রবীন্দ্রনাথের আধ্যাত্মিকতা

  অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ১২ মে ২০১৮, ১১:১৮

ইকবাল হায়দার, ১২ মে, এবিনিউজ : এ অধরায়, এ মহাবিশ্বের কত যে রঙ্গ, কত অনুষঙ্গ, কত রূপ, বিষাদ বেদনা, জন্ম ক্ষয়, লয় তার মর্ম উদ্ধার করা সহজ কথা নয়, যদি না অন্তরে থাকে ঐশ্বরিক চেতনা। বিশ্ব সৌন্দর্য্যে আলা আধারীর রহস্যে, জীবনের উন্মেষ ও তিরোধানে গুঢ় তত্ত্বে ইন্দ্রীয় দ্বারা উপলব্ধি করার ক্ষমতা যার আছে সেই পারে অপরূপকে জানার, অধরা কে ধরার, অরূপকে রূপ দান করার। রবীন্দ্রনাথ সে কাজটি করেছেন অতি সযতনে, বিস্ময়ে তা আমরা তাঁর গানে, কবিতায়, ছোট গল্পে বিশেষভাবে অবলোকন করি। জীবনের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অনুভূতি, সুখ–দুঃখ, রূপ রস তার কাব্য প্রতিভাকে গীতিপ্রবণ করে তুলেছিল।

রবীন্দ্রনাথের প্রজন্মে ইউরোপীয় শিক্ষার মধ্যদিয়ে রোমান্টিসিমের প্রবেশ। রবীন্দ্রনাথের কবিতার বৈশিষ্ট্য প্রেম। মানব প্রেম, ঈশ্বর প্রেম, প্রকৃত প্রেম, নারী প্রেম ইত্যাদি। রবীন্দ্রনাথের সৌর্ন্দয্য ও রসবোধ ছিল সুক্ষ্মতর। প্রেমের শালীন, শৈল্পিক আর সুক্ষ্মতর রূপই ইউরোপীয় শিক্ষায় শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণিকে উন্মাতাল করেছিল। প্রেম সম্পর্কে যে ধারণা ও রূচি সেদিন মধ্যবিত্ত শ্রেণি অর্জন করেছে সে ধারণা আর রূচির প্রতিফলন লক্ষ্য করা যায় রবীন্দ্রনাথের কবিতার মধ্যে। রবীন্দ্রনাথ ইউরোপীয়ান ভিক্টোরীয় আদর্শবাদে আচ্ছন্ন ছিল। শেক্সপিয়র, বায়রণ, কিটস, শেলী, ওয়ার্ডসওয়ার্র্থ, সুইন বার্ন–এর মতো কবিদের কবিতা নিয়েই তিনি থাকতেন মগ্ন। গভীর রাত পর্যন্ত তাদের লেখা বই বুকের উপর নিয়ে অধ্যায়নরত থাকতেন তিনি। বিখ্যাত ইংরেজ কবি সুইন বার্ন –এর `Atlanta in Clydon–এর হুবহু বঙ্গানুবাদ তার উর্বশী কবিতায় আমরা লক্ষ্য করি, যা মোহিত লাল মজুমদার তার সমালোচনা গ্রন্থে পাশাপাশি উল্লেখ করেছেন। রবীন্দ্রনাথের প্রেম চেতনা মূলত ইউরোপীয় রেনেসাঁসের চেতনাস্নাত। এই প্রেমের ধারণা প্রকাশ রীতি তার রচনায় এককভাবে বেশি প্রকাশ পায়। ইংরেজি কাব্য ও কবিতা পঠন পাঠনের মধ্য দিয়ে রবীন্দ্রনাথ নিজেকে বাঙালি কবিতার শ্রেষ্ট আসনে অধিষ্ঠিত করেন।

ডা. এনামুল হক তার ‘মনীষা মঞ্জুষা’ গ্রন্থে বলেছেন, “বাংলা কাব্য–সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথের প্রভাব নির্ণয় এক দুঃসাধ্য ব্যাপার। তাঁহার সহিত তাঁহার অনুকারীদের কোন তুলনা হয় না। ইহার একমাত্র কারণ, তাঁহার সংস্কার–মুক্তি ও চিন্তার বিস্তৃতি। বিগত পঞ্চাশ–ষাট বছরের মধ্যে পাশ্চাত্য সাহিত্য–জগতে যত প্রকারের সাহিত্যিক রীতি ও ভাবধারণ প্রবর্তনের পরীক্ষা ও নিরীক্ষা চলিয়াছে, রবীন্দ্রনাথ তাঁহার প্রায় সব কিছুই আত্ম’ করিয়া ফেলিয়া বাংলায় আমদানী করিয়াছেন। এতদ্ব্যতীত তিনি ভারতীয় চিন্তাশীলতা ও দর্শনের প্রাণ–রসটুকুও নিংড়াইয়া লইয়া তাঁহার কাব্য–সৃষ্টিতে মিশাইয়া দিয়াছেন। এই জন্যই তাঁহার কাব্যে উপনিষদ হইতে তসববুফ্‌ পর্যন্ত প্রাচ্য সাধনার এবং মুনি–ঋষি হইতে বাউল–ফকির পর্যন্ত প্রাচ্য মর্মবাদী সাধকদের চিন্তাধারণর প্রভাব দুর্লক্ষ্য নহে। আবার, পাশ্চাত্য সাহিত্য–জগতে Romantic Ideal বা কল্পনাপ্রবণ আদর্শের যত প্রকার রীতি চালু হইয়াছে কিংবা চালু হইয়া মরিয়া গিয়াছে অথবা পাশ্চাত্যর Symbolic Ideal বা প্রতীক প্রবণ আদর্শের যেই রূপ স্বায়িত্বপ্রাপ্ত হইয়াছে , তাহার কোনটিই রবীন্দ্রনাথে লোকোত্তর ও কালোত্তর সৃষ্টির মধ্যে ধরা না দিয়া পারে নাই। তাঁহার ‘সোনার তরী’, ‘ডাকঘর’, ‘রাজা’, রক্তকরবী’, প্রভৃতি পাশ্চাত্যের প্রতীকপ্রবণ আদর্শেরই প্রমূর্ত রূপ এবং ‘গীতাঞ্জলী’, ‘নৈবেদ্য’, ‘গীতিমাল্য’, ‘বলাকা’, ‘পলাতকা’, ‘পূরবী’, ‘প্রান্তিক প্রভৃতি কাব্যের বহু কবিতা মর্মবাদ ও কল্পনাপ্রবণ আদর্শের নিদর্শন।”

রবীন্দ্রনাথ জন্ম রোমান্টিক কবি বলে বুদ্ধদেব বসু তাঁর ‘কবি রবীন্দ্রনাথ’ বইয়ে দাবী করেছেন, রোমান্টিকদের মধ্যে যে যে বৈশিষ্ট্য থাকে তার সকল রবীন্দ্রনাথের মধ্যে ছিল অত্যন্ত প্রকট। তীব্র কল্পনা প্রসূত, সুদূরের প্রতি আকর্ষণ, সুক্ষ্ম সৌর্ন্দয্য বোধ, প্রকৃতির প্রতি বাঁধভাঙা আর্কষণই রবীন্দ্র প্রতিভার প্রধানতম বৈশিষ্ট্য।

প্রেম, রবীন্দ্রনাথ ও ‘বাঙালি সমাজ’ প্রবন্ধে কুদরত–ই–হুদা প্রথম আলো ৪ মে, ২০১৮ উল্লেখ করেছেন, “ঊনবিংশ শতাব্দীতে পাশ্চাত্য শিক্ষার হাত ধরে বাংলায় যে আধুনিকতার প্রবেশ তা ইংরেজি শিক্ষিত শ্রেণির চিন্তার জগতে একটা ঘোরতর আলোড়ন তোলে”।

নীরদ চন্দ্র চৌধুরী তাঁর ‘আত্মঘাতী বাঙালি’ বইয়ে বলেছেন, “বাঙালি জীবনে ইউরোপ হইতে আনা রোমান্টিসিসম সেই যুগেই গোলাপের মতো ফুটিতে ছিল।”

বাংলার বিস্ময় কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর [১৮৬১–১৯৪১]। দিনের সূর্য যেমন চারদিক আলোকিত করে রবীন্দ্রনাথও তেমন করে বাংলা সাহিত্যকে স্বীয় প্রতিভায় উদ্ভাসিত করে রেখেছেন। বৈচিত্র্যময় রূপ ও রসের উদগাতা তিনি। দীর্ঘ দেহ, দীর্ঘ আয়ু আর দীর্ঘ শিল্পী জীবনে তিনি এত কিছু সৃজন করেছেন যে অতল মহাসাগরও হার মানে তার সৃষ্টির কাছে।

আমরা অবাক চিত্তে বিমূঢ় হয়ে ভাবি, একজন মানুষ তার এক জীবনে এত কিছু কিভাবে বিশিষ্ট ভঙ্গিমায় সৃষ্টি ও রচনাসমূহ সুবিন্যাস ও গ্রন্থনা করলেন, এত শিল্প কিভাবে নির্মাণ করলেন যা কিনা এক জীবনে পড়ে শেষ করাই এক কঠিন কাজ। তিনি উপন্যাস, গল্প, প্রবন্ধ, ছোট গল্প গীতিনাট্য এবং কাব্য গ্রন্থ রচনা করেছেন। আর তাঁর গান! এ যেন যাদু! যার স্বরলিপি তিনি নিজেই করে গিয়েছেন। কী অসাধারণ তাঁর সংগীতা! কথা আর সুরের খেলা। শুধু কি তাই? প্রাণ দিয়েছেন, সুর দিয়ে। সেই সুরের ছোঁয়া, প্রাণের পরশ, কী যে যাদুকরী তার ক্ষমতা। এ তো শিল্প। এ হচ্ছে বোধের ব্যাপার। দেখারও কেউ নেই, শোনারও কেউ নেই, বোঝার ও তেমন কিছু নেই। শুধু আছে অনুভবের। তবুও তার সমগ্র শিল্প চেতনার মধ্যে একটা নিগৃঢ় আধ্যাত্ম–অনুভূতি প্রবাহিত হয়ে সমগ্র রচনায় আত্মপ্রকাশ করেছে। তার খেয়া–গীতাঞ্জলি–গীতিমাল্য–গীতালি কাব্য এবং অন্যান্য রচনায় আধ্যাত্ম চেতনা প্রকাশিত হয়েছে।

১৮৯০ এর ৩১ অক্টোবর ‘হিতকরী’ পত্রিকায় রাইচরণ দাশ হঠাৎ লিখলেন, “লালন ফকির নামে বাউলদের মধ্যে একজন বড় মহাত্মা ছিলেন তিনি আর ইহলোকে নেই। তিনি ধর্ম জীবনে বিলক্ষণ উন্নত ছিলেন, নিজে লেখাপড়া জানিতেন না কিন্তু তাঁহার রচিত অসংখ্য গান শুনিলে তাহাকে পরম পণ্ডিত বলিয়া মনে হয়…তাঁহার অন্তদৃষ্টি খুলিয়া যাওয়ায় ধর্মের সারতত্ত্ব জানিবার অবশিষ্ট ছিল না…সকল ধর্মের লোকে তাকে আপন বলিয়া জানিত।” এই লালনের মতো এক গেঁয়ো অথচ প্রকৃত মহাত্মার আবিস্কারে একটা শোরগোল পড়ে গেল। লালনকে বাঙালি সাংস্কৃতির ঐতিহ্য সুপ্রতিষ্ঠিত করলেন জোড়াসাঁকোর ব্রহ্মজ্ঞানী ঠাকুর পরিবার।

সুধির চক্রবর্তী সম্পাদিত ‘বাংলার বাউল ফকির’ গ্রন্থের প্রবন্ধকার রমাকান্ত চক্রবর্তী পৃষ্ঠা ৬৪–তে উল্লেখ করেছেন

“এম ভাবা যায় যে, দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর শিলাইদহ অঞ্চলে বিস্তীর্ণ জমিদারির সূত্রে লালনের এবং স্থানীয় অন্যান্য বাউলদের খবর পেতেন। তাঁর পুত্র জ্যোতিরিন্দ্রনাথ লালনের যে স্কেচ এঁকেছিলেন – সেই পবিত্র মূর্তি বৃদ্ধ সাধকের স্কেচ এখনও দেখা যায়। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছাত্র নন্দনাল বসুও লালনের একটি অসামান্য স্কেচ আঁকেন। রবীন্দ্রনাথও শিলাইদহে অবস্থানকালে স্থানীয় বাউলদের সঙ্গে পরিচিত হয়েছিলেন। লালন–রচিত গানের দুইটি খাতা তিনি সংগ্রহ করেন। তবে তার সঙ্গে লালনের দেখা–সাক্ষাত হয়নি।”

একই বইয়ের ৭৮ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে, বাউল ধর্ম, বাউলদের আধ্যাত্মিক সাধনা এবং বাউল গান সম্বন্ধে রবীন্দ্রসাথ ১৮৮৩ খ্রিস্টাব্দ থেকে শেষ পর্যন্ত বহু কথা লিখেছেন। প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত রবীন্দ্রনাথ এক কথাই বার বার বলেছেন। বাউলদের মধ্যে কারো কারো ইন্দ্রিয় পরায়ণতার বিরোধী হলেও তিনি বাউল সাধনার এবং গানের গুণগ্রাহী। তিনি লিখেছেন: ‘আমার লেখা যাঁরা পড়েছেন, তাঁরা জানেন, বাউল–পদাবলীর প্রতি আমার অনুরাগ আমি অনেক লেখায় প্রকাশ করেছি। শিলাইদহে যখন ছিলাম , বাউল দলের সঙ্গে আমার সর্বদাই দেখা সাক্ষাত ও আলাপ আলোচনা হত। আমার অনেক গানেই আমি বাউলের সুর গ্রহণ করেছি এবং অনেক গানে অন্য রাগ রাগিনীর সঙ্গে আমার জ্ঞাত বা অজ্ঞাতসারে বাউল সুরের মিল ঘটেছে। এর থেকে বোঝা যাবে, বাউলের সুর ও বাণী কোন এক সময়ে আমার মনের মধ্যে সহজ হয়ে মিশে গেছে। মুহাম্মদ মনসুরউদ্দীন ‘হারামণি’ (ঢাকা, ১৯৭৬) প্রথম খণ্ড, “আশীর্বাদ”।

‘হারামণি; ১. প্রাগুক্ত, পৃ. ৫–৮: রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন; “. . . এ জিনিস হিন্দু–মুসলমান উভয়েরই, একত্র হয়েছে অথচ কেউ কেউ আঘাত করেনি.. এই মিলনে গান জেগেছে। সেই গানের ভাষা ও সুর অশিক্ষিত মাধুর্যে সরস। এই গানের ভাষায় ও সুরে হিন্দু–মুসলমানের কণ্ঠ মিশেছে, কোরানে পুরাণে ঝগড়া বাধে নি।”

সনৎকুমার মিত্র সম্পাদিত ‘বাউল লালন রবীন্দ্রনাথ’ গ্রন্থে পৃষ্ঠা ১৮৯–২৫৪ উল্লেখ আছে: ‘এমন ধারণাও আছে যে, রবিবাবু মশাই সাঁইজির খাতা নি, ফেরত না দিয়ে, তাঁর গানের ভাব অনুকরণ করে বিশ্বখ্যাত হয়েছেন ও নোবেল প্রাইজ পেয়েছেন।’ এমনও বলা হয় যে রবীন্দ্রনাথ কবীরের ভাবসম্পদ লাভ করে ইউরোপে সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। প্রশান্ত কুমার পালের মতে, “রবীন্দ্রনাথের ‘কবি স্বভাবে’ অনেক কিছুরই প্রভাব কোথাও সুস্পষ্ট, কোথাও অনুভববেদ্য। সেগুলো হল উপনিষদের বাণী, বৈষ্ণব পদাবলী ও বৈষ্ণব ধর্ম, কালিদাস–বালভট্টের রচনাবলি , ইউরোপীয় রোমান্টিক কাব্য, ‘নিজের সহজাত প্রকৃতি–প্রীতি; বাউলদের ‘সহজিয়া সাধনা’ বৌদ্ধ সাহিত্য, বাইবেল, খ্রিস্টান ‘ভক্তবাণী’ সূফী সাধকদের গীতাবলি, কবীর প্রভৃতি সন্তদের গান, আত্মীয়–বিয়োগ–ব্যাথা। স্বদেশকে, স্বদেশের সমাজ ও সংস্কৃতিকে রবীন্দ্রনাথ গভীরভাবে ভালবেসেছেন।”

রবীন্দ্রনাথের প্রাসঙ্গিক রচনাবলি পড়ে এই মনে হয় যে, প্রধানত তিনটি কারণে তিনি বাউল বা আধ্যাত্মিক সঙ্গীত এবং সাধনার দ্বারা আকৃষ্ট হয়েছিলেন। প্রথম কারণ ছিল বাউল গানের সরল, অথচ সুগভীর অর্থসম্পন্ন ভাষা এবং চিত্তাকর্ষক ছন্দ এবং সুর। রবীন্দ্রসঙ্গীতে বাউল বা আধ্যাত্মিক সুরের প্রভাব সুবিদিত।

বাউলদের প্রতি রবীন্দ্রনাথের আকর্ষণ বোধ করার দ্বিতীয় কারণ ছিল বাউলের ধর্মচিন্তারয় উদারতার এবং অসাম্প্রদায়িক বিচারধারণর প্রকাশ। রবীন্দ্রনাথ এটা জানতেন যে, বাউল ধর্মে বহু ভাল উপাদান সংমিশ্রিত হয়েছে। বাউল–সাধনা হিন্দু–মুসলমানের সম্মিলিত সাধনা। এই উদারতাকে তিনি খুব পছন্দ করতেন।

বাউল ধর্মে ‘বস্তুবাদ’ রবীন্দ্রনাথের বিচারে অভাবনীয় ছিল। বাউল ধর্ম আত্মোপলব্ধির ধর্ম, এই দৃঢ় বিশ্বাস ছিল বাউল ধর্মে রবীন্দ্রনাথের শ্রদ্ধার তৃতীয় কারণ। তিনি লিখেছিলেন:

One day I chanced to hear a song from a beggar belonging to the baul sect of Bengal … What struck me in this simple song was a religious expression which was neither grossly concrete, full of crude details, nor metaphysical in its rarefied transcendentalism … It spoke of an intense yearning of the heart for the Divine which is in Man not in the temple, or scriptures, in images and symbols.

১৯২৫–এ কলকাতায় অনুষ্ঠিত ভারতীয় দর্শন মহাসভার অধিবেশনের সভাপতিরূপে রবীন্দ্রনাথ পঠিত The Philosophy of our people শীর্ষক অভিভাষণে বাউল জীবন দর্শনের ভাববাদী ব্যাখ্যা বিদগ্ধ শ্রোতাদের মুগ্ধ করেছিল।

অধ্যাপক অমিয়রতন মুখোপাধ্যায় লিখেছেন, “রবীন্দ্রনাথের আদর্শ হইতেছে পরম মানুষ। মনের মানুষকে বাউলরা খোঁজ করেন ত্যাগে, সেবার মহত্ত্বে, দুঃখের গৌরবে এবং প্রেমের বৈরাগ্যে। বাউলদের কথা এই– মান সাধনায় হইতে হইবে পরম মানুষ। রবীন্দ্রনাথের কথা এই –প্রেম সাধনায় হইতে হইবে পরম মানুষ। বাউলরা তত্ত্ব –সাধনায় জৈব প্রেম হইতে উত্তীর্ণই হইতে চাহেন, তবে জৈবপ্রেমকে আচম্বিতে অস্বীকার করিয়া বসেন না। … বাউলের নিকট বিশ্ব, বিশ্বমানব ও বিশ্বপ্রকৃতি চৈতন্য জাগরণের আনন্দাগার; রবীন্দ্রনাথের নিকট বিশ্বপ্রকৃতি প্রেমোদ্বোধনের আনন্দাগার। আমরা সুধীর চক্রবর্তী সম্পাদিত ‘বাংলার বাউল ফকির’ গ্রন্থের পৃষ্ঠা নং ৬৫–৬৬ তে উল্লেখ পাই, “এমনও বলা হয়েছিল যে, লালনের ভাবসম্পদ না পেলে রবীন্দ্রনাথ কি আর নোবেল পুরস্কার পেতেন। রবীন্দ্রনাথ ছিলেন ‘রবি বাউল; Edward C. Dimock–এর ভাষায় Rabindranath Tagore-The Greatest Baul of Bengal।

রবীন্দ্রনাথ বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদে অনুষ্ঠিত একটি ছাত্র সভায় বলেন: ‘এই লালন ফকিরের মতে মুসলমান হিন্দু জৈন (জোর আমার দেওয়া) মত সকল একত্র করিয়া এমন একটি জিনিস তৈয়ার হইয়াছে যাহাতে চিন্তা করিবার অনেক বিষয় আছে। অন্যত্র রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, অনেককাল পরে ক্ষিতিমোহন সেন মহাশয়ের অমূল্য সঞ্চয় থেকে এমন বাউলের গান শুনেছি। ভাষার সরলতায়, ভাবের গভীরতায়, সুরের দরদে যার তুলনা মেলে না’ ‘হারামণি’ প্রাগুক্ত, পৃ.৫–৬;

প্রমথনাথ বিশী তার বই ‘রবীন্দ্র নাট্য প্রবাহ’তে উল্লেখ করেছেন, “রবীন্দ্রনাথ নিজেই ‘ফাল্গুনী নাটকে’ অন্ধ বাউলের ভূমিকায় অভিনয় করেন।”

যে ‘গীতাঞ্জলি’র জন্য তিনি নোবেল পুরস্কার লাভ করেন, সেই ‘গীতাঞ্জলি’ যে পরিপূর্ণভাবে আধ্যাত্মিক আধারিত। তা পূর্বে অনেকের আলোচনায় প্রতিফলিত হয়েছে। আমরা বিস্ময়ে, গভীর নিরীক্ষায়, আবেগে লক্ষ্য করি ‘গীতাঞ্জলি’র প্রথম কবিতাই তো ‘আমার মাথা নত করে দাও হে তোমার চরণ ধূলার তলে’ তাঁর আধ্যাত্মিকতার পূর্ণ পরিচয় প্রকাশ করে।

আধ্যাত্মিকতার ভাষায়, অনুসন্ধানে, ধ্যানে এটাই স্পষ্ট হয় যে, আমাদের মনের ভেতর যে মানুষের বাস তার নাম কেউ জানে না। সে মানুষ না আরো শক্তিধর কোন কিছু সে কথাও কেউ বলতে পারে না। কিন্তু মানুষের হৃদয়ে যে সুর তার প্রাকশের ভিন্নতা তাকে নানাভাবে চিহ্নিত করতে পারে। সুরের প্রকাশের ভেতর তার পরিচয়। সুতরাং সুর আর মানুষ এক অভিন্ন সূত্রে গাঁথা। এই সুর যিনি ধরে আছেন তিনি কিন্তু অধরা। আর এই অধরাকে লাভ করার জন্যই মানুষ উপাসনা করে, আরাধনা করে, ধ্যান করে। মানুষের জীবনে আধ্যাত্ম সাধনা এই অধরাকে লাভেরই প্রয়াস

আসলে আধ্যাত্মিক সাধনাকে ইংরেজি করলে দাঁড়ায়, Pertaining to spirit, relating to God or the super natural being or theological or metaphysical.

রবীন্দ্রনাথ বিশ্বাস করতেন প্রতিটি আত্মার পরিশুদ্ধ রূপই ঈশ্বর। ঈশ্বর বাইরের কেউ না। “আমার হিয়ার মাঝে লুকিয়ে ছিলে, দেখতে আমি পাইনি” কিংবা “আমার প্রাণের মানুষ আছে প্রাণে তাই হেরি তার সকল খানে…। আমি তার মুখের কথা শুনব বলে গেলাম কেথা, শোনা হল না, হল না– আজ ফিরে এসে নিজের দেশে এই যে শুনি, তার বাণী আপন গানে . . .।

জীবাত্মা ও পরমাত্মার নিবিড় সম্বন্ধ ও অন্তরঙ্গ মিলনই আধ্যাত্ম সাধনার লক্ষ্য। অতিপ্রাকৃত আনন্দ লোকের স্বপ্ন, দর্শন, রসাস্বাদান এবং পরম সত্যের নিবিড়তম উপলব্ধি এক রহস্যময় উপাসনার ধারণ মরমীয়াবাদে সাধনায় পরিণত হয়। সেন্ট অগাষ্টাইন খ্রিস্টধর্মের মরমীয়া আরাধনা প্রবর্তন করেন এবং সেন্ট পল ইহাকে ব্যাপকভাবে প্রচলিত করেন মধ্যপ্রাচ্যের সূফি সম্প্রদায় আধ্যাত্মবাদে বিশ্বাসী। ইস্ট দেবতার সহিত অভেদ সম্বন্ধ স্থাপনই আধ্যাত্মবাদের মূল কথা। তান্ত্রিক এবং বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের মধ্যেও আধ্যাত্মবাদের প্রসার লক্ষ্য করা যায়। ভারতবর্ষে ইসলাম অনুপ্রবেশের পর হতে সূফি আধ্যত্মবাদ এদেশীয় ধর্ম সাধনার সাথে মিশ্রিত হয়ে আধ্যত্ম সাধনার প্রবর্তন করে। কবির, সন্ত তুকারাম এবং শ্রীচৈতন্যদেবের সাধনায় আধ্যাত্মবাদ লক্ষ্য করা যায় আধ্যাত্ম সাধকগণ অনেক ক্ষেত্রেই মানবিক প্রেমের রূপকে ঈশ্বর উপাসনার পদ্ধতি ব্যক্ত করেছেন। ঈশ্বর ও ভক্তের সম্পর্ক স্বামী–স্ত্রীর বিবাহ মিলনের দ্যোতক।

বাউল গানের মূল সূর ও ভাব আধ্যাত্মিক। তাই বাউল গান আধ্যাত্মিক গান। এ গান সাধকদের গান। বাউলদের সাধনা অতি প্রাচীন। বাউল দর্শনে ধর্ম সাধনার বাণী আছে। একতারার সূর ঝংকারে সে বাণী হৃদয় থেকে হৃদয়ে অনুরণন তোলে। বাউল সাধনার আশ্রর সঙ্গীত। বাউলদের সাধনা সহজ পথের সন্ধান। সঙ্গীতের মাধ্যমেই তারা সেই পথের সন্ধানে লিপ্ত। বাউল গানের আবেদন অন্তর্ভেদী। এর সাধনার তৃপ্তি বাউল সুরে প্রকাশিত।

আধ্যাত্মিকতা বলতে সেই বাস্তবতাকে বোঝানো হয় যা আমাদের প্রতিদিনের স্থূলতা থেকে অনেক দূরের। এটি হচ্ছে সেই গহীন পথ যার দ্বারা একজন ব্যক্তির বেঁচে থাকা কিংবা তার অস্তিত্ব আবিষ্কারের প্রচেষ্টা স্পষ্ট হয়। ধ্যান, প্রার্থনা, প্রত্যাশা দিয়ে একজনের অন্তরজীবনের উন্নতি হতে পারে। আধ্যাত্মিকতার বাস্তবতা হতে পারে ঈশ্বরের সঙ্গে যোগাযোগ এবং এই সংযোগ ব্যক্তি থেকে প্রসারিত হতে পারে মানব সমাজ, প্রকৃতি, বিশ্বলোক ও ঈশ্বরের সিংহাসন পর্যন্ত। জীবনে বেঁচে থাকার অনুপ্রেরণাও হতে পারে পরমার্থসাধনা। যে বিশ্বাস ধারণ করে ঈশ্বর সম্পর্কে অন্তর্নিহিত ভাবনা কিংবা বিশ্বের সীমানা ছাড়িয়ে অসীমের জন্য কাতরতা তারই নাম কি আধ্যাত্মিকতা?

আধ্যাত্মিক সাধনা অরূপের সাধনা; সাধকরা বস্তু পৃথিবীর বাইরে অতীন্দ্রিয় জগতের অনুসন্ধান করেন সেই সাধনায়। আধ্যাত্মিকতা আমাদের চেতনাকে ঈশ্বরের সঙ্গে সংযুক্ত করে। এর মাধ্যমে তার আনন্দ রূপ আমরা প্রত্যক্ষ করি। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ সন্ন্যাসী কিংবা সাধক ছিলেন না। তিনি সূফি ধারণসহ অন্য মরমিয়াদের মতো আধ্যাত্ম সাধনায় নিমগ্নও হননি। তিনি ছিলেন কবি।

আমরা রবীন্দ্রনাথ ঠাঁকুরের নোবেল বিজয়ী বই ‘গীতাঞ্জলি’র নামকরণসহ প্রতিটি গানে অবাক হয়ে লক্ষ্য করি কিছু বিশেষ্য, বিশেষণ, কিছু ভাব প্রধান শব্দের, পদের, উক্তির, আকুতি, মিনতি, আরাধনা, বিনয়, অনুনয় ইত্যাদি লক্ষ্য করি। যেমন: সে, তুমি, তার, তোমার, তোমায়, বন্ধু, প্রাণনাথ, অন্তরতম, নিঠুর ওগো, পরাণসখা, প্রভু অন্তর্যামী, নিরব যিনি, প্রাণের মানুষ দেবতা, সুন্দর তুমি, ওগো মৌন, নিঠুর, তুমি অপরূপ, হে গুণী, হে মোর দেবতা।

আবার নিম্নোক্ত অনেক গানে দেখি–

১। আমার মাথা নত করে দাও হে তোমার চরণ ধূলার তলে। গান–১, পৃষ্ঠা–৯ [গীতাঞ্জলি, প্রকাশকাল–২০১০, বিশ্বসাহিত্য ভবন, ঢাকা]

২। নামাও, নামাও আবার তোমার চরণতলে। গান–৫৩, পৃষ্ঠা–৩৬ [গীতাঞ্জলি, প্রকাশকাল–২০১০, বিশ্বসাহিত্য ভবন, ঢাকা]

৩। তুমি এবার আমায় লহ হে নাথ লহ। গান–৪১, পৃষ্ঠা–৫৭

৪। সীমার মাঝে অসীম তুমি বাজাও আপন সূর। গান–১২০, পৃষ্ঠা–৭৬

৫। রূপ সাগরে ডুব দিয়েছি। গান–৪৭, পৃষ্ঠা–৩৪

এমন আরও কত গান, শব্দ, পদ, বিশেষ্য, বিশেষণ আধ্যাত্মিক ভাবধারণ যুক্ত হয়ে আছে।

উপরোক্ত গানসমূহে আমরা বাউল গানের আধ্যাত্মিকতার মর্ম, তত্ত্ব, যে রবীন্দ্রনাথকে আধ্যত্মিকতায় প্রভাবিত করেছিল তার প্রকৃষ্ট প্রমাণ পাই। রবীন্দ্র–আধ্যাত্মিকতার মূলে আছে বিশ্ব নিয়ন্ততার প্রতি বিশ্বাস। বিশ্ব প্রকৃতির সঙ্গে একাত্ম হওয়া এবং এই অভিজ্ঞতা থেকে কাব্য সৃষ্টিকেই রবীন্দ্রনাথ আধ্যাত্মিকতা বলেছেন।

অন্যভাবে প্রকৃতি প্রেম, মানব প্রেম, ধর্ম প্রেম, বিশ্ব প্রেমও রবীন্দ্রনাথকে আধ্যাত্মিক করে তুলেছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার ‘আত্মপরিচয়’ রচনায় মানুষের নিজের ভেতরকার ধর্মকে নিজ চোখে দেখার কথা বলেছেন। মনের ভেতরে গোপনে থেকে মানুষকে সৃষ্টি করে তোলে তাই তো তার ধর্ম। কোনো ব্যক্তির কোষ্ঠীতে বা নামপত্রে যে ধর্মের উল্লেখ আছে কিংবা জন্মসূত্রে যে ধর্ম বিশ্বাসপ্রাপ্ত হয়েছেন সেটা তার প্রকৃত ধর্ম নাও হতে পারে। ব্যক্তির জীবনদর্শন বা চরিত্রের ভেতর থেকে উঠে আসে যথার্থ ধর্ম। রবীন্দ্রনাথের অধ্যাত্মচেতনায় অনুশাসন বা শাস্ত্র আশ্রিত ধর্মচেতনা সক্রিয় ছিল না। তবে তার ধর্মবোধ বিবর্তিত হয়েছে। প্রথম থেকে শেষ জীবন পর্যন্ত ধর্মীয় আদর্শ, ধর্মচিন্তা সব মিলিয়েই কবির আধ্যাত্মিকতা।

আধ্যাত্মিকতার মাধ্যমে মানুষ শুচি হয়ে ওঠে। বড় হওয়ার ইচ্ছা, মহৎ হওয়ার ইচ্ছাই আধ্যাত্মিকতা ধর্মসাধনা করলে হৃদয় কোমল হয়, চারিত্রিক তীব্রতা মাধুর্যে পরিণত হয়। ধর্মসাধনার অন্তরালে সুন্দর লুকিয়ে থাকে। তাকে আবিষ্কার করতে হলে ধ্যান, উপাসনা, প্রার্থনা দরকার। এসবই রবীন্দ্রনাথের আধ্যাত্মিক চেতনায় উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল।

কবির আধ্যাত্মিক সাধনা সর্বজনীন হয়ে উঠেছে হিন্দুসমাজের লোকাচার ও ধর্মসংস্কার ত্যাগের মধ্য দিয়ে। ১৮৯১ সালের ২২ ডিসেম্বর মানবিক সত্য ও আস্তিক্যবাদ রবীন্দ্রনাথের অধ্যাত্মবাদের সারকথা। জগৎ ও জীবন তার কাছে রূপাতীত, লোকাতীত, অনন্ত দেশ কালব্যাপী এক মহান আনন্দশক্তির প্রকাশ। সুন্দর, মহনীয়, অপরূপ ও অনির্বচনীয় সবকিছু কবির আরাধ্য। তিনি সবকিছুর ভেতর ঈশ্বরের অস্তিত্ব অনুভব করেছেন। এটিই তার বড় আধ্যাত্মিকতা।

হৃদয়ের শুদ্ধতা, সহিষ্ণুতা, করুণা ও দয়ার মাধ্যমে জীবনকে দেখতে হবে। আধ্যাত্মিকতার ভেতরে যে সত্য আছে তা কোনো বিশেষ ধর্মের পরিপোষক নয়। সবাই ঈশ্বরের সন্তান। ঈশ্বর পরম। একে অপরের পরিপূরক হয়ে ওঠে বিভিন্ন ধর্মসম্প্রদায়। রবীন্দ্রনাথ ব্রাহ্ম সমাজভুক্ত হলেও তার আধ্যাত্মিকতার উপলব্ধি সেই গণ্ডির বাইরে ছিল।

প্রকৃতি, বিশ্ব, নিরাকার ইশ্বর, অসীম সসীম, তারা ভরা রাতের আকাশ, গ্যালারি বিশালত্ব ইত্যাদি বিষয়ে রবীন্দ্রনাথের আধ্যাত্মিকতাকে প্রবলভাবে নাড়া দিয়েছিল।

রবীন্দ্রনাথের ‘গীতাঞ্জলি’র ৭৬ পৃষ্ঠায় ১২০ নং গানে আমরা দেখি রবীন্দ্রনাথ নিজেই গেয়েছেন –

সীমার মাঝে অসীম তুমি বাজাও আপন সুর

আমার মধ্যে তোমার প্রকাশ তাই এত মধুর

এই বিশ্ব প্রকাশিত রূপ আর ঈশ্বর, এই বিশ্বের অপ্রকাশিত রূপ। প্রত্যেক বস্তুর রয়েছে প্রকাশ ও অপ্রকাশ্য রূপ। যা প্রকাশ্য তা সীমা দ্বারা বেষ্টিত, অর্থাৎ সসীম। আর যা অপ্রকাশ্য তা সীমার অতীত, অর্থাৎ অসীম। ঈশ্বর নিরাকার। কিন্তু সৃষ্টির লীলা চরিতার্থ করার জন্য তিনি যে কোন আকার পরিগ্রহ করতে পারেন। যখন তিনি কোনো আকার পরিগ্রহ করেন, অর্থাৎ সীমা ধরণ করেন তখনো কোন কিছু সৃষ্টি হয়। সীমাই সৃষ্টি। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, সীমার মধ্যে অসীম নিজেকে প্রকাশ করবে সেটাই সমস্ত সৃষ্টির মূলভাব। সমস্ত সৃষ্টি তাঁরই আকার ধারণ, সীমা ধারণ অর্থাৎ তারই প্রকাশ্য রূপ।

অবশ্যই উপরোক্ত আলোচনা, সমালোচনা, অধ্যয়ন, জ্ঞান ও সার্বিক বিচার ও উপলব্ধি থেকে আমরা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারি যে, রবীন্দ্রনাথের মরমী মানসে লালন ছিলেন প্রেরণার স্বতস্ফূর্ত উৎস। কালজয়ী এই দুই গীত–প্রতিভা সম্পর্কে এ কথা হয়তো বলা যায়, রবীন্দ্রনাথ নিরক্ষর হলে লালন ফকিরের মতো মরমী কবি হতেন, আর লালন শাহ শিক্ষিত হতে হতে রবীন্দ্রনাথেরও মতো বিদগ্ধ কবি।”

তথ্যপঞ্জি:

১. ‘বাংলার বাউল ফকির’ সুধীর চক্রবর্তী সম্পাদিত প্রথম প্রকাশ: ১৯৯৯ পুস্তক বিপনী, ২৭ বেনিয়া টোলা লেইন, কলকতা।

২. ‘মনীষা মঞ্জুষা’ প্রথম খন্ড ড: মুহাম্মদ এনামুল হক ১৯৭৫, মুক্তধারণ, পৃষ্ঠা ৩১–৩২।

৩. ‘লালন শাহ’ আবুল আহসান চৌধুরী, প্রকাশকাল– ১৩৯৯, ঢাকা, পৃষ্ঠা– ৫৯–১১৯।

৪. ‘হারামনি’ মো. মনছুর উদ্দীন, ঢাকা, ১৯৭৬ প্রথম খন্ড, পৃষ্ঠা– ১৮৯–২৫৪

৫. “রবি জীবনী” প্রশান্ত কুমার পাল, কলকাতা ১৩৯৯, পৃষ্ঠা – ১৬৩–১৬৪।

৬. ‘গীতাঞ্জলি’ রবীন্দ্রনাথ ঠাঁকুর, প্রকাশকাল– ২০১০, বিশ্বসাহিত্য ভবন, ঢাকা

৭. ‘সঞ্চয়িতা’ রবীন্দ্রনাথ ঠাঁকুর, ১৯৯৬, ঢাকা, সাহিত্য সংসদ।

৮. ‘রবীন্দ্রনাথে আধ্যাত্মিকতা ও সাবর্জনীন চেতনা” , মিল্টন বিশ্বাস

৯. ‘সমাজ ও আধ্যাত্মিকতা’ আচার্য্য সত্যশিবানন্দ অবদূত।

১০. ‘বাউল লালন রবীন্দ্রনাথ’ সনৎ কুমার মিত্র সম্পাদিত, ১৯৯৫ কলিকাতা।

১১. ‘রবীন্দ্রনাথ নাট্য প্রবাহ’ প্রমথ নাথ বিশী, কলিকাতা, ১৯৮৬ পৃষ্ঠা–৪৬১
(সংগৃহীত)

এবিএন/ফরিদুজ্জামান/জসিম/এফডি

এই বিভাগের আরো সংবাদ