ঝালকাঠিতে কবর থেকে লাশ উত্তোলন

  অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ১৮ জুলাই ২০১৮, ১২:৪৮

ঝালকাঠি, ১৮ জুলাই, এবিনিউজ : ঝালকাঠি সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট আদালতের নির্দেশে বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি)’র সিনিয়র ক্যামেরা পার্সন আলতাফ হোসেনের মৃত্যুর ৪ বছর ৩ মাস পরে কবর থেকে মাথার খুলি, শরীরের হাড়সহ মৃতদেহের অংশ বিশেষ উত্তোলন করা হয়েছে। আলতাফ হোসেন’র স্ত্রী ছবি আক্তার সাবিনা বাদী হয়ে ‘স্বামীকে পরিকল্পিত ভাবে হত্যার’ অভিযোগে নালিশী মামলা দায়ের করলে আদালত ভিশেরা রিপোর্টের নির্দেশ দিলে গত ১৬জুলাই সোমবার দুপুর ২ টায় রাজাপুর উপজেলার কানুদাসকাঠি পারিবারিক গোরস্থান থেকে এ কঙ্কাল উত্তোলন করেছে। এ সময় জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মোঃ সাখাওয়াত হোসেন এর নেতৃত্বে রাজাপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক মোঃ আসাদুজ্জামান, অফিসার ইন চার্জ (প্রশাসন) মোঃ শামসুল আরেফিন, ওসি (তদন্ত) হারুন অর রশিদ উপস্থিত ছিলেন। 
রাজাপুর থানার ওসি মোঃ শামসুল আরেফিন জানায়, ২০১৪ সালের ৬মার্চ বিটিভি’র সিনিয়র ক্যামেরা পার্সন আলতাফ হোসেনের মৃত্যু হলে তার দ্বিতীয় স্ত্রী ছবি আক্তার সাবিনা বাদী হয়ে ৩বছর ৭মাস পরে গত ২০১৭ সালের ১২ অক্টোবর সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট আদালতে নালিশী মামলা দায়ের করেন। আদালত অভিযোগটি আমলে নিয়ে রাজাপুর থানার ওসিকে এজাহার রেকর্ড করে প্রেক্ষিতে আদালত রাজাপুর থানার ওসিকে এজাহার রেকর্ড পূর্বক মৃতদেহ উত্তোলন করে ফরেনসিক টেষ্টের মাধ্যমে আদালতে ভিশেরা রিপোর্ট জমা দেয়ার নির্দেশ দেন। সে অনুযায়ী আদালতে নির্দেশের ৪ দিন পর গত ১৬ অক্টোবর নালিশী অভিযোগটি রাজাপুর থানা পুলিশ এজাহার হিসাবে রেকর্ড ( মামলা নং-০৭) করেন।
বাদী নিহতের স্ত্রী ছবি আক্তার সাবিনা মামলার বিবরনে উল্লেখ করেন, ২০১১ সালের ২৭ জুলাই ঝালকাঠি জেলাধীন রাজাপুর উপজেলার কানুদাসকাঠি গ্রামের মৃত. তাছেন উদ্দিনের পুত্র বিটিভি ক্যামেরাম্যান আলতাফ হোসেনের সাথে তিনি বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন।  দাম্পত্য জীবনে তার একমাত্র সন্তান আবতাব উদ্দিন আলআমিন ৮মাসের গর্ভাবস্থায় স্বামী আলতাফ হোসেনকে জমিজমা সংত্রান্ত স্থানীয় বিরোধী ও তার প্রথম সংসারের স্ত্রী-সন্তানেরা সম্পত্তি আত্মসাতের জন্য পরিকল্পিত ভাবে হত্যা করে।
কারন নিহত স্বামী আলতাফ হোসেনের সাথে কানুদাসকাঠি গ্রামের জাহিদুল ইসলাম লিটন ওরফে সাদু হাওলাদার (৪০), মোঃ রেজোয়ান হাওলাদার (৪২), মোঃ মুজাম্মেল হাওলাদার (৪৫), মোঃ সিদ্দিকুর রহমান (৪৮) সাথে নিয়ে দীর্ঘদিনের দ্বন্দ্ব ছিলো। তাছাড়া প্রথম পক্ষের স্ত্রী নাসিমা বেগমের মেয়ে লাইজু আক্তারের সাথে উক্ত প্রতিপক্ষ জাহিদুল ইসলাম লিটনের গোপন সম্পর্ক ছলো। এই সূত্রধরে তারা একত্রিত হয়ে সহায়-সম্পত্তি আত্মসাতের জন্য পরিকল্পিত ভাবে আলতাফ হোসেনকে হত্যা করে। তাদের এ হত্যার ষড়যন্তের বিষয়টি আগেই আঁচ করতে পেরে আলতাফ হোসেন দ্বিতীয় স্ত্রী বাদিনীকে নিয়ে ঢাকার বাসা ছেড়ে রাজাপুর উপজেলার কানুদাসকাঠি গ্রামে পৈত্রিক বাড়ীতে এসে উঠলেও প্রথম পক্ষের স্ত্রী-সন্তানেরা ঢাকাতেই বসবাস করতে থাকে। 
মামলার বিবরনে আরো উল্লেখ করেন, গত ২০১৪ সালের ১১ ফেব্রুয়ারী সকাল ৮ টার দিকে প্রথম স্ত্রী নাসিমা বেগম ও ছেলে-মেয়েরা একটি সাদা অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে গ্রামে এসে বাড়ীতে না গিয়ে পার্শ্ববর্তি কাটাখালী বাজারে অবস্থান নেয়। সেখান থেকে তারা পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী লিটন, মুজাম্মেল, সিদ্দিক ও রহমানকে পাঠিয়ে চিকিৎসা করানোর কথা বলে গ্রামের ঘর থেকে আলতাফ হোসেন একটি ভ্যান গাড়ীতে তুলে নিয়ে আসার পর থেকে সে নিখোজ হয়। এ অবস্থার প্রায় একমাস পরে ৬মার্চ উক্ত লিটন নিখোঁজ আলতাফ হোসেনের বাড়ীতে এসে ২য় স্ত্রী ছবি আক্তার সাবিনাকে বলেন ‘আলতাফ বয়স্ক মানুষ, কত দিন আর বাঁচবে ? এরমধ্যে আবার একটি সন্তানও নিয়ে নিলে, এখন তার কি হবে? জমি-জমা সব তো আমাদের লিখে দিছে। 
বাদী ২য় স্ত্রী ছবি আক্তার সাবিনা অভিযোগ করেন, এঘটনার পরের দিন ৭ জুলাই সকাল ৮ টার দিকে প্রথম পক্ষের স্ত্রী-সন্তানেরা আলতাফ হোসেনকে মৃতাবস্থায় গ্রামের বাড়িতে নিয়ে আসে। বাড়িতে এনে তারা সকলের সাথে আলাপ করে এলাকায় মাইকিং করে বিকেলে জানাজা ও দাফনের কথা ঘোষনা করলেও রহস্যজনক কারনে তাড়াহুড়া করে মাত্র এক ঘন্টা পর সকাল ৯ টার মধ্যেই আলতাফ হোসেনকে জানাজা ও দাফন সম্পন্ন করে। এরপরেই প্রথম পক্ষের নাসিমা বেগম তার ছেলে-মেয়েদের নিয়ে ঢাকায় চলে যায় এবং সেখানে দ্বিতীয় স্ত্রী-সন্তানকে গোপন করে কৌশলে ঢাকার বাড়ী, ব্যাংকে জমানো টাকাসহ সকল অর্থ-সম্পদ আত্মসাত করে। 
উক্ত নালিশী অভিযোগটি গত ১৫ জুলাই ২০১৮ইং রবিবার সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে দায়ের করার পর প্রাথমিক শুনানী শেষে আদালতের বিচারক সেলিম রেজা আলতাফ হোসেন’র মরদেহ কবর থেকে উত্তোলন করে পরীক্ষার জন্য নির্দেশ দেন। 
এ ব্যাপারে মামলার বাদী ছবি আক্তার সাবিনা জানায়, আমার স্বামিকে হত্যার পর ঢাকার সব সহায়-সম্পত্তি আত্মসাত করেও তাদের পেট ভরেনি। এখোন গ্রামের সহায়-সম্পত্তি আত্মসাতের জন্য পূর্ব শত্রুদের সাথে হাত করে আমাকে ও আমার একমাত্র পুত্র সন্তানকে হত্যার জন্য নানাভাবে ষড়যন্ত্র করছে। তাঁদের কারণে বর্তমানে আমরা স্বাভাবিক ভাবে জীবনযাপনও করতে পারছি না। 
এ বিষয়ে বাদী সাবিনার পিতা বেলায়েত হোসেন জানায়, মেয়ে জামাই আলতাফ হোসেনকে হত্যা করার পর আমাদেরকে স্বপরিবারে উৎখাতের জন্য নানা চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্র করছে। আমাদের জীবন যে কোন সময় আসামীদের হাতে শেষ হয়ে যেতে পারে। আমরা এতোটাই নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি যে তাদের ভয়ে বাড়িতে থাকতে পারি না। কয়েকদনি পূর্বে তারা আমাদের দুটি ছাগলকেও মেরে ফেলেছে। 
এ ব্যাপারে রাজাপুর থানার ওসি মোঃ শামসুল আরেফিন জানায়, আদালতের নির্দেশক্রমে কবর থেকে কঙ্কাল উত্তোলন করা হয়েছে। দাফনের ৪ বছর ৩ মাস পরে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের কিছু হাড্ডি এবং মাথার খুলি ছাড়া আর কিছুই পাওয়া যায়নি। 
এ ব্যাপারে রাজাপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক মোঃ আসাদুজ্জামান জানান, আদালতের নির্দেশে কবর খুড়ে কিছু হাড্ডি ও মাথার খুলি পাওয়া গেছে। এগুলো পরীক্ষার জন্য মহাখালী স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রেরণ করা হবে। 

এবিএন/ আজমীর হোসেন তালুকদার/জসিম/নির্ঝর

এই বিভাগের আরো সংবাদ