কুখ্যাত প্রতারক নাসিমকে বিদেশি অস্ত্র, জালনোট ও মাদকসহ গ্রেফতার

  অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ০১ অক্টোবর ২০২০, ২১:১৭

ছবিঃ সংগৃহীত
রাজধানীর রূপনগর এলাকা থেকে নাসিম রিয়েল স্টেটের মালিক ৫৫ মামলার গ্রেফতারী পরোয়ানাভুক্ত পলাতক আসামি কুখ্যাত প্রতারক নাসিমকে বিদেশি অস্ত্র, জালনোট ও মাদকসহ গ্রেফতার করেছে র‌্যাব-৪। এ সময় তার স্ত্রী হালিমা আক্তার সালমাকেও গ্রেফতার করা হয়।
বৃহস্পতিবার দুপুরে কারওয়ান বাজার র‍্যাবের মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলনে এসব জানান র‌্যাব-৪ এর অধিনায়ক অতিরিক্ত ডিআইজি মোজাম্মেল হক।

তিনি জানান, গতকাল বিকেল ৩টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত রাজধানীর রূপনগর আবাসিক এলাকা নাসিমের বাসায় ও চিড়িয়াখানা রোডের নাসিম রিয়েল এস্টেট এর অফিসে অভিযান পরিচালনা করে একটি বিদেশি পিস্তল, একটি ম্যাগজিন, তিন রাউন্ড গুলি, জাল ১ লাখ ৩৫ হাজার টাকা, ১৪০০ পিস ইয়াবা, দুই বোতল বিদেশি মদ, ৪ টি ওয়াকিটকি সেট, ৬টি পাসপোর্ট, ৩৭টি ব্যাংক চেক বই এবং ৩২টি মোবাইল সিমসহ গ্রেফতার করা হয়।

যেভাবে নাসিমের উত্থান:

ইমাম হোসেন নাসিমের গ্রামের বাড়ি ভোলা জেলার দৌলতখান থানার মেদুয়া গ্রামে। তার বাবা ১৯৫০ সালের দিকে ঢাকায় চলে আসে। সে ১৯৬০ সালে ঢাকার বাড্ডায় জন্মগ্রহণ করেন। এরপর আজিমপুরের একটি স্কুল থেকে প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করে। অতঃপর মিরপুরের একটি হাই স্কুল থেকে এসএসসি, ঢাকার ২টি কলেজ থেকে এইচএসসি ও গ্র্যাজুয়েশন সম্পর্ন করেন। ব্যক্তিগত জীবনে ৩টি বিয়ে করেন এবং চার সন্তানের জনক। ১৯৯৬ সালে প্রথম বিয়ে, পুনরায় ২০০৪ সালে দ্বিতীয় বিয়ে অতঃপর ২০১৩ সালে তৃতীয় বিয়ে করেন।

প্রতারণার কৌশলে যেভাবে নাসিম:

আসামি নাসিম ১৯৭৮ সাল থেকে ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত ঠিকাদারির কাজ করে এলেও মূলত ২০০২ সাল থেকে অভিনবভাবে প্রতারণামূলক কৌশলের মাধ্যমে নিজেকে কথিত নাসিম রিয়েল এস্টেট কোম্পানির মালিক পরিচয় দিয়ে সাইনবোর্ড টানায়। এছাড়া ক্ষেত্রবিশেষে অস্ত্র প্রদর্শন পূর্বক ভয় ভীতি দেখিয়ে সাভারের কাউন্দিয়া এলাকায় অন্যের জমি, খাস জমি দখল করে আবাসিক শহর গড়ে দেয়ার নামে প্রায় ৫ হাজার সাধারণ মানুষের কাছে থেকে অর্থ বায়না করে। প্রত্যেকের কাছ থেকে ৫ লাখ টাকা এবং ২৫০ জনের সঙ্গে ভুয়া চুক্তিপত্র করে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা আত্মসাৎ করে। এটির পাশাপাশি সে ২০০৫ থেকে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করে ভিন্ন ভিন্নভাবে মানুষের কাছ থেকে টাকা আত্মসাৎ করে। 

শাহ আলী থানার চিড়িয়াখানা রোডের নাসিম গ্রুপের অফিসে অভিযান চালিয়ে তার মালিকানাধীন ১৬টি প্রতিষ্ঠানের সন্ধান পাওয়া গেছে। 

যতগুলো প্রতারণার অফিস গড়েন নাসিম:

নাসিম রিয়েল এস্টেট লিমিটেড, নাসিম ডেভলপার লিমিটেড, নাসিম এগ্রো ফুড লিমিটেড, নাসিম বাজার,এস বি ফাউন্ডেশন, ডা. বেলায়েত হোসেন মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল, নাসিম পার্সেল ও কুরিয়ার সার্ভিস, সাপ্তাহিক ইমারত অর্থ, নাসিম শিপ বিল্ডার্স, নাসিম ইঞ্জিনিয়ারিং ও কন্সাল্টেন্সি, নাসিম ট্রেডিং লিমিটেড, সাহানা আই হাসপাতাল,বাংলা নিউজ ১৬, নাসিম ড্রিংকিং ওয়াটার, নাসিম রিফাইন্ড সুগার, নাসিম বেভারেজ।

আত্মগোপনের কৌশল:

বিভিন্ন সময়ে নামে-বেনামে ৩২টি সিমকার্ড ব্যবহার করে সে সেসব প্রতারণার শিকার মানুষদের ধরা-ছোঁয়ার বাইরে চলে যেতো। সময়ে সময়ে অস্ত্র প্রদর্শন ও ওয়াকিটকি দেখিয়ে নিজের নিরাপত্তাও নিশ্চিত করতো। গ্রেফতার এড়াতে আন্ডারগ্রাইন্ডে তার গোপন সুরঙ্গে অবস্থিত ফিঙ্গারপ্রিন্ট সম্বলিত দরজাযুক্ত অফিসে আত্মগোপন করতো। নাসিমের অনুপস্থিতিতে তার তৃতীয় স্ত্রী হালিমা আক্তার প্রতারণার ব্যবসা দেখাশোনা করতো।

প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের বরাত দিয়ে র‍্যাবের এই কর্মকর্তা জানান, গ্রেফাতারকৃত আসামিরা নিম্নোক্ত অভিনব প্রতারণার কৌশল অবলম্বন করে সাধারণ জনগণকে প্রতারিত করে আসছিলো।  

অস্ত্রধারী ভূমিদস্যু হিসেবে প্রতারণা:

আসামি অভিনব পন্থা অবলম্বন করে দীর্ঘদিন যাবত সাধারণ জনগণের কাছে প্রতারণামূলক কৌশলের মাধ্যমে নিজেকে বিভিন্ন সময় রিয়েল এস্টেট কোম্পানির মালিক পরিচয় দিয়ে আবার ক্ষেত্রবিশেষে অস্ত্র প্রদর্শন পূর্বক জমি দখল করে কোটি কোটি টাকা আত্মসাত করে আসছিলো।

৩২ টি সীমকার্ড ও ৪ টি ওয়াকিটকি সেট দিয়ে প্রতারণা:

আসামি নাসিম নামে-বেনামে ৩২টি সিমকার্ড ব্যবহার করে সকলের ধরা-ছোয়ার বাহিরে থেকে প্রতারণার কাজ সঠিকভাবে পরিচালনা করতো এবং এ ওয়াকিটকি সেটগুলো দ্বারা নিজের নিরাপত্তা ও রিয়েল এস্টেট কোম্পানির মালিক হিসেবে তার পরিচয় নিশ্চিত করতো।

৫৫ টি গ্রেফতারি পরোয়ানাভুক্ত পলাতক আসামি:

রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন থানায় আসামিদ্বয়ের বিরুদ্ধে প্রতারণা, ভূমিদস্যুতা, মাদক ও জালটাকা মামলার প্রায় অর্ধশতাধিক গ্রেফতারী পরোয়ানা রয়েছে। 

শীর্ষস্থানীয় মাদক ও জালটাকার ব্যবসায়ী: আসামিদ্বয় দেশের সীমান্তবর্তী এলাকাসমূহ থেকে স্ত্রীর সহযোগিতায় মাদক দ্রব্য ইয়াবা ও বিদেশি মদ সংগ্রহ করে ঢাকা মহানগরীর বিভিন্ন এলাকার ডিলার ও খুচরা মাদক কারবারীদের নিকট বিক্রয় করে আসছিলো। এছাড়াও ওই আসামিদ্বয় ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় জাল নোটের ব্যবসা পরিচালনা করতো। 

ভুক্তভোগী মানুষেরা তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে শতাধিক মামলা করে যার পরিপ্রেক্ষিতে তার বিরুদ্ধে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন থানায় প্রতারণা মামলার ৫৫টি গ্রেফতারী পরোয়ানা জারি হয়। এছাড়াও তার বিরুদ্ধে প্রতারণা সংক্রান্ত অসংখ্য জিডি ও অভিযোগ রয়েছে।

গ্রেফতারকৃত নাসিম ও তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে অস্ত্র, মাদক, প্রতারণার মোট ৪টি মামলা প্রক্রিয়াধীন। প্রতারিত অসংখ্য ভুক্তভোগী আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে, তাদের মধ্যে ১০/১২ জন প্রতারক নাসিমের বিরুদ্ধে মামলা করার প্রস্তুতি গ্রহণ করছেন। যারা মামলা করতে ইচ্ছুক, র‌্যাব-৪ তাদের প্রয়োজনীয় আইনগত সহায়তা দিতে প্রস্তুত।

 

এবিএন/ইমরান/জসিম/এসই

এই বিভাগের আরো সংবাদ