বাংলাদেশের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির প্রেক্ষাপট এবং সংকট-কথা

  অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ২৬ আগস্ট ২০১৮, ১৪:০২

নাওজিশ মাহমুদ, আগস্ট ২৬, এবিনিউজ : ১৯৪৭ সালে দ্বি-জাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে ভারত ও পাকিস্তান বিভক্ত হয়। ভারতীয়রা এক জাতি, এই ধারণার বিপরীতে হিন্দু মুসলমানেরা দুই জাতি থেকে দ্বিজাতিতত্ত্ব। ভারতীয় জাতীয়তাবাদের উৎস, প্রেরণা ও ভিত্তি ছিল হিন্দু ধর্ম। বিপরীতে মুসলিম জাতীয়তাবাদের প্রেরণা ও ভিত্তি ছিল ইসলাম ধর্ম। কলকাতাকে কেন্দ্র করে বাংলায় যে রেনেসাঁর বা জাগরণ ঘটে এটারও ভিত্তি ছিল এই ভারতীয় জাতীয়তাবাদ।
১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গকে কেন্দ্র করে কলকাতার এই মধ্যবিত্ত বুদ্ধিজীবীরাই বাংলাকে ঐক্যবদ্ধ রাখার জন্য বাঙালি জাতীয়তাবাদকে সামনে নিয়ে আসেন। কিন্তু ভারতীয় জাতীয়তাবাদকেও বিসর্জন দেন নি। কারণ ভারতীয় জাতীয়তাবাদ এবং হিন্দুত্বকে দিয়ে আর যা কিছু হোক বাংলার মুসলমানদের কাছে টানা যাবে না। আর, বাঙালি মুসলমানেরা যদি সমর্থন না দেয় তা হলে দুই বাংলাকে এক রাখা যাবে না। দুই বাংলাকে এক না রাখলে সর্বভারতে যেমন নিজেদের কর্তত্ব এবং নেতৃত্ব দুই হারাতে হবে। সেই সাথে হারাতে হবে জমিদারী এবং ব্যবসা। কারণ পূর্ব বাংলার বিস্তীর্ণ এলাকার জমিদারদের অধিকাংশই বসবাস করতো কলকাতায় । আর কলকাতা পশ্চিমবঙ্গে ভাগে পড়ে যাওয়ায় জমিদারী বা নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার জন্য হয় পূর্ব বাংলায় নিজেদের স্থানান্তরিত হতে হবে অথবা আলাদা অফিস খুলতে হবে। জমিদারী বা কলকাতা, যে কোন একটা ছাড়তে হবে।
চা বাগানের অধিকাংশই পূর্ব বাংলায় ভাগে পড়ায় রপ্তানী-আমদানীর বিরাট অংশ চলে যাবে চট্টগ্রামে। কলকাতায় রপ্তানীবাণিজ্য ব্যবসার ক্ষতিগ্রস্ত হবে। পশ্চিমবঙ্গ-বিহার-উড়িষ্যা সংযুক্ত প্রদেশে হিন্দু বাঙালি সংখ্যালঘু হওয়ার কারণে রাজনৈতিক নেতৃত্বও হারাবে। কলকাতার হিন্দু বুদ্ধিজীবী ও মধ্যবিত্ত যার অধিকাংশ ছিল ব্রাহ্মণ। তারা নিজেদের কে মনে করে আর্য, বাকীদের অনার্য। ব্রাহ্মণ প্রাধান্য হিন্দু মধ্যবিত্ত ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ বিরোধিতা করতে গিয়ে সাথে রাখতে চাইলো বাঙালি মুসলমানদের কিন্তু বাঙালি মুসলমানরা হঠাৎ হিন্দুদের এই আচরণে আস্থা রাখতে পারে নি। তখন তারা আত্মসচেতন হয়ে উঠে। নিজেদের গুরুত্ব বুঝতে শিখে । হিন্দু ধর্মের বিপরীতে ইসলাম ধর্মকে আশ্রয় করে এগুবার চেষ্টা করে। ফলে, বাঙালি-হিন্দু মুসলিমে বিভক্ত হয়ে পড়ে। বিভক্তির ধারাবাহিকতা এখনও প্রবাহমান। এই অঞ্চলে হিন্দুধর্ম বৌদ্ধধর্ম, ইসলাম ধর্ম এবং খৃস্টান ধর্ম রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা পেলেও জৈন ধর্ম পায় নি। বাংলাদেশে মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠে ইসলাম ধর্ম এবং হিন্দুধর্ম। শশাংকের (৬০৫-৬৩৭ খ্রিস্টাব্দ) পুষ্ঠপোষকতায় হিন্দুধর্ম বাংলায় বিকশিত হলেও বৌদ্ধ পালদের (৭৫৬-১০৪৫ খ্রিস্টাব্দ) আমলে এসে হিন্দুধর্ম বাধাগ্রস্ত হয়। আবার, সেন আমলে (১০৯৭-১২২৩ খ্রিস্টাব্দ) এসে হিন্দুধর্ম রাজধর্ম হিসেবে স্থান করে নেয়। বৌদ্ধধর্ম বাধাগ্রস্ত হয়। ১২২৭ সালে বাংলা অঞ্চল মুসলমানদের শাসনাধীন হলে হিন্দুধর্ম ও বৌদ্ধধর্ম দুটিই বাধাগ্রস্ত হয়। চৈতন্যদেব হিন্দুধর্মকে রক্ষা করলেও বৌদ্ধধর্ম সংকুচিত হয়ে যায়। ইসলাম ধর্ম রাজধর্ম হিসেবে পৃষ্ঠপোষকতা পেয়ে সুফিদের প্রভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালি কৃষকদের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠে।
সোনারগাঁয়ের ফখরুদ্দিন মোবারক শাহ আলাদা স্বাধীন রাজ্য গঠন করেন (১৩৩৮-১৩৫২)। ১৩৫২ সালে লক্ষণাবতীর সামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ সমস্ত বাংলা অঞ্চলকে একত্রিত করে স্বাধীন সুলতানাত- এ- বাংলা গঠন করলে বাংলা ভাষা, বাঙালি জাতি এবং বাঙালি সংস্কৃতির উদ্ভব হয়। যা ছিল সকল ধর্মের কাছে গ্রহণযোগ্য। গড়ে উঠে অন্যের অধিকার ক্ষুণœ না করে সকল ধর্ম পালনের অবাধ অধিকারের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি। ইলিয়াস শাহকে কেন্দ্র করে যে সুলতানাতের উত্থান ঘটে (১৩৫২- ১৫৪০) , তারা ধর্মীয় ভাষার বদলে তখন ফার্সিকে রাজভাষা হিসেবে গ্রহণ করায় ভারতের বাহিরের একটি মানবপ্রেমিক ভিত্তিক আর্ন্তজাতিক সংস্কৃতি চর্চা শুরু হয়।
বাংলা ভাষাকে পৃষ্ঠপোষকতা করায় বাংলা ভাষা সর্বজনীন রূপ পায়। গ্রামেগঞ্জে পীর-মুর্শিদের হাতে ইসলামের সুফি ধারা বিকশিত হয়। চৈতন্যদেবের প্রভাবে বৈষ্ণব ধারা হিন্দুদের মধ্যে বিকশিত হয়। সুফীধারা ও বৈষ্ণব ধারা ছিল বৌদ্ধদের অহিংস ধারার সাথে অনেকবেশী কাছকাছি। যা ছিল হিন্দুধর্মের ব্রাহ্মণ-প্রভান্বিত শৈব ধারা এবং ইসলামের কট্টর ধারা থেকে ভিন্ন। এইসময় মানবপ্রেমিক সাহিত্য রচনার মাধ্যমে বাঙালি সংস্কৃৃতির নতুন অবয়বে আত্মপ্রকাশ ঘটে
১৫৭৫ সালে মোঘলদের হাতে বাংলার স্বাধীনতা পতন হলে এই দুই ধারার অপমৃত্যু ঘটে। নদীয়ার মহারাজার পৃষ্ঠপোষকতায় নবদ্বীপে শৈবধারা ধীরে ধীরে মাথা চাড়া দিয়ে উঠে। সংস্কৃতচর্চা অব্যাহত থাকে। নবাবী আমলের পতন ঘটলে ইংরেজ আমলে হিন্দু জমিদারদের সাথে মুসলিম জমিদারদের অত্যাচারের পটভূমিতে ইসলামে ফরাজী এবং ওহাবীদের উত্থান ঘটে। মজার ব্যাপার হলো, সৌদি আরবের ওহাবীদের কাছ থেকে অনুপ্রাণিত হলেও বাংলায় তােেঁদর রাজনৈতিক চিন্তা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। কারণ অটোমান সা¤্রাজ্যকে ভিতর দিকে পতন ঘটাবার জন্য ইংরেজরা ওহাবীদের সবরকমের পৃষ্ঠপোষকতা ও সাহায্য সহযোগিতা করে। আর, ভারতের ওহাবীরা ইংরজেদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরে । বাংলার ফরাজী এবং ওহাবীরা হিন্দু জমিদারদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ওই ইসলামকে সামনে আনে এবং রাজনৈতিক ইসলামের সূত্রপাত ঘটে। সুফী মতবাদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
ইংরেজরা বাংলা শিক্ষার জন্য ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ (১০ জুলাই ১৮০০) প্রতিষ্ঠা করে। কলকাতার উপকন্ঠে নদীয়ার নবদ্বীপের সংস্কৃত প-িতদের সাহায্য নেয়। কারণ, মুসলমান নবাবদের হাত থেকে ক্ষমতা নেয়ায় আরবী ফার্সী প্রভান্বিত কোন মুসলিম বাংলা বিশেষজ্ঞকে পরিহার করাটাই স্বাভাবিক। ব্রাহ্মণ প-িতদের হাতে পড়ে বাংলা ভাষা সংস্কৃত ও হিন্দু ঐতিহ্য ধারণ করে বিকশিত হয়। কারণ, সংস্কৃত ছিল হিন্দুদের ধর্মীয় ভাষা। যদিও পরে চলতি ভাষা প্রবর্তনের মাধ্যমে বাংলাভাষা কিছুটা সংস্কৃত মুক্ত হয়। স্বাধীন সুলতানেরা বাংলা ভাষাকে পৃষ্ঠপোষকতা করলেও নবাবেরা ফার্সি এবং উর্দুকেই প্রাধান্য দেয় ফলে, নবাবী আমলে অভিজাত মুসলমানেরা ছিল ফার্সি ও উর্দুভাষী। আর সাধারণ গ্রামের মুসলিমরা ছিল পুঁথিভিত্তিক বাংলাভাষী, যার মধ্যে আরবী ফার্সি ভাষার প্রভাব বেশী। গ্রামের অব্রাহ্মণ হিন্দুরা ছিল চৈতন্যদেবের বৈষ্ণবধারার অনুসারী। এটাই বাংলার ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির মূল ধারা ।
বঙ্গভঙ্গের পরে কলকাতা থেকে রাজধানী স্থানান্তর হওয়ায় (১৯১২) এবং মুম্বাইয়ে ভারতের জাতীয় পুঁজি বিকশিত হওয়ায় রাজনৈতিক নেতৃত্ব অর্থনৈতিক নেতৃত্ব দুটোই বাংলা হারায় । ফলে, বিভ্রান্ত বাঙালি সুফি ধারা ও বৈষ্ণব ধারার পাশ কাটিয়ে ভারতীয় নেতৃত্বের কাছে আত্মসমর্পণ করে। সর্বভারতীয় হিন্দু ও মুসলিম নেতৃত্ব শৈবধারা ও ওহাবী ধারার প্রতিনিধি না হলেও এই ধারাকে উপেক্ষাও করার উপায়ও ছিল না। বাংলার নেতৃত্বেও বৈষ্ণব ধারা ও সুফি ধারার প্রতিনিধিদের সমন্বিত কোন রাজনৈতিক নেতৃত্ব গড়ে উঠে নি। তবে, কলকাতাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠা আধুনিক ইংরেজী শিক্ষিত হিন্দু -মুসলিম রাজনৈতিক নেতৃত্ব ছিল কেন্দ্রমুখী এবং সর্বভারতীয় নেতৃত্বের চরিত্র ছিল স্বৈরাচার ও কর্তত্বপরায়ণ। যা পরে দিল্লী ও মুম্বাইয়ে স্থানান্তরিত হয়। তাদের ভিত্তি ছিল হিন্দুধর্ম ও মুসলিম ধর্ম। কারণ, বিভিন্ন প্রদেশে ভাষাভিত্তিক এবং আঞ্চলিক সংস্কৃতির প্রাধান্য দিতে গেলে তাঁদের নেতৃত্বের একক কর্তত্ব আর থাকে না। মুসলমানদের অধিকার আদায়ের রাজনীতির লক্ষ্য ছিল সংখ্যালঘু হিসেবে নিরাপত্তা। পাশাপশি মুসলিম সংখ্যারিষ্ঠ অঞ্চলের স্বায়ত্তশাসন দাবী। কংগ্রেস নেতৃত্ব মনে করলেন মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলকে স্বায়ত্ত্বশাসন দিতে গেলে হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলকেও স্বায়ত্তশাসন দিতে হবে। তার চেয়ে মুসলমানদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলকে বের করে দেয়ায় শ্রেয়। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল থেকে হিন্দু প্রাধান্য জেলাসমূহ যতদূর সম্ভব বের আনাটায় লাভজনক। একটি শক্তিশালী কেন্দ্রও হবে এবং মুসলমানদের আপদ থেকেও রক্ষা পাওয়া যাবে। কৃষক প্রজাপার্টি এই দুই ধারার বাইরে বাংলার ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির মূল ধারার রাজনীতি শুরু করলেও ধারবাহিকতার অভাব এবং বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের ভারতীয় জাতীয়তাবাদ না বাঙালি জাতীয়তাবাদ কোনটাকে ভিত্তি করবে এই দ্বিধা-দ্বন্দ্বে বাঙালি ধর্মের ভিত্তিতে বিভক্ত হয়ে পড়ে।
মুসলিম নেতৃবৃন্দ স্বায়ত্তশাসন চেয়ে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল নিয়েই স্বাধীন একটা রাষ্ট্র পেয়েছে। এতেই সন্তুষ্ট ছিল। সর্বাত্মক চেষ্টা করেছিল পুরা সংখ্যগরিষ্ঠ অঞ্চল নিয়ে স্বাধীন মুসলিম রাষ্ট্র করার কিন্তু ইংরেজ এবং কংগ্রেসের আপোষ ফর্মুলায় সম্ভব হয় নি। কীটদষ্ট পাকিস্তান নিয়ে সন্তুষ্ট ছিল। পাকিস্তানী অপশাসন ও জাতিগত শোষণের ফলে যে আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন মুসলমানদের জন্য চেয়েছিল তা ভুলেই একটি শক্তিশালী কেন্দ্র গড়ে তোলার খেসারত হিসেবে সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালি বের হয়ে এসে স্বাধীন বাংলাদেশ গঠন করলো বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে। বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে বাংলাদেশের সৃষ্টি ভারতীয় জাতীয়তাবাদ (যা মূলত হিন্দু জতিয়তাবাদ) ও মুসলিম জাতীয়তাবাদকে অস্বীকার করেই জন্ম নিয়েছে। তাই বাঙালি জাতীয়তাবাদে ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট, উৎস প্রেরণা ভিন্ন একবারে স্বকীয় এবং স্বতন্ত্র। ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গকে কেন্দ্র করে বাঙালি জাতীয়তাবাদের সাংস্কৃতিক ভিত্তির প্রাথমিক পর্যায় গড়ে উঠলেও রাজনৈতিক ভিত্তি গড়ে উঠে ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে। অর্থনৈতিক ভিত্তি গড়ে উঠে বাংলাদেশ উত্থানের পর। রাজনৈতিক ভিত্তি এবং অথনৈতিক ভিত্তিকে ধরে রাখতে এবং আরো এগিয়ে নিতে দরকার হয়ে পড়ে বাঙালি জাতীয়তাবাদের সাংস্কৃতিক ভিত্তির নতুন করে বিন্যাস।
যেহেতু বর্তমান বাংলাদেশ গঠনের পূর্বে মুসলমান ইস্যুতে পাকিস্তান সৃষ্টি হয়েছিল। সেখান থেকে বাঙালি ইসুতে বাংলাদেশ সৃষ্টি হলো। মুসলমান ইস্যু বাংলাদেশে যেমন অবলুপ্ত হয় নি। তেমনি বাঙালি ইস্যু একেবারে সর্বজনীন হতে পারে নি। মুসলমানিত্ব এবং বাঙালিত্ব কোনটি প্রাধান্য পাবে তা-ই নিয়ে নতুন করে পরিচিতি সংকট ও সাংস্কৃতিক সংকট দেখা দিল। যেহেতু অর্থনৈতিক কারণে বাঙালি মধ্যপ্রাচ্যে গমন করলো, সেখানে মুসলিম সংস্কৃতি তাঁকে নতুন করে ভাবিয়ে তুললো। বিশেষ করে মক্কা মদিনাকে কেন্দ্র করে যে ওহাবী মতবাদ, তা তাঁদের কাছে পবিত্রতার প্রতীক হিসেবে মনে হলো এবং গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠলো। সেখানে গণতন্ত্র না থাকলেও দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন তাঁদের মানস প্রভান্বিত করলো। বাংলাদেশ গণতন্ত্রের চর্চা সুষ্ঠু ও স্বাভাবিক না হওয়ায়, গণতন্ত্রের বদলে সুশাসনের প্রতি আকৃষ্ট করলো। মধ্যপ্রাচ্যের প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে সেখানকার সুশাসন ইসলামী শাসন হিসেবে বাংলাদেশেও কায়েম করতে চাইলো।
ভারতের আচরণ, বর্ডার সমস্যা, আকাশ সংস্কৃতি, শিক্ষা, চিকিৎসায় ও পর্যটনে ভারতের গমন, আমাদের বিভিন্ন বাণিজ্যে তাদের আধিপত্য, রপ্তানীতে বাধা, ভারতীয়দের ব্যাপারে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছে। বাংলাদেশের ক্রমাগত বিকাশমান অর্থনীতির ভারতের সাথে সংঘাতের ক্ষেত্রও প্রস্তুত হওয়ার সম্ভাবনা আছে। ভারতের পক্ষে-বিপক্ষের জনমত অনেক বেশী আক্রমনাত্মক। এর থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য আত্মরক্ষামূলক একটি ভিন্ন সংস্কৃতির প্রয়োজন হয়ে পড়ে। বাঙালি জাতীয়তাবাদ, বাঙালি সংস্কৃতি ও বাঙালি ঐতিহ্য চর্চার কোন উদ্যোগ নেই। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতাও নেই। ক্ষমতাসীনদের আচরণে কারণে বাঙালি জাতীয়তাবাদের সংস্কৃতি জনগণের কাছে এর আবেদন প্রশ্নের সম্মুখীন। ফলে, মুসলমান সংস্কৃতি তাঁদের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠে। সেই সাথে সৌদি সাহায্য, মসজিদ-মাদ্রাসা এবং আলেমদের একটি অংশের ওয়াজ-মহফিলের মাধ্যমে মুসলিম সংস্কৃতির পক্ষে জোর প্রচারণায় বাঙালি সংস্কৃতি চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। ফলে, বাংলাদেশের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং পরিচিতির সংকটকে ভবিষ্যতে আরো প্রকট করে তুলবে। আমাদের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ বাঙালি এবং মুসলমান । অন্য সংখ্যালঘু জাতি ও ধর্মীয় সম্প্রদায়ের কাছেও আমাদের দায়বদ্ধতা আছে। কারণ, ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে জন্ম নেয়া একটি রাষ্ট্রের সকল ধর্ম ও জাতির প্রতি সমান আচরণ করা নৈতিক দায়িত্ব ।
ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধকে কেন্দ্র করে যে সংস্কৃতির উত্থান হয়েছিল, তাকে রক্ষার করা বা ধরে রাখার পক্ষে কার্যকর প্রচারণা, শিক্ষাব্যবস্থায়, রাজনৈতিক দলসমূহের আচরণ, আমাদের রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ডে এবং বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা কোনটাই আশানুরূপ নয়। বাংলাদেশে ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুরা সুরক্ষিত এটা আমরা গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারছি না। বিশেষ করে বাংলার গ্রামেগঞ্জে বাঙালির ঐতিহ্যগত সংস্কৃতির সাথে সৌদি প্রভাবান্বিত মুসলিম সংস্কৃতির দ্বন্দ্ব ও সংঘাত আমাদের রাষ্ট্রকে ভবিষ্যতে সংকটে ফেলতে পারে। তার পাশাপাশি বিদেশী সংস্কৃতি, যা পাশ্চাত্য সংস্কৃতির ভোগবাদী প্রবণতা, সুষ্ঠু সংস্কৃতিকে বিকশিত না করে মুনাফাভিত্তিক নাগরিক সংস্কৃতি বাংলাদেশের মানুষকে মুনাফার যন্ত্রে পরিণত করতে চাচ্ছে। যার বহিঃপ্রকাশ হচ্ছে সর্বক্ষেত্রে দুর্নীতি ও দুর্বৃত্তায়নের আবরণে শিকড়বিহীন সংস্কৃতি চর্চা। যা আমাদের নাগরিক সমাজের বৈশিষ্ট্য। বাংলাদেশের মানুষকে সুষ্ঠু, মননশীল, সৃজনশীল, পরস্পরের মধ্যে সম্প্রীতি, নৈতিকতার উৎকর্ষতার লক্ষ্যে ঐতিহ্যকে ধারণ ও বিকশিত করে একটি বাঙালির সংস্কৃতি গড়ে তোলার অন্দোলন না করলে দুর্বৃত্ত ও দুর্নীতিপরায়ণ নাগরিকসমাজ থেকে মুক্তি পাওয়া অসম্ভব হয়ে পড়বে । রাষ্ট্র ও সমাজকে রক্ষা করতে হলে আমাদেরকে একটি মানবিকসমাজ ও মানবিক রাষ্ট্র গড়ে তোলার লক্ষ্যে এগিয়ে যেতে হবে। এর জন্য প্রয়োজন একটি মানবিক সাংস্কৃতিক আন্দোলন। (দৈনিক পূর্বকোণ থেকে সংগৃহীত)

লেখক : রাজনীতি বিশ্লেষক ও কলামিস্ট।

এই বিভাগের আরো সংবাদ