জাতির পিতাকে নিয়ে আমার স্মৃতি

  অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ২৪ আগস্ট ২০১৮, ১৩:০৮

মেজর জেনারেল (অব.) সুবিদ আলী ভূঁইয়া, ২৪ আগস্ট, এবিনিউজ : চাকরি-জীবনে সেনাবাহিনীতে গুরুত্বপূর্ণ পদে কাজ করার সুবাদে সে-সময় দেশের প্রায় সকল রাষ্ট্র-প্রধান ও সরকার-প্রধানকে কাছ থেকে দেখার এবং জানার সুযোগ হয়েছিল আমার। তবে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অধীনে সরাসরি কাজ করার সৌভাগ্য না হলেও দেশ স্বাধীনের পর বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন কারণে ইতিহাসের এই মহানায়ককে কাছ থেকে দেখার এবং জানার সুযোগ হয়েছিল আমার। ছাত্রজীবনে সক্রিয় রাজনীতি করতাম না; কিন্তু বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনে তার দেওয়া কর্মসূচি বাঙালিকে যেভাবে উদ্বুদ্ধ ও প্রভাবিত করেছিল, আমিও এর বাইরে ছিলাম না। দেশ স্বাধীনের পর ১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের শেষদিকে বঙ্গবন্ধুর সাথে আমার প্রথম সাক্ষাতের সুযোগ হয়। এরপর শাহাদাতের আগ পর্যন্ত তার সাথে আমার মোট সাতবার সাক্ষাতের সুযোগ হয়েছিল।

মানুষের জীবনে অনেক ঘটনাই ঘটে থাকে। ভালোমন্দ সব মিলিয়েই মানুষের জীবন। জীবনে চলার পথে অনেক স্মৃতিময় ঘটনার জন্ম হয়। কিছু স্মৃতি হয় সুখের আর কিছু বেদনার। মানুষের জীবনে এমন অনেক স্মৃতি আছে, যা ইচ্ছে করলেই ভুলা যায় না। তেমনি আমার জীবনের এক স্মৃতিÑ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে কাছ থেকে দেখা।

দীর্ঘদিন ধরেই চেষ্টা করছি বঙ্গবন্ধুকে কাছ থেকে দেখার স্মৃতিগুলো নিয়ে কিছু লেখার। কিন্তু নানা কারণে তা হয়ে ওঠেনি। আনন্দ-বেদনা নিয়েই স্মৃতি। এর মধ্যে কিছু স্মৃতি আছে গর্বের। আমার কাছে বঙ্গবন্ধুর সাথে সাক্ষাতের সব স্মৃতিই গর্বের। সেই স্মৃতি নিয়ে আজকে আমার এই লেখা।

তুমি থেকে তুই...
১৬ ডিসেম্বর ’৭১, দেশ স্বাধীন হলেও সেই সময়ে দেশের বেশ কয়েকটি বিহারি অধ্যুষিত এলাকা তখনও উত্তপ্ত ছিল। ওই সব স্থানে তখনও বাঙালি-বিহারি সংঘর্ষ চলছিল। মুক্তিযুদ্ধের সময় বিহারিদের অমানুষিক ও বর্বর আচরণের কারণে স্বাধীনতার পর বাঙালিরা ছিল তাদের প্রতি ক্ষুব্ধ। আমার যতদূর মনে পড়ে সময়টা ১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ দিকে। আমি তখন যশোর ক্যান্টনমেন্টে ১১ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের টুআইসি। একদিন রাত প্রায় ১২টার দিকে টেলিফোন পেলাম খুলনার খালিশপুরে বাঙালি-বিহারি রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হচ্ছে। ১১ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের তৎকালীন কমান্ডিং অফিসার মেজর মতিন ফোনে জানালেন দুই ঘণ্টার মধ্যে একটি কোম্পানি নিয়ে আমাকে ঘটনাস্থলে যেতে হবে। এর কিছুক্ষণ পরই ৫৫ বিগ্রেডের বিগ্রেড কমান্ডার লে. কর্নেল এমএ মঞ্জুর আমাকে ফোনে খুলনার খালিশপুরে বাঙালি-বিহারি সংঘর্ষের বিস্তারিত জানালেন এবং নির্দেশ দিলেন যত দ্রুত সম্ভব পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য। নির্দেশ পেয়ে ব্যাটালিয়নে গেলাম। অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে খুলনার দিকে রওয়ানা হলাম। খুলনা পৌঁছে সূর্য ওঠার আগেই দাঙ্গাকবলিত এলাকায় সৈন্য মোতায়েন করলাম। গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে মেশিনগান ফিট করলাম এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনলাম।

এর কয়েকদিন পর, এ মুহূর্তে তারিখটি মনে নেই। বঙ্গবন্ধু দাঙ্গাকবলিত এলাকা দেখতে এলেন। লে. কর্নেল এমএ মঞ্জুর বিগ্রেড কমান্ডার হিসেবে বঙ্গবন্ধুকে রিসিভ করলেন। বঙ্গবন্ধু ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শনের পর খুলনা সার্কিট হাউসে চলে গেলেন। লে. কর্নেল এমএ মঞ্জুর আমাকে ধন্যবাদ জানিয়ে বিদায় নিয়ে চলে যাওয়ার সময় বললেন, ‘ভূঁইয়া আমি সার্কিট হাউসে যাচ্ছি, বঙ্গবন্ধু আমাকে ডেকেছেন।’ তখন আমি মঞ্জুরকে বললাম, ‘স্যার, আমি কি আপনার সাথে যেতে পারি? আমি কখনও বঙ্গবন্ধুকে দেখিনি।’ মঞ্জুর বললেন, ‘ও তুমি কখনও দেখনি! ঠিক আছে চল, গাড়িতে ওঠো।’

সার্কিট হাউসে গেলাম। লে. কর্নেল মঞ্জুর খুলনার পরিস্থিতি নিয়ে বঙ্গবন্ধুর সাথে প্রায় ৪০ মিনিট কথা বললেন। বিদায়ের আগে মঞ্জুর বঙ্গবন্ধুকে বললেন, ‘স্যার, আমার সাথে একজন অফিসার এসেছে, সে আপনাকে কখনও দেখেনি। আপনাকে দেখতে চায়।’ বঙ্গবন্ধু বললেন, ‘ও তাই না-কি, ওর নাম কি? ঠিক আছে, ওকে ডাকো।’

আমি বঙ্গবন্ধুর রুমে ঢুকে সামরিক কায়দায় সালাম দিলাম। বঙ্গবন্ধু বললেন, ‘ভূঁইয়া তুমি কেমন আছ?’ আমি জবাব দেওয়ার আগেই হাসতে হাসতেই বললেন, ‘আরে তুমি মেজর ভূঁইয়া না ক্যাপ্টেন ভূঁঁইয়া?’ আমি হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছি। বঙ্গবন্ধু আবারও বললেন, ‘তুমি যুদ্ধের সময় চট্টগ্রামে ছিলে, তোমরা চট্টগ্রামে যুদ্ধ করেছিলে তা আমি শুনেছি।’ তারপর বললেন, ‘আমি নাসিরের (শেখ আবু নাসের) বাসায় যাচ্ছি। ইউ বোথ ফলো মি।’

বঙ্গবন্ধু সকল সফর সঙ্গীকে নিয়ে শেখ নাসের সাহেবের বাসায় পৌঁছলেন। খানাপিনার সুন্দর আয়োজন। বঙ্গবন্ধু খাবার টেবিলে বসলেন। টেবিলটি (আনুমানিক ২০ ফুট বাই ৪ ফুট) উত্তরে-দক্ষিণে সাজানো। দক্ষিণ দিকে বসলেন তিনি। তার পাশে মন্ত্রী-এমপিরা বসলেন। এমএ মঞ্জুর ও আমি বসলাম উত্তর প্রান্তে শেষদিকে, মুখোমুখি। বঙ্গবন্ধু এদিক-ওদিক তাকিয়ে বললেন, ‘আরে দেখ্ তো, আমার সাথে দুজন সামরিক বাহিনীর অফিসার এসেছে, ওরা কোথায়?’ আমাদের অবস্থান জানার পর তিনি তার ডানে এবং বামে বসা দুই মন্ত্রীকে অন্যত্র বসতে বলে আমাদের তার কাছে এসে বসতে বললেন। আমি বসলাম বঙ্গবন্ধুর ডানে এবং মঞ্জুর বামে। মঞ্জুর আর আমি মুখোমুখি। খাবার টেবিলেই বঙ্গবন্ধু জানতে চাইলেন মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে চট্টগ্রামে কী ঘটেছিল, কীভাবে কী করেছিলাম। একপর্যায়ে তিনি আমাকে ‘তুমি’ থেকে ‘তুই’ সম্বোধন করে কথা বলতে শুরু করলেন। আমি বিস্তারিত সংক্ষেপে বললাম। জানতে চাইলেন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের কথা। একপর্যায়ে তিনি আমাকে বললেন, ‘ওই ভূঁইয়া তোরা তো একটা ভুল করেছিলি। আমাকে পাকিস্তানিরা ধরে নিয়ে গেল আর তোরা রেডিওতে প্রচার করেছিলি আমি তোদের সাথেই আছি- এটা কেমনে করলি তোরা। আমি বললাম, ‘স্যার, আপনার নাম বলা ছাড়া তো আর কোনো উপায় ছিল না। আমাদের কে চিনে!’ বঙ্গবন্ধু বললেন, ‘শোন্, আমি আছি পাকিস্তানিদের সাথে আর তোরা বলছিলি আমি আছি তোদের সাথে। এই অজুহাতে ওরা যদি আমাকে মেরে ফেলত?’ ‘স্যার আসলে ওই সময় তো এত সিরিয়াসলি ভাবি নাই। তবে আপনার নাম বলার কারণ ছিল জনসাধারণকে আমাদের পক্ষে টেনে আনা, তাদের মনোবল চাঙ্গা রাখার জন্য। জনগণ যদি জানত এবং বিশ্বাস করত আপনি আমাদের সাথে নাই তখন তো যুদ্ধের শুরুতেই দেখা দিত বিশৃঙ্খলা বা হতাশা।’ বঙ্গবন্ধু আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন।

একপর্যায়ে আমি বললাম, ‘স্যার, একটা কথা বলি, আপনি তো দেশটা স্বাধীন হওয়ার স্বপ্ন দেখছিলেন। আমরা আপনার নাম ব্যবহার করার ফলে যদি তারা আপনাকে মেরে ফেলত, বিনিময়ে যদি আমরা স্বাধীনতা পেতাম, আপনার আত্মা অন্তত শান্তি পেত।’ বঙ্গবন্ধু আমার কথা শুনে হাসি দিয়ে খাবার টেবিল মাতিয়ে তুললেন। সেই স্মৃতিময় সাক্ষাৎ আমাকে আজও বিমোহিত করে। মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যেই তিনি আমাকে তুমি থেকে তুই বলে আপন করে নিয়েছিলেন। এরপর যতবারই দেখা হয়েছে ততবারই তুই বলে সম্বোধন করতেন। পাঠকদের অবগতির জন্য বলছি, বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে কেন বঙ্গবন্ধুর নাম বারবার ব্যবহার করা হয়েছিল তার ব্যাখ্যা রয়েছে ১৯৭২ সালের জুন মাসে আমার লেখা মুক্তিযুদ্ধের প্রথম বই ‘মুক্তিযুদ্ধে নয় মাস’-এর অধ্যায় দশ (নতুন সংস্করণ ‘স্বাধীন বাংলা বেতারে’ শিরোনামের) অংশে।

ছাপাইয়া ফেল না, কি হবে
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাসের লড়াইয়ের ঘটনাপ্রবাহকে আমি একটি ডায়রিতে লিখে রাখতাম। যুদ্ধের পর এই ডায়রিটা আমার শ^শুর মহিউদ্দিন আহমেদ সাহেবকে দেখালাম। আমার যুদ্ধকালীন সময়ের এই ডায়রি দেখে তিনি বললেন, ‘এটা তো একটা সুন্দর বই হয়। তুমি এটাকে বই আকারে রূপ দেও না কেন?’

উল্লেখ্য, মহিউদ্দিন সাহেব ছিলেন আহমদ পাবলিশিং হাউসের স্বত্বাধিকারী। তার এই পরামর্শ আমাকে আগ্রহী করে তুলল। তার এই পরামর্শের পর ১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারির শেষদিকে খুলনার খালিশপুরে পিপলস জুট মিলে বাঙালি-বিহারি দাঙ্গা দমনের দায়িত্ব পালনের ফাঁকে অবসর সময়টুকু কাজে লাগাই। সেখানে থাকা অবস্থায় প্রায় দুই মাস অনেক পরিশ্রম করে এই স্মৃতিচারণগুলো বই আকারে দাঁড় করানোর জন্য স্ক্রিপ্ট তৈরি করলাম। আমি যেহেতু সেনাবাহিনীর অফিসার, তাই সেনা সদরের অনুমতি ছাড়া বই প্রকাশ করা সম্ভব না। সে-জন্য সেনাসদরে ক্লিয়ারেন্সের জন্য পাঠালাম। কিন্তু অনুমতি পেতে বিলম্ব হচ্ছিল। স্বাধীনতা যুদ্ধের ওপর বই, তাই আমার শ^শুর বারবার তাগাদা দিচ্ছিলেন। যশোর থেকে ঢাকায় ফিরে আমি একদিন সুগন্ধায় গেলাম। সে-সময় এটা ছিল বঙ্গবন্ধুর সান্ধ্যকালীন অফিস। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সেখানে অনেক মন্ত্রী ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি উপস্থিত। বঙ্গবন্ধু আমাকে দেখেই বললেন, ‘কি ভূঁইয়া কেমন আছিস?’ বললাম, ‘ভাল আছি স্যার। স্যার, আপনার সাথে কথা ছিল।’ তিনি বললেন, ‘একটু অপেক্ষা কর।’ তিনি গুরুত্বপূর্ণ কাজ ও কথাবার্তা সেরে বললেন, ‘উপরে চল।’ দ্বিতীয় তলায় গিয়ে বসতেই বঙ্গবন্ধু বললেন, ‘তুই জানি কি বলতে চেয়েছিলি?’ আমি বললাম, ‘স্যার, আমি মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণমূলক একটি বই লিখেছি। নাম দিয়েছি “মুক্তিযুদ্ধে নয় মাস”। প্রকাশের জন্য অনুমতি চেয়ে সেনা সদরে পাঠিয়েছি; কিন্তু এক মাস হয়ে গেল অনুমতি পাই না।’ তিনি বললেন, ‘কেন? অনুমতি পেতে দেরি হচ্ছে কেন?’ ‘স্যার, কারণ তো বলতে পারব না। তবে ক্লিয়ারেন্স না পেলে তা প্রকাশ করতে পারছি না।’ তিনি বললেন, ‘কে ক্লিয়ারেন্স দেয়?’ আমি বললাম, ‘নিয়মানুযায়ী সেনা সদর। স্যার, দেরি হয়ে যাচ্ছে।’ বঙ্গবন্ধু আমাকে বললেন, ‘ছাপাইয়া ফেল না, কি হবে।’ পরক্ষণেই বললেন, ‘ঠিক আছে আর কয়েকটা দিন দেখ। বেশি দেরি হলে আমাকে জানাইছ।’

১২ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে...
আমি তখন ১২ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের ভারপ্রাপ্ত কমান্ডিং অফিসার। দিনটা ছিল ২৬ ডিসেম্বর ১৯৭২। বঙ্গবন্ধু যশোর ক্যান্টনমেন্ট পরিদর্শনে এলেন। এ-সময় ১২ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট পরিদর্শন করলেন। পরিদর্শনকালে ট্রুপসদের মহড়া দেখলেন, কোয়ার্টার গার্ড পরিদর্শন করলেন, পরিদর্শন বইতে স্বাক্ষর করলেন, অফিসার্স মেসে কিছুক্ষণ কাটালেন। তাকে সেদিন মহড়ার সময় এবং পরিদর্শনকালে অতি কাছ থেকে দেখার এবং তার সঙ্গে কথা বলার সুযোগ হয়েছিল আমার।

আর্মস রিকভারি বরিশাল
’৭৪ সালের কথা। আমি তখন ব্যাটেলিয়ানসহ বরিশালে। আমার ওপর দায়িত্ব ছিল আর্মস রিকভারি করার। আমার হেড কোয়ার্টার তখন বরিশালে। আমি লেফটেনেন্ট কর্নেল। আমি তখন আর্মস রিকভারিতে ব্যস্ত। সে-সময় বঙ্গবন্ধুর মা সায়েরা খাতুন মারা যান। বঙ্গবন্ধু দাফন শেষে স্টিমারযোগে টুঙ্গিপাড়া থেকে ফেরার পথে বরিশাল এলেন। আমাকে এবং বরিশালের এসপি মোর্শেদকে স্টিমারে তার সাথে দেখা করার জন্য খবর পাঠালেন। আমি এবং এসপি সেখানে গেলাম। তিনি আমাদের কাছে অস্ত্র উদ্ধার এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাইলেন। আমরা তাকে বিস্তারিত জানালাম। আজ মনে পড়ছে সে সময় ওই এলাকার কুখ্যাত ডাকাত কুদ্দুস মোল্লাকে আমরা গ্রেফতার করেছিলাম। পাকিস্তান আমলেই যার ৫৪ বছরের জেল হয়েছিল। তার অত্যাচারে ওই অঞ্চলের মানুষ অতিষ্ঠ ছিল। বঙ্গবন্ধু এই গ্রেফতারের কথা শুনে সেদিন খুব খুশি হয়েছিলেন। সেই সময় তোফায়েল আহমেদও বঙ্গবন্ধুর সাথে ছিলেন। সেদিনই তোফায়েল ভাইয়ের সাথে আমার প্রথম পরিচয় হয়।

বড় গাড়িতে তেল খরচ বেশি হয়
আমি তখনও বরিশালে। বঙ্গবন্ধুর সাথে আমার এবারের সাক্ষাৎটা খুব একটা সুখকর ছিল না। আমি বৃহত্তর বরিশালের দায়িত্বে। আর্মস রিকভারির উদ্দেশ্যে আমার টুআইসি এক মেজরকে এক কোম্পানি সৈন্যসহ পটুয়াখালী অঞ্চলে দায়িত্ব দিয়েছিলাম। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে আর্মস রিকভারি একটি দুরূহ কাজ। কারণ যে কেউ তার হাতে থাকা অস্ত্র জমা দিতে চায় না। যেহেতু স্বেচ্ছায় কেউ অস্ত্র জমা দেয় না, সে-কারণে তা উদ্ধার করার জন্য মাঝে মধ্যে উদ্ধারকারীরা থার্ড ডিগ্রি মেথড অ্যাপ্লাই করে থাকেন। তখন সমগ্র বরিশালে সর্বহারা, গণবাহিনীর তৎপরতায় জনগণ অতিষ্ঠ। এ অবস্থায় আর্মস রিকভারি করতে গিয়ে পটুয়াখালীতে ট্রুপসদের ভূমিকায় কিছুটা ভুল বুঝাবুঝির সৃষ্টি হয়েছিল। এ বিষয়টিকে কেন্দ্র করে বিস্তারিত জানতে আমাকে গণভবনে তলব করা হয়। সেদিন গণভবনে উপস্থিত ছিলেন সেনাপ্রধান শফিউল্লাহসহ একজন সিনিয়র মন্ত্রী ও কয়েকজন নেতা। বঙ্গবন্ধু বিস্তারিত শুনলেন। বিষয়টি কিছুক্ষণ শোনার পর দীর্ঘায়িত না করে বঙ্গবন্ধু অন্যদের বললেন, ‘তোমরা যাও, আমি বিষয়টি দেখছি।’ আমাকে বললেন, ‘তুই বস। তোর সাথে কথা আছে।’ সবাই চলে যাবার পর বঙ্গবন্ধু আমাকে বললেন, ‘বাসায় চল।’ আমি প্রথমে তার কথাটি বুঝতে পারিনি। পরে তার পিছন পিছন এলে তিনি বললেন, ‘গাড়িতে ওঠ।’ ছোট্ট একটি গাড়ি। গাড়ির দরজা দিয়ে ঢুকতে গিয়ে বঙ্গবন্ধুর কষ্ট হচ্ছিল। আমি গাড়িতে বসে বঙ্গবন্ধুকে বললাম, ‘স্যার, আপনি এত ছোট্ট গাড়ি ব্যবহার করছেন?’

বঙ্গবন্ধু বললেন, ‘বড় গাড়িতে তেল খরচ বেশি হয়। দেখতেই তো পারছিস দেশে তেল সংকট চলছে।’ আমি বললাম, ‘স্যার, আপনি একা সাশ্রয় করলেই কি হবে? তিনি বললেন, ‘আমার দেখাদেখি দেখিস অনেকেই তা করবে। আমাকে অনুসরণ করবে।’ তিনি আমাকে নিয়ে এলেন ৩২ নম্বরের বাড়িতে। বাসার তৃতীয় তলার টেরেসে বসতে বললেন। এই বাড়িতে আমার এই প্রথম আসা। মিনিট কয়েক পর বঙ্গবন্ধু এলেন। আমাকে দু-একটা ব্যক্তিগত প্রশ্ন করার পর তিনি প্রসঙ্গ আনলেন বরিশালের পরিস্থিতি নিয়ে। জানতে চাইলেন বৃহত্তর বরিশালে সর্বহারা ও গণবাহিনীর তৎপরতা এবং তাদের কাছে অস্ত্র উদ্ধারের বিষয়ে। আমি তাকে বললাম সেনাবাহিনী মাঠে নামার পর গণবাহিনী এলাকা ছেড়ে চলে গেছে। আর সর্বহারারা অস্ত্রসহ আত্মগোপনে। তারপরও আমরা চেষ্টা চালাচ্ছি। সেদিন আরও কিছুক্ষণ কথাবার্তার পর বাসায় চলে আসি।

পরশ্রীকাতরতা শব্দটি...
সালটা ১৯৭৫, প্রথম দিকের কথা। বঙ্গবন্ধু চট্টগ্রাম সফরে এলেন। আমি তখন বিডিআর-এর সেক্টর কমান্ডার। বঙ্গবন্ধু ভিজিটে আসায় আমাকে সেখানে যেতে হলো। বিকেলে তিনি হিমছড়িতে গেলেন। সেখানে ঝাউগাছ বেষ্টিত বাগানে বঙ্গবন্ধু তার কয়েকজন মন্ত্রী পরিষদের সদস্যকে নিয়ে গল্প করছিলেন। আমি কাছাকাছিই বসেছিলাম। নানা কথার মাঝে বঙ্গবন্ধু একপর্যায়ে আক্ষেপ করে তার মন্ত্রিসভার এক সিনিয়র মন্ত্রীকে বললেন, ‘দেখ... “পরশ্রীকাতরতা” শব্দটি একমাত্র আমাদের বাংলা ডিকসনারিতেই আছে। আর কোনো ভাষার অভিধানে নেই।’ কথাটি আজও আমার মনে পড়লে সেই স্মৃতিপটটি ভেসে ওঠে।

সেদিনের আরেকটি ঘটনা এখানে উল্লেখ না করলেই নয়, বঙ্গবন্ধু আলাপচারিতার এক পর্যায়ে বললেন, ‘শোন- আইয়ুব খানের আমলে আমি যখন হুলিয়া নিয়ে দেশের নানা স্থানে ঘুরে বেড়াই তখন এই পাহাড়ের পূর্বদিকে এক চৌকিদারের ঝুপড়ি ঘরে আমি আশ্রয় নিয়েছিলাম।’ বঙ্গবন্ধু উপস্থিত ডিসিকে উদ্দেশ্য করে বললেন, ‘দেখ তো তাকে খুঁজে বের করা যায় কি না।’ বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে তাকে আনা হলো। তার সাথে বঙ্গবন্ধু কথা বললেন এবং ডিসিকে তাৎক্ষণিক নির্দেশ দিলেন তার জন্য কিছু খাস জমির ব্যবস্থা করার জন্য।

স্মৃতিশক্তি ছিল প্রখর...
৬ জুলাই ১৯৭৫। বঙ্গবন্ধুর ৩২ নম্বরের বাড়িতে দ্বিতীয়বার যাওয়া। আমি তখন চট্টগ্রামে বিডিআর-এর সেক্টর কমান্ডার। ঢাকার হেড কোয়ার্টারে এসেছিলাম একটি কাজে। বঙ্গবন্ধুর সাথে দেখা করার ইচ্ছে ছিল। সুযোগও পেলাম। আমি আর বঙ্গবন্ধু ৩২ নম্বরের তৃতীয় তলায় দক্ষিণের বারান্দায় বসে কথা বলছি। বঙ্গবন্ধু দেশের পরিস্থিতির পাশাপাশি আমার কাছে বাংলাদেশ-বার্মা সীমান্তের চোরাচালান সংক্রান্ত বিষয়াদি জানতে চাইলেন। আমি যেহেতু ওই অঞ্চলের দায়িত্বপ্রাপ্ত সেক্টর কমান্ডার, তাই আমাকে তিনি কিছু দিক-নির্দেশনা দিলেন। সাক্ষাতের একপর্যায়ে শেখ কামাল এলেন। সেনাবাহিনীর অফিসার হিসেবে তার সাথে আমার আগে থেকেই পরিচয় ছিল। তবে বঙ্গবন্ধুকে সেদিন খুব বিষণ্ণ মনে হয়েছিল। তাকে চিন্তিত মনে হয়েছিল। এই দীর্ঘ সময়ের কথাবার্তায় কখনও মনে হয়নি আমি দেশের একজন রাষ্ট্রপ্রধানের সাথে কথা বলছি। আসার সময় তিনি তার স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে বললেনÑ ভালো থাকিস। সেই দেখাই আমার সাথে শেষ দেখা।

পাঠক, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু এই ভূখণ্ডে জন্ম নিয়েছিলেন গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া নামক এক অজপাড়াগাঁয়ে। তারপর অনেক চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে তিনি শেখ মুজিব থেকে বঙ্গবন্ধু এবং জাতির পিতা হয়েছেন। হয়েছেন ইতিহাসের মহানায়ক, সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি।

বঙ্গবন্ধু মনেপ্রাণে ছিলেন খাঁটি বাঙালি। তার চলনে-বলনে বেশ-ভূষায় বাঙালিত্বের ছাপই লক্ষ করা গেছে। সাধারণ জীবনযাপনে তিনি ছিলেন অভ্যস্ত। তার মতো সাহসী রাজনীতিবিদ ইতিহাসে বিরল। মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সিদ্ধান্তে অটল ছিলেন। ছিলেন আপসহীন ও নির্ভীক। দুবার ফাঁসির মঞ্চ থেকে ফিরে এসেছেন। তার মধ্যে ছিল প্রবল দেশপ্রেম। তিনি ছিলেন দূরদর্শী- যার প্রমাণ পাওয়া যায় তার ৭ই মার্চের ভাষণে। এদিন তিনি আনুষ্ঠানিক ঘোষণা এড়িয়ে গিয়ে এমন বক্তব্য দিলেন, যা স্বাধীনতার ঘোষণারই শামিল। মানুষকে খুব সহজে আপন করে নিতেনÑ যার প্রমাণ আমি নিজেই। তিনি ছিলেন মহৎ এবং উদার এক নেতা। স্মৃতিশক্তি ছিল প্রখর। হিমছড়ির ফরেস্টের সেই চৌকিদারের কথা নামসহ মনে রাখা এবং তাকে সহায়তাই এর বড় দৃষ্টান্ত।

বিশ্বভ্রাতৃত্বের প্রতি তিনি ছিলেন উদার। তার কূটনৈতিক দূরদর্শিতার কারণে অল্পসময়ে সদ্য স্বাধীন একটি দেশকে পৃথিবীর অধিকাংশ দেশ স্বীকৃতি দিয়েছিল। তার নেতৃত্ব ও ব্যক্তিত্বের কারণেই মাত্র তিন মাসের মধ্যে ভারতীয় সৈন্য বাংলাদেশ ত্যাগ করে। পৃথিবীর ইতিহাসে এ ধরনের ঘটনা বিরল। পাঠক নিশ্চয়ই জানেন, দ্বিতীয় বিশ^যুদ্ধ শেষ হয়েছে ১৯৪৫ সালে। অথচ আজও বিদেশি সৈন্য রয়ে গেছে জার্মানি, দক্ষিণ কোরিয়া, ফিলিপিন, জাপানসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে। শুধু তাই নয়, দেশ স্বাধীনের পর মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্র সমর্পণ প্রক্রিয়াটিও হয়েছিল তারই ব্যক্তিত্বের কারণে।

আজকাল অনেকেই বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কটু কথা বলে থাকেন, তাকে খাটো করার জন্য ইতিহাস থেকে এমনকি সংবিধান থেকেও মুছে ফেলার অপচেষ্টা চালাচ্ছেন কেউ কেউ। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে বঙ্গবন্ধু বেঁচে আছেন এদেশের কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ের সংবিধানে। কারণ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আন্দোলন-সংগ্রামের মাধ্যমে হয়ে উঠেছিলেন জাতির প্রতীক। সেই স্কুলজীবন থেকে ধাপে ধাপে এ পর্যায়ে এসেছেন। তিনি হঠাৎ করে নেতা হননি বা ক্ষমতায় আসেন নি। আসলে বড় নেতা তারাই যারা সময়ের সাথে সাথে আরও বড় হতে থাকেন। তাদের হত্যা করে সমাজ থেকে নির্বাসিত করা যায় না। তারা বারবার ফিরে আসেন। আব্রাহাম লিংকন, মার্কিন লুথার কিং, মহাত্মা গান্ধীকেও কুচক্রীরা হত্যা করেছিল কিন্তু ইতিহাস থেকে মুছতে পারেনি। বঙ্গবন্ধুকেও পারবে না।

পরিশেষে বলতে চাই, ইতিহাস কারও নির্দেশে রচিত হয় না। ইতিহাস তার নিজস্ব গতিতেই চলে। ইতিহাসের সত্যরক্ষার খাতিরে ইতিহাসই বঙ্গবন্ধুকে ধরে রাখবে।

লেখক : মুক্তিযোদ্ধা, সংসদ সদস্য ও আওয়ামী লীগ নেতা

এই বিভাগের আরো সংবাদ