করোনা থাবার পোশাক কারখানার প্রণোদনানির্ভর হতে করি মানা

  খন রঞ্জন রায়

১৩ জানুয়ারি ২০২১, ১৭:৪৯ | অনলাইন সংস্করণ

করোনার কুপ বেশি পড়েছে পোশাক শিল্পে। ল-ভ- হয়েছে সঠিক সময়ে প্রণোদনাও পেয়েছে। তার ফল ঘুরে দাঁড়িয়েছে। যথাযথভাবে শ্রমিকরা আত্মনিয়োগ করেছে। আমাদের রফতানির প্রধান এই খাতকে সমুন্নত রাখতে। চলমান রাখতে। নানা চড়াই উৎরাই পেরিয়ে দেশের পোশাক শ্রমিকদের অক্লান্ত পরিশ্রম আর বিন্দু বিন্দু ঘামে আমাদের পোশাক শিল্প আলোর মুখ দেখেছে। দেশে-বিদেশে সুনাম অর্জন করেছে। বহু আগে থেকেই দেশের তৈরি পোশাক বিদেশে রফতানি করা হচ্ছে। দেশের জন্য বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে পোশাক শ্রমিকরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। কিন্তু আমাদের পোশাক শ্রমিকরা অত্যন্ত মানবেতর জীবনযাপন করে। তারা একবেলা খেলে আরেক বেলা খেতে পায় না। অর্ধাহারে অনাহারে তাদের জীবন কাটে। তারা যে টাকা বেতন পায়, তা দিয়ে তাদের সংসার চলে না। তাদের শ্রমের তুলনায় এ টাকা একেবারে অপ্রতুল। সংসারের অভাব-অনটন দূর করার জন্য গরিব মানুষেরা গ্রাম ছেড়ে শহরে আসে এবং পোশাক শিল্পে কাজ নেয়। এদের বড় অংশ নারী শ্রমিক। সমাজে নারীর স্বাবলম্বিতা অর্জনে পোশাক শিল্পের অপরিসীম ভূমিকা রয়েছে।

আমাদের সমাজের দরিদ্র ও প্রান্তিক অবস্থানের শিক্ষাবঞ্চিত নারীরা পোশাকশিল্পে কর্মরত। তাঁদের সহজাত দক্ষতা অর্জনক্ষমতার সহায়তায় উৎপাদনশীলতা বাড়াতে সক্ষম হয়েছে। ফলে পোশাকশিল্পে সফলতা অর্জন করেছে। কিন্তু বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিজ্ঞাননির্ভর আধুনিক শিক্ষায় এই গার্মেন্টস পরিচালনায় প্রযুক্তিবিদ্যা শিক্ষিত না হওয়ায় নারী শ্রমিকেরা দক্ষ কারিগর হয়ে উঠতে পারেননি। তাঁরা কম্পিউটার চালাতে পারছেন না, কম্পিউটারচালিত যন্ত্রপাতিও চালাতে অপারগ। ছিটকে পড়ছে জটিল প্রযুক্তি ব্যবহারকারী কাজগুলো থেকে। এমনকি আমাদের পোশাকশিল্পে যে দুই লাখের মতো দক্ষ বিদেশি প্রযুক্তিবিদ ও ব্যবস্থাপক লোভনীয় বেতনে কর্মরত, সে চাকরিগুলোতে আমাদের দেশের দক্ষ টেকনোলজিস্ট, প্রফেশনাল পাওয়া যাচ্ছে না। ভারত, শ্রীলঙ্কা, দক্ষিণ কোরিয়া ও চীন থেকে এ ধরনের দক্ষ কারিগর ও ব্যবস্থাপক জোগাড় করতে বাধ্য হচ্ছে। এমনই দাবী গার্মেন্টস মালিক ও সংগঠনে বিজিএমইএ’র।

সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে জানা যায় গার্মেন্টসে নারী শ্রমিক কমছে। এবং আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়অর মূল কারণ প্রযুক্তিগত পরিবর্তন। এখানেই বাংলাদেশের জন্য ভবিষ্যতের একটা বড় বিপদের ‘অশনিসংকেত’। এই বিপদের নাম ‘জবলেস গ্রোথ সিনড্রোম’।

বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের বিকাশের প্রাথমিক পর্বে, আশির দশক ও নব্বইয়ের দশকে পোশাক কারখানাগুলোতে কর্মসংস্থান হওয়া শ্রমিকদের ৯০ শতাংশের বেশি ছিলেন নারী। ওই কারখানাগুলোর সিংহভাগই ছিল ‘কাটিং অ্যান্ড মেকিং’, সেলাইনির্ভর ওভেন গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি। নারী শ্রমিকেরা যে কাজগুলোতে পুরুষের চেয়ে বেশি পারদর্শিতা অর্জন করতে সক্ষম হতো।

অর্থনৈতিক বিচারে নারী শ্রমিকদের উৎপাদনশীলতা ছিল বেশি, কিন্তু মজুরি ছিল কম। এই দুটো বৈশিষ্ট্য থাকলেই শ্রমকে ‘সস্তা শ্রম’ সংজ্ঞায়িত করা যায়। নব্বইয়ের দশক থেকে নিটওয়্যার ফ্যাক্টরিগুলোতে পুরুষ শ্রমিকের কর্মসংস্থান নারীদের চেয়ে দ্রুত বিকশিত হওয়ার পর ফ্যাক্টরিগুলোতে পুরুষ শ্রমিকের কর্মসংস্থান নারীদের চেয়ে দ্রুত হারে বাড়তে শুরু করে। ফলে যুক্তভাবে ওভেন ও নিটওয়্যারÑএই দুই ধরনের তৈরি পোশাকশিল্পের মোট শ্রমিকদের মধ্যে নারী শ্রমিকের অনুপাত কমতে শুরু করে।

গত দশ বছরে নারী শ্রমিকের অনুপাত কমেছে ১০ দশমিক ৬৮ শতাংশ। অথচ প্রতিবছর নিরবচ্ছিন্নভাবে বাংলাদেশ থেকে পোশাক রপ্তানি আয় বেড়েই চলেছে। এই খাতের শ্রমিকদের উৎপাদনশীলতাও ক্রমবর্ধমান।
এক দশক ধরে পোশাকশিল্পে আধুনিক প্রযুক্তি ও আধুনিক যন্ত্রের ব্যবহার দ্রুত বেড়েছে। এসব যন্ত্র একই সঙ্গে অনেক কাজ করতে পারে। আগে যেসব কাজ নারী শ্রমিকেরা করতেন, সেগুলো এখন যন্ত্রের মাধ্যমেই হয়ে যাচ্ছে। এখন সুয়িং, ফিনিশিং, কাটিং, এমব্রয়ডারি, নিটিং ও ওয়াশিং-মূলত এই ছয় ধরনের কাজ হয় বাংলাদেশে। নারীরা এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি কাজ করেন সুয়িংয়ে, এরপর ফিনিশিংয়ে। অন্য কাজগুলোতে নারী শ্রমিকের অংশগ্রহণ তেমন নেই।

বর্তমানে বিশ্বে এই পণ্যের বাজার ৪৫০ বিলিয়ন ডলারের। চীন একাই ১৬০ বিলিয়ন ডলার বা ৩৫.৫ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করছে। সে তুলনায় বাংলাদেশের অংশ ৫.৪ শতাংশ (২৪.৪৯ বিলিয়ন ডলার।)।

চীনে পোশাক শিল্পে কাঁচামাল কাপড়, সূতা, বোতাম, বকটন, চেইন, নিজস্ব কারখানায় তৈরি করে। সকল প্রকার মেশিন চীনে উৎপাদিত হয়। বাংলাদেশে কোন কাঁচামাল নেই, সেলাই মেশিন পর্যন্ত বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। চীনের প্রতিটি শ্রমিক নিয়োগের যোগ্যতা ন্যূনতম ডিপ্লোমা ডিগ্রি। প্রশিক্ষণবিহীন কোন লোক নিয়োগ দেওয়া হয় না।

গার্মেন্টস শিল্পে প্রশিক্ষিত দক্ষ কারিগর নিয়োগের লক্ষ্যে ৩ দশক পূর্বেই চীন সরকার 

১)    ইয়ার্ন ইঞ্জিনিয়ারিং
২)    ফেব্রিক ইঞ্জিনিয়ারিং
৩)    ওয়েট প্রসেস ইঞ্জিনিয়ারিং
৪)    এ্যাপারেল ইঞ্জিনিয়ারিং
৫)    টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং ম্যানেজমেন্ট
৬)    টেক্সটাইল ফ্যাশন অ্যান্ড ডিজাইন
৭)    ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যান্ড প্রোডাকশন ইঞ্জিনিয়ারিং
৮)    টেক্সটাইল মেশিনারী ডিজাইন অ্যান্ড মেইনটেনেন্স
৯)    ডাইজ অ্যান্ড কেমিক্যালস ইঞ্জিনিয়ারিং
১০)    এনভায়রনমেন্টাল সাইন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং

১০টি বিষয়ে ডিপ্লোমা কোর্স চালু করেছে। ডিপ্লোমা প্রযুক্তিবিদরা ঘণ্টায় গড়ে ৩ হাজার ৭৩২ পিছ কাপড় উৎপাদন করে।

বাংলাদেশে মাত্র ৭১২ পিছ কাপড় উৎপাদন করতে সক্ষম। চীনে প্রতিটি শ্রমিকের গড় বেতন দুই হাজার ডলার। বাংলাদেশের সর্বাধিক বেতন হলো ৭৮০ ডলার। এদেশের প্রতিটি সচেতন লোক জানে বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্পের পুরোধা ‘দেশ গার্মেন্টস’। প্রতিষ্ঠাতারা গার্মেন্টস শিল্পে উৎপাদনের পূর্বে সকল শ্রমিককে কোরিয়া থেকে উচ্চতর প্রশিক্ষণ দিয়ে এনেছিলেন।

আজকে বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠিত গার্মেন্টস শিল্পের মালিকের অধিকাংশই দেশ গার্মেন্টসের শ্রমিক কিংবা ঠিকাদার। বাংলাদেশে অনেক গার্মেন্টস প্রশিক্ষিত দক্ষ জনবলের কারণে রুগ্ন হয়ে মৃত্যুবরণ করছে।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে সর্বক্ষেত্রে অস্থিতিশীল বিশ্ব অর্থনীতি ও শিল্প-শ্রমবাজার। এরপরও আমাদের স্বশিক্ষিত শ্রমিকরা দেশ-বিদেশে কঠোর কঠিন পরিশ্রম করে দেশের রিজার্ভ সর্বকালের সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে গেছে। 

যে কোনো দেশের অর্থব্যবস্থার মূল বড় ভরসা সেখানকার শ্রমিকেরা। পরিকল্পিত শ্রম উন্নয়ন ঘটে একটি ভিশনকে সামনে রেখে। আর এই ভিশন মূলত দীর্ঘ মেয়াদী। শ্রমশক্তির ভিশনকে সামনে রেখে সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ নিরুপন করা এবং সেই অনুযায়ী শিক্ষা প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তিতে অগ্রসর হওয়া এখন সময়ের দাবী। 

জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য বা এসডিজি-ও একই কথা বলে। এসডিজি যুব কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। বাংলাদেশ বৈশ্বিক এসডিজির অভীষ্টগুলো অনুমোদন করেছে এবং এগুলোকে জাতীয় উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা হিসেবে সংযুক্ত করেছে। এসডিজির ৮ নম্বর অভীষ্টের ১২টি লক্ষ্যমাত্রা কর্মসংস্থান বাড়াতে সামষ্টিক অর্থনৈতিক পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলেছে, যা উৎপাদনশীলতা বাড়াবে, সম্পূর্ণ ও উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে এবং সব নারী-পুরুষের জন্য শোভন কাজের ব্যবস্থা করবে। একই সঙ্গে কর্মসংস্থান, শিক্ষা অথবা প্রশিক্ষণে না থাকা যুব সম্প্রদায়ের হার কমাবে। শ্রম অধিকার রক্ষা এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশ সৃষ্টিরও লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। অভিবাসী শ্রমিক, বিশেষত নারী শ্রমিক এবং যারা অনিরাপদ কাজে নিয়োজিত, তাদের গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অন্তর্ভুক্তিমূলক ও লক্ষ্যমাত্রাগুলো দক্ষতা উন্নয়নে প্রশিক্ষণের ওপর জোর দিয়েছে।

সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে মুখরোচক শব্দ চতুর্থ শিল্পবিপ্লব। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের একটা প্রধান ডাইমেনশন হলো প্রতিষ্ঠানগুলোতে ‘আর্টিফিশিয়াল ইনটেলিজেন্স’-এর উদ্ভাবন। তার ফলে শ্রমঘন প্রযুক্তিকে পিছু হটিয়ে ক্রমেই যন্ত্রনির্ভর ও রোবটনির্ভর প্রযুক্তির ব্যবহার দ্রুত বাড়তে থাকবে। বাংলাদেশের মতো বিপুল জনসংখ্যা-অধ্যুষিত দেশের জন্য কর্মসংস্থান ইস্যু আরও জটিল হয়ে পড়বে। এই সমস্যাকে মোকাবিলা করতে হলে দেশের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ পদ্ধতিকে যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দ্রুত আধুনিকায়নের পথেই এগোতে হবে।

এক্ষেত্রে তৈরি পোশাক শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে সরকারকে সবার প্রথমে কঠোর হতে হবে। একটি উৎপাদনমুখী শিল্প হিসেবে একে টিকিয়ে রাখতে  এই খাতের শিক্ষা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে হবে। 
প্রযুক্তিদক্ষ প্রশিক্ষিত জনবলরাই পেশাগত উৎকর্ষ সাধন করে গার্মেন্টস কারখানাকে শিল্পে পরিণত করবে। কোন এক সময়ে পাট এবং চামড়ার অগ্রগণ্য শিল্প যেমন দক্ষতার অভাবে ধ্বংস হয়েছে। গার্মেন্টস এর বেলায় তা যেন না হয়, সেইদিকেই তীক্ষ্ম নজর, সূতীক্ষ্ম করতে হবে।

লেখক: সমাজচিন্তক, গবেষক ও সংগঠক

এই বিভাগের আরো সংবাদ