শিক্ষক ১৯জন শিক্ষার্থী ১৭জন

কুড়িগ্রাম বুদ্ধি প্রতিবন্ধী বিদ্যালয় অনিয়মের স্বর্গরাজ্য

  অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ১০ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১৬:৩০

কুড়িগ্রাম জেলা শহরে হাসপাতাল পাড়ায় ১৯৮৫ইং স্থাপিত হয় বুদ্ধি প্রতিবন্ধী বিদ্যালয়। শুরুর দিকে সুইড-বাংলাদেশ পরিচালিত কুড়িগ্রাম শাখা কর্তৃক এই বিদ্যালয়ের কার্যক্রম ভালোই চলতো। বর্তমানে ভুয়া নিয়োগ ও জাল সনদে কতিপয় ব্যক্তি চাকুরি গ্রহণ করায় এই প্রতিষ্ঠানে আইনী জটিলতা কঠিন আকার ধারণ করেছে।

যোগদানের পূর্বের বেতন গ্রহণ, সভাপতিকে উপেক্ষা করা সহ নানাবিধ অনিয়মে বিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম ভেঙ্গে পড়েছে। জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফান্ডেশনের আওতায় আসা এই প্রতিবন্ধী বিদ্যালয়ের সরকারি পদক্ষেপ ভেস্তে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বর্তমানে ১৯ জন শিক্ষক-কর্মচারী মাসিক বেতন প্রায় ৩ লক্ষ টাকা উত্তোলন করলেও প্রকৃত অর্থে প্রতিবন্ধীদের মান উন্নয়ন সহ শিক্ষা কার্যক্রমে কোন সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। বিদ্যালয়ে প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীর উপস্থিতি প্রতিদিন গড়ে ১৮/২০ জন। 

আজ ১০ সেপ্টেম্বর (সোমবার) সরেজমিন দেখা যায়, সকাল ১১টা ৩০ মিনিটে সকল শিক্ষক কর্মচারী অফিস রুমে এবং মাঠের কনারে গল্পগুজবে ব্যস্ত। মাঠের আনাচে-কানাচে ঘুড়ে বেড়াচ্ছে ৭জন প্রতিবন্ধী। ৪টি শ্রেণি কক্ষ মিলে প্রতিবন্ধী পাওয়া যায় মাত্র ১০ জন। শ্রেণি কক্ষে মোছাঃ রাবেয়া বেগম ছাড়া অন্য শিক্ষকদের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়নি। অফিস সহকারী মোজাফফর হোসেন বিদ্যালয়ে ছিলেন না। এছাড়াও শ্রেণি কক্ষগুলোর বেহাল অবস্থা সহ শিক্ষার কোন উপকরণ চোখে পড়েনি। 

জুনিয়র শিক্ষক মোঃ আমিনুল ইসলাম বলেন- আমাদের বিদ্যালয়ে জটিলতা চলছে। তাই শিক্ষার্থী উপস্থিতি কম হয়। আমরা মাঠে বসে হাওয়া খাচ্ছি। বিদ্যালয়ে আসা প্রতিবন্ধী রাজু (২০), ময়না (১৯), সুজাতা (১৮) বলে- কিছু শিখি না। জীবন গাড়িতে আনে, পরে বাড়ি যাই। নজরুল স্যার নাই। 
অনুসন্ধানে জানা যায়, পূর্বের সুইড-বাংলাদেশ পরিচালিত এই বিদ্যালয় ১০ই ফেব্রুয়ারি ২০১০ সমাজ কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশনের আওতায় আনা হয়েছে। সমাজ কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের এই বিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মচারীর সংশোধিত ডাটা বেইজ চেয়ে পত্র প্রেরণ করে ১১ই মার্চ ২০১৮ইং। পত্রে বিদ্যালয়ে কর্মরত জুনিয়র শিক্ষক নাছরিন আক্তার, নাজমা আক্তার, শামীমা খাতুন, আমিনুল ইসলাম, নাসরিন আক্তার এবং শিক্ষা সহকারী জীবন চন্দ্রদাসের কর্তৃপক্ষের অনুমোদন বিহীন নিয়োগের কারণ জানতে চাওয়া হয়েছিল। পরে প্রধান শিক্ষক মোঃ নজরুল ইসলাম গত ২০/০৫/২০১৮ইং  ২১ পাতার সংযুক্তি সহ এই ৬ শিক্ষক কর্মচারীর বয়স কমাবাড়া, পত্রিকা বিজ্ঞপ্তি নেই, জাল সনদ সহ যাবতীয় ত্রুটি তুলে ধরে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে মতামত প্রেরণ করেছেন। 

অপরদিকে, এই বিদ্যালয়ে বকুল হোসেন এবং অপর এক মহিলা শিক্ষক শিক্ষাগত যোগ্যতার জাল সনদ দিয়ে চাকুরী করার গুরুতর অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। মোছাঃ রোজিনা বেগম নামের এক আয়া ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে যোগদান করার কথা থাকলেও আইনী জটিলতা থাকায় যোগদান করতে পারেনি। অফিস সহকারী মোজাফফর হোসেন বিল নিচ্ছেন সহকারী শিক্ষক হিসেবে।

রপরেও আগষ্ট ২০১৮ইং (আট) মাসের বেতন উত্তোলন করে অনিয়মের রেকর্ড ভঙ্গ করেছেন তিনি। এদিকে বিদ্যালয়ের সভাপতি কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসকের মতামতের ভিত্তিতে গত ২৪/০৭/২০১৮ইং প্রধান শিক্ষক মোঃ নজরুল ইসলামকে বরখাস্ত করেছে দাতা প্রতিষ্ঠান। 

এ ব্যাপারে প্রধান শিক্ষক নজরুল ইসলাম বলেন-আমাকে অন্যায় ভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে। আমি অন্যায়ের প্রতিবাদ করেছি এটাই আমার অপরাধ। তৎকালীন ম্যানেজিং কমিটি আমাকে ছাড়াই অবৈধ ভাবে ৬ জন শিক্ষক কর্মচারীকে মোটা অংকের উৎকোচ নিয়ে নিয়োগ দিয়েছিলেন। দুজন শিক্ষক জাল সনদে চাকুরী করছে। একজন যোগদান না করেও বেতন উত্তোলন করেছে। আমার ব্যক্তিগত একাউন্টের টাকা উত্তোলনের নিষেধাজ্ঞা থাকায় বরখাস্ত হওয়ার পূর্বের বেতন ভাতা তুলতে পাচ্ছি না। আমার ছেলেকে একটি কিডনি দিয়েছি। আমি অসুস্থ্য এখন মানবেতর জীবন যাপন করছি। 

এ বিষয়ে কথা হলে প্রতিবন্ধী বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার আমিন আল পারভেজ বলেন- শিক্ষক কর্মচারীরা দায়িত্ব বুঝে কাজ করলে ইউএনও’কে প্রতিবন্ধী স্কুলের প্রধান শিক্ষক হওয়ার দরকার হবে না। সবাই সচেতন হলে বিদ্যালয়ের পরিবেশ ফিরিয়ে আনা সম্ভব। শিক্ষক স্টাফের সংখ্যা অনুযায়ী শিক্ষার্থীর সংখ্যা শতাধিক থাকার কথা থাকলেও উপস্থিতি প্রতিদিন ১৭/১৮ জন। বহিস্কৃত প্রধান শিক্ষক কোন খাতা পত্র রেজুলেশন  না দেয়ায় বিদ্যালয়ে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনতে একটু কঠিন হচ্ছে।

এবিএন/অনিরুদ্ধ রেজা/জসিম/নির্ঝর

এই বিভাগের আরো সংবাদ