কবিয়াল ফণী বড়ুয়া

গানের মানুষ, প্রাণের মানুষ

  অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ২৫ জুন ২০১৮, ১৮:১৫

সমীরণ বড়ুয়া, ২৫ জুন, এবিনিউজ : কবিয়াল ফণী বড়ুয়া। দেশীয় লোকজ সাহিত্য সংস্কৃতির একজন বিরল বহুমাত্রিক প্রতিভাধর কবি। তিনি ছিলেন নিখিল ভারত এ উপমহাদেশের খ্যাতিমান কিংবদন্তী কবিয়াল। গানের মানুষ, প্রাণের মানুষ। অতি মেধাবী কর্ম প্রতিভু একজন সফল কবি। আবহমান চিরায়ত বাংলার রূপ, রস, শব্দ, গন্ধ, প্রকৃতির মাটি, উৎসব পার্বণ গণসংগ্রামে ও মানুষের কাছাকাছি থেকেছেন। অসাম্প্রদায়িক, প্রগতিশীল, স্বাধীনতাকামী, চেতনায় দীপ্ত একজন খাঁটি বাঙালি। তাঁর সৃষ্টি কর্মের অন্যতম ফসল কাব্যিক ছড়া, কবিতা, গানে ছিল হৃদয় ছোঁয়ানো অপূর্ব সুর ও ছন্দ। সৃষ্টিশীল এই মানুষটি অত্যন্ত বাকপটু ও প্রত্যুৎপন্নমতি সম্পূর্ণ ছিলেন। তাঁর রচিত গানে শব্দ চয়নও শব্দসম্ভার অকল্পনীয় ও ঈর্ষনীয়। লোকায়ত বাংলা প্রতিটি জনপদে ছিল তার অবাধ বিচরণ। ১৯৩০ এর দশক থেকে ১৯৯০ এর দশক পর্যন্ত বীর দর্পে প্রতিটি দেশ ও জাতির সংকটপূর্ণ মুহূর্তে কবিগানের মাধ্যমে গণজাগরন সৃষ্টি করেছেন। তিনি আমাদের অহংকার, গর্বের ধন। আমাদের বাংলা সাহিত্যের আদি যুগে ও মধ্য যুগে প্রকাশের মাধ্যম ছিল সংগীত । বাংলা সাহিত্য সংস্কৃতি শুরু থেকে কাব্য ও সংগীত একই সূত্রে গ্রথিত। চর্যাগীতিকা, শ্রীকৃষ্ণ কীর্তন, নাথগীতিকা, গীতগোবিন্দ, বৈঞ্চব পদাবলী, গোপীচন্দের গান, নানাবিধ মঙ্গলগীতি, রামায়ন মহাভারত ও ভগবত গীতি প্রাচীন বাংলা সাহিত্যে খুবই স্বীকৃত। এই ভাবধারা থেকে বেরিয়ে আপন মহিমায় স্বতন্ত্র ”বৈশিষ্ট্য নিয়ে ফণী বডুয়া কবিগান শুরু করেন। এছাড়া কথকতার প্রচলন প্রথা এদেশে সুপ্রাচীন। হাজার বছর পূর্বেও আমাদের দেশে রাম– পাঁচালি ভারত– পাঁচালি, হরগৌরি, রাধা–কৃষ্ণ , বিষ্ণ– লক্ষ্মী প্রভৃতির ধামালী গানের চর্চা ছিল। কালের পরিক্রমায় ধীরে ধীরে দেশে কবিগানের প্রচলিত হয়। ঊনিশ শতকের শুরু থেকে আশির দশক পর্যন্ত কবিগানের স্বর্ণযুগ ছিল। প্রায় ৭০ বছর ধরে ফণী বডুয়া উপমহাদেশে অবিরাম কবিগান গেয়েছেন। তার অনবদ্য সৃষ্টি রচনা শৈলীগুলো এদেশের গণমানুষকে মুক্তির পথ দেখিয়েছেন। ইতিহাস ঋদ্ধতায় কবিগানকে তিনি সমৃদ্ধ করেছেন। দেশ বরেণ্য এ গুণী কবিয়াল ফণী বড়ুয়ার ২২ জুন, শনিবার ১৭ তম মৃত্যু বার্ষিকীতে হৃদয়ের অফুরন্ত গভীর শ্রদ্ধাভরে তাঁকে আজ স্মরণ করছি। প্রতিথযশা কবিয়াল ফণীবড়ুয়ার কবিগান, কাব্যরস, সমকালীন ধমনী রাজনীতি অর্থনীতি সামাজিক চালচিত্র নিয়ে এবারে সংক্ষেপে আলোকপাত করছি। তিনি আমাদের কি দিয়েছেন? কি রেখে গেলেন? এ প্রসঙ্গে প্রথমে আলোকপাত করছি। লোকশিল্পী ফনী বডুয়া গভীর দেশপ্রেম, সামাজিক ও অর্থনৈতিক মুক্তির প্রেরণার প্রিয় দেশবাসীকে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন। তিনি কবিগানকে নিছক আনন্দ বিনোদন হিসেবে নেয়নি। বরঞ্চ তাঁর রচিত গানের অপরূপ সুর ও ছন্দভরা অন্ত্যমিল ছিল। গ্রামীণ মানুষের প্রচলিত লোকজ ভাষার মধ্য দিয়ে শোধিত নিপীড়িত নিখিল ভারতবাসীকে শোষণ মুক্তির শপথে উজ্জীবিত করতে সমর্থ হয়েছিলেন। তাঁর এ কবি গানের প্রতিভার বিকাশ ঘটে পরম কল্যাণ মিত্র গুরু লোকশিল্পী রমেশ শীলের হাত ধরেই তিরিশের দশকের শুরুতেই গুরু শির্ষ্যের মধ্যে এই কবি গানের লড়াই শুরু হয়। বোয়ালখালীর জ্যৈষ্ঠপুরা আসন্ন কৃষক সম্মেলনে গুরু রমেশশীল ও কিশোর ফণী বড়ুয়ার মধ্যে ‘কৃষক বনাম জমিদার’ শীর্ষক পালা পরিবেশিত হয়। ফণী বড়ুয়ার একটি গানের বাণীতে তাঁর প্রিয় গুরুকে উৎসর্গ করে তিনি মঞ্চে গেয়েছিলেন রমেশ শীলের সঙ্গে থাকি/ ধর্মীয় কবিগান শিখি/ ফরিয়াদি অবাস্তবের ধ্যান। বছর তাহার সনে/ পাল্টা দিলাম কবিগানে। পাই নি কোনো রাজনীতির সন্ধান।” এ কবি গানে কৃষকের ভূমিকায় ফণী বডুয়া জমিদার পক্ষে রমেশ শীল বিপক্ষে গান করেন। প্রথম গুরুকে কবিতার ছন্দে বলেছিলেন–

স্মরণ করলে যাদের স্মৃতি বুকে জাগে স্বদেশ প্রীতি

চালাইতে মুক্তির অভিযান।

সূর্য্য সেনের নেতৃত্বে পাঞ্জা ধরি মৃত্যুর সাথে

স্বাধীনতা করতে চাই অর্জন।

জালালাবাদে পাহাড়েতে অস্ত্রের জবাব অস্ত্রে দিতে

করিয়াছে জীবন বিসর্জন।

এই গানের মাধ্যমে তিনি সমকালীন রাজনীতিকে তুলে এনেছেন। দেশে তখন চারদিকে তেভাগা আন্দোলনের কড়া নড়ছে। জমিদারি প্রথা উচ্ছেদের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন জনতা। এই প্রসঙ্গে ফনী বড়ুয়ার উক্তি– “রাজতন্ত্র উচ্ছেদ করে শোষিত প্রজায় / জমিদারী উচ্ছেদ হবে লাঙ্গলের ঠেলায়। এই প্রতিবাদী দৃপ্ত কন্ঠের গানগুলো শ্রোতাদের হৃদয় ছুঁয়ে যায়। জনতা জয়ের ধ্বনির মাধ্যমে কবিকে উৎসাহিত করেন।

চল্লিশের দশকে কবিয়াল ফনী বড়ুয়া ছিলেন তেজোদীপ্ত তরুণ কবি। এ সময়ের শুরুতেই ১৯৪১–১৯৪২ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ লেগে যায়। এ যুদ্ধে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। চালের দাম বেড়ে দ্বিগুণ হয়। চারদিকে মানুষ অনাহারে যন্ত্রণায় মরছে। শহরে খোলা হয় লঙ্গর খানা। তখন উচ্চবিলাসী কালোবাজারীর ভুঁইফোড় দুর্নীতিবাজেরা নিত্য জিনিসপত্রের দাম বৃদ্ধি করে। সেই সময়ে মানবতার নৈতিকতার চরম অবক্ষয় ঘটে।

১৯৪৩ সালে ফনী বড়ুয়ার বাড়ির পার্শ্ববর্তী বাগোয়ান গ্রামে ‘চট্টগ্রাম জেলার’ কৃষক সম্মেলন হয়। এ সম্মেলনে “কৃষক ও মজুতদার” বিষয়ে কবিগান হয়েছিল। এতে কৃষকের পক্ষ নিয়ে গান করেন ফনী বড়ুয়া। মজুতদারের পক্ষে ছিলেন তাঁরই গুরু রমেশ শীল। এই আসরে ফনী বড়ুয়া অতুল সুর ও ছন্দে গেয়ে ওঠেন এভাবে– “আমি কৃষক নন্দন / সভার সদন / পরিচয় জানাই। তুমি পুঁজিবাদী মহাজন তোমাকে চিনে সাধন/ দেশের প্রতি কী কারণে তোমার দরদ নাই? তুমি লাভের লোভেতে এই দুর্ভিক্ষেতে / করিতেছে মজুত কেনে? দেশের মানুষ, যার মরে যায় মজুতদারি শোষণে। যুদ্ধের প্রথম অবস্থায় চালের বস্তা দশ টাকায়/ পাওয়া যেত সকল দোকানে। এখন আশি টাকায় / চালের বস্তা শুনতে পাই/ বিক্রি কর গোপনে।” বাঘোয়ানের দু’দিন ব্যাপী কৃষক সম্মেলনের পরে চট্টগ্রাম জেলা কবি সমিতি নামে ফনী বড়ুয়ার পাঁচখাইন বাড়িতে একটি কবিয়াল সংগঠনের জন্ম লাভ করে। এ সংগঠনের সভাপতি ছিলেন রমেশ শীল, সাধারণ সম্পাদক ছিলেন ফনী বড়ুয়া। চট্টগ্রাম জেলার বিভিন্ন থানা অঞ্চলের কবিয়াল বৃন্দ এ সংস্থায় কর্মকর্তা ও সদস্য ছিলেন। ফনী বড়ুয়া তরুন বয়সে পুরানো ভাবধারাকে তুচ্ছ করে কবিগানে এনেছেন নতুনত্ব ও বৈচিত্র্যতার সংযোজন। তিনি এভাবে মঞ্চে ওঠেন “দেখি অনেক কবিওয়ালী / নিয়ে পরের গুলিগোলা, আপন বন্দুকে শিকার করে। পরের ধান সাজি ধনী/ করিতেছে মহাজনি/ সুনামধন্য সেজেছে বাজারে, জ্ঞানীর কাছে পড়বে ধরা/ এই সমস্ত বর্ণচোরা / নকল করা ধূর্ত কবিয়াল। পাখির মত শেখা বুলি/ বলিয়া তোর মূল হারালি/ কেন তুই ব্যবহার করলি, পরের তলয়ার।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে মাষ্টারদা সূর্যসেন কর্তৃক ব্রিটিশের অস্ত্র লুন্টন ও তাঁর ফাঁসি ইত্যাদি বিষয়ে ফনী বড়ুয়ার সাহসে উচ্চারণ ছিলো এভাবে– “অগ্নিপুরুষ সূর্যসেন অগ্নিমন্ত্রে শিক্ষাদানে/ স্বাধীনতার করিতে লড়াই/ অস্ত্রের জবাব অস্ত্রে দিতে ইংরেজকে তাড়াইতে/ এই সংকল্প অন্তরে জানাই।” তিনি বিপ্লবী মাষ্টারদা সূর্যসেনের আদেশের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়েছিলেন এভাবে– “ সূর্যসেনের সূর্যের মতো তেজ–বীর্য–সাহস/ কোনো বাঁধায় টলেনি তার বিপ্লবী মানস। অগ্নিমন্ত্রে গঠন করে গুপ্ত সংগঠন / ঘুচাইতে সাম্রাজ্যবাদী বিদেশী শোষণ। চট্টগ্রাম জালালাবাদে পাহাড়ের চূড়ায় / যুদ্ধ করি স্বাধীনতার পতাকা উড়ায়। তিনি অন্য পংক্তিতে লিখেছেন “সূর্যসেন স্মরণে জাগে ভীরু মরুমন/ স্বাধীনতার মূল অধিকার করিতে অর্জন”।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষে তার ডাক আসে চট্টগ্রামের বাইরে। তিনি চট্টগ্রামের বাইরে ঢাকা, কলকাতাসহ নিখিল ভারতের বিভিন্ন জনগুরুত্বপূর্ণ স্থানে কবিগান গেয়ে নিজেকে মানুষের হৃদয়ের মন্দিরে ঠাঁই করে নিয়েছেন। তিনি দেশের ঠকবাজ, স্বার্থবাদী, লুঠেরাদের বিরুদ্ধে স্বকন্ঠে তুলে ধরেন– “খাঁটি মানুষ চেনা না যায়/ স্বার্থপরের মিল থাকে না কাজে আর কথায়। প্রকৃত দেশদরদী নিজের স্বার্থ নাহি চায়। বড় চাকরি কন্ঠাক্টারী, জমিদারী লইয়া / পেট মোটা হয়েছে যাহার/ রাঘব বোয়াল হইয়া / তারা মেম্বার হইয়া / গদী, পাইয়া লুঠের সুযোগ পায়”। এভাবে তিনি সমকালীন সমাজের চিত্র এঁকেছিলেন। যাহা বর্তমান সমাজে বিদ্যমান রয়েছে। কবির মানসপটে অংকিত অসংখ্য গান কালোত্তীর্ণ হয়েছে। যাহা আজও আমাদের সমাজ রাষ্ট্রকে জাগিয়ে তুলছে। দেশ প্রেমিক কবি হিসেবে জাতীর জন্য তিনি গান, কবিতা, ছড়া লিখে গেছেন। যাহা আধুনিক বাংলা সাহিত্যে এক অমূল্য সম্পদ হিসেবে পরিনত হয়েছে।

১৯৫২ সালের বাংলা ভাষা আন্দোলনের প্রাক্কালে মৃাতৃভাষার দাবির প্রতি তার গানের কথার সুর রচিত হয় এভাবে– “বাঙালিদের বাংলা ভাষার রাখি ইজ্জত মান/ হাসিমুখে সফিক, বরকত করে জীবন দান/ রমনার মাটি লাল হইয়া তাজা বুকের খুনে / বাঙালির মন জ্বলে উঠে বিদ্রোহের আগুনে। মিটিং–মিছিল হরতালের ছুটলো তুফান, ব্রজকন্ঠে আওয়াজ ওঠে বাংলা মোদের প্রাণ।” তিনি পাকিস্তানি শোষণ, বঞ্চনা ও ভাষা প্রশ্নে লিখেছেন– “একুশে ফেব্রুয়ারী দাও/ তুমি স্মরণ করিয়ে, শহীদের লাল খুনের কথা। ঢাকার বুকে রমনার মাঠে / স্বৈরাচারীর বুলেটে / রক্তঝরা ইতিহাসের পাতা, সম্প্রদায়িক নীতি নিয়ে / পাকিস্তানের জন্ম দিয়ে / বাঙালি হয় পূর্ব পাকিস্তানি। এক পাখির দুই পাখার মত / পূর্ব– পশ্চিম মুসলিম যত শুনতে পায় বহু মধুর বানী”।

তিনি পাকিস্তানি রাষ্ট্র ধর্ম নিরপেক্ষতা প্রসঙ্গে দ্বাথ্যহীন ভাষায় গেয়েছিলেন– “ছয় দফার জয় হল ভোটে/ মুসলিম লীগের পতন ঘটে, জয় বাংলার পতাকা দিল তুলি/ কেন বাংলার বাংলাভাষী– সাজিল আজ বাংলাদেশী। বাঙালি জাতীয়তা ভুলি। বাংলাদেশী জাতীয়তা, সাম্প্রদায়িক জন্মদাতা, ধর্ম নিরপেক্ষতা পদদলি”। কবির এই অমর বানীটি এখনো ষোল কোটি মানুষের হৃদয়ের গাঁথা যেন প্রতিধ্বনি হয়ে কানে বাজছে। তিনি খুবই রাজনৈতিক সচেতন ছিলেন। তাই তাঁর কাব্যরসে রাজনৈতিক গন্ধ খুঁজে পাওয়া যায়। তিনি স্বৈরাচারী পাকিস্তানিদের শাসন শোষনের বিরুদ্ধে যেমনি গান রচনা করেছেন। তিনি তেমনি গরীব, দুঃখী, কৃষক, শ্রমিকদের পক্ষে সব–সময় সোচ্চার ছিলেন। তাই তার কাব্য ঢংয়ে, সুর ছন্দে কন্ঠে ধ্বনিত হলো এভাবে– “জালিয়াতির শাসনের ভিতরে / সমাজ কি গঠন হতে পারে? মুষ্টিমেয় কয়েকজন / সুখ–সম্পদে দিন যাপন করিতেছে এই দেশের ভিতরে। কৃষক–শ্রমিক, মধ্যবিত্ত, বাঁচতে নারে বাঁচার মত। অসহায় জীবন যাপন করে। পরের মেহনতের ফল / বিনাশ্রমে ভোগ দখল / যারা আজ করে টাকার জোঁরে/ গাড়ি–বাড়ি, ধন–সম্পত্তি, নিয়ে সাঁজে কোটিপতি। গরিবের দল কাঁদে হাহাকারে। ” তিনি দরিদ্র কৃষক পরিবারের ছেলেদের অভিশপ্ত জীবনের শিক্ষা নিয়ে লিখেছেন– “ শিক্ষাহীন কৃষকের ছেলে, গরুর পিছে লাঙ্গল ঠেলে, নাম পর্যন্ত লিখতে না পারে। ভার তুলিয়া কাঁধে লয়/ গাধার মত বোঝা বয়/ দুঃখের আগুন বুকে নিয়ে মরে।” ফনী বড়ুয়ার খুরধার লেখনীতে সমকালীন দর্পন ও রাজনৈতিক নির্বাচনে কিছুটা চালচিত্রের দৃশ্যপট নিয়ে তাঁর কবিতায় ভাব বৈচিত্রে আমরা দেখতে পাই– “তিনি যখন গেয়েছিলেন। গুলি লাটি চালাইয়া রাখে শাসন ব্যবস্থা / আইয়ুবের দালালী করি/ চোর সাজিলে ফেরেশতা। ঘুচাইতে এ অবস্থা/ জীবন দিল ছাত্রগণ। ইসলাম রক্ষা করতে হবে। যাদের মুখে প্রচারে, মদ, গাঁজা, ঘুষ, সুদের ব্যবসা বন্ধ কেন না করে। ধোঁকা দিয়া জনতারে, করে স্বার্থ অন্বেষণ।”

অন্যদিকে তাঁর সৃষ্টিশীল কাব্যের মধ্যে দেশের স্বাধীনতা, ধনতন্ত্র ও গণতন্ত্রের কথা সুস্পষ্টভাবে ফুটে উঠে এভাবে–

গণস্বার্থে গণতন্ত্র দাবি করলে ষড়যন্ত্র

করে যত কায়েমী স্বার্থের দল

ধনতন্ত্র বাঁচতে চায় গণতন্ত্রের ছলনায়

শ্রেণি স্বার্থে করিয়া কৌশল ।

বিনা অস্ত্রে ক্ষমতার লড়াই করতে জনতার

অধিকার গণতন্ত্রের পায়,

অর্থনৈতিক গণতন্ত্র স্বাধীনতার মূলমন্ত্র

পুঁজিবাদে বন্দি রাখতে চায়।

ফনী বড়ুয়া দেশের লোক সাহিত্য ও সংস্কৃতির বিকাশ সাধনেও কাজ করেছেন। এ প্রসঙ্গে তার রচিত কাব্যে এভাবে ধরা পড়ে লোক সংস্কৃতির জীবনগ্রন্থ/ করিবারে প্রাণবন্ত/ কর লোকগীতি সংস্কৃতির সাধনা/ মরমী ধরমী গানে / ক্ষণিকের আনন্দ দানে/ তার মধ্যে নাই সংগ্রামী চেতনা।

সত্তর দশকের কবি ফনী বড়ুয়া ১৯৭১ সালে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পরবর্তী সময়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবুর রহমানের নেতৃত্বে সরকার দেশের রাজাকার, আলবদরদের চিহ্নিত করার লক্ষ্যে কলম ধরেছিলেন। তাঁর সাহসী লেখনির মাধ্যমে তিনি কাব্যের অন্যতম উপাদান হিসেবে তুলে ধরেছেন এভাবে– “শান্তিকামী মানুষের অন্তরে/ ভয় কেন স্বাধীনতার পরে। যাদের হাতে অস্ত্র আছে/ এনে দাও সরকারের কাছে। বঙ্গবন্ধু বলে বারে বারে / রাজাকার আলবদর দলে/ গণ্য হবে কাজের ফলে। / যারা অস্ত্র রাখে গোপন করে/ যারা খাঁটি দেশপ্রেমিক / স্বাধীনতার মুক্ত সৈনিক/ বঙ্গবন্ধুর আদর্শ পালন করে/ যারা সুবিধাবাদী / অস্ত্র নিয়ে অদ্যবধি/ ডাকাতি লণ্ঠনে মানুষ মারে।”

ফনী বড়ুয়া তার কবিগানকে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক অসঙ্গতি থেকে প্রিয় দেশবাসীকে মুক্তি দেওয়ার লক্ষ্যে নিরলসভাবে জ্ঞান সাধনা করেছেন। তাঁর কাব্যের মধ্যে এর মিল আমরা খুঁজে পাই।– দেশের বৃহৎ অংশ গরীবেরা /অন্ন বস্ত্র শিক্ষা ছাড়া/ পন্থহারা পথিকের মত কাঁদে/ আছে বাংলায় বহু নেতা/ দলীয় স্বার্থে ঘুরে মাথা/ ঐক্য নাই রাজনৈতিক দ্বন্দ্বে/ নেতাদের কোন্দলে পড়ি/ যারা তাদের অনুসারি / তাদের মধ্যে লেগে যায় কোন্দল/ সুধা মন্থন করবার কালে বিষের ভান্ড টেনে তোলে/ ধরে জনগণের ভিতরে ফাটল।”

উপরোক্ত পংক্তিগুলো পাঠ করলে আমরা নির্দ্বিধায় বলতে পারি যে, তিনি সর্ব যুগের সর্ব কালের জন্য এই কবিতার শব্দ বিন্যাস করেছিলেন। দেশের বর্তমান রাজনৈতিক মতাদর্শে বিভিন্ন নেতাকর্মীদের মধ্যে এ দ্বন্দ্ব কোন্দল এখনো বিদ্যমান রয়েছে। অথচ তিনি কাব্যিক চেতনায় শৈল্পিকভাবে এটাকে তুলে এনেছেন। তিনি আরো বিদ্রোহী ভাষায় লিখেছেন–

ঘুষ দুর্নীতি স্বজনপ্রীতি জুলুম মিথ্যা জালিয়াতি

জন্ম নিল পুঁজিবাদী আইনে

চোরা কারবার মজুতদারে কৃত্রিম অভাব সৃষ্টি করে

দ্রব্যমূল্য বাড়াইবার জন্যে।

উপরোক্ত কবিতার চরণগুলো তিনি যেভাবে অন্তমিল ঠিক রেখে অতি সহজ সরল ভাষায় সুর ও ছন্দে উপস্থাপন করেছেন। তাহা এ সময়ের গণমানুষের সত্য কথাটিও তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছেন।

দেশের প্রতিটি আন্দোলন, সংগ্রামে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র–ছাত্রীদের রয়েছে অনেক অবদান। উচ্চ শিক্ষা লাভ করে এ ছাত্র/ছাত্রীরা দেশের চালিকা শক্তি হিসেবে কাজ করবে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তুু শিক্ষার্থীরা যখন রাজনৈতিক দলে আশ্রয় প্রশ্রয়ে হয়ে ওঠে বিপদগামী। ন্যায়–অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা অকালে প্রাণ হারায়। এ ব্যাপারে ফনী বড়ুয়ার গানের উক্তিতে এভাবে পরিস্ফুষ্ট হয়ে ওঠে– “বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঝে ছাত্রের দুই দলে/ অস্ত্র হাতে লড়াই বুকের রক্ত ঢেলে। মাতা–পিতায় পুত্র পাঠায় উচ্চ শিক্ষার তরে/ উচ্চ শিক্ষা তুচ্ছ করি মারামারি করে। যাদের ছেলের মৃতদেহ ঘরে ফিরে যায়/ বিনা মেঘে বজ্রপাত যা বাবার মাথায়”। এ চরণগুলো প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া শিক্ষার্থী ও অভিভাবকগনের অন্তরের ভাবটুকু যেন প্রকাশ করতে চেয়েছেন।

কবিয়াল ফনী বড়ুয়া মানুষের যৌবন, নারী, পুরুষের প্রেম, প্রীতি, ভালবাসার আশা–আকাঙক্ষা, কাঙিক্ষত স্বপ্ন পূরণ নিয়ে গভীর ভাবাদেশে উপনীত হন। তাই কবিতার চরণে তিনি এভাবে গেয়েছিলেন–

রমনীর দয়া–মায়া স্নেহ ভালবাসা

না পাইলে পুরুষের মরু–মাঠে বাসা।

রমনীর পবিত্র প্রেম প্রীতির পরশে

পুরুষের হৃদয় নাচে আনন্দ ময় রসে।

তাঁর প্রিয় সহধর্মিনী সুরচি বড়ুয়াকে নিয়ে রচিত পঙক্তি মালায় তিনি প্রিয়তম স্ত্রীর প্রতি ভালবাসা অভিব্যক্তি প্রকাশ করেছিলেন এভাবে–

প্রিয়সী সুরুচি তোমার পেয়ে যত্ন সেবা

জাগ্রত হয়েছে আমার কবিত্ব প্রতিভা।

ফনীর মনি সরুচি রানী তাই তোমারে বলি

তুমি মোর কবিতা, কাব্য কুসুম কলি।

বহুমাত্রিক কাব্য প্রতিভার অধিকারী কবিয়াল ফনী বড়ুয়া কিশোর, যৌবন, জীবন প্রসঙ্গে কবিতার চরণতুলিতে এভাবে তুলে ধরেছেন–

আমি হারাইলামরে কিশোর যৌবন কাল

মন আমার যুবকের মত তুলে আশার জাল।

ধন সম্পত্তি হারাইলে চেষ্টা করলে পায়

জীবন যৌবন হারাইলে পাওয়া নাহি যায়

দেহের আছে উত্থান পতন জন্ম নিলে মরে

বিদ্রোহী মন জোয়ান থাকে চিরকালের তরে।

তিনি এ কবিতার চরণগুলোতে একজন দার্শনিক এর ভূমিকায় অবর্ত্তীণ হয়েছেন। তাঁর আধুনিক চিন্তা, চেতনা, দার্শনিক ভাবধারা কবিত্ব শক্তিকে যেন আকাশের সুউচ্চে নিয়ে গেছে। কবিয়াল ফনী বড়ুয়া জীবদশায় ঢাকার বুলবুল একাডেমি, কচি–কাচার মেলা, সিনেমা–টেলিভিশন ইত্যাদিতে কবিগান করেছেন। বাংলাদেশের প্রথম লোক–সঙ্গীত উৎসবেও তিনি যোগ দেন। গণভবনে, বাংলা একাডেমীতে, শিল্পকলা একাডেমিতে বহুবার কবিগান করেছেন। রমেশ শীলের পুত কবিয়াল যজ্ঞেশ্বর শীলের সাথে তিনি বিভিন্ন সময়ে গান করেছেন। স্বাধীনতোত্তর বাংলাদেশে ১৯৭৬ সালে ঢাকা শিল্পকলা একাডেমিতে কবিগান গেয়ে সুখ্যাতি অর্জন করেছিলেন। এই কবিগানের মাধ্যমে তিনি সব যুগের মানুষের প্রতিবিম্ব তুলে ধরেছেন। গণ চেতনার মাধ্যমে তিনি শোষিত মানুষের সুখ–দুঃখ, হাসি–কান্না, আশা–নিরাশা সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। ধর্মান্ধতা বর্জন করে গানের মধ্যে জীবনাবেগ প্রকাশ করেছেন। একান্ত সাদা–খোলা মন নিয়ে নির্ভীক চিত্তে সাধারণ মানুষের সমস্যার সমাধানে পথ খুঁজে দিতে পেরেছেন। তিনি একজন সাম্যবাদী কবিয়াল। জীবদশায় তাঁর চারটি বই প্রকাশিত হয়েছে। বইগুলো হচ্ছে– ১) হাল জামানার গান (১০/১০/১৯৭০ইং) ২) দেশের ডাক (নতুন যুগের গান) ২৮/১২/১৯৫৩ ইং। ৩) জনতার গান ৪) সর্বহারার জীবন সঙ্গীত। সম্ভবত: দেশের ডাক তাঁর প্রকাশিত প্রথম গানের বই। তিনি স্বাধীন বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত–পাকিস্তানে কবিগান পরিবেশন করে দেশের গৌরবোজ্জ্বল অবদান রেখেছেন। অধ্যাপক বাদল বরণ বড়ুয়া, লেখন সৈয়দ মোহাম্মদ শাহেদ সংকলিত ও সৈয়দ মোহাম্মদ শাহেদ কর্তৃক সম্পাদিত “কবিয়াল ফনী বড়ুয়ার জীবন ও রচনা” গ্রন্থটি জুন ১৯৯৭ সালে বাংলা একাডেমি প্রকাশ করেছেন। এছাড়াও অনোমা সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী, চট্টগ্রাম কর্তক অধ্যক্ষ প্রাবন্ধিক শিমুল বড়ুয়া সম্পাদিত মার্চ ২০১০ খ্রিষ্টাব্দে গণমানুষের মুক্তির সংগ্রামে নিবেদিত যে জীবন কবিয়াল ফনী বড়ুয়াকে নিয়ে প্রথম স্মারক গ্রন্থ প্রকাশিত হয়। এই প্রথিত যশা কবিয়াল ফনী বড়ুয়াকে আজন্ম বিদ্রোহী বলা চলে। ১৯১৫ সালে চট্টগ্রামের রাউজান থানার পাঁচখাইন গ্রামে তাঁর জন্ম। পিতা– নন্দ বড়ুয়া, মাতা– শ্যামবর্তী বড়ুয়া। পিতা–মাতার ৩ সন্তানের মধ্যে তিনি ছিলেন মেঝ সন্তান। মাত্র অল্প বয়সে মাকে হারান। তিনি কৈশোরে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করেছেন। দারিদ্রতার তীব্র কষাঘাতে লেখাপড়ার ইতি টানেন। তিনি কৈশোর থেকে মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত অনেক গুণী কবিয়ালদের সাথে কবিগান করেছেন। দীর্ঘ ৭০ দশক ধরে তাঁর কবি শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি সাধনার স্বীকৃতি স্বররূপ বাংলাদেশ সরকার ২০০১ খ্রিষ্টাব্দে তাকে রাষ্ট্রীয় সম্মান ‘একুশে পদক’ প্রদান করেন। এই দেশ বরেণ্য কবিয়াল ফনী বড়ুয়াকে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নতুন প্রজন্মের কাছে চির স্মরণীয় ও বরনীয় করে রাখার লক্ষ্যে বাংলাদেশ সরকারের নিকট প্রস্তাব আকারে আমি নিম্মের দাবীগুলো তুলে ধরলাম। ১) কবিয়াল ফনী বড়ুয়ার নামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি হলের নামকরণ করা ২) চট্টগ্রাম লালদীঘির চত্বরে তাঁর নামে সভা মঞ্চ তৈরী করা। ৩) চট্টগ্রাম জেলা শিল্প কলা একাডেমি কর্তৃক প্রতিবছর তাঁর জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকীতে সাংস্কৃতিক সেবীদের মধ্যে তাঁর নামে পদক ঘোষণা ও বিতরণ করা। ৪) মাধ্যমিক পর্যায়ে পাঠ্যপুস্তকের তাঁর রচিত কাব্য ছড়া, অন্তুর্ভূক্ত করা। ৫) রাউজানের পাঁচখাইন গ্রামে তাঁর বসত ভিটায় সরকারি সাংস্কৃতিক কমপ্লেঙ নিমার্ণ করা, ৬) বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বেসরকারি টিভি চ্যানেলগুলোতে তাঁর জন্ম বার্ষিকী ও মৃত্যু দিবসে বিশেষ প্রামাণ্য অনুষ্ঠান সম্প্রসারণ করা। ৭) দেশের প্রতিটি জেলা, উপজেলা শিল্পকলা একাডেমীতে তার জন্ম ও মৃত্যু বার্ষিকীতে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা। ৮) দেশে শিক্ষার্থীদের সৃজনশীল প্রতিভা বিকাশের লক্ষ্যে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়সমুহে তাঁর জন্ম ও মৃত্যু বার্ষিকীতে তার ওপর নির্মিত চলচ্চিত্র প্রদর্শন এবং শিক্ষার্থীদের মধ্যে ডিবেটিং ক্লাশ ও প্রতিযোগীতার ব্যবস্থা করা।

পরিশেষে এই গুণী শিল্পী কিংবদন্তী ও দর্শক নন্দিত কবিয়াল ফনী বড়ুয়ার ১৭ তম মৃত্যুবার্ষিকীতে তাঁর সকল ভক্ত ও পরিবার পরিজনকে জানাচ্ছি অশ্রুসিক্ত নয়নে, বেদনাভরা গভীর ভালবাসা। তাঁর এই শূন্যতা, অপূরণীয় দেশ ও জাতির মধ্যে তাঁকে আজ শ্রদ্ধা নিবেদন করুক। এটাই তাঁর কাজের মূল্যায়ন প্রাপ্তি ও প্রত্যাশা।

তথ্য সূত্রঃ কবিয়াল ফনী বড়ুয়া জীবন ও রচনা বাংলা একাডেমি, কবিয়াল ফনী বড়ুয়ার স্মারকগ্রন্থ, চট্টগ্রাম।
(সংগৃহীত)

এবিএন/ফরিদুজ্জামান/জসিম/এফডি

এই বিভাগের আরো সংবাদ