যে আমরা একাধারে প্রেমের কোমলতা আর বীরত্বের দৃঢ়তার পরিচয় পাই। ইসলামের ভেতর কবি দেখেছেন এক বিশ্বব্যাপী আজাদীর আহ্বান।

নজরুল বর্তমানে যা পেয়েছেন, তার থেকে এক উন্নততর নতুন বর্তমান গড়ে তোলার প্রয়াসী। মানবতার কল্যাণ-রথ সর্বদা সামনের দিকে চালাতে হবে, পিছে তাকিয়ে হা-হুতাশ করে কোনো লাভ নেই। তাই তিনি বলতে পেরেছেন : যাক্ রে তখ্ত-তাউস,/জাগ্ রে জাগ্ বেহুঁশ!/ডুবিল রে দেখ্ কত পারস্য,/কত রোম গ্রিক্ রুশ;/জাগিল তারা সকল,/জেগে ওঠ্ হীনবল!/আমরা গড়িব নতুন করিয়া/ধুলায় তাজমহল!

(চল্ চল্ চল্ : সন্ধ্যা)

নজরুল আশার কবি—শুধু বৈষয়িক ক্ষেত্রে নন, প্রেমের ক্ষেত্রেও। নজরুলের প্রেমিকা হচ্ছেন এক শাশ্বত প্রতীক্ষামানা অনন্ত সুন্দরী। সর্বদা তার মিলনের জন্য কবি অগ্রসর হচ্ছেন, এক কূলে নৌকা না ভিড়লেও আরেক কূলে ভিড়তে পারে। সব কূলই সেই এক প্রেমময়ীর। নজরুলের একটা গানে আছে :

কেউ ভোলে না কেউ ভোলে অতীত দিনের স্মৃতি/কেউ দুখ লয়ে কাঁদে কেউ ভুলিতে গায় গীতি/কেউ শীতল জলদ হেরে অশনির জ্বালা,/কেউ মঞ্জরিয়া তোলে তার শুষ্ক কুঞ্জ-বীথি/ কেউ জ্বালে না আর আলো তার চির দুখের রাতে,/ কেউ দ্বার খুলি’ জাগে চায় নব চাঁদের তিথি।/

এখানে আশাবাদী নজরুলের মনের টান কোন দিকে তা সহজেই বোঝা যায়। এই ভেদাভেদ চূর্ণকারী মানবতার কবিকে আমরা ভালোবাসি। কবি বহুবার বলেছেন, ‘শ্রদ্ধা আমি অনেক পেয়েছি, কিন্তু ভালোবাসাই দুর্লভ।’ তাঁর আশা ধ্বনিত হয়েছে পূজারিণীর কয়েকটি লাইনে :

ভেবেছিনু বিশ্ব যারে পারে নাই, তুমি নেবে তার ভার হেসে/ বিশ্ব-বিদ্রোহীরে তুমি করিবে শাসন/অবহেলে, শুধু ভালোবেসে।

কবির এ আশা পূর্ণ হয়েছে কি না জানি না; কিন্তু অন্য যেকোনো কবির চেয়ে মানুষের কবি নজরুলকে যে তাঁর গুণেভরা স্বদেশবাসী অনেক বেশি অন্তরঙ্গ বলে অনুভব করে থাকে, এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায়। (কালের কণ্ঠ থেকে সংগৃহীত)

লেখক : ইমেরিটাস অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান, কবি নজরুল ইনস্টিটিউট ট্রাস্টি বোর্ড

এই বিভাগের আরো সংবাদ