পান বিক্রি করে স্বাবলম্বী সোনাগাজীর অদম্য প্রমিলা

  অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ১২ জানুয়ারি ২০১৯, ২০:১১

অভাব যখন নিত্য দিনের সঙ্গী তবুও জীবন সংগ্রামে থেমে থাকেনি সোনাগাজীর অদম্য প্রমিলা।দারিদ্রের সাথে লড়াই করে পান বিক্রি করে সে হয়েছে স্বাবলম্বী ।তার এ স্বাবলম্বী হওয়ার অন্তরালে রয়েছে প্রতিকুলতার সাথে লড়াই করার অনুকরনিয় গল্প।

মাগরিবের নামাজের আজান পড়েছে।হেটে যাচ্ছিলাম সোনাগাজী পৌরসভার মেইন রোড় হয়ে পশ্চিম বাজারে।বাজারের মাঝখানে কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের অপর পাশে ব্যাবসায়ী মোশারফের তানিয়া ফ্যাশনের সামনে এসে একটি আওয়াজে পথচলা থেমে গেলো। “দিদি নামাজে যাচ্ছি দোকানের দিকে খেয়াল রাইখেন” -কথাটা বলছিলো  কয়েকজন দোকান মালিক।রাস্তার পাশে তানিয়া ফ্যাশনের সামনে পানের ঝুপড়ি নিয়ে বসা মাথায় সিদুর হাতে শাখা পরা শ্যাম বর্নের হালকা পাতলা গঠনের মহিলাটি উত্তর দিলো দাদা আপনারা নামাজে যান, কোন সমস্যা হবেনা।

নামাজ শেষে মহিলাটির পাশে গিয়ে দাড়ালাম। দাড়িয়ে থাকতে দেখে জিজ্ঞাসা করলো দাদা পান লাগবে?উত্তরে বলেছি না এমনিতে দাড়িয়েছি পান লাগবেনা।
 মহিলাটির পাশে গিয়ে বসে ক্ষীনস্বরে প্রশ্ন করলাম মহিলা হয়ে কেন ফুটপাতে পান বিক্রি করেন?  তার সাথে আলাপচারিতায় জানা গেলো অদম্য সাহসী নারীর জীবন সংগ্রামের গল্প। বেঁচে থাকার জন্য যে কিনা জীবন সংগ্রামের অংশ হিসেবে পান বিক্রি করছে।

পান বিক্রেতা মহিলাটির নাম প্রমিলা রানী দাস(৩০)।সে সোনাগাজীর চরছান্দিয়া ইউপির পূর্ব চরছান্দিয়া গ্রামের রাদেশ্যাম মাষ্টার বাড়ীর অলঙ্গ কুমার দাসের মেয়ে।সোনাগাজীর উপকুলীয় দরিদ্র এলাকা জেলে পাড়ায় তার জম্ম।দারিদ্রতাই জম্মের পর প্রমিলার নিত্যসঙ্গী হয়ে উঠে।

শৈশব ও কৈশর পার করে একসময় প্রমিলা যৌবনে পা দেয়।দরিদ্র পিতাকে সহযোগীতা করার জন্য সে মাঠে ঘাটে কাজ করেছে,এমনকি হালচাঁষ পর্যন্ত করেছে।২০০৭ সালে হবিগঞ্জের যুবকের সাথে বিয়ে হয় প্রমিলার।বিয়ের পর স্বামী সংসার নিয়ে সুখে থাকার কথা থাকলেও সুখ নামক সোনার পাখিটা তার জীবনে আসেনি।২০১০ প্রমিলার একমাত্র ছেলে ফয়েল চন্দ্র সরকার যখন ছয় মাসের গর্ভে তখন তার স্বামী তাকে রেখে পালিয়ে যায়।

স্বামী পালিয়ে যাওয়ার পর নতুন করে জীবন সংগ্রামে নামতে হলো প্রমিলাকে।সন্তান জম্মের পর অভাবের তাড়নায় দির্ঘ পাঁছ বছর প্রমিলা হাল চাষ, বদলা দেওয়া,মাছ ধরা সহ সবই করেছে। অতিরিক্ত পরিশ্রমের কারনে সে ২০১৬ সালের জানুয়ারী মাসে গুরতর অসুস্থ্য হয়ে পড়ে।পাড়া প্রতিবেশীর সহযোগীতায় তিন মাস চিকিৎসার পর কিছুটা সুস্থ্য হয়ে নতুন কাজের সন্ধানে বেরিয়ে পড়ে।

প্রমিলা বলেন,সুস্থ্য হয়ে মুসলমান এক ব্যাক্তির কাছ থেকে ১৫০ টাকা ধার নিয়ে সোনাগাজী বাজারে যায়।এই ১৫০ টাকা দিয়ে পান কিনে তাকিয়া রোড়ের মাথায় ফুটপাতে বিক্রির জন্য বসে পড়ি।প্রথম দিনেই ১৫০ টাকার পান ২৭০ টাকা বিক্রি করে।সেই থেকে শুরু প্রমিলার পান ব্যাবসা।এরপর দরদরবেশ ইউপির দাশের হাট এলাকা থেকে অল্প অল্প পান কিনে এনে বিক্রি অবহ্যত রাখে।

প্রমিলা আক্ষেপের শুরে বলেন, ফুটপাতে পান বিক্রি করতে গিয়ে কম ঝামেলা পোহাতে হয়নি।বাজারের পুরাতন পান বিক্রেতারা তাকে কয়েকবার নিয়ে বেঁধে রাখে ও মারধর করে।কোন দোখানের সামনে পান নিয়ে বসতে গেলে তাকে উঠিয়ে দেওয়া হয়েছে।উপায়হীন হয়ে পৌর মেয়রের কাছ থেকে পান বিক্রির অনুমতি গ্রহন করতে হয়।অনুমতি পেলে কি হবে পান নিয়ে বসবে কোথায়?এমন পরিস্থিতিতে এগিয়ে এলো তানিয়া ফ্যাশনের মালিক  ব্যাবসায়ী মোশারফ।

গত দুই বছর যাবৎ প্রমিলা তানিয়া ফ্যাশনের সামনে ফুটপাতে পান বিক্রি করছে।প্রতিদিন সকাল ৯ টার সময় এসে রাত ৯ টায় বাড়ীতে ফিরে যায়।সারাদিন ২৫০০/৩০০০ টাকার পান বিক্রি হয়।সে দুপুর খাওয়ার জন্য বাড়ী থেকে ভাত নিয়ে আসে।প্রাকৃতিক প্রয়োজনে ফাজিল মাদ্রাসার বাথ রুম ব্যাবহার করলেও কখনো তাকে সমস্যায় পড়তে হয়নি।

প্রমিলা এখন ভালো আছে।পান বিক্রি করে সে স্বাবলম্বী।একমাত্র শিশু পুত্র ও বৃদ্ধা মা’কে নিয়ে তার জীবন।স্বামীর প্রতি প্রচন্ড ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন,ভগবান তার বিচার করবে।প্রতিবেশী মুসলমান যুবক যে প্রমিলাকে পান বিক্রির ঝুপড়ি কিনে দিয়েছে তারপ্রতি এবং তানিয়া ফ্যাশনের মোশারফের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।প্রমিলার নিজের কোন ভিটে নেই।বাড়ীর এক আত্মীয়র মালিকিয় ভুমিতে ছোট একচালা টিনের ঘর তুলে বাস করছে।পান ব্যাবসা করে সে কছিু টাকা সঞ্চয় করেছে।তার স্বপ্ন একখন্ড ভুমি ক্রয় করে যেখানে বাকি জীবন সন্তান কে নিয়ে বসবাস করবে, বাজারে দোকানের একটা ভিটে নিবে,ব্যাবসা প্রসারিত করবে।ছেলেকে নিয়ে তার অনেক স্বপ্ন।তার ছেলে স্থানীয় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেনীতে পড়ছে,ছেলেকে লেখাপড়া করিয়ে অনেক বড় ডাক্তার বানাবে যেন অসহায় মানুষের সেবা করতে পারে।

স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বলেন, হিন্দু হয়েও প্রমিলা সবার বিশ্বাস অর্জন করেছে।সে থাকার কারনে দোখান বন্ধ না করে সবাই নামাম আদায় করতে যায়।নামাজের সময়ে সে দোখান পাহারা দেয়।পানের সাথে সে সুপারি,সাদা পাতাও বিক্রি করে।কোন ক্রেতা এ পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ করেনি।পুরো বাজারে সে একমাত্র মহিলা ব্যাবসায়ী। বাজারের মুল সড়কের ফুটপাতে বসে পান বিক্রি করার কারনে সব শ্রেণির ক্রেতা তার কাছ থেকে পান ক্রয় করে।বর্ষাকালে সমস্যায় পড়লেও অন্য সময় তার তেমন সমস্যা হয়না।

এবিএন/আবুল হোসেন রিপন/জসিম/রাজ্জাক

এই বিভাগের আরো সংবাদ
well-food