পাহাড়ে ‘ধর্মীয় সম্প্রীতি’ নিয়ে নুহাশ হুমায়ূনের তৈরি বিজ্ঞাপন নিয়ে বিতর্ক

  অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ২২ মে ২০১৯, ১১:৪৮

কয়েকদিন আগে তৈরি একটি মোবাইল ফোনের বিজ্ঞাপনের বিষয়বস্তু সামাজিক মাধ্যমে বেশ আলোচনা এবং বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। 

বিজ্ঞাপনটিতে পাহাড়ে বসবাসরত বাঙালি এবং ক্ষুদ্র নৃতাত্বিক গোষ্ঠীর সদস্যদের মধ্যে সম্প্রীতির চিত্র ফুটিয়ে তুলতে গিয়ে সেখানকার পাহাড়ি ও বাঙালিদের সম্পর্কের ঐতিহাসিক পটভূমির সত্যতাকে খর্ব করা হয়েছে বলে সামাজিক মাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ক্ষুদ্র নৃতাত্বিক গোষ্ঠীর সদস্যদের অনেকে।

বিজ্ঞাপনটি তৈরির সঙ্গে জড়িতরা বলছেন, আজানের শব্দ শোনা যায় না এমন একটি এলাকায় রমজান মাসে সেহেরি ও ইফতারের সময় পাহাড়ে বসবাসরত বাঙালি মুসলমানদের আজানের সময় জানিয়ে দেয়া এক কিশোরের গল্পের মাধ্যমে পাহাড়ি-বাঙালি সম্প্রীতির চিত্র ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করা হয়েছে বিজ্ঞাপনটিতে।

তারা বলছেন, বিজ্ঞাপনটি মূলত টেলিভিশনের জন্য বানানো হয়েছে, যদিও এটি প্রথমে প্রকাশ করা হয় ইউটিউব ও ফেসবুকে।

তরুণ নির্মাতা নুহাশ হুমায়ূন বিজ্ঞাপনটি পরিচালনা করেন। এর নির্মাণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একজন জানিয়েছেন, এক পাহাড়ি মুসলিম কিশোরের গল্প বিজ্ঞাপনটিতে বলা হয়েছে এবং এর পটভূমি হিসেবে দেখানো হয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের পাহাড়ি এলাকা।

এটি প্রকাশের পর পরই সামাজিক মাধ্যমে ক্ষুদ্র নৃতাত্বিক গোষ্ঠীর অনেকেই বিজ্ঞাপনটির ঘটনা প্রবাহ পাহাড়ি এলাকার পাহাড়ি-বাঙালি সম্পর্কের বাস্তব চিত্রের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে মন্তব্য করেন।

তাদের দাবি, বিজ্ঞাপনে পাহাড়ে বসবাসরত বাঙালিদের সঙ্গে পাহাড়িদের যে সুসম্পর্কের চিত্র দেখানো হয়েছে, তাতে গত কয়েক দশকের পাহাড়ি-বাঙালি দ্বন্দ্বের বিষয়টিকে এবং পাহাড়িদের ধর্মান্তরিত হওয়ার পেছনের বাস্তবতাকে উপেক্ষা করা হয়েছে। এ ছাড়া পাহাড়ি কিশোরের মুসলিম হওয়ার বিষয়টি এবং বিজ্ঞাপনে দেখানো পাহাড়ের মানুষের জীবনধারার কিছু অসঙ্গতির বিষয়েও অভিযোগ তুলে মন্তব্য করেছেন অনেকে।

পার্বত্য অঞ্চলের ক্ষুদ্র নৃতাত্বিক গোষ্ঠীর সদস্যদের বিভিন্ন ফেসবুক পেজ এবং গ্রুপেও এই বিজ্ঞাপনটির ব্যাপক সমালোচনা লক্ষ করা যায়।

মুক্তাশ্রী চাকমা সাথীর ফেসবুক পেজে ইংরেজিতে একটি স্ট্যাটাস দেয়া হয়, যেখানে ‘গতানুগতিক বৈষম্যবাদী ধারার সাথে না গিয়ে পাহাড়ের মানুষের জীবনের সত্য ঘটনাগুলো’ তুলে ধরার অনুরোধ করা হয় বিজ্ঞাপন নির্মাতার প্রতি।

পাহাড় বা পাহাড়ে বসবাসরত জনগোষ্ঠীর জীবনধারা, তাদের ঐতিহ্য-সংস্কৃতি নিয়ে কিছু নির্মাণ করার আগে গবেষণা ও অনুসন্ধান করা উচিত বলে মন্তব্য করে সিএইচটি এন্টারটেইনমেন্ট নামের একটি ফেসবুক পেজে এই বিজ্ঞাপনটির সমালোচনা করা হয়।

বিজ্ঞাপন নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের বক্তব্য কী?
এসব অভিযোগের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে বিজ্ঞাপনটির ‘কনসেপ্ট’ দিয়েছেন যিনি- সেই তুরাস আইমান বলেন, ধর্মীয় সম্প্রীতির চিত্র তুলে ধরার উদ্দেশ্যেই বিজ্ঞাপনটি তৈরি করা হয়েছে এবং এর পেছনে তাদের অন্য কোনো উদ্দেশ্য ছিল না।

আইমান বলেন, ‘বাংলাদেশের পাহাড়ে গিয়ে পাহাড়ি ও বাঙালিদের মধ্যে যে হৃদ্যতার সম্পর্ক আমাদের চোখে পড়েছে, সেটি তুলে ধরাই ছিল বিজ্ঞাপনটির মূল উদ্দেশ্য। এখানে কোনো গোষ্ঠী, সম্প্রদায় বা ধর্মের ঐতিহাসিক বাস্তবতাকে খাটো করার কোনো উদ্দেশ্য ছিল না।’

বিজ্ঞাপনটির শুরুতে ‘সত্য ঘটনা অবলম্বনে’ উল্লেখ করার কারণও ব্যাখ্যা করেন আইমান। বলেন, ‘এ ঘটনাটি সত্য, কিন্তু তার মানে এই নয় যে, একেবারে ওই এলাকায় এবং ওই জনগোষ্ঠীর মানুষের সাথে হওয়া একটি ঘটনা এটি। এমনকি ছেলেটির যে নাম বলা হয়েছে, সে নামটিও সত্যি নয়। একটি সত্য ঘটনাকে কেন্দ্র করে, পারিপার্শ্বিক আবহ তৈরি করে, বিজ্ঞাপনটি প্রকাশ করা হয়েছে মাত্র।’

পরিবারহীন এক কিশোর কীভাবে সেহরি ও ইফতারের সময় জানিয়ে দেয়ার মাধ্যমে তার এলাকার মানুষের মধ্যেই পরিবারের সান্নিধ্য খুঁজে পেল- সেই গল্পটিই তুলে আনার চেষ্টা করা হয়েছে বলে মন্তব্য করেন আইমান।

তবে এ বিষয়ে জানতে বিজ্ঞাপনটির পরিচালক নুহাশ হুমায়ূনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি আলাদাভাবে বিবৃতি দেবেন বলে জানান।
তথ্যসূত্র : বিবিসি বাংলা

এবিএন/সাদিক/জসিম

এই বিভাগের আরো সংবাদ