করোনার শংকা ও আশার মধ্যে রাজনীতি প্রসঙ্গ

  শেখর দত্ত

২৬ নভেম্বর ২০২০, ১৩:২২ | অনলাইন সংস্করণ

একদিকে শংকা আর অন্যদিকে আশা।শংকা এই কারণে যে, দেশে করোনার প্রথম ওয়েভ শেষ হতে না হতেই শীতে দ্বিতীয় ওয়েভ আসছে বলে অনুমিত হচ্ছে। বর্তমান দিনগুলোতে রোগী ও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে বলে অনুমিত হচ্ছে। করোনা আরো কত ভোগাবে এবং প্রাণ নিবে তা এখনও সুস্পষ্ট নয়। উল্টোদিকে করোনার টিকা আবিষ্কারের খবরে আশা জাগ্রত হয়েছে। ইতোমধ্যে দুই  আমেরিকান  কোম্পানি ফাইজার ও মর্ডনা ঘোষণা দিয়েছে, তারা করোনার প্রতিষেধক টিকা আবিষ্কার করেছে এবং তা ৯০-৯৫ ভাগের উপর কার্যকর। ইতোমধ্যে তারা টিকা ব্যবহারের অনুমতির জন্য এই বিষয়ক সর্বোচ্চ সংস্থা ইউএস ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশস (এফডিএ) কাছে অনুমতি চেয়েছে।১০ ডিসেম্বর ২০২০ এই সংস্থার কর্মকর্তারা বৈঠকে বসবেন। অনুমোদন পাওয়া অনেকটাই নিশ্চিত বিধায় আশা প্রকাশ করা হচ্ছে,  ১১-১২ ডিসেম্বর থেকে আমেরিকায় টিকা প্রদান কর্মসূচি শুরু হয়ে যাবে। ইউরোপে জার্মানি ও স্পেন প্রথমেই টিকা দিতে পারবে বলে আশা প্রকাশ করেছে।

বলাই বাহুল্য, প্রতিষেধক বের হওয়া ও আমেরিকা-ইউরোপসহ উন্নত দেশে প্রয়োগ শুরু হলেও বিশে^র পিছিয়ে পড়া তথা আমাদের মতো দেশে তা ব্যবহার কবে শুরু করা যাবে, তা এখনও সুস্পষ্ট নয়। ইতোমধ্যে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, সরকার  আগেই টাকা  দিয়ে রেখেছে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, প্রথম যে উৎস  থেকে পাব, সেখান থেকে আমরা উপযুক্ত টিকা সংগ্রহ করবো। এজন্য আমরা সবার সাথে যোগাযোগ করেছি। এটা নিঃসন্দেহে উৎসাহজনক। তবে প্রথম সমস্যা হচ্ছে উৎপাদনের। জানা যাচ্ছে অনুমতি পেলে চলতি বছর উল্লেখিত দুই কোম্পানি মিলে  ৩ কোটি থেকে ৪ কোটি ডোজ টিকা পাওয়া যেতে পারে। প্রতিজন ২ ডোজ করে হলে যা দিয়ে মাত্র সর্বোচ্চ ২ কোটি লাখ মানুষকে টিকা দেওয়া সম্ভব।

ইতোমধ্যে মর্ডানা যুক্তরাষ্ট্রকে সবার আগে ১০ কোটি ডোজ দেওয়ার চুক্তি করে রেখেছে। তারপর পাবে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। দেশভিত্তিক  বিতড়নের নীতিমালা কি হবে, কোন দেশ কখন পাবে, তা এখনও সুস্পষ্ট নয়। উন্নত দেশগুলো আগে  যে পাবে তা সহজেই অনুমান করা যায়। তাই উৎপাদন বিবেচনায় আমরা কবে পাব এর অনিশ্চয়তা  থেকেই যাচ্ছে। সর্বোপরি উৎপাদন হলেই তো সাথে সাথে তা প্রয়োগ করা যাবে না। দেশে এসে রোগীর কাছে পৌঁছাটাও সময়ের ব্যাপার। জানা গেছে, অক্সফোর্ডের টিকাও বের হয়ে যাবে। এর কার্যকারিতা কতটুকু তা জানার পর বুঝা যাবে, তা উৎপাদনের সংখ্যা বাড়ানোর ক্ষেত্রে কতটা প্রভাব রাখতে পারবে। রাশিয়া  ও চীন  প্রতিষেধক টিকা বের করেছে বলে ঘোষণা দিয়েছে, কিন্তু সঙ্গত কারণেই ওই সব টিকা বিশ^াসযোগ্যতা অর্জন করতে পারবে বলে মনে হচ্ছে না।

এটা তো ঠিক যে, ফাইজার ও মার্ডনার টিকা অনুমোদিত হলে উৎপাদন বাড়বে। কিন্তু কতটা বাড়ানো সম্ভব! বিশে^  জনসংখ্যা ৭০০ কোটির ওপরে। তাই সবার কাছে প্রতিষেধক টিকা কবে পর্যন্ত পৌঁছাবে, তা অনুমান করা বেশ কঠিন। আগামী বছরের প্রথম দিকে, মাঝামাঝি নাকি শেষদিকে পাওয়া যাবে? কত ডোজ পাওয়া যাবে? সবাইকে দেওয়ার জন্য একবারে সব পাওয়া  যে যাবে না, তা সুস্পষ্ট। দ্বিতীয় সমস্যা হচ্ছে, প্রতিষেধক সুরক্ষিতভাবে দেশে নিয়ে আসা এবং তা যথোপযুক্তভাবে প্রদান করা। জানা যায়, টিকা সুরক্ষার জন্য কোল্ড চেন বা শীতল ব্যবস্থা তথা মাইনাস কমবেশি ৭০-৮০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা প্রয়োজন। বাংলাদেশে মাইনাস ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত ব্যবহৃত হয়  বলে জানলাম। আবার এটাও জানা যায়, বেক্সিমকো ফার্মাকে নাকি এই কাজে ব্যবহার করা যাবে। বাস্তবে বাংলাদেশে এই ব্যবস্থা কতটুকু কি আছে, কত সহজে তা নতুনভাবে কয় জায়গায় করা যাবে, কতটা দ্রুত তৃণমূল পর্যন্ত এটা নেওয়া সম্ভব, তা এখনও সুস্পষ্ট নয়।  

সার্বিক বিচারে  প্রতিটি দেশের সাথে লাইনে দাঁড়িয়ে এবং কোল্ড চেন তৈরি বা ঠিক  করে কবে আমরা টিকা পাব, তা এখনও সুস্পষ্ট নয়। তাই কতগুলো বিষয় আমাদের আগে থেকেই ব্যবস্থা সম্পন্ন করে রাখা প্রয়োজন। প্রথমত টিকার সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও বিতড়নের নীতিমালা। কার্যকর টিকা যথাযথ মূল্যে সংগ্রহ কে করতে পারবে? বেসরকারি সংস্থা কি পারবে? অর্থ জোগানের জন্য সরকারি-বেসরকারি পার্টনারশীপ  কি প্রয়োজন? তাতে কি ফল হতে পারে? সংরক্ষণ কিভাবে হবে? তদুপরি  বিতড়ন বয়সভিত্তিক হবে নাকি আগে এলে আগে পাবে, সরকার  সাবসিডি দিবে কিনা প্রভৃতিও ঠিক করা প্রয়োজন। একটা কথা তো আমাদের  বিবেচনায় নিতেই হবে যে, অব্যবস্থা ও দুর্নীতি হচ্ছে আমাদের রাষ্ট্র ও সমাজজীবনের সাথী। ক্ষমতাবান ও অর্থবানেরা আগেই টিকা নিতে হুমকি খেয়ে পড়বেন। সরকারি ব্যবস্থার অদক্ষতা ও গাফিলতির সাথে যখন লুটপাট, কালোবাজারি, নকল যুক্ত হওয়ার বিষয়টা সবসময়েই জড়িত থাকে এবং তা ভয়াবহ। তাই টিকা ব্যবহারের আশা যখন আমার করতে পারছি, তখন এইসব বিষয়ে শক্ত নীতিমালা প্রনয়ণ ও ব্যবস্থা গ্রহণ তথা পূর্ব প্রস্তুতি খুবই জরুরি।

তবে আমরা টিকা যখনই পাই না কেন, তা যে দ্বিতীয় ওয়েভ যদি আসে তার আগে পাব না, এটা সুস্পষ্ট। তাই টিকা সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও বিতড়নের নীতিমালা ও ব্যবস্থা করার  সাথে সাথে দ্বিতীয় ওয়েভ সামলানোর জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি। ইতোমধ্যে সরকারের পক্ষ থেকে সবাইকে সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মাস্ক পড়া ও অন্যান্য সুরক্ষাবিধি পালনের জন্য প্রচার ও ব্যবস্থা জোরদার করার কথা শোনা যাচ্ছে। এখনও স্বাস্থ্য রক্ষাবিধি যারা না মেনে যারা বাইরে বের হচ্ছে, তাদের ব্যাপারে আরো জোরদার কি ব্যবস্থা গ্রহণ করা যায়, তা চিন্তা করা সময়ের দাবি। করোনার আক্রমণের মধ্যেই আমাদের স্বাভাবিক কাজকর্ম চালাতে হবে। তাই এক্ষেত্রে প্রচার বাড়ানো ও জরিমানা করা ভিন্ন আর কোনো পথ খোলা আছে বলে তো এই মুহুর্তে মনে হচ্ছে না।

বলাই বাহুল্য, প্রথম ধাক্কাটা জাতি হিসাবে আমরা ভালোই সামাল দিয়েছি। বিগত দিনগুলোর সবলতা-সাফল্যের দিকটি বিবেচনায় নেওয়ার  সাথে সাথে সীমাবদ্ধতা - দুর্বলতার দিকগুলোকেও আমাদের অবশ্যই বিবেচনায় নিতে হবে, দ্বিতীয় ওয়েভ যদি আসে তবে তা সামাল দেওয়ার জন্য। একই আবহাওয়ার পাশর্^বর্তী দেশগুলোর চাইতে যে আমরা রোগ প্রতিরোধ বা সামাল দেওয়ার ক্ষেত্রে এগিয়ে রয়েছি।  কেন তা পারলাম, তা  যথাযথভাবে চিহ্নিত করে প্রচারে আনা প্রয়োজন আগামী দিনগুলোতে ভরসা এবং অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা পাওয়ার জন্য। একইভাবে সীমাবদ্ধতা-দুর্বলতার দিকগুলোকেও সামনে আনার গুরুত্ব রয়েছে। করোনা ভ্যকসিন নিয়ে গত বৃহস্পতিবার বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে দলের সম্পাদকম-লির সাথে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে আলোচনার সময়  করোনা প্রসঙ্গে বলেছেন যে, দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থ-সম্পদ  যে প্রয়োজনে কোনো সুফল দিতে পারে না, তা করোনা সবাইকে শিক্ষা দিয়ে গেছে। কথাটা যথাযথ। কিন্তু প্রশ্নটা হলো, চোরা কখনও ধর্মের কাহিনী শোনে না। এক্ষেত্রে  জিরো টলারেন্স ও আইনকে নিজস্ব গতিতে চলার নীতি কার্যকর করা হচ্ছে  না বলে জনগণ মনে করে। এই মনোভাব পাল্টানো জরুরি, জনগণের মনে আস্থা ও বিশ^াস  ক্রমাগত বাড়ানোর জন্য। এক্ষেত্রে বলতেই হয় করোনার দ্বিতীয় ওয়েভ আসতে পারে বিপদ বিবেচনায় এই সময়ে রাজনীতিতে বিতর্ক কিংবা বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়, এমন কোনো কাজ করা থেকে সরকার ও বিরোধি দলগুলোর বিরত থাকা প্রয়োজন। তাতে হতাশা ও ক্ষোভ সৃষ্টি হয় এবং এই দুই হচ্ছে ষড়যন্ত্র- চক্রান্তের আতুড়ঘর। এই সময়ে তা হতে দেওয়া একেবারেই যায় না।

প্রসঙ্গত বলতেই হয়, মুজিববর্ষে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ থেকে ধর্মনিরপেক্ষতা বাদ দেওয়া  হলো কেন? কিজন্য, কারা করলো? এতে কি লাভ হলো? প্রসঙ্গত, ছাড় তো কম দেওয়া হয় নাই, তবু বঙ্গবন্ধুর ভাষ্কর্য তুলে নেওয়ার কথা তুলছে কারা, কি জন্য? এটাও ভাবনার প্রয়োজন রয়েছে। রাজনৈতিক বিবেচনায়  ছাড় দিতে থাকলে ছাড়ই হয়ে যায় ললাট লিখন। তাতে জাতির জন্মলগ্নের মর্মবাণী তথা জাতীয় চার মূলনীতির আর কিছু থাকে না। এরই মধ্যে এসেছে ভাষ্কর্য ইস্যু। ভাষ্কর্য ভাঙতে বা তুলে নিতে বলা সমাজে অরাজকতা-বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিরই  নামান্তর।এক্ষেত্রেও আইনেেক নিজস্ব গতিতে চলতে দেওয়া প্রয়োজন। সর্বোপরি ঢাকার রাস্তায় প্রকাশ্য দিবালোকে যানবাহন পোড়ানোর ঘটনা ঘটলো। বিএনপির বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠছে। এই অভিযোগ বিশ^াসযোগ্যতা পাওয়ার সঙ্গত কারণ রয়েছে।

প্রশ্নটা হলো, দল জনবিচ্ছিন্ন ও ছত্রখান অবস্থায় থাকার পর এই ধরনের কাজ করে কি বিএনপি কখনও রাজনীতির মাঠে ফিরে আসতে পারবে? এক্ষেত্রে অতীত অভিজ্ঞাতা কি বলে?  করোনার প্রভাব কাটিয়ে দেশ যখন অর্থনীতির বিপর্যয় রোধ করে অগ্রসর হচ্ছে, করোনার দ্বিতীয় ওয়েভ নিয়ে মানুষ যখন উদ্বিগ্ন, তখন কোন ধরনের কর্মসূচি নিলে বিএনপি বন্ধাত্ব বা বিপর্যয় রোধ করতে পারে, তা দলটির ভেবে দেখার প্রয়োজন রয়েছে। অন্য বিষয়ের মতো রাজনীতিতেও সময়ের বাও বুঝে কাজ করা  প্রয়োজন। এক্ষেত্রে সরকারি দল আওয়ামী লীগকে অনুধাবন করতে হবে, দুই বছর হয়ে যাচ্ছে, আগামীতে নির্বাচনের মুখোমুখি হতে হবে। আর বিএনপিকে বিবেচনায় নিতে হবে, বিগত নির্বাচনের মতো নির্বাচন করলে ফললাভ শূন্য হবে; দলের অস্তিত্ব আরো আরো বিপদের মধ্যে পড়বে। সংসদীয় গণতন্ত্র হচ্ছে আমাদের জাতীয় পছন্দ, জাতীয় চার মূলনীতির একনীতি। তাই জনগণ যেমন চায় মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ধারা যেমন রাষ্ট্র ও সমাজ জীবনে থাকুক; তেমনি সংসদের ভেতরে-বাইরে শক্তিশালী বিরোধী দলও চায়। এই দিকটি বিবেচনায় নিয়েই দেশের দুই  বড় দল শংকা ও আশার  দোদুল্যমানতার মধ্যে  রাজনীতি ও সংগঠনকে গুছিয়ে তুলুক, এটাই কামনা।

লেখক : কলাম লেখক ও সাংবাদিক

এই বিভাগের আরো সংবাদ