সাইকেল

  অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ১৩ জুলাই ২০১৮, ১০:৫৪

সজল দাশ, ১৩ জুলাই, এবিনিউজ : ক্রিং ক্রিং শব্দ শুনলে রহিসের মন কেমন হয়ে যায়। অপলক দৃষ্টিতে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। যতোদূর চোখের আলো থাকে। সোলেমান মিয়ার ডাক শুনে কখনো কখনো সম্বিত ফিরে আসে।

সোলেমান মিয়া এই গ্যারেজের মিস্ত্রি কাম মালিক। কেউ কোনো এতিম বাচ্চা এনেদিলে সে তাদেরকে খুব যত্ন করে কাম শেখায়।না বুঝলে বারবার বুঝায় ।ভাবে–ওরা খুব অসহায়। না হলে এই কাম কেউ শেখে।

এ পর্যন্ত অনেক ছেলেকে কাম শিখিয়েছে।কেউ কেউ রিক্সার মালিক বা গ্যারেজের মালিক হয়ে দিব্বি আরামে সংসার করছে। মাঝে মাঝে কেউ এসে দেখাও করে। এসে সোলেমান মিয়ার পা ছুঁয়ে সালাম করে। এতেই তার তৃপ্তি। কারণ আজকাল পা ছুঁয়ে সালাম করা সমাজ থেকে উদাও। একমাত্র ওস্তাদ সাগরেদের বেলায় এখনো আছে। তাই কেউ দেখা করতে আসলে সোলেমান মিয়া খুব যত্ন খাতির করে। ঠান্ডা গরমে মিশ্রণে সোলেমান মিঁয়ার মন। বলে-‘এখন থেইকা ওগোরে ডাক দোহাই না দিলে কাম শিখবো ক্যামনে? আদরের সময় আদর, আর কামের সময় কাম“। রহিস ছাড়াও আরো একটা ছেলে এই গ্যারেজে কাম শেখে।নাম–আগ্রহ। প্রথম প্রথম ওর নাম শুনে সবাই হা করে তাকিয়ে থাকতো। কেউ কেউ হাসাহাসিও করতো।কেউ নাম নিয়ে কিছু জিজ্ঞেস করলে, আগ্রহ চুপচাপ শুনতো কিছুই বলতো না। মাঝে মাঝে আগ্রহর মনেও উঁকি দিতো, এ নাম ওর কে রেখেছে? এবার বাড়ি গিয়ে ঠিক ঠিক বাবাকে জিজ্ঞেস করবে। এভাবে সান্ত্বনা খোঁজে আগ্রহ।

রহিস ও আগ্রহর যোগদান এই গ্যারেজে খুব বেশি দিনের নয়। তাও দেখতে দেখতে তিন মাস পার হয়ে চার মাসে পড়লো। সাতদিন আগে আসে আগ্রহ। দু‘জনের খুব ভাব। একেবারে গলায় গলায়। বয়সটাও কাছাকাছি। রহিসের নয়,আগ্রহ আটে পড়েছে।

এই উপশহরে সোলেমান মিয়া যখন প্রথম গ্যারেজ দেয়, তখন শুধু রিক্সার কাজই হতো। একসময় রিক্সার জায়গা দখলে নেয় ব্যাটারি চালিত রিক্সা।এরপর সাইকেলের দিকে নজর দেয় সোলেমান মিঁয়া।সাইকেলের ভালো খদ্দরও জোটে। এরপর থেকে সাইকেল সাড়ানোর কাজ নিয়মিত।

রহিসকে এখানে এনে দেয় রহিসেরই এক দূর সম্পর্কের খালু। বাবা হারা এতিম। বাবা মারা যাওয়ার পর মা এবাড়ি ওবাড়ি টুকটাক কাজ করে রহিসকে বড় করছিলো । রহিসকে গ্রামের এক স্কুলে ভর্তিও করা হয়েছিল। টিনের চালের স্কুলটি ছিলো রহিসদের একমাত্র পড়ার ঘর। গেলো বছর বড় বন্যায় স্কুল ঘরটি পানিতে তলিয়ে যায়। পানি সরে যাওয়ার পর স্কুল ঘরটি আর স্কুল রইলো না। টিনের চাল সহ স্কুল ঘরটি মাটিতে শুয়ে পড়ে। সেই থেকে রহিসের স্কুল বন্ধ। মা এ বাড়ি ও বাড়ির কাজ করতে করতে দিন আর ঠিক থাকে না। মা‘র দুশ্চিন্তা হয়। বাপ হারা ছেলেটার কি হবে? উঠতি বয়স। পাছে খারাপ সংগে ছেলেটা যেন নষ্ট না হয় । রহিসকে কিছু বুঝতে দেয় না মা। ভাবনাও মাথা থেকে সরে না। দূর সম্পর্কের এক বোনকে তার আশংকার কথা বলাতে, একদিন সত্যি সত্যি রহিসকে নিয়ে অই খালু সোলেমান মিঁয়ার গ্যারেজে হাজির। খালু, সোলেমান মিয়ার পূর্ব পরিচিত।

যেদিন রহিসকে নিয়ে আসে, রহিসের মা সারাদিনঘরে একা একা চোখের পানি ফেলেছে। মাঝে শুধু ছেলের জন্য আল্লাহর কাছে দুই হাত তুলে চার রাকাত নফল নামাজ আদায় করে। আগ্রহ সাইকেলটাকে উল্টো ভাবে শোয়ায়। চাকা গুলো ঠিক মতো কাজ করছে কি না, স্প্রোকে হাত দিয়ে জোরে ঘুরান দেয় ।চাকাটি অনেকক্ষণ ধরে ঘুরতে থাকে। আগ্রহর দৃষ্টি চলন্ত চাকাটির দিকে। চোখের পাতা একদমই নড়ে না । ঘুরতে ঘুরতে চাকাটি একসময় স্থির হয় । আগ্রহ তখনও এক দৃষ্টি তে তাকিয়ে। পাশ থেকে রহিসের ধাক্কায় স্বাভাবিক হয় ।আগ্রহর খুব ইচ্ছা ওর একটা সাইকেল থাকবে । সেই সাইকেলে চড়ে গ্রামের আঁকা বাঁকা কাঁচা মাটির রাস্তা দিয়ে ক্রিং ক্রিং শব্দ করে চালাবে। এই স্বপ্ন দেখে যাচ্ছে যখন সে একটু আধটু বুঝতে শিখেছে । কিন্তু এই স্বপ্নের কথা বলবেই বা কাকে। সৎ মায়ের ঘরে বেড়ে উঠা।

আগ্রহর মা নেই। জন্মাবার আধা ঘণ্টা পর মা মারা যান। তাই এই বয়স অব্দি মার ভালোবাসা কি এখনো বুঝে উঠতে পারে না। মা মারা যাওয়ার সময় আগ্রহকে কোলে নিয়ে অনেক আদর করেছে । দু‘গালে শুধু চুমু আর চুমু। মা হয়তো বুঝে গিয়েছিলো সময় আর বেশি নেই। একসময় বুকের উপর দুই হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরে। বুকের উপর শোয়া অবস্থায় মা মারা যান। এসব কথা বাবার মুখে শোনা।

মার পষ্ট কোনো ছবি আগ্রহর চোখে নেই। আশেপাশে কোনো মা ছেলেকে আদর করতে দেখলে মনটা ভারী হয় । প্রথম প্রথম যখন বুঝতে শেখে তখন এই সৎমাকেই মা জেনেছে। আস্তে আস্তে বুঝতে পারে এটা ওর আসল মা না। শুনেছে–মা মারা যাওয়ার তিন মাসের মাথায় বাবা আবার বিয়ে করেন। কারণ তিন মাসের আগ্রহকে লালন পালন করা খুব কষ্ট হচ্ছিল। তা ছাড়া দেখারও কেউ ছিলো না। বাবা পুরুষ মানুষ। এতো টুকুন ছোট্ট বাচ্চা। তার উপর মা মরা ছেলে। আত্মীয় স্বজনের জোরাজুরিতে শেষ মেষ বাবা বিয়েতে রাজি হয় ।

আগ্রহ আস্তে আস্তে বড় হতে থাকে । আগ্রহর বয়স যখন চার তখন তার একটা ছোট ভাই জন্ম নেয় । ভাই পেয়ে আগ্রহর কি না খুশি। সারাদিন ভাইয়ের চার পাশে ঘুর ঘুর ।বাইরের কাউকে ধরতে দিতো না।কেউ কোলে নিলে আগ্রহর সে কি চিৎকার। এই ভয়ে পারতপক্ষে ওর সামনে কেউ ছোট বাবুটাকে কোলে নিতো না।

আরো বছর খানেক পর আগ্রহকে স্কুলে ভর্তি করা হয় । স্কুলে চুপচাপ বসে থাকতো। শিক্ষকরাও ওকে খুব আদর করতো।এক কান দুই কান করে শিক্ষকরাও জেনেছে ওর মা নেই । আগ্রহকে সবচেয়ে বেশি আদর করতো–ক্লাস টিচার মমতা রানী। মমতা রানীর সাত বছরের বিবাহিত জীবনে এখনো কোনো সন্তানাদি আসেনি। হয়তো তাই আগ্রহর প্রতি মমতা রানীর মমতা একটু বেশি।

ক্লাসে সব বিষয়ে আগ্রহর মোটামুটি আগ্রহ। শিক্ষকরা যা বলেন মন দিয়ে শোনে। খাতায় প্রতিটি শব্দ পষ্ট করে লেখে। আঁকা জোকার দিকেও খুব আগ্রহ। এই জন্য শিক্ষকদের প্রিয় ছাত্র। আগ্রহর হাতের লেখা দেখে বুঝার উপায় নেই,সে ক্লাস ওয়ানের ছাত্র । বছরের মাঝামাঝি স্কুলে সবার পরিচিত মুখ আগ্রহ।

ইদানিং মার ব্যবহার আগ্রহ বুঝতে পারে । বই নিয়ে পড়তে বসেছে,মার ধমক–খবরদার পড়তে হবে না,ভাই ঘুমুচ্ছে। কারণে অকারণে মার ধমকে আগ্রহর মন ভারী হয়ে ওঠে। বাবা একটু আদর করলে মার লাল চোখ বাবার দিকে। এভাবে আরো কিছুদিন চললো। সৎমার অত্যাচার বাবা দেখেও না দেখার ভান করেন। একবার বলতে গিয়ে সংসারে কি অশান্তি ।রাতেই মা কাপড় চোপড় গুছিয়ে বাপের বাড়ি যায় যায় অবস্থা। বাবার সেই কি আকুতি। অনেকক্ষণ পর মার মাথা ঠা–া হলে বাবা বলে–দেখো মা মরা ছেলে।আমি ছাড়া আর কেউ নেই, যে ছেলেটাকে দেখবে। বেড়ার ফাঁক দিয়ে ভেসে আসা কথা গুলো আগ্রহ শুনেছিলো। বাবাকে তখন প্রচ– ভালোবাসতে ইচ্ছে করে আগ্রহর।

তারও একবছর পর করিম চাচা আগ্রহকে নিয়ে এই গ্যারেজে আসে।

সোলেমান মিঁয়া অনেকক্ষণ থেকে রিক্সার প্যাডেলটা হাতে নিয়ে নাড়াচাড়া করছে। কিছুতেই কিছু বুঝতে পারছে না ,চলন্ত অবস্থায় রিক্সায় খট্‌ খট্‌ শব্দ ।এভাবে ওভারে কয়েকবার নেড়েচেড়ে আবারো চোখ দেয়–প্যাডেলটা যে চেসিসটার মধ্যে থাকে ইঞ্চি খানেক গোল সেই ছিদ্রটার মধ্যে । সব পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে । সোলেমান মিঁয়ার একটা সুনাম আছে এই মহলে–সে কোনো মালিককে অযথা হয়রানি করে না । কোনো পুরানো পার্টস দিয়ে কাজ হলে নতুন পার্টসের ধার ধারে না। যতোক্ষণ সময় লাগে লাগুক ঠিক সে করবেই। এই কারণে অনেক মালিক গ্যারেজে রিক্সা ফেলে শুধু সমস্যার কথা বলে চলে যায়। ওরা জানে সোলেমান মিঁয়ার চরিত্র । কিন্তু আজ কিছুতেই কিছু হচ্ছে না । প্যাডেলটা নিচে রেখে দাঁড়ায় সোলেমান মিয়া। এক পা দু পা করে এগিয়ে সামনের পানের দোকান থেকে দুই খিলি পান মুখে দেয় । এটা তার স্বভাব। কোনো জটিল সমস্যায় পড়লে পান চিবুতে চিবুতে সমাধান বের করে।

গ্যারেজ থেকে হঠাৎ চিৎকার শুনে সোলেমান মিয়া দৌড় দেয়। সাইকেল দাঁড় করিয়ে কাজ করছিলো আগ্রহ । হঠাৎ সাইকেল কাত হয়ে ওর শরীরের ওপর পড়ে। সোলেমান মিয়া দৌঁড়ে এসে আগ্রহর উপর থেকে সাইকেল তুলে নেয়। তেমন কোনো বড় দুর্ঘটনা না। হাতের কনুইর পাশে সামান্য আঁচড় পড়েছে । তাতেই সোলেমান মিঁয়ার কি কষ্ট । পাশের ঔষধের দোকান থেকে ব্যান্ডেজ এনে লাগিয়ে দেয়। গ্যারেজের ছেলে গুলোকে নিজের ছেলের মতোই ভালোবাসে সোলেমান মিঁয়া ।কারো একটু জ্বর হলেও সে এটাকে খুব সিরিয়াস ভাবে নেয় । জ্বর অথবা ব্যথা পেলে ওদিন কাজ বন্ধ।

গ্যারেজের এক কোণায় একটা চৌকিতে সারাদিন বিশ্রাম। যদিও এটাকে বিশ্রাম বলে, কিন্তু সারাক্ষণ হাতুড়ির বারির শব্দ লেগেই থাকে।

এই অঞ্চলে সোলেমান মিঁয়ার আগমন এক যুগেরও বেশি সময় ধরে । জমিটা কিনে প্রথম যখন গ্যারেজ দেয়–তখন অনেকেই বিশ্বাসই করতে পারেনি এখানে গ্যারেজ ব্যবসা হবে । গ্যারেজের আসে পাশে কোনো দোকান পাটও ছিলো না ।সোলেমান মিঁয়ার ভাবনা,কম টাকায় এর চাইতে ভালো জমি কোথায় পাবে। সময় গড়ানোর সাথে সাথে এখন গ্যারেজের চারপাশে জমজমাট। টাকা দিয়েও জমি মেলে না । এরই মধ্যে দালাল মারফত বেশ ক‘জন জমিটা কিনতে সোলেমান মিঁয়ার কাছে ধর্না দিয়েছে। সোলেমান মিঁয়ার এক কথা, জীবন থাকতে এই জমি বেচবে না। এ জন্য অনেকে অনেক ভাবে পিছে লেগে থাকে। ক্ষতি করার চেষ্টাও করে । সোলেমান মিয়া এ নিয়ে এখন খুব একটা ভাবে না । শুধু ভাবে গ্যারেজে কাজ করা ছেলে গুলোর কথা ।আরো ভাবে–সংসার যদি থাকতো তাহলে ওদের মতোই ছেলে মেয়ে থাকতো ।বিয়েটাও করে ছিলো,পাশের গ্রামের এক অপরুপ সুন্দরিকে। মেয়েটিকে প্রথম দেখায় পছন্দ হয় সোলেমান মিঁয়ার । দেখতে এতোই ফর্সা যে,পূর্ণিমার চাঁদের আলো যেন ওর পুরো শরীরে আছড়িয়ে পড়েছে।

বউটা সোলেমান মিঁয়াকে খুব ভালোবাসতো। রাতে যতো দেরীতে ফিরুক না কেন, পাটি বিছিয়ে তার মধ্যে খাবার সাজিয়ে বসে থাকতো। স্বামী আসলে পরে একসাথে দুজনে খাবার খেতো। খাবার শেষে এক খিলি পান সোলেমান মিঁয়ার হাতে গুঁজে দিয়ে পাশে বসে থাকতো ।এভাবে সংসার এগিয়েছে পাঁচ মাসের মতো হবে। একদিন কাজের চাপে বাড়ি ফিরতে বেশ রাত হয় সোলেমান মিয়ার। বাড়িতে ঢুকে বউকে বিছানায় শোয়া দেখে, মাথায় হাত দেয়। প্রচ– গরম অনুভব করে। তাড়াতাড়ি বালতিতে পানি নিয়ে মাথায় ঢালতে শুরু করে । কাপড় ভিজিয়ে হাত মুখ মুছে দেয়। রাত অনেক গভীর । ভরা পূর্ণিমার চাঁদের আলো বেড়ার ফাঁক দিয়ে ঘরে ঢোকে, পষ্ট দেখতে পায় সোলেমান মিঁয়া । আর কিছু জানে না । সকালে ঘুম ভাঙলে বউয়ের মাথায় হাত দিয়ে বুঝতে পারে বউ আর এই জগতে নেই।

এরপর সোলেমান মিঁয়া আর বিয়ে করেনি। কেউ জিজ্ঞেস করলে, শুধু একটু হেসে আবার কাজে মন দেয় ।

রহিস ও আগ্রহ একটা চৌকিতে পাশাপাশি শোয়।খানিক দূরে অন্য চৌকিতে সোলেমান মিঁয়ার নিবাস। আশ্রয়স্থল সেই গ্যারেজ। দুই বন্ধু সারাদিন কাজ করার পর এই চৌকিতে বসে গল্প করে। মা‘র গল্প, বাবার গল্প, এমনকি ফড়িংয়ের পিছে দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে পুকুরে পড়ে যাবার গল্প। দুজনেই গল্পের মাঝখানে খুব হাসাহাসি করে । এমন নিটোল হাসি শুনে সোলেমান মিঁয়ার মন ভরে যায়। তখন নিজেরও ছোট বেলার কথা মনে পড়ে যায়। ছোট বেলায় সোলেমান মিঁয়া খুব দুষ্ট ছিলো ।পাড়ার এমন কোনো ফলের গাছ ছিলো না, যে গাছে সোলেমান মিঁয়ার হাত পড়েনি । এই নিয়ে বাবার কাছে বিচার লেগেই থাকতো। বাবার বকা এবং মারের কথা এখনো মাঝে মাঝে মনে পড়ে। তাই ওদের হাসি দেখে সোলেমান মিঁয়াও মুখ লুকিয়ে হাসে। ভাবে শৈশব বড়ই মধুর। যদিও এখন তা অতীত।

মাঝে মাঝে সোলেমান মিঁয়ার খুব ইচ্ছে জাগে,রহিস ও আগ্রহ কি নিয়ে গল্প করে তা শোনার। আড়াল থেকে শুনতে গিয়ে যদি ওরা দেখে ফেলে তাহলে ওদের গল্পটাই মাটি হয়ে যাবে। তাই শোনার ইচ্ছেকে চেপে রাখে।

রহিস আর আগ্রহর গল্প অনেক রাত অবধি গড়ায়। গল্প করতে করতে যখন ওরা ঘুমিয়ে পড়ে, তারও অনেক পড়ে সোলেমান মিয়া ঘুমায়।

কাজ করতে করতে হঠাৎ আনমনা হয়ে পড়ে রহিস। কোনো দিকে খেয়াল থাকে না। শুধু এক দৃষ্টিতে অপলক তাকিয়ে। সোলেমান মিঁয়ার ডাকও তার কান স্পর্শ করে না। কি হয়েছে সোলেমান মিঁয়া জিজ্ঞেস করে। রহিস কিছু বলে না। আগ্রহ ব্যাপারটা বুঝতে চেষ্টা করে। অবশ্য রহিসকে সেও কিছু বলে না ।তবে একদিন রাতের গল্পে রহিস বলেছিলো,ওর পড়া লেখা করার ইচ্ছে, এমনকি স্কুলে যেতে মন চায় ।

গ্যারেজের সামনে দিয়ে প্রতিদিন অনেক ছেলে মেয়ে স্কুলে যায় ।কারো বাবা কারো মা হাত ধরে তাদের স্কুলে নিয়ে যাবার দৃশ্য রহিসের চোখে পড়ে। তাই দেখে রহিসের মন মাঝে মাঝে মন খারাপ হয়।কাজে মন বসাতে পারে না। কাজের ফাঁকে যখনই দেখে তখনই সে অন্য জগতে হারিয়ে যায়। একদিন রাতে স্বপ্নে সে দেখেছে–মা ওকে স্কুল ড্রেস পড়িয়ে স্কুলে নিয়ে যাচ্ছে। কাঁধে ব্যাগ হাতে পানির বোতল,গেইটের সামনে গিয়ে মা হাত ইশারায় বিদায় দেন।এরপর আর কিছুই মনে নেই। পরদিন ঘুম থেকে উঠে আগ্রহকে বলবে ভাবছিলো কিন্তু বলেনি।পাছে আগ্রহর মন খারাপ হয় । আগ্রহও স্কুলে ভালো ছাত্র ছিলো। এসব কথা গল্পের ছলে আগ্রহ তাকে বলেছিলো । শুনে রহিসের মনও খারাপ হয়েছিলো ।

রহিস কোনো কোনোদিন ভাবে, সব কথা সোলেমান মিঁয়াকে বলবে, কিন্তু বলে না । যদি অন্য কিছু হয় মা শুনে কষ্ট পাবে। ইদানিং মার কথা খুব মনে পড়ে।

সোলেমান মিঁয়া আজ খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে। শুক্রবার, গ্যারেজ বন্ধ । সপ্তাহের এই একটা দিন গ্যারেজের সমস্ত কাজ বন্ধ থাকে।সারা সপ্তাহ খাটুনির পর এই একটা বন্ধের দিনে ব্যক্তিগত কাজ গুলো করতে হয়। কাপড় ধোয়ার কাজও এই দিনে করে ওরা।

সোলেমান মিঁয়া ঘুম থেকে উঠে প্রাত্যহিক কাজ সারতে ঘণ্টাখানেক সময় নেয়।এরপর দুই ছেলেকে নিজেই ঘুম থেকে ডেকে উঠায়। বয়স্ক এক মহিলা এসে সকাল ও দুপুরের রান্না করে দেয়। আবার বিকেলে এসে রাতের রান্না করে দিয়ে যায়।এই ভাবে সোলেমান মিঁয়ার ঘরে সবার খাবারের ব্যবস্থা।সকালে সবাইকে সঙ্গে নিয়ে সোলেমান মিঁয়া নাস্তা সারে।এটা নিয়মিত।

আজ একটু অন্য রকম মনে হচ্ছে । অন্য শুক্রবার সোলেমান মিঁয়া এতো সকালে ঘুম থেকে উঠেন না। যদি না বিশেষ কাজ থাকে।

আজ কফিলের বিয়ে। কফিল এই গ্যারেজে কাজ শিখে, নিজে আলাদা গ্যারেজ খুলেছে। প্রায় দশ বছর হতে চলল কফিলের গ্যারেজ। সোলেমান মিঁয়ার সাথে আলাপ না করে কোনো বিশেষ কাজে হাত দেয় না কফিল।ওস্তাদের সম্মতি নিয়ে জুম্মাহর নামাজের পর বিয়ের দিন ঠিক হয় । রহিস ও আগ্রহকে নিয়ে কফিলের বিয়েতে যাবে আজ সোলেমান মিয়া।

কফিলের বাড়ি পৌঁছাতে পৌঁছাতে আযানের শব্দ কানে আসে। জুমার নামাজ শেষ করে বিয়ে বাড়িতে হাজির সোলেমান মিঁয়া। কিছুক্ষণ পর বর কনে এসে কাজী সাহেবের দুপাশে দুই চেয়ারে বসে। কাজী সাহেব ছেলের বিস্তারিত বলে মেয়েকে বলেন–বলো কবুল। মেয়েটি লজ্জায় মুখ ঢাকে। সোলেমান মিঁয়ার নিজের বিয়ের কথা মনে পড়ে যায় ।ফুটফুটে ছোট্ট অই পরীর মতো মেয়েটাও সোলেমান মিয়াকে কবুল বলতে কাজী সাহেবের ধৈর্য পরীক্ষা নিয়েছিলো ।

মেয়েটা কোন ফাঁকে কবুল বলেছে সোলেমান মিয়া টের পায়নি। হঠাৎ চেয়ার থেকে উঠে সরাসরি সোলেমান মিঁয়ার পা ছুঁয়ে সালাম করে মেয়েটা।বলে–ভাইজান আইজ রাইয়ের না। বিয়ার আগে উনার কাজ থেইকা আফনার হগল কথাই হুনছি। আইজ থেইকা আমিও আফনার ছোড বইন।” কথা শুনে সোলেমান মিয়ার দুই চোখে তখন বর্ষার আগমন ।

সাইকেলের একটা চাকা নিয়ে অনেকক্ষণ থেকে নাড়াচাড়া করছে আগ্রহ। কোনো দিকে খেয়াল নেই। একমনে বুঝতে চেষ্টা করছে চাকাটার টাবলু কোথায়। একবার এদিক ঘোরাইতো পরক্ষণেই অন্য দিকে। কিছুতেই কিছু বুঝতে পারে না। একজন মহিলা গ্যারেজের সামনে দাঁড়িয়ে, আগ্রহর এইসব কাজ পর্যবেক্ষণ করছিলো। মহিলার দৃষ্টি আগ্রহর দিকে। দো মনা ভাব মহিলাকে আচ্ছন্ন করে। ভাবনার মাঝখানে অস্ফুট স্বরে বলে–আগ্রহ আগ্রহ। কোনো সাড়া নেই। কিছুক্ষণ পর আগ্রহ পাশ ফিরতেই মহিলাকে দেখে। আগ্রহর তেমন কোনো আগ্রহ নেই মহিলাকে নিয়ে ।

সোলেমান মিঁয়া দেখতে পেয়ে হাতের কাজ বন্ধরেখে মহিলার সামনে এসে দাঁড়ায়। রহিস একটা ছোট টুল এনে মহিলাকে বসতে দেয়। সোলেমান মিয়া মহিলার পরিচয় জানে না। তবুও ভদ্রতার খাতিরে মহিলাকে বসতে বলে। সোলেমান মিঁয়া ভাবে গ্যারেজে যখন ঢুকেছে নিশ্চয় কোনো আত্মীয়স্বজন হবে। মহিলা বসতে বসতে নিজের পরিচয় দেয়–আমি মমতা রানী। ও আমার ছাত্র। স্কুলে ওকে অনেক আদর করতাম। তাছাড়া পড়াশোনায়ও ভালো ছিলো। হঠাৎ দেখি আগ্রহ ক্লাসে আসে না। খোঁজ নিয়েছি। কেউ তেমন বলতে পারেনি। এখানে আমার বাপের বাড়ি। গতকাল এসেছি। রিক্সার জন্য অপেক্ষা করছিলাম। ভাবতেও পারেনি ওকে এখানে এমনভাবে দেখতে পাবো। সোলেমান মিঁয়া এতোক্ষণ হা করে তাকিয়ে মহিলার কথা শুনছে। আগ্রহ দৌঁড়ে এসে মমতা রানীর পা ছুঁয়ে সালাম করে। মমতা রানী আগ্রহকে জড়িয়ে ধরে। যেন অনেকদিন পর হারানো ছেলেকে ফেরত পেয়েছে মমতা রানী।

রহিসের মা কিছুদিন পর পর ওর খবরাখবর নেয়। আগ্রহর খবর আজ অবধি কেউ নিতে আসেনি ।রহিসের খবর নিতে যেদিন কেউ আসে,অই দিন আগ্রহর মনটা খারাপ হয়। তারপরও শান্ত্বনা খোঁজে আগ্রহ ।সৎ মায়ের ঘর,বাবাটা চাইলেও কিছু করতে পারে না। আগ্রহর খারাপ মন রহিস বুঝতে পারে।

রহিসের মা‘র পাঠানো খাবার আগ্রহকে না দিয়ে সে মুখেই নেয় না। সে বার যখন রহিসের মা পিঠা বানিয়ে পাঠালো, সোলেমান মিঁয়া সহ সবাই একসাথে বসে খেয়েছে। একবার চারটা মুরগির ডিমও পাঠিয়ে ছিলো। ঘরের পালা মুরগির ডিম। এই মুরগিগুলো একসময় রহিসই দেখাশোনা করতো। ডিমগুলো সবাই খুব মজা করে খেয়েছে ।

আজ আগ্রহর শরীরটা ভালো নেই। রহিস কপালে হাত দিয়ে দেখেছে । একটু গরম গরম ভাব। রাতে খেতে বসে কিছু না খেয়ে উঠে পড়ে আগ্রহ। সোলেমান মিয়া কপালে হাত দিয়ে আৎকে ওঠে। প্রচ– জ্বর গায়ে। রহিস বালতিতে পানি নিয়ে আসে । সোলেমান মিয়া গামছা ভিজিয়ে কপালে দেয় । হাত পা শরীর মুছতে থাকে । এভাবে প্রায় ঘণ্টা খানেক সোলেমান মিঁয়া আগ্রহর পাশে বসে মাথায় জল পট্টি দেয় । জ্বরের ঘোরে বিড় বিড় করে আগ্রহ কি যেন বলে ।পাশে বসা সোলেমান মিঁয়া কিছুই বুঝতে পারে না।সোলেমান মিয়া আবারো কপালে হাত দেয় । জ্বর না বাড়লেও কমেনি। আগ্রহর প্রলাপ বেড়ে যায়। সোলেমান মিঁয়ার চোখে ঘুম নামে। “মা আর মাইরো না ।আমারে আর মাইরো না “ঘুম চোখে সোলেমান মিঁয়ার কানে কথা গুলো বাজতে থাকে। লাফ দিয়ে ওঠে ।ঘুম কাটাতে পানি দিয়ে নিজের দুই চোখে ঝাপটা দেয়। আগ্রহর কপালে আবারো হাত দেয়,না জ্বর তেমন বাড়েনি।

ফজরের আযানের সুমধুর কন্ঠ ভেসে আসছে। আগ্রহর জ্বর আস্তে আস্তে কমতে থাকে।

মমতা রানী আজ আবারো গ্যারেজে এসে হাজির। হাতে অনেক প্যাকেট ও টিফিন ক্যারিয়ার । হাত মোটামুটি ভরা। গ্যারেজে ঢুকে এদিক ওদিক তাকালো। এক কোণে বসে কাজ করছিলো আগ্রহ । মমতা রানী সেদিকে এগুতে আগ্রহ দৌঁড়ে আসে। হাত থেকে প্যাকেট গুলো নিয়ে নিচে নামিয়ে রাখে।এরই মধ্যে রহিসও এসে হাজির । মমতা রানীর আসা যদিও আগ্রহর জন্য ,রহিসকে ভালো লাগে মমতা রানীর। রহিসের কুশলাদি জিজ্ঞেস করে । রহিস এই টুকুতেই খুশি। মমতা রানী প্রথম প্যাকেটটা খুলে রহিসের হাতে দেয়। একটি লাল রঙয়ের গেঞ্জি। রহিসের গায়ের রঙ ধবধবে ফর্সা । তাই যাই পড়ুক মানায় ভালো।মমতা রানীর ধারণা লাল রঙ ওকে আরো উজ্জ্বল দেখাবে।সোলেমান মিঁয়ার জন্য আনা হয়েছে কারুকাজ করা পাঞ্জাবি।সবার শেষে আগ্রহর হাতে তুলে দেয় শেষ প্যাকেটটি। আগ্রহ খুলে দেখে দুইটা গেঞ্জি । খুশিতে কি বলবে বুঝতে পারে না।ভেতরে ভেতরে সোলেমান মিঁয়াও খুশি। মমতা রানী ওদের আনন্দের পুরোটা উপভোগ করে ।

টিফিন ক্যারিয়ারের ঢাকনা খুলতে গন্ধে মৌ মৌ করছে পুরো গ্যারেজ।মুরগির মাংসের পাতলা ঝোল ও সাদা পোলাও। সবাইকে নিয়ে গোল করে বসে মমতা রানী।অল্প সময়ের মধ্যে মমতা রানীকে সবাই আপন করে নিয়েছে ।এরই মধ্যে রহিস চারটা প্লেট নিয়ে আসে। সোলেমান মিয়া হাত ধুয়ে খেতে বসে পড়ে।মমতা রানী সবার প্লেটে খাবার দিয়ে যাচ্ছে । সবাইকে এমন গোগ্রাসে গিলতে দেখে মমতা রানীর অন্য রকম সুখ অনুভূত হয়। নিজের পরিবার মনে হয়।

আজ সোলেমান মিয়ার মন ভালো নেই । সকালে ঘুম থেকে উঠে–চৌকিটার ওপর মুখ ভার করে বসা। কোনো কথা বলছে না। মাঝে মাঝে দুই হাত মুখ ঢেকে কি যেন ভাবে।দেখলে মনে হবে চিন্তার সাগরে সাঁতার কাটছেন।আবার কখনো এক দৃষ্টিতে মাটির দিকে তাকিয়ে ।

আস্তে আস্তে বেলা গড়াতে থাকে। রহিস, আগ্রহ কি করবে বুঝতে পারে না। রহিস ও আগ্রহ একা একা নাস্তা সারে।গ্যারেজের দরোজা খুলতে হবে। এই প্রথম সোলেমান মিঁয়াকে ছাড়া নাস্তা খাওয়া। সোলেমান মিঁয়াকে এভাবে এর আগে দেখেনি আগ্রহরা।সবসময় হাসি খুশি মুখ,আদর মাখা চোখ দেখতে অভ্যস্ত ওরা। কিন্তু আজ কি হয়েছে কিছু বুঝতে পারে না । আজ সোলেমান মিঁয়াকে অন্য সোলেমান মিঁয়া মনে হয় ।তারপরও আগ্রহ ভয় মাখা বুকে এক পা দু পা করে এগিয়ে সোলেমান মিঁয়ার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। বলে–ওস্তাদ উইঠা পড়েন,সাইকেল ডেলিভারি নিতে আইছে ।কি করুম বইলা দেন। “সোলেমান মিঁয়া এক চোখের ভুরু তুলে কোণা চোখে তাকালো। কিছু না বলে নিঃশব্দে উঠে দাঁড়ায়। বাথরুমের দিকে এগোয়।

গোসল সেরে বের হয় সোলেমান মিঁয়া।আগের রুপে। আগের সোলেমান মিঁয়া এখনকার সোলেমান মিঁয়ার অনেক তফাৎ। দরোজার সামনে গিয়ে কাস্টমারকে সাইকেল ডেলিভারি দেয়।

আজ ছিলো সোলেমান মিঁয়ার ঘর আলো করে আসা স্ত্রীর মৃত্যুবার্ষিকী। এই দিনটি আসলে স্ত্রীর কথা বেশি বেশি মনে পড়ে । স্‌হীর থাকতে পারে না সোলেমান মিঁয়া । তাই সকাল বেলা এরকম মৌনতা।একান্তই নিজের মতো ভাবে ।

দুপুরের পর মমতা রানীর আসার কথা । মফস্বলের ছোট্ট এক পার্কে সবাইকে নিয়ে ঘুরতে যাবে ।

আগ্রহর কান্না কোনো ভাবেই থামছে না। বলা যায় থামানো যাচ্ছে না ।অঝোর কান্নার শব্দে আশ পাশের লোকজন উঁকি ঝুঁকি দিচ্ছে। কেউ সামনে এগোয় না। রহিস চেষ্টা চালাচ্ছে কান্না থামাবার কিন্তু কিছুতেই কিছু হচ্ছে না। আগ্রহর কান্নার শব্দে গ্যারেজের চারপাশ ভারী। সোলেমান মিয়াও বুকে জড়িয়ে ধরে একবার সান্ত্বনা দেয়ার চেষ্টা করেছে। উল্টো কান্নার মাত্রা আরো বেড়ে যায়। সান্ত্বনা দিতে গিয়ে সোলেমান মিয়ার চোখ ভিজে একাকার ।

কি ভাবেই বা ওকে সান্ত্বনা দেবে সোলেমান মিয়ার মাথায়ও কাজ করছে না। রহিসের চোখ জলে ছল ছল। বন্ধুর কষ্টে নিজেও কষ্টের ভাগ নিতে ইচ্ছে করে। আসলে কেউ কারো কষ্টের ভাগ নিতে পারে না। উঃ আঃ বলে সাথী হয় ।

সোলেমান মিঁয়া–কাঁদুক।আরো বেশি বেশি কাঁদুক। কাঁদলে কষ্ট হালকা হয়ে আসে।

সেই ছোট বেলা । সোলেমান মিঁয়ার বয়সইবা কতো হবে, চার কি পাঁচ। বাড়িতে হঠাৎ কান্নার শব্দ । আশে পাশের লোকজন ছুটে এলো। পরে আত্মীয়স্বজন এসে হাজির। এসেই কান্না ।একজন অন্য জনকে ধরে কি সে বিলাপ। সোলেমান মিঁয়া কিছুই বুঝতে পারে না। বুঝারও বয়স না। কেউ কেউ সোলেমান মিঁয়াকেও জড়িয়ে ধরে কান্না করে। সোলেমান মিঁয়া এদিক ওদিক ছোটাছুটিতে ব্যস্ত। পাশের বাড়ির চাচী এসে বললো– সোলেমান তোর বাপ মইরা গেছে। তাতেও সোলেমান মিঁয়া শুধু হা করে শুনেছে। বাঁচা বা মরা এই বোধ তখন সোলেমান মিঁয়ার মধ্যে ছিলো না । বড় হবার পর বুঝেছে–বাপ–মা কি।একটা বটবৃক্ষ। যতোদিন থাকবে ছায়া দিয়ে চতুর্দিকে আগলিয়ে রাখবে।না থাকলে অনেক বন্ধুর পথ পাড়ি দিতে হয় ।

বাবার মৃত্যু সংবাদ আগ্রহ জানতে পারে আজ সকালে ।তাও গ্রামের এক দূর সম্পকের্র আত্মীয়র মাধ্যমে। সাতদিন হয়েছে বাবা মারা গেছে। সৎমা আগ্রহকে কোনো খবর দেয়নি।এজন্য আগ্রহর কষ্ট আরো বেশি লাগছে । মৃত বাবার মুখটাও শেষ দেখা হলো না। ইচ্ছে ছিলো,এবার ঈদে বাবার জন্য একটা পাঞ্জাবি কিনবে,শাদা চেক লুঙ্গি বাবার পছন্দ। সেটাও নেবে।কিন্তু আশা পূর্ণ হলো না। একটানা কেঁদে যাচ্ছে আগ্রহ ।

খুব সকালে মমতা রানী এসে হাজির । সবাই তখনো বিছানায় । শুক্রবারে একটু দেরিতে ঘুম থেকে উঠা হয়। সারা সপ্তাহের খাটুনির পর এই বন্ধের দিনে কিছুটা বিশ্রাম হয়। মমতা রানী অনেকক্ষণ ধরে গ্যারেজের কড়া নাড়ছেন। কিন্তু ভেতর থেকে কেউ এসে খুলছে না। কিছুক্ষণ বিরতি দিয়ে আবারো একটানা কড়া নেড়ে যাচ্ছে । বেশ খানিকটা সময় পর সোলেমান মিঁয়া এসে দরোজা খুলতে–মমতা রানীকে দেখে অবাক হয়।এতো সকালে মমতা রানী আসতে পারে সোলেমান মিঁয়ার ভাবনাতেই ছিলো না। দরোজা খুলতেই অন্ধকারাচ্ছন্ন গ্যারেজ সকালের আলোতে ভরে ওঠে । মমতা রানী গ্যারেজে ঢুকে একটা কাঠের টুলের উপর গিয়ে বসে। হাতে আজকেও টিফিন ক্যারিয়ার ।সম্ভবত সকালের নাশতা ।সোলেমান মিঁয়ার ডাকে আগ্রহরা ভিমরি খায়।উঠেই মমতা রানীকে দেখে লজ্জা পায়।

সকলের নিয়মিত কাজ সেরে সবাই গোল হয়ে বসে। নিচে পাটি বিছিয়েছে মমতা রানী। সবাইকে খাবার পরিবেশন করে নিজেও খাবার মুখে দেয় ।খেতে খেতে অনেক গল্প হলো।এক ফাঁকে মমতা রানী বলে–তোমাদের সবাইকে আজ একটা খুশির খবর দিতে এই সকাল সকাল আসা। সবাই উৎসুক মুখে জানতে চায় কি সেই খুশির খবর! মমতা রানী গড় গড় করে বলে যায়–অনেকদিন থেকে চেষ্টা করছি কিন্তু কিছুতেই কিছু হচ্ছিল না। মাত্র গতকাল জানতে পেরেছি আমার স্কুল ট্রান্সফারের খবর।আমাদের পাশের স্কুলে। এখন থেকে আর স্কুল ছুটির জন্য অপেক্ষা করতে হবে না ।যখন মন চাইবে তখনই তোমাদের কাছে আসতে পারবো। কথা শেষ হতে না হতেই সবাই হাত তালি দিয়ে মমতা রানীর খুশির সাথে একাত্মতা জানালো। মমতা রানীর চোখ জলে ভাসা ।

হাসপাতালের বেডে মাথার কাছে বসে মা রহিসের মাথা বুলিয়ে দিচ্ছে । রহিস ব্যথায় উঃ আঃ করেই যাচ্ছে । কিছুতেই ব্যথা কমছে না। মা, গত দুই দিন তিন রাত একটানা ছেলের পাশে ডিউটি করছে।খাবার দাবারের বালাই নেই । কিছুক্ষণ পর পর দুই হাত উপরে তুলে ছেলের সুস্থ কামনায় দোয়া পড়ে যাচ্ছে । বাঁচার জন্য হলেও খেতে হবে এই সত্যটা রহিসের মা কাছে বেমানান।অসীম ধৈর্যশীল মহিলা। দেখে বুঝার উপায় নেই গত তিন রাত উনি নির্ঘুমে কাটিয়েছেন। সোলেমান মিয়া সকাল বিকাল দুই বার আসে। সঙ্গে কিছু শুকনো খাবার এনে রহিসের মার হাতে দেয় । হাসপাতালের নিয়মের কারণে সোলেমান মিঁয়া চাইলেও থাকতে পারে না । ভিজিট আওয়ার সকাল বিকাল এক ঘন্টা করে । সোলেমান মিয়া এসেই রহিসের খবরাখবর নিয়ে পরে অন্য প্রসঙ্গে আনে। যাওয়ার সময় রহিসের মার হাতে ক‘টা টাকা গুঁজে দেয় । যদি রাত বিরোতে প্রয়োজন হয় কোথায় যাবে মহিলা?

রহিসকে খুব আদর করে সোলেমান মিঁয়া। রহিসও বাধ্য ছেলের মতো মাস কে মাস গ্যারেজে কাটিয়েছে। একদিন ভরা অমাবস্যার রাতে কাউকে কিছু না বলে সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়ে রহিস ।সোলেমান মিঁয়ার মাথায় আসে না, রহিস একাজ করতে পারে।

রাত আনুমানিক একটা। সোলেমান মিঁয়ার চোখে ঘুম ঘুম ভাব।বাইরে ভীষণ শোরগোলের শব্দে সোলেমান মিঁয়া দরোজা খুলে রহিসের এই করুণ অবস্থা দেখতে পায়।দুই জন লোক রহিসকে চ্যাং দোলা করে দাঁড়িয়ে । গ্যারেজ থেকে রিক্সা বের করে নিজে চালিয়ে দ্রুত হাসপাতালে নেয় সোলেমান মিয়া।বাম পায়ের হাড় ভেঙে গেছে । পরদিন সকালে রহিসের মার কাছে খবর পাঠানো হয়।

টানা একুশ দিন হাসপাতালে কাটানোর পর ডাক্তার ছুটি দিয়েছেন । রহিসের পায়ের ব্যান্ডেজ খুলে দেয়া হয়েছে। মার কাঁধে ভর দিয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটতে পারে । ডাক্তার বলেছেন ক‘দিন পর স্বাভাবিক হাঁটাচলা করতে পারবে।

মা রহিসকে আজ বাড়িতে নিয়ে যাবে । খুব ভোরে সোলেমান মিঁয়া উপস্থিত । রহিসকে বুকে জড়িয়ে সে কি কান্না সোলেমান মিয়ার।

বেশ ক‘দিন থেকে আগ্রহকে আগের আগ্রহ বলে মনে হচ্ছে না। কাজে তেমন মন নেই। শুধু ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। সবসময় হা করে বসা। পুরোপুরি আনমনা। অসীম চিন্তা মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে । খাবার দাবারেও তেমন আগ্রহ নেই। রহিস যাবার পর থেকে আগ্রহর এই পরিবর্তন। এরই মধ্যে সোলেমান মিঁয়াকেও অন্য রকম মনে হয় আগ্রহর। ক‘দিন আগে সোলেমান মিঁয়ার গ্রাম থেকে এক দূর সম্পর্কের আত্মীয় এসেছিলো।গ্যারেজের যে রুমটায় সোলেমান মিঁয়া থাকে অই রুমে আত্মীয়কে নিয়ে দীর্ঘক্ষণ আলাপ করে সোলেমান মিঁয়া ।কোনো জরুরি বিষয়ে সোলেমান মিঁয়া এভাবে দরোজা বন্ধ করে বৈঠক করেন। এর আগে আরো কয়েকবার এই ভাবে অন্যদের সাথে বৈঠক করেছেন সোলেমান মিঁয়া। এধরনের বৈঠকের বিষয়ে আগ্রহর তেমন আগ্রহ দেখা যায় না। আজ বৈঠক সেরে বাইরে আসার পর সোলেমান মিঁয়াকে বেশ হাসি মুখ দেখে আগ্রহ। একবার গ্যারেজের বাইরে গিয়ে পান মুখে আবার গ্যারেজে ঢুকে সাইকেল সারানোয় মন দেয়। সাইকেলের চাকা এদিক ওদিক ঘুরাতে থাকে সোলেমান মিয়া। ফাঁকে মুচকি হাসিতে ভরে থাকে মুখ। আগ্রহ দেখে অবাক। কাজের ফাঁকে এভাবে হাসতে সোলেমান মিঁয়াকে আগে কেউ দেখেনি ।

আজ মমতা রানী আবারো গ্যারেজে এসেছে। আগ্রহর কুশলাদি নিয়ে সোলেমান মিঁয়ার পাশে রাখা টুলে ঠুক করে গিয়ে বসে পড়ে ।দুজন কি যেন আলাপে মত্ত। মমতা রানীকে এর আগেও সোলেমান মিঁয়ার সাথে গল্প করতে দেখেছে আগ্রহ ।

মমতা রানী আগ্রহকে নিয়ে নিজের বাড়ির দিকে রওনা দিতে প্রস্তুত ।আগ্রহকে আবার স্কুলে ভর্তি করাবে। খেলাধুলা করবে। যখন খুশি ফড়িংয়ের পিছে দৌড়াবে।

আগ্রহর যেহেতু বাবা মা নেই তাই মমতা রানীরছেলে হয়ে বাকি জীবন পরিচিত হবে। সোলেমান মিয়ারও এতে সায় আছে।

এদিকে আগামীকাল সোলেমান মিয়ার বিয়ে। সাগরেদ কফিল, তার গ্রামের এক বিধবা মহিলার সাথে বিয়ের আয়োজন করে।
(সংগৃহীত)

এবিএন/ফরিদুজ্জামান/জসিম/এফডি

এই বিভাগের আরো সংবাদ