মহানায়কের স্বদেশ ফেরা

  শিবলী নোমান সরকার

১০ জানুয়ারি ২০২১, ১১:৫৮ | অনলাইন সংস্করণ

নায়ক শত্রুর কারাগারে বন্দি, কিন্তু তার নামে যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন এবং কোনরূপ পণ না দিয়ে শত্রু সেই মহানায়ককে সসম্মানে ফেরত পৌঁছানোর ঘটনা শুধু একটিই। সেই মহানায়ক বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকবাহিনী বঙ্গবন্ধুকে তার ঐতিহাসিক ৩২ নম্বর বাড়ি থেকে আটক করা হয়। তিনি মুক্ত হন ১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারি। স্বদেশে পা রাখেন ১০ জানুয়ারি। 
বঙ্গবন্ধুকে আটকের পর সেখান থেকে প্রথমে এ্যাসেম্বলি বিল্ডিং-এ। পরে ক্যান্টনমেন্টের একটি স্কুলের একটি অন্ধকার আর নোরাং ঘরে। ছয় দিন ধরে তিনি কাটালেন সেই ঘরে। তবে মধ্যরাত থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত রাখা হয় টিক্কা খানের বাড়িতে। ১ এপ্রিল তাকে নেয়া হয় রাওয়ালপিন্ডি, পরে মিয়ানওয়ালীবাগ জেলে। পাকিস্তানের কারাগারে তার বিচার শেষ হয়েছিল ৪ ডিসেম্বর ৭১ তারিখে। কিন্তু যুদ্ধের কারণে তা কার্যকর করা সম্ভব হয়নি। হত্যার চেষ্টা হয়েছিল কিন্তু এক জেলার তাকে রক্ষা করেন। মিয়ানওয়ালী জেলের অবস্থান জেনারেল নিয়াজীর এলাকায়। গুজব ছড়ানো হলো যে, ১৫ ডিসেম্বর ১৯৭১ তারিখে ঢাকায় নিয়াজীকে হত্যা করা হয়েছে। এতে ক্ষুদ্ধ জেল-কয়েদীরা বঙ্গবন্ধুকে হত্যার জন্য খুঁজতে ছিল। কিন্তু জেলার তাকে অন্যত্র সরিয়ে নিয়েছিল। সে সময়ের ঘটনা কিঞ্চিত উদ্ধৃত করা হলো বঙ্গবন্ধুর সাথে সিডনি স্কানবার্গের সাক্ষাৎকার থেকে। 
বঙ্গবন্ধু স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর ১৬ জানুয়ারি ১৯৭২ নিউইয়র্ক টাইমস-এর বিশেষ প্রতিনিধি সিডনি এইচ স্কানবার্গ এর কাছে প্রদত্ত সাক্ষাতকারে বলেন, সেই চরম মুহূর্তে তাঁর সামনে দুটো পথ খোলা ছিল। ভারত চলে যাওয়া অথবা বন্দিত্ববরণÑ যা ১৬ জানুয়ারি ৭২ তারিখে উক্ত পত্রিকায় প্রকাশ পায়। এতে তিনি বলেন যে, তাঁকে আটক করতে না পারলে ঢাকাসহ দেশের বহু লোককে হত্যা করত। তাঁকে যেভাবে গোয়েন্দারা অনুসরণ করেছিল তাতে তাঁর পক্ষে পালানোর চেষ্টা হলে হত্যা করে বাঙালিদের ওপর দোষ চাপাত। এগুলো সবই সত্য কিন্তু যে কথা তাঁর পক্ষে কখনও প্রকাশ করা সম্ভব ছিল না  অর্থাৎ ভারত চলে যাওয়া কৌশল হিসেবে ছিল না- পছন্দ তা অবশ্যই বিবেচনায় আসবে ভারতের সাথে রাষ্ট্রনায়ক কালের আচরণকে বিশ্লেষণ করে। 
আসলে পাকবাহিনীর টার্গেট ছিল ‘বঙ্গবন্ধুকে’ আটক করলে সব ঠান্ডা হবে। কৌসলী মুজিব তাদের সে সুযোগ দিয়েছেন কিন্তু ধরা দেননি কাউকে। পাকিস্তান, মার্কিন বা ভারত কাউকেই নয়। তিনি ধরা ছিলেন বাঙালি এবং বিশ্ব মানবতার কাছে। জনতার শক্তিতে নির্ভরশীল মুজিব চেয়েছিলেন প্রয়োজনে তাঁর জীবনের বিনিময়ে যেন স্বাধীনতা আসে। পাকরা বুঝতেই পারেনি যে ‘হুকুম’ যা দেবার মুজিব তা দিয়েছেন সেজন্য তৈরি ছিল লাখো মুজিব। আর তাদের নেতৃত্ব দেয়ার জন্য অন্তত সাড়ে চারশ এমএনএ/এমপিএ, যুব-ছাত্র নেতা সহ কোটি বাঙালী এবং নেতৃত্ব দেয়ার মতো বিচক্ষণ তাজউদ্দীন। তাই মুজিববন্দী হলেও একমাত্র ঢাকা ছাড়া বাংলাদেশে প্রাথমিক প্রতিরোধ গড়ে ওঠে স্বতঃষ্ফূর্তভাবে। যা সামলাতে পাকবাহিনীর কমপক্ষে দু’মাস লেগেছিল। এটাই ছিল মুজিবের প্রস্তুতি। 
আটক হওয়ার আগে স্বাধীনতার রেকর্ডকৃত ভাষণ ইপিআর এবং টিএন্ডটির কাছে দিয়েছিলেন যার প্রচার বঙ্গবন্ধু শুনেছিলেন। তিনি নিশ্চিত হয়েছিলেন যে, তার ৭ মার্চের নির্দেশ পালন করার মতো প্রস্তুতি জনগণের আছে। তিনি খবর নিলেন আওয়ামী লীগ ছাত্রলীগ এবং অন্যরা পাক সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে ঢাকা-চট্টগ্রাম-ফার্মগেট-আগ্রাবাদ-ষোলশহররে এবং অন্যান্য স্থানে ব্যরিকেট দিয়ে প্রতিরোধ শুরু করেছে (এই ব্যারিকেডেই ছিল মুক্তিযুদ্ধের প্রথম প্রহর)। বন্দী হওয়ার আগে ৩২ নম্বরে অনেকেই গেছেন। এদের একজন প্রয়াত সাংবাদিক আতাউস সামাদকে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ও যধাব মরাবহ ুড়ঁ ষঁফবঢ়বহফবহপব, মড় ধহফ ঢ়ৎবংবৎাব রঃ (স্বাধীনতা দিলাম রক্ষা করো)। এই বক্তব্য ছিল অহসযোগকালের ধারাবাহিকতা।
অসহযোগ কালের ফলাফল শুন্য হলেও বঙ্গবন্ধু কি করতে চেয়েছিলেন তার প্রামাণ্য দলিলের চিত্র কিন্তু পরিষ্কার। ১৯৭১ সালের ১ মার্চ থেকে ২৫ মার্চ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর অসহযোগ আন্দোলনের একটি পর্যায়ে ১৬-২৫ মার্চ ইয়াহিয়া খান ঢাকায় ছিলেন। বঙ্গবন্ধুর সাথে কয়েকদফা বৈঠকও হয়। ২২-২৪ মার্চ ভুট্টো ইয়াহিয়া মুজিবও আলোচনায় মিলিত হন। এই আলোচনার সূত্র ধরে নিন্দুকেরা গবেষণা করেন যে বঙ্গবন্ধু আপোষ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু মুজিবের আলোচনার লক্ষ্যে ছিল একটিই তা হচ্ছে ইয়াহিয়ার কাছ থেকে বিনা রক্তপাতে আলাদা রাষ্ট্র গঠনের ঘোষণা আদায় করা। ইয়াহিয়া খান ২৬ মার্চ ’৭১ সন্ধ্যায় করাচি থেকে বেতার টিভিতে প্রচারিত ভাষণে স্পষ্টভাবে বলেন, ‘শেখ মুজিব এবং তাঁর উপদেষ্টারা এক পাকিস্তানের ভিত্তিতে কোন মীমাংসায় না এসে প্যারালাল সরকার চালিয়ে আমার (ইয়াহিয়া) কাছ থেকে একটি ঘোষণা আদায় করতে চেয়েছিলেন যা ফেডারেশনের পরিবর্তে কনফেডারেশন এবং সামরিক আইন প্রত্যাহার। এসব পরিকল্পনার লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশ নামে আলাদা একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা।’ 
ইয়াহিয়ার ভাষণ যে মিথ্যা ছিল না তার প্রমাণ রয়েছে ২৩ মার্চ ’৭১ প্রকাশিত ঢাকার ইংরেজী দৈনিক দি পিপল-’ এ প্রকাশিত প্রখ্যাত আইনজীবী এ, কে, ব্রোহির বিবৃতি থেকে। উল্লেখ্য, ব্রোহি তখন ঢাকায় এসেছিলেন ইয়াহিয়াকে আইনগত সহযোগিতা প্রদানের জন্য। মুজিব যখন ক্ষমতা হস্তান্তরের জন্য চাপ সৃষ্টি করে চলছিলেন অপরদিকে ভুট্টোও পশ্চিম পাকিস্তানের ক্ষমতা পাওয়ার জন্য উদগ্রীব সে মুহূর্তে আলাদাভাবে পূর্ব পাকিস্তানের ক্ষমতা মুজিব এবং পশ্চিম পাকিস্তানের ক্ষমতা ভুট্টোর কাছে হস্তান্তরে আইনগত জটিলতা আছে কিনা সে বিষয়ে ইয়াহিয়া এ কে ব্রোহির মতামত চেয়ে পাঠান। এ কে ব্রোহি এ বিষয়ে লিখিত মতামত প্রদান করেন। মতামত ছিল এরকমÑ ‘নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের কথা ছিল সংবিধান প্রণয়নের পরে। কিন্তু সে পর্যায়ে পর্যন্ত অপেক্ষা না করে সামরিক শাসন প্রত্যাহার এবং গণ-প্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের কোন আইনগত প্রতিবন্ধকতা আছে কি-না এ বিষয়ে আমার মতামত চাওয়া হয়েছে। ‘জাস্টিস পয়েন্ট অব নিড্’ থেকে বিষয়টি বিবেচনায় এনে একথা বলা সংগত যে এ ধরনের ক্ষমতা হস্তান্তরে কোন আইনগত জটিলতা নেই। রাষ্ট্রক্ষমতার সর্বময় অধিকর্তা ইয়াহিয়া খান এই মর্মে ঘোষণা দিতে পারেন যে তিনি আর রাষ্ট্্র ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করবেন না। আমাদের কাছে ‘ইনডিয়ান ইনডিপেনডেন্স এ্যাক্ট’ এর ঐতিহাসিক উদাহরণ রয়েছে। বিট্রিশরা দেশ চালাতো। দেশ স্বাধীন হওয়ার প্রক্কালে বিদায়ী বিট্রিশরাজ ‘ইনডিয়ান ইনডিপেনডেন্স এ্যাক্ট’ তৈরী করেন যা মূলত. ভারত ও পাকিস্তান নামক দু’টি আলাদা রাষ্ট্র গঠন প্রক্রিয়া ও ক্ষমতা হস্তান্তরের রূপরেখা। উক্ত রূপরেখায় ভারত-পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্য আলাদা সংবিধান তৈরী না হওয়া পর্যন্ত বিদ্যমান আইনসমূহ বলবত রাখার ব্যবস্থা ছিল। আমরা যদি আইনের দিকে তাকাই এবং বিট্রিশ পাওয়ারের পরিবর্তে মার্শাল ’ল পাওয়ার’ বিবেচনা করি তাহলে উক্তরূপ বিরাজমান পরিস্থিতি সম্যক উপলব্ধি করতে সক্ষম হবো। যদি ক্ষমতা হস্তান্তরের একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত হয় তা'লে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া একটি ‘ডিক্রি’ জারী করে গণ-প্রতিনিধিদের কাছে নির্বিগ্নে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে পারেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ : দলিলপত্র- ২য় খন্ড পৃঃ ৭৭৭)। একথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, এ কে ব্রোহি ১৯৪৭ সনে বিট্রিশরাজ যেভাবে ভারত ও পাকিস্তান নামক দুটি আলাদা রাষ্ট্রের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেছিল সেভাবে ইয়াহিয়াকে বিট্রিশরা ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে সুপারিশ করেন। 
অসহযোগ আন্দোলনকালে ভুট্টোর ঘনিষ্ঠ সহযোগী মুজিব-ভুট্টো-ইয়াহিয়ার সাথে একাধিক বৈঠকে অংশগ্রহণকারী পাকিস্তান পিপলস পার্টির ভাইস চেয়ারম্যান মিয়া মাহমুদ আলী কাসুরী লাহোরে ১৮ এপ্রিল ’৭১ লাহোরে এক সাংবাদিক সম্মেলনে বলেন, ‘আওয়ামী লীগ আগেই পূর্ব পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল এবং এ লক্ষ্য অর্জনের জন্য স্ট্যাটেজি স্থির করেছিল। শেখ মুজিবুর রহমান একতরফাভাবে স্বাধীনতা ঘোষণার উদ্দেশ্যে কাজ করছিলেন এবং এর জন্য তিনি সম্পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। তিনি বলেন একথা বিশ্বাসযোগ্য নয়, ঢাকায় আকস্মিক কিছু ঘটেছে এবং পূর্ব পাকিস্তানীরা কেন্দ্রের ক্ষমতাকে অবজ্ঞা করে শেখ মুজিবুর রহমানকে বাংলাদেশের সার্বভৌম প্রধানরূপে প্রতিষ্ঠার জন্য রাতারাতি নিজেদের প্রস্তুত করেছে।
তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ অবশ্য মূল পরিকল্পনা পরিবর্তন করে। সে পরিকল্পনা অনুযায়ী বেআইনী ঘোষিত আওয়ামীলীগের প্রথম পাকিস্তানের কর্তৃত্ব গ্রহণ এবং পরে পশ্চিম পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন হতে বাধ্য করানোর কথা ছিল। দেশের রাজনৈতিক কার্য্যকলাপের প্রেক্ষিতে এ পরিকল্পনা পরিবর্তনা করা হয় এবং ২৬ মার্চ শুক্রবার জুম্মার নামাজের পর বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণার ট্রাটেজি গ্রহণ করা হয়। তিনি বলেন, জাতিসংঘ বাংলাদশেকে একটি স্বাধীন দেশে হিসেবে গ্রহনের জন্য আবেদন জানানোর উদ্দেশ্যে একটি খসড়া প্রণয়ন করা হয়েছিল। এ আবেদনের খসড়াটি মূলত শেখ মুজিবুর রহমানের নামে ছিল, কিন্তু পরে এ আবেদন যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় বসবাসকারী পূর্ব পাকিস্তানীদের নামে করা হয় এবং বেসরকারী ও ব্যক্তিগত পর্যায়ের এ আবেদনটি জাতিসংঘের নিরাপত্তা সংক্রান্ত লিগ্যাল কমিটির কাছে জমা দেয়া হয়। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ প্রধান যখন ৫ মার্চ থেকে ২৪ মার্চ পর্যন্ত প্রেসিডেন্টের সঙ্গে আলোচনা অব্যাহত রাখেন, তখন ঢাকায় পাকিস্তানের প্রতিটি প্রতীক এই সাথে ধ্বংস করা হচ্ছিলো। ২৩ মার্চ পুরো শহরে সরকারী ও বেসরকারী ভবনের শীর্ষে বাংলাদেশের পতাকা তোলা হয়। এ অবস্থা একদিনে করা সম্ভব হয়নি। ২৩ মার্চ শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর কুচকাওয়াজে অভিবাদন গ্রহণ করেন এবং বাংলাদেশের সার্বভৌম শাসকরূপে নিজেকে তুলে ধরেন। কাশুরী বলেন, তার কাছে প্রমাণ আছে, সে সময় পরিস্থিতি সম্পূর্ণরূপে আওয়ামী লীগ প্রধানের নিয়ন্ত্রণে ছিল এবং তিনি নিজেই এসব নির্দেশ দেন, যার ফলে স্বাধীন বাংলাদেশ গঠিত হতে পারে। এটি প্রমাণিত সত্য যে, মুজিবকে বন্দি করা ছিল পাকিস্তানের প্রথম পরাজয়। মূল নেতাকে আটক এবং হত্যার ভয় দেখিয়ে তাঁর কাছ থেকে “স্বাধীনতার ঘোষণা” প্রত্যাহার করা যায়নি। তাই যারা বঙ্গবন্ধুর বন্দিত্বকে আত্মসমর্পণ বলেন তারা বোকার স্বর্গে বাসকরেন। কারণ, আটক মুজিবের জীবন রক্ষা ও মুক্তির দাবিটিও স্বাধীনতার পরিপূরক হয়ে মুক্তিযুদ্ধ বেগবান ও বিজয় ত্বরান্বিত হয়েছে। 
২৫ মার্চ ভারতে যাওয়া সম্ভব ছিল না। এটা করতে হলে তাঁকে পালাতে হতো। মুজিব কি পালানোর লোক। আর ভারতে গেলে কি হতো? পালিয়ে ভারত যাওয়ার অর্থ বিচ্ছিন্নতাবাদী এক অসহায় মানুষ যার প্রতি কোনও সমর্থন, সহযোগিতা আসতো না। বরং দেশে অপপ্রচার হতো। তাতে বিজয় অর্জিত হলেও তাঁর জন্য অনেক দাম যেন দিতে না হয় বাঙালির। প্রথমত. মুজিবকে ভারতের সাথে মুক্তিযুদ্ধকালেই একটি মোটাদাগে চুক্তি করতে হতো যা তাজউদ্দীন আহম্মদ এড়াতে সক্ষম হন এই বলে যে, চুক্তি করার ক্ষমতা যার সেই নেতা মুক্ত হউন এবং দেশ শত্রুমুক্ত হোক। যা করার তিনিই করবেন। এভাবে দুর্বল অবস্থানে থেকেও ভারতের সাথে মুজিবনগর সরকার দর কষাকষির একটি বিরল সুযোগ ভোগ করেছেন। আজ একটি স্পষ্ট সত্য যে, ভারতের সাহায্য নিলেও সেজন্য বড় দাগে মুল্য দিতে হয়নি। নিরংকুশ সার্বভৌমত্বে কারও হস্তক্ষেপ করার সুযোগ বঙ্গবন্ধু দেননি। মৃত্যুকালেও তাঁর প্রিয় দেশটি তিনি সার্বভৌম রেখে গেছেন। এটা সম্ভব হয়েছে বঙ্গবন্ধুর দুরদর্শী ও বিচক্ষণ সিদ্ধান্তের ফলে।
১৭ ডিসেম্বর ১৯৭১ তারিখের ভুট্টো ইয়াহিয়াকে গৃহবন্দি করে ক্ষমতা দখল করার পর ১৯ ডিসেম্বর বঙ্গবন্ধুর সাথে রাওয়ালপিন্ডিতে সাক্ষাৎ করেন। প্রথম সাক্ষাতে বঙ্গবন্ধু ভুট্টোকে বলেন, ‘আমি মুক্ত কিনা বলুন’। ভুট্টো বললেন, ‘আপনি মুক্ত কিন্তু আমি আপনাকে যেতে দেয়ার আগে কয়েকদিন সময় চাই’। কিন্তু কোন আলোচনা ঐ দিন হয়নি। আরেক মুহূর্তে, যখন ভুট্টো বলছিলেন যে দুই অংশ এখনো আইন আর ঐতিহ্য দিয়ে যুক্ত, তখন শেখ মুজিব তাকে মনে করিয়ে দিলেন যে গত জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে আর এই ফলাফলকে কখনোই শ্রদ্ধা করা হয়নি- বললেন, যদি পাকিস্তান এখনো একটি দেশ হয়ে থাকে, তাহলে আপনি প্রেসিডেন্ট আর প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক নন, সেটা আমি। 
৫ জানুয়ারি ১৯৭২ প্রেসিডেন্ট ভুট্টো শেখ মুজিবের সঙ্গে তৃতীয় আর শেষবারের মতো দেখা করতো গেলেন। বঙ্গবন্ধু বললেন, আপনি অবশ্যই আমাকে আজকে রাতে মুক্তি দেবেন। আর দেরি করার কোন জায়গা নেই। হয় আমাকে মুক্ত করুন নয় হত্যা করুন। ভুট্টো উত্তর দিয়েছিলেন যে- এত স্বল্প সময়ের মধ্যে ব্যবস্থা করা সম্ভব নয়, কিন্তু পরে তাঁকে লন্ডন পাঠিয়ে দিতে রাজি হলেন। 
৮ জানুয়ারি ১৯৭২ পাকিস্তানের একটি বিমানে লন্ডনের হিথরো বিমান বন্দরে এই মহানায়ককে বীরোচিত মর্যাদা দেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী। পরের দিন বিট্রিশ রাজকীয় এয়ারফোর্সে একটি বিমানে ঢাকার পথে থামলেন দিল্লীর পালাম বিমান বন্দরে। সম্মান-শ্রদ্ধা জানালেন ভারত ও তার জনগণ এবং বন্ধু ইন্দিরা গান্ধী। আদায় করলেন সৈন্য প্রত্যাহারের ওয়াদা। যেন সবটাই নিয়ে ঘরে ফিরলেন বাঙালির জাতির পিতা। ঢাকা ফিরে জনগণের প্রত্যাশার জবাব দিলেন সহোরয়ার্দী উদ্যানে। ভুট্টোর উদ্দেশ্যে বললেন, এক সাথে থাকার আর কোন সুযোগ নেই, আপনারা ভালো থাকুন... আরো অনেক কথা। শত্রুকে ভালো থাকার এই মহানুভবতা বিশ্ব রাজনীতিতে একেবারেই বিরল। কিন্তু এটা বঙ্গবন্ধুর মানবিকতার পক্ষে সম্ভব। মূলত ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনই বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশের স্বীকৃতির পথ সুগম করে দিয়েছিল।

লেখক : রাজনৈতিক কর্মী

এই বিভাগের আরো সংবাদ