প্রতিবন্ধিতাকে জয় করে

মায়ের কোলে চড়ে পরীক্ষা কেন্দ্রে সিয়াম

  অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ২১ নভেম্বর ২০১৮, ২১:২৬

ময়মনসিংহের ভালুকার শারিরীক প্রতিবন্ধি সিয়ামকে কোন বাধাই আটকাতে পারেনি। অন্যেরা পাঁয়ে হেটে পরীক্ষা কেন্দ্রে এলেও তাকে আসতে হচ্ছে মায়ের কোলে চড়ে। এর পরও তার মনে কোন আগ্রহের কমতি নেই, আরও একটু বেশীই।

কারন সে প্রতিবন্ধকতাকে জয় করতে চায়, বড় হতে চায়। আর বড় হতে হলে লেখা-পড়া করতে হয় একথা তার মা বলেছে। কারখানা শ্রমিক ফারুক আহাম্মেদ এর একমাত্র ছেলে অদম্য সিয়ামের বয়স ১১ কি ১২ হবে।  একটি ভয়ানক রোগে আক্তান্ত হয়ে সে কয়েক বছর যাবৎ সুস্থ্যতার পরিবর্তে অসুস্থতার অতলে এগিয়ে যাচ্ছে।  বিকল দু‘টি পা সোজা করতে না পারলেও সে প্রতিদিন স্কুলে যায়। সহপাঠীদের আন্তরিকতা দেখে সে আরও উৎসাহিত হয় বলে সে জানায়। পায়ের মত হাতে খুব একটা শক্তি করতে পারে না। তবে অন্যদের চেয়ে আধা ঘন্টা সময় বেশী পাওয়ায় তার পরীক্ষায় কোন সমস্যা হচ্ছে না বলে ও জানায়। কেবল ডান হাতে যে শক্তি আছে আর মনোবল দিয়ে নিজ হাতে লিখে এবার প্রাথমিক সমাপনি পরীক্ষা দিচ্ছে ভালুকার শারিরিক প্রতিবন্ধি সিয়াম।  হাটতে না পারায় প্রতিদিন পরীক্ষা কেন্দ্রে আসতে হয় তার মায়ের কোলে চড়ে,ভ্যানে/রিক্সায়। ঘটনাটি উপজেলার হবিরবাড়ী ইউনিয়নের পাড়াগাঁও এলাকার।

উপজেলার বড়চালা প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে সিয়াম পিএসসি (প্রাথমিক সমাপনি পরীক্ষা) দিচ্ছে। খুব একটা স্বচ্ছল নয় এমন ঘরে জন্ম নেয়া ও শারীরিক এমন প্রতিবন্ধকতার কাছে হার না মেনে নিজের স্বপ্ন পুরন করতে মরিয়া খুদে এই শিক্ষার্থী সিয়াম।  (২০নভেম্বর) মঙ্গলবার পরীক্ষার দিন সকালে মায়ের কোলে করে পাড়াগাঁও উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে পরীক্ষা দিতে আসতে দেখা যায় সিয়ামকে।

এ সময় তাঁর সাথে প্রতিদিনে মা‘ই ছিল, কারন তার বাবা একজন কারখানা শ্রমিক হিসেবে ডিউটিতে ছিলেন। সিয়াম তাঁর ক্লাসের মেধাবী ছাত্র। খুদে এই শিক্ষার্থীর স্বপ্ন পড়াশোনা করে ডাক্তার হবে।  আর এই স্বপ্ন পুরন করতে শত বাধা পেরিয়ে হলেও সে পড়া লেখা করবে বলে তাঁর প্রত্যয়।

মঙ্গলবার পরীক্ষা কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, পাড়াগাঁও উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রের একটি কক্ষে বন্ধু আর সহপাঠিদের সাথেই সে পরীক্ষা দিচ্ছে যদিও একটু পরপর তাকে ওয়াশরুমে যেতে হচ্ছে মায়ের কোলে করে। বিছানা পেতে একাকী পরীক্ষা দিতে তার ভালো লাগবে না তাই কষ্ট করে সবার সাথেই পরীক্ষা দিতে সে স্বাচ্ছন্দবোধ করছে বলেও জানায় সিয়াম।

সিয়ামের মা আসমা পারভীন বলেন, তার ছেলে ছোট বেলায় হাটাহাটি ও দৌড়াদৌড়ি করতে পারলেও বয়স বাড়ার সাথে সাথেই চলাচলে অচল ও অসুস্থ হতে থাকে। তাকে স্থানীয় ও ঢাকার বিভিন্ন ডাক্তারের পরামর্শে চিকিৎসা করানো হচ্ছে। চিকিৎসক বলেছে হয়তো ছেলেটি সুস্থ হতেও পারে, নাও হতে পারে কারন তার বাবা-মায়ের রক্তের একই গ্রুপ থাকায় তার এই সমস্যা। সময়ের সাথে সাথে তার অসুস্থতা আরও বৃদ্ধি পাবে।

তারপরও ছেলের অদম্য ইচ্ছে আর আমাদের স্বপ্নের কারনে সিয়ামের ভবিষৎকে আলোকিত করতে মা হিসেবে আমাদের চেষ্টা অব্যাহত থাকবে। ছেলের পরীক্ষা নিয়ে চিন্তায় ছিলাম ,কিন্তু তার ইচ্ছা শক্তি প্রবল থাকায় সে পরীক্ষায় অংশ গ্রহণ করছে। আমি আশাবাদী সে ভালো রেজাল্ট করবে।

কেন্দ্র সচিব মো: নজরুল ইসলাম বলেন- এ বছর এই কেন্দ্রে প্রাথমিক বিদ্যালয়, কিন্ডার গার্টেন ও মাদরাসা মিলিয়ে ২৫৩ জন পিএসসি পরীক্ষার্থী অংশ গ্রহণ করছে। যাদের মধ্যে একমাত্র সিয়াম‘ই স্পেশাল চাইল্ড হিসেবে পরীক্ষা দিচ্ছে। হল সুপার আলেয়া আক্তার বলেন, অসুস্থ শিক্ষার্থীর পরীক্ষা গ্রহণে যাতে অসুবিধা না হয় সেদিকে খেয়াল রেখে তার পরীক্ষা গ্রহণ করা হচ্ছে।  তারপরও সে পরীক্ষায় অংশ নিতে পেরে আনন্দিত। কেন্দ্রের  দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোঃ রফিকুল ইসলাম বলেন, এই পরীক্ষার্থীর সমস্যা হলে আলাদা কক্ষে পরীক্ষা নেয়ার ব্যাবস্থা নিব।তার প্রতি আমাদের আলাদা নজর রয়েছে। চিকিৎসাসহ সবাই সার্বক্ষনিক নজর রাখছেন।

উপজেলা শিক্ষা অফিসার জুয়েল আশরাফ জানান, এই শিক্ষার্থী সম্পর্কে আমি অবগত নই। তবে শারীরিক সমস্যা থাকায় নির্ধারিত সময় তিন ঘণ্টার পর সে আরও আধা ঘন্টা বেশি পাবে। কারন সে শারিরিক প্রতিবন্ধি। কেন্দ্র সচিবদেরকে এ বিষয়ে ব্যাবস্থা নিতে বলা হয়েছে।

এবিএন/জাহিদুল ইসলাম খান/জসিম/রাজ্জাক

এই বিভাগের আরো সংবাদ