কবিতার সীমা প্রসারিত করায় বিশ্বাসী ছিলেন অলোকরঞ্জন

  অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ২১ নভেম্বর ২০২০, ১২:১৭

সত্তর বছর-প্রায় কবিজীবনে অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত বহু বার দিকবদল করেছেন তাঁর কবিতাযাত্রায়। শেষ দিকবদল দুই শতাব্দীর সন্ধিক্ষণে, যখন, তাঁরই নিজের কথায়- কবিতাসংগ্রহ-র তৃতীয় খণ্ডের সূচনায় তাঁর ‘মিতভাষ’-এ- “মার্কিন আগ্রাসনের দাপটে ঘনিয়ে এল গাল্‌ফ্ যুদ্ধ, আমার জন্য রেখে গেল পূর্বধার্য কাব্যমীমাংসার বদলে চ্যালেন্‌জ্‌সঞ্চারী কাব্যজিজ্ঞাসা। বিশেষত এই সংগ্রহের শেষ দুটি বইতে আমার প্রতীতি ও অনাস্থার সেই দোলাচল লুকিয়ে থাকেনি, আমার ঘনিষ্ঠ পাঠকদের কাছে এই তথ্যও গোপন থাকেনি যে জগৎজোড়া শরণার্থীদের সঙ্গেই আমি তখন থেকে অষ্টপ্রহর সম্পৃক্ত হয়ে আছি।” বার বার দিকবদলেও কিন্তু অব্যাহত অবিচল- ও সমান সজীব- থাকে তাঁর অমোঘ মুদ্রাগুণ, শব্দনির্মাণের ঝলকানি। তাঁর সদ্যবয়নে এই নতুন শব্দগুলি- না কি শব্দবন্ধই- যে তাৎক্ষণিক দ্যুতিতে ফেটে পড়ে পাঠকের অভ্যস্ত কাব্যচারণকেই ধ্বস্ত করে নতুন এক চিন্তায় তাকে প্ররোচিত করে, তার মধ্যে অলোকরঞ্জনের যে কাব্যদর্শন প্রোথিত, তার পরিচয় আছে একটি কবিতায়, যেখানে তিনি তাঁর প্রতিবাদী সত্তাকে বিস্ফোরণের প্রাক্‌মুহূর্তে এনে দাঁড় করান। তিনি বলেন: ‘আমি তোমাদের এখন যা কিছু বলছি সে সমস্তই পাথরের অবরুদ্ধ চিৎকার। তোমরা ডিনামাইট দিয়ে আমাকে বিস্ফারিত করলেই আমার প্রতিবাদের ভাষা বুঝতে পারবে। উদয়াস্ত অন্যায়ের বিরুদ্ধে মুখে ফেনা তুলে কথা বলে চলেছিলাম। তাতে কোনোই ফল হয়নি। এখন স্নায়ুশিরার ভাঁজে ভাঁজে জমিয়ে রাখি যাবতীয় বিক্ষোভ। একটু আগেই যারা গঞ্জের কিশোরদের মাথা মুড়িয়ে অকালভিক্ষু বানিয়ে দিল তাদের বিষয়েও বিবমিষা বুনে রেখে দিয়েছি এই শিলার অন্তঃশরীরে... তোমাদের শুধু প্রথমে পাথরটাকে পাথর বলে শনাক্ত করতে ঈষৎ বেগ পেতে হবে। কারণ তাকে ঘিরে রয়েছে এখন সাতসতেরো প্রাচীরলিপি আর বিজ্ঞপ্তি।... এই সমস্ত আগাছা সরিয়ে তবেই কিন্তু ডিনামাইট দিয়ে তোমাদের দীর্ণ করতে হবে আমাকে। শুধু সতর্ক থেকো, ভালোবেসেই বিস্ফোরণের কাজটা ঘটাতে হবে।’

শব্দনির্মাণের মুদ্রাটি ছাড়াও আরও একটি মুদ্রাকে অলোকরঞ্জন তাঁর নিজস্ব কাব্যভাষার অঙ্গ করে নিয়েছিলেন- কবিতার জন্মমুহূর্তের দ্যোতনাকে তিনি প্রায়ই স্থাপন করেন এক পটচিত্রকথার বয়নে, যাতে স্মৃতি থেকে উঠে আসে ইতিহাস-পুরাণ-বর্তমানের নানা চরিত্র, কখনও চেনাজানা সমকালীন মানুষও, কল্পভূমিকায়, কল্পভাষে; কখনও বা সরাসরি ব্যক্তিস্মৃতির বাস্তবতায়; অনুষঙ্গরূপকের এক বিচিত্র মাত্রায়: নিজের সদ্যপ্রয়াত মেজো ভাই ‘ঊর্ণাতন্তুময় সাজ খুলে ফেলে/ অন্তরীক্ষে মিশে যাবার আগে/... আমার দিকে তাকিয়ে হাসল/ ভাবখানা এই: কেমন মজা?’ কিংবা তৃপ্তি মিত্র: ‘এলা, নন্দিনী অথবা সুদর্শনা/ কে আপনি? এই সাজলেন বুলু আর/ এই ফুলওয়ালি। নিচু উলুখাগড়ার/ পরেই সবিতা কাঞ্চনরঙ্গনা,/ উদয়াচলের সূর্যের দুর্বার/ রক্তকরবী যক্ষপুরীতে, যার/ পাপড়িতে বাজে দয়া আর ভর্ৎসনা/ একাধারে। সূর্যাস্তের পরগনা/ হায়দ্রাবাদের সেমিনারে নেমে এলে/ আমি ও শমীক স্মিত চকমকি জ্বেলে/ ভেবেছি শুধাব এই সমস্ত কথা...’; আমার কোনও ‘অনুবাদের ওয়ার্কশপে’ ‘আমি শুধুই বলেছিলাম অন্ধকারে জ্বলতেছে চেরাগ-/ ওরা বলল চেরাগের বদলে/ প্রদীপ বললে ন্যায্য হত, অরুণ মিত্র বললেন পিদ্দিম...’ অলোকরঞ্জন এই কুশীলবদের যে কল্পপটে পুনরুজ্জীবিত করেন, তাতে তাঁরা তাঁদের উপস্থিতির সঙ্গে নিয়ে আসেন সাংস্কৃতিক ইতিহাসের নিরবচ্ছিন্ন ক্রমান্বয়তার রেশ, না কি প্রচ্ছন্ন সূত্র।

সমকালের দুঃসময়ের ছায়াঘোর বিভ্রান্তির মধ্যে আলোকচ্ছটার মতো জ্বলে উঠে এই মুহূর্তগুলি কবিতার মধ্যে যে নাটকীয় মাত্রা সৃষ্টি করে, তার মায়ায় মজে অলোকরঞ্জন কখনও কখনও নাট্যকণিকাও সৃষ্টি করেন, তাঁর ভাষায় ‘সংলাপিকা’। এমনই একটি সংলাপিকা ‘বাঁশের কেল্লাটা চলছে’-য় তিতুমিরের বিদ্রোহের তাৎপর্য বিচার করে দুই কিশোর, সাক্ষী হিসেবে তারা পেয়ে যায় বর্তমানে আর ঐতিহাসিক অতীতে অনেক কল্পকুশীলব, তর্ক-মতান্তরে প্রাণবন্ত সওয়াল জবাব, আবার এক ত্রিকালদর্শী গনতকার যে দেখে আর এক কাল, যখন “এখন সবারই তিতুমীর নাম।/ এ গাঁয়েই কেন, যেখানেই যাও-/ হাসনাবাদে বা বেড়াচাঁপা গাঁয়ে/ হাড়ুয়া বাঁশবেড়ুর তলায়/ সব জায়গায় সব জায়গায়/ ছেলেরাই কেন, যত বুড়োরাও তিতুমীর নাম সম্বল করে/ মরতে চলেছে। আমার নিজেরও/ তিতুমীর নাম, ধরে বেঁধে নিয়ে মেরে ফ্যাল তোরা আমায়, তবুও/ নামটা বিকিয়ে দিতে পারব না।” তথ্য, তত্ত্ব ও ভাবনা নিয়ে এই দ্বন্দ্বজটিল বিচারপর্ব শেষে, যেন স্থিতি-প্রতিস্থিতির বিরোধ পেরিয়ে সংস্থিতিতে পৌঁছে তারুণ্যে উপনীত কিশোর সিদ্ধান্তে পৌঁছয়: “সে ছিল শহিদ সে ছিল প্রেমিক/ আর এই দুই সত্তা যখন/ মিলে মিশে যায় এক মোহানায়/ মহাবিপ্লবী শুধু তাকে বলা যায়।”

স্বগত কবিতা থেকে সংলাপিকা, কবিতার সীমা ক্রমাগতই প্রসারিত করে চলেছিলেন অলোকরঞ্জন। এই শতাব্দীর গোড়ায় সমবায়ী শিল্পের গরজে প্রবন্ধগ্রন্থের ভূমিকায় তিনি লিখলেন, “কবিতাকে আজ আর একচোরা হয়ে ভাবের ঘরে চুরি করা মানায় না। তাকে থেকে থেকেই চিত্রকলা, সংগীত বা ফিল্মের কাছ থেকে আঁজলা ভরে রসদ নিতে হয়। অন্যদিকে মিশ্রশিল্পের গূঢ় মন্ত্রণায়, সৃষ্টির নানামুখী প্রকাশচর্যারও কি এখন কবিতার কাছে শরণার্থী হওয়ার কথা নয়?” ওই বইয়ে অন্তর্গত আমাকে লেখা এক খোলা চিঠিতে তিনি তাঁর একান্ত স্বকীয় সেই সমবায়ী চেতনায় জারিত ভাষায় কবিতায় জীবন ও সংস্কৃতির অবিরাম ধারাপাত চিহ্নিত করে লিখেছিলেন: “শমীক, এই সুযোগে আমাদের যাপিত সময়ের এক টুকরো আপনাকে আরেকবার মনে করিয়ে দিতে চাই। হায়দ্রাবাদের প্রবাসী বঙ্গসাহিত্য সম্মেলনের ছোটোগল্প সংক্রান্ত আলোচনাচক্র যখন আমাদের নিদারুণ অবসন্ন করে তুলল, আমরা আচমকা সেকেন্দ্রাবাদে চলে যাই। রমজানের সারারাত্তির পথে ঘুরতে ঘুরতে আমরা কি গোটা মানুষ আর শিল্পীর মাঝখানকার অন্বয়মুখী টানাপোড়েনের কথাই আলোচনা করিনি? হায়দ্রাবাদ ছাড়বার আগে অতিথিসদনের বারান্দায় মঞ্চের বাইরে তৃপ্তি মিত্রের ‘রক্তকরবী’ থেকে অনবদ্য অভিনয়, অজন্তায় সপ্তদশ গুহায় নিবিড় অভয় ও অসহায়তার মধ্যে বুদ্ধের উচাটন, ইলোরার অভ্যন্তরে একদল দুর্বৃত্তের হানা দিয়ে হিন্দি ফিল্মি ঢঙে পিকনিক জুড়ে দেবার অসভ্যতা, আর এই সব কিছু নিয়ে ও ছাপিয়ে সেই রমজানের রাত ও যোজনব্যাপী আজান আমাদের আচ্ছন্ন করে দিয়েছিল।” ইতিহাস, সভ্যতা, মানবতার সমস্ত সম্পদের অনির্বাণ পরম্পরার মধ্যে মানুষের প্রাত্যহিক জীবনচর্যাকে লালন করার তাগিদেই কবিতাকে প্রসারিত করার এই পরম সাধ কিন্তু ওই নব্বইয়ের দশকেই প্রবল ধাক্কা খেয়েছে অলোকরঞ্জনের দৈনন্দিন বোধে। দেশে-বিদেশে অন্তহীন যুদ্ধের বীভৎসতায় তাড়িত কবি এ বার কবিতাকে আরও প্রসারিত করে রচনা করেন যুদ্ধের ছায়ায়। তার সূচনায় তিনি লিখলেন: “কীভাবে কেন ঠান্ডা ইতিহাসের একটা বই পড়ছি, এমন সময় শমীক এলেন। শমীকের সঙ্গে দেখা হলেই এক একটি প্রকল্পের বোধন হয়। সেদিনও ঠিক হল, যুদ্ধ নিয়ে, অর্থাৎ যুদ্ধ ব্যাপারটার বিরুদ্ধে, একটি কোলাজ তৈরি করতে হবে।” কবিতা থেকে এ বার কোলাজ, তার শুরু হল ইঙেবার্গ বাখ্মান-এর কবিতার অনুবাদ দিয়ে: “যুদ্ধ এখন আর ঘোষিত হয় না,/ বরং চলতেই থাকে। কেলেংকারি প্রাত্যহিক হয়ে উঠেছে।” তার পর ইতিহাসের সন-তারিখে যুদ্ধ ও প্রাণবিনাশের খতিয়ানের সঙ্গে গেয়র্গে গ্রোস্‌ৎস, অটো ডিক্‌স্‌-এর যুদ্ধক্ষেত্রের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা থেকে উৎসারিত চিত্রকলা, কলকাতার তরুণ চিত্রকর তপন ভট্টাচার্যের রেখায় নির্মম কৃষ্ণকৌতুকী, অনুবাদে, নতুন নিজের কবিতায় শ্বাসরুদ্ধকারী সেই কোলাজ-এ রইল ‘ঈর্ষাপ্রবণ’ নামে তাঁর সেই পরম উচ্চারণও: ‘সাদী-র ছিল গুলিস্তান, শিল্পসরস্বতীকে নজরানা,/ দিতে হলেও সুফী কবির ডানা/ ছেঁটে দেবার স্পর্ধা কারো ছিল না; নজরুল যতটা বিপ্লবী ছিলেন ততটাই মঞ্জুল;/ এবং যখন তুলসীদাস বারাণসীর ঘাটে/ রামচরিত লিখছিলেন হিন্দুরা মাতেনি মৌলবাদে;/... কিন্তু আমি হঠাৎ ঈশ্বরিত/ হয়ে-ওঠার দুঃসাহসে ত্বরান্বিত একখানি ত্রিপদী/ লিখতে গিয়ে দেখেছি আজ হয়নি কোথাও যুদ্ধের বিরতি/ সাদীর ছিল যোজনব্যাপী গুলবাগিচা, আমার তকদির:/ বিবদমান বন্ধুদের গুলিগালাজ, জম্মু ও কাশ্মীর।’ বই শেষ করেছিলেন গ্যের্নিকার ধ্বংসের পর পিকাসোর ছবির প্রসঙ্গ থেকে সোজা লেখার মুহূর্তে ফিরে এসে: “পিকাসোর মতোই দীর্ঘায়ত অপেক্ষার পরেও হঠাৎই যে এই অসহিষ্ণু চর্চা শুরু হয়ে যেতে পারে তার সদ্য, অনুসরণযোগ্য নিদর্শন সত্তর বছর পূর্তির জন্মদিনে পৌঁছিয়ে নাট্যকার হ্যারল্‌ড্‌ পিন্টারের একটি মুদ্রায়: বসনিয়ায় ন্যাটোর বোমাবর্ষণে একটি কিশোরীর মৃত্যুর প্রতিবিধান দাবি করে তিনি ইংল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারকে আন্তর্জাতিক আদালতের কাঠগড়ায় নিয়ে যাওয়ার জন্য বদ্ধপরিকর হয়ে উঠেছেন। এভাবেই কি আমরাও গুজরাটের কোনো একটি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একজন অপরাধীকে সরাসরি দায়বিদ্ধ করতে পারি না? সেটাই হতে পারে সংগ্রামী শান্তির সপক্ষে আমাদের প্রথম সুনিশ্চিত পদক্ষেপ।”

আমি নিশ্চিত জানি, আর এক বার অলোকদার সঙ্গে দেখা হলে যে প্রকল্পটির বোধন হত, তার পরিণামে অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত ‘দেশদ্রোহী’ বলে চিহ্নিত হয়ে ভারাভারা রাও-এর সহকারাবাসী হতেন।

সৌজন্যে: আনন্দবাজার পত্রিকা

এই বিভাগের আরো সংবাদ