রানা প্লাজা ট্র্যাজেডি

গাইবান্ধার ‘অরকা হোম’-এ হতাহতের সন্তানরা কেমন আছেন

  অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ২৪ এপ্রিল ২০১৯, ২২:১১

আল-আমিন, ওলি হোসেন, ফাতেমা আক্তার মিম, সোনালী আক্তার বিথী, জিয়াদ হোসেন গুনে গুনে ওরা ৪৮ জন। এর মধ্যে ২০ জন মেয়ে, ২৮ জন ছেলে। ওরা সবাই সাভারের রানা প্লাজা ধসে হতাহত নারী পোশাককর্মীদের সন্তান। এদের কেউ মাকে হারিয়েছে। কারো মা থাকলেও বাবা নেই। আবার আজীবনের জন্য পঙ্গুত্ববরণ করেছে কারও মা কিংবা বাবা। এইসব ‘ট্র্যাজেডি-শিশু’ গুলোর পাশে দাঁড়িয়েছে রাজশাহী ক্যাডেট কলেজের প্রাক্তন ছাত্রদের সংগঠন ‘ওল্ড রাজশাহী ক্যাডেট অ্যাসোসিয়েশন’ (অরকা)। এইসব দুস্থ ও এতিম শিশুদের জন্য গাইবান্ধায় ‘অরকা হোমস’ নামে একটি আশ্রয় কেন্দ্র গড়ে তুলেছে অরকা।

মায়ের লাশ পাওয়ার আশা নিয়ে রানা প্লাজার ধ্বংসস্তপের পাশে মামা-খালা ও নানির সাথে অপেক্ষায় থাকতো সাভারের ছেলে ওলি হাসান। ১৫ দিন পর তার মায়ের লাশ খুঁজে পাওয়া যায়। অধর চন্দ্র মডেল হাইস্কুল মাঠে পচে-গলে যাওয়া সেই লাশ দেখে প্রথমে চিনতে পারা যায়নি। পরে হাতে ধরে থাকা ব্যাগে পরিচয়পত্র আর পরনের কাপড় দেখে মাকে সনাক্ত করা হয়েছিল। সেই সময়ে ওলি হাসানের পাশে দাঁড়ায় রাজশাহী ক্যাডেট কলেজের প্রাক্তন ছাত্রদের সংগঠন ‘ওল্ড রাজশাহী ক্যাডেটস অ্যাসোসিয়েশন’ (অরকা)।

ওলি হাসানের ঠাঁই হয় প্রথমে চট্টগ্রামে ‘অরকা হোমস’-এ। সেখান থেকে দেড় আগে গাইবান্ধা হোমসে আসে সে। এখানে শুধু আশ্রয় নয়। এখানে এসে ওলি পেয়েছে নতুন করে জীবন শুরু করার প্রেরণা। সুন্দর পরিবেশে থাকা-খাওয়ার পাশাপাশি স্কুলে পড়াশোনার সুযোগ। ক্লাস সেভেনে পড়ছে। সে জানায়, এখানে কোন সমস্যা নেই-নিয়মের মধ্যে জীবন বাধা। লেখাপড়া শেষ করে পুলিশ অফিসার হবার ইচ্ছে তার।

গাইবান্ধার অরকা হোমসে আশ্রয় পেয়েছে রানা প্লাজায় হতাহত নারী শ্রমিকের ২৮ ছেলে ও ২০ মেয়ে। ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল ঢাকার সাভারে রানা প্লাজা ধসে ১ হাজার ১৩৮ জনের বেশি শ্রমিক প্রাণ হারান। দুর্ঘটনায় হাজারো শ্রমিক আহত হন। আজীবনের জন্য পঙ্গুত্ববরণ করেন অনেকে।

গাইবান্ধা অরকা হোমসে ওলির সাথে থাকে আরেক শিশু জিয়াদ হোসেন। রানা প্লজার ধ্বংসস্তপের নিচ থেকে দুইদিন পর তার মাকে জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। তবে মাথায় আঘাতের কারণে স্মৃতি হারিয়ে এখন তিনি মানষিক ভারসম্যহীন। সান্তনা বলতে তিনি শুধু বেঁচে আছেন। আর্থিক দুরবস্থার কারণে জিয়াদের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবার মতো অবস্থা তার পরিবারের ছিল না। এ রকম সময়ে তার মাথার ওপর ছায়া দেয় অরকা হোমস। ভালো আছে জিয়াদ লেখাপড়া শেষ করে দেশের কাজে সেনাবাহিনীতে যেতে চায় সে।

গাইবান্ধার ফুলছড়ি উপজেলার কঞ্চিপাড়া ইউনিয়নের হোসেনপুর গ্রামে তিন তলাবিশিষ্ট অরকা হোমস ভবন। ভবনের দোতলায় থাকে ছেলেরা। আর মেয়েরা থাকে তিনতলার কক্ষগুলোতে। ২০১৪ সালের ২৬ ডিসেম্বর প্রায় ৯০ লাখ টাকা ব্যয়ে গাইবান্ধায় গড়ে তোলা হয় অরকা হোমস। পরবর্তীতে আরো একটি সম্প্রসারিত তিনতলা ভবন নির্মিত হয়। প্রচলিত দুস্থ আশ্রয় কেন্দ্রের ধারণার সঙ্গে এর কোনো মিল নেই। এখানে থাকা শিশু-কিশোরদের পোশাক-পরিচ্ছদ এবং চলাবলায়ও সুরুচির ছাপ স্পষ্ট। এখানে থাকা শিশু-কিশোরের সবাই পড়াশোনা করছে পাশের মুসলিম একাডেমিতে। এসব শিশু-কিশোরদের দেখভালের জন্য রয়েছেন তত্ত্বাবধায়ক। তাদের জন্য রাখা হয়েছে গৃহশিক্ষক। রয়েছেন শরীরচর্চার শিক্ষকও। ধর্ম শিক্ষার ব্যবস্থাও রয়েছে। আর সংশ্লিষ্টরা সব সময়ই স্নেহ-মমতা দিয়ে ওদের মুখে হাসি ফুটিয়ে রাখার চেষ্টায় থাকেন।

গাইবান্ধার সাদুল্লাপুর এলাকার আল-আমিন বলে, ‘ভবনধসে মাকে হারিয়েছি। এখানে ভালো আছি। লেখাপড়া শিখে প্রকৌশলী হব।’ সাভারের ফাতেমা আক্তার মিম কান্না জড়িত কন্ঠে জানায়, ‘ওই ঘটনায় মা বুকে আঘাত পেয়ে ভীষণভাবে আহত হন। সেই আঘাত এখন ক্যান্সারে পরিনত হয়েছে। দিনমজুর শ্রমিক বাবাও অসুস্থ্। কাজ হারিয়ে আমাদের লালন-পালনে অক্ষম তিনি। অরকা হোমস্ আমার থাকা-খাওয়াও লেখাপড়র দায়িত্ব নিয়েছে। আমার ছোটবোন সোনালী আক্তার বিথী আমার সাথে এখানে থাকে। সে দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ে। আমি সপ্তম শ্রেণিতে পড়ছি। আমরা ভালো আছি।’ তাদের মতো প্রায় সবাই ভালো থাকার কথা জানায়।

গাইবান্ধা অরকা হোমস্রে পরিচালক মো. জাহিদুল হক জানালেন, ‘দেশ-বিদেশে থাকা অরকার সদস্যদের আর্থিক সহায়তার ভিত্তিতেই মূলত আশ্রয় কেন্দ্রের ব্যয় মেটানো হয়। এছাড়া রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ হোমসের শিশুদের জন্য প্রতি মাসে ৫০ হাজার টাকা করে বরাদ্দ দেয়। এখানে বসবাসকারী শিশুদের লেখাপড়া শেষ করে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হবে। পাশাপাশি মেয়েদের বিয়ের ব্যবস্থা করা হবে। শিশুরা যেন বাবা-মায়ের মতো স্নেহ পায় সে জন্য খেলাধুলা ও বিনোদনের ব্যবস্থা করা হয়েছে’। তিনি বলেন, ‘এখানকার শিশুরা যেদিন সমাজে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবে, সেদিনই তাঁদের উদ্দেশ্য সফল হবে’।

অনেকগুলো মানুষের জীবনের স্বপ্ন ভেঙ্গে তছনছ করে দেয়া রানা প্লাজা ট্র্যাজেডি সবার চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছিল কিছু স্বার্থপর, অর্থলোভী মানুষের দায়িত্বহীনতা আর শ্রমিকদের নিরাপত্তাহীনতার চিত্র। এর বিপরীতে কিছু হৃদয়বান মানুষের স্নেহ-ভালোবাসায় ওইসব শোকাতুর দুঃস্থ শিশুরা অরকা হোমসে আজ প্রকৃত মানুষ হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে বেড়ে উঠছে। ওরা বেড়ে উঠছে ‘অরকা’র মমতায়। ছবি সংযুক্ত

এবিএন/আরিফ উদ্দিন/জসিম/রাজ্জাক

এই বিভাগের আরো সংবাদ