সম্পদ বড়ুয়ার ‘কত দেশ কত গল্প’

  মিল্টন বিশ্বাস

১৪ অক্টোবর ২০১৯, ১১:২৬ | অনলাইন সংস্করণ

‘কত দেশ কত গল্প’ (২০১৮) সম্পদ বড়ুয়ার একটি অসাধারণ  অনূদিত  গল্পের বই। সম্পদ বড়ুয়া একজন খ্যাতিমান কবি, অনুবাদক ও গল্পকার।  ১০ জন ভিন্ন ভিন্ন লেখকের ১১টি গল্প নিয়ে লেখক এ গ্রন্থটি সাজিয়েছেন। 

সম্পদ বড়ুয়ার জন্ম ১৯৫৮  সালে চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার হাইদচকিয়া গ্রামে। তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। পরে তিনি ইংল্যান্ডের বার্মিংহাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাবলিক ফিন্যান্সে এমএসসি ডিগ্রি নিয়ে কলেজে অধ্যাপনা শুরু করেন। ১৯৮৬ সালে তিনি সিভিল সার্ভিসে যোগ দেন। বর্তমানে রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ে সচিব হিসেবে কর্মরত আছেন। 

ছাত্র থাকাকালীন ছড়া লেখার মাধ্যমে লেখালেখিতে সম্পদ বড়ুয়ার আগমন। ইংরেজিতে অধ্যাপনা করায় প্রথম থেকেই কবিতা লেখা ও অনুবাদের প্রতি আগ্রহ বেশি।  আর এতেই একজন সফল অনুবাদক হয়ে ওঠেন তিনি। এ ছাড়া তিনি আলবার্তো মোরাভিয়ার গল্প (২০০৩), বার্ট্রান্ড রাসেলের আত্মকথা ১ম খণ্ড (২০০৪), আফ্রিকান প্রাণীদের গল্প (২০১৫), গল্প দেশে দেশে (২০১৫) গ্রন্থের রচয়িতা।  

সাকির ‘ষাঁড়’, মুলক রাজ আননদ’র ‘জন্ম’ এবং ‘রুপার চুড়ি’, আলবার্তো মোরাভিয়ার ‘শিশু’, অমৃতা প্রীতমের ‘দীর্ঘশ্বাস’, নাদিন গর্ডিমার ‘নিরাপত্তা ব্যবস্থা’, গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের ‘নিদ্রালু সুন্দরী এবং এরোপ্লেন’, চন্দ্রকান্ত কেনি’র ‘হিপ্পি মেয়েটি’, হারুকি মুরাকামি’র ‘বেকারিতে দ্বিতীয় হামলা’, চন্দ্রিকা বালানের ‘একটি কবিতার গল্প’, ঝুমপা লাহিড়ীর ‘সেক্সি’- এই এগারোটি বিদেশি গল্পের অনুবাদ নিয়ে ‘কত দেশ কত গল্প’ বইটি বেঙ্গল পাবলিকেশন্স প্রকাশ করেছে।  সব গল্পই সরল গদ্যে অনুবাদ করা। বিষয় বৈচিত্র্যে ভরা গল্পগুলো মনস্তাত্ত্বিক,  থ্রিলারধর্মী, মাতৃত্ব সম্পর্কিত কিংবা নারীবাদী। কোনোটিতে  রয়েছে সামাজিক ও নৈতিক অবক্ষয়ের চিত্র, আবার রয়েছে শ্রেণি বৈষম্য। নিখাদ ভালোবাসার আনন্দ বেদনার সাথে কিশোর উপযোগী গল্পও আছে এ গ্রন্থে। এসব গল্পের সাথে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রাগৈতিহাসিক গল্পের মিল খুঁজে পাওয়া যায় সহজেই। এগারোটি গল্পের মধ্যে মিয়ানমারের গল্পকার সাকি’র ‘ষাঁড়’ গল্পটি একটি ষাঁড়কে নিয়ে লেখা, আলবার্তো মোরাভিয়ার ‘শিশু’, মার্কেজের নিদ্রালু সুন্দরী এবং এরোপ্লেন, হারুকি মোরাকামির ‘বেকারিতে দ্বিতীয় হামলা’ এবং চন্দ্রিকা বালানের ‘একটি কবিতার গল্প’ অন্যতম। এসব গল্প অনুবাদের মাধ্যমে লেখক বিশ্বসাহিত্যকে সহজেই বাংলা ভাষীর কাছে পৌঁছিয়ে দিয়েছেন। বাংলার সাহিত্যপ্রেমীরা তাঁর কাছে ঋণী।

বিশ্বসাহিত্যের অপরূপ সৃষ্টিসম্ভার ও সেই সাহিত্য যে শত বিষয়-বৈচিত্র্যে অনাবিল তারই সুন্দর সংকলন এই বইটি। গল্পগুলোর মাঝে এক ধরনের টান আছে, যা পড়তে গেলে গল্পপ্রেমীরা সহজেই উপলব্ধি করতে পারবেন।
‘ষাঁড়’ গল্পটি একটি ষাঁড়কে নিয়ে ঘটে যাওয়া  ঘটনার বর্ণনা। অসাধারণ এ গল্পটিতে অ্যাশলে ও এডেলার মাধ্যমে শৈল্পিক হয়ে উঠেছে। অ্যাশলে পেশায় একজন চিত্রশিল্পী আর তারই প্রতিবেশী এডেল। অ্যাশলের শখ ছবি আঁকা আর এডেলের বাগান করা। অ্যাশলে প্রাণীজগৎ নিয়ে ছবি আঁকতে বেশি পছন্দ করে। একদিন অ্যাশলে যখন ছবি আঁকতে বসে তখনই এডেল জানতে পারে যে একটি ষাঁড় তার বাগানে ঢুকে গাছ নষ্ট করছে এবং ফুল খাচ্ছে।  এডেল তার কাছে ষাঁড় তারানোর জন্য সাহায্য চাইলে সে জানায় সে ষাঁড় তারাতে জানে না,  জানে ষাঁড়ের ছবি আঁকতে। এদিকে ফুল খেয়ে নষ্ট করাতে এডেল তার উপর রেগে যায়। ষাঁড়টা এডেলের প্রিয়ফুল ক্রিস্যানথিমাম খেয়ে নষ্ট করে তা দেখে এডেল সহ্য করতে পারে না। অ্যাশলে ষাঁড়টা তাড়িয়ে দেওয়ার পরে ষাঁড়টি কেমন ছিল তা ধরে রাখার জন্য দ্রুত রং তুলি নিয়ে ছবি আঁকতে বসে যায়।  মূলত ষাঁড়টা এমন ছিলো যে অ্যাশলে যে ঘরে বসে ছবি আঁকছিলো তার চেয়ে বড়। সে এটা নিয়ে ছবি আঁকে এবং সে ছবি অনেক মানুষ পছন্দ করে সংগ্রহ করে। কিন্তু সেদিনের ঘটনার পর এডেল রাগ করে; আর কোনো ভাবেই তাদের বন্ধুত্ব গড়ে ওঠেনি।
‘শিশু’ গল্পটি একটি নবজন্ম শিশুকে নিয়ে লেখা। শিশু সন্তানটিকে নিয়ে এক দম্পতির সমস্যাও চিহ্নিত হয়েছে। শিশুটি জন্ম নিলে স্বামী সে শিশুটি রাখতে চায় না। তারা প্রথমে কাউকে দিয়ে দিতে চায়লেও পায় না। পরে বিভিন্ন কৌশলে শিশুটিকে  ফেলে রাখার জন্য জায়গা খোঁজে। কারো কাছে বিক্রি করতে চায়। সেটা সম্ভব হয় না।  যতবারই চেষ্টা করে দুজনে ব্যর্থ হয়। গির্জায় রাখতে গিয়ে পারেনি। আবার মানুষ দেখে যাবে সেজন্য প্যাকেটে করে ফেলে রাখতে যায়। এদিকে বাচ্চাটার ক্ষুধা পেলে কান্না করতে থাকে। মা স্তন্য দিলে বাচ্চাটা লোভাতুরভাবে তা গ্রহণ করে। পার্কে রাখতে গিয়ে পারেনি। পরে তারা প্যাকেটে করে একটা গাড়ির মধ্যে রেখে দিয়ে চলে আসে। তারা যেন সন্তান জন্ম দিয়ে পাপ করেছে।  চলে আসার পরে তাদের মায়া বেড়ে যায়। তখন আবার আনতে গেলে গাড়ির মালিক মহিলা বাচ্চাটাকে নিজের সন্তান বলে দাবি করে। এভাবেই দেখা যায় কেউ নিজের সন্তানকে ফেলে দেয় আবার কেউ অন্যের সন্তানকে নিজের করে নেয়। 
‘নিদ্রালু সুন্দরী এবং এরোপ্লেন’ গল্পটিকে ভ্রমণ, প্রেম ও ভ্রমণকাহিনি বলা যায়। প্লেন ভ্রমণের সময় তুষার ঝড়ের কারণে প্লেন ছাড়তে দেরি হয়।তখন  গল্প কথকের সাথে এক ডাচ সুন্দরী ভদ্রমহিলার পরিচয় হয়। প্রথম দেখায় প্রেম জাগলেও একটু মনোমালিন্য হয়।  প্লেন ছাড়ার সময় এসে দেখে যে সেই মহিলা তার সিটের পাশের সিটে বসে আছে। ঘুমের সময় সুন্দরী যে আরো বেশি কমনীয় সুন্দরী হয়ে ওঠে তা কথকের চোখে ধরা পড়ে। ‘আমি সব সময় বিশ্বাস করি একজন সুন্দরী মহিলার চেয়ে অধিক সৌন্দর্য প্রকৃতিতে  আর থাকতে পারে না।’ মহিলাকে সে ভিন্নভাবে আবিষ্কার করে। সুন্দরী মহিলাকে তার এতটাই ভালো লাগে যে শীতকেও বসন্ত ভাবে সে। কথক ডাচ মহিলার জন্য নিজের আরাম বিসর্জন দিলেও ঘুম থেকে উঠে চলে যাওয়ার সময় ধন্যবাদ সূচক বাক্যও উচ্চারণ করে না নারীটি। তখন তার মনে হয়,  ‘‘আমি কেন বৃষ রাশির ষাঁড় হয়ে জন্মালাম না।’’
‘হিপ্পি মেয়েটি’ গল্পে দেখানো হয়েছে নারী ও পুরুষের মনকে ধর্ম ও সমাজের কাছে আবদ্ধ থাকতে হয়। ভারতীয়দের সাথে ইউরোপীয়দের চিন্তা, দর্শন, ভাবনার যে পার্থক্য সে কথাই গল্পকার সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। গল্পের নায়ক একজন ভারতীয় বিবাহিত। আর নায়িকা ফ্রান্স থেকে আসা এক আশ্রয়হীন অল্প বয়সী সুন্দরী সিনড্রেলা। আকস্মিকভাবে তাদের পরিচয়। পরে প্রেম, প্রণয় ও মিলন। সিনড্রেলা নায়ককে বোঝানোর চেষ্টা করে যে,  পুরুষের মন এক নারীতে আবদ্ধ থাকা ঠিক না। আবার ভারতীয় পুরুষ এটা মানে যে তারা স্ত্রীকে ছাড়া আর কাউকে আবির পড়াতে পারে না। সিনড্রেলা নায়ককে প্রয়ণের জালে আবদ্ধ করে এবং মিলিত হওয়ার জন্য নেশা করায়। কিন্তু প্রকৃতই ভালোবাসা জন্মায়। সিনড্রেলার গর্ভে সন্তান আসে এবং অবৈধ সন্তান হিসেবে পালন করার আশ্বাস দেয় সে। কিন্তু নিঃসন্তান  ভারতীয় তার স্ত্রীর মন ভেঙে দিয়ে আসতে চায় না। এভাবে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে গল্পকার ইউরোপীয় নারী ও ভারতীয় পুরুষের মনকে বোঝানোর চেষ্টা করেছেন। আবার নারীর জয় এবং পুরুষের পরাজয়কে দেখানো হয়েছে।

‘বেকারিতে দ্বিতীয় হামলা’  জাপানি লেখকের এ গল্পে নব বিবাহিত দম্পতির কাহিনি চিত্রিত হয়েছে। তাদের বিয়ে হওয়ার পর থেকে অস্বাভাবিকভাবে ক্ষুধা বেড়ে যায়।  তারা যতই খেতে থাকে মনে হয় আরো খাওয়া দরকার।  গভীর রাতে তারা  খাবার না বানিয়ে বেকারিতে যায়,  রেস্টুরেন্টে যায়।  অনেক রাতে বেকারি খোলা থাকে না।  এতে ক্ষুধা লাগে যে তারা বেকারিতে হামলা করে।  এবং স্বামী তার স্ত্রীকে আগের হামলার কথা বলে।  তারা দুই বন্ধু মিলে একবার বেকারিতে হামলা করেছিলো তখন তাদের কাছে খাবার কেনার মতো টাকা ছিলো না।  সে বলে ‘ক্ষুধার্ত ঈগল যেমন খাবারের খোঁজে থাকে আমরা দুজনও সেভাবে পুরো রাস্তা চষে বেড়াচ্ছি।’ মূলত ক্ষুধা থাকলে মানুষ যে অনেক কিছুই করতে পারে তা গল্পকার বোঝানোর চেষ্টা করেছেন।  বিশ্বসাহিত্যে সাহিত্যিকরা যে এতো সুন্দর করে যে কোনো বিষয় নিয়েই শিল্প রচনা করতে পারে তারই চিত্র পাওয়া যায় এ গল্পে। ‘একটি কবিতার গল্প’ এ গল্পকার কবিতার উপকরণ, কবিতা কেমন করে মানুষের মনের রাজ্যে আসে এবং কবিতার মাধ্যমে মানুষের মন কি বলতে চায় তা কবিতা রচনার মাধ্যমে  তুলে ধরেছেন। 
মূলত ‘কত দেশ কত গল্প’ সম্পদ বড়ুয়ার অন্যতম একটি গ্রন্থ। সহজ-সরল ভাষায় ও সাবলীল গদ্যে বিশ্বসাহিত্যকে সাধারণ পাঠকের সামনে তুলে ধরার কৃতিত্ব পুরোটাই তাঁর। আশা করি তিনি সাম্প্রতিক বিশ্ব সাহিত্যের বিচিত্র ধারার আরো বেশ কিছু গল্প-উপন্যাস-কবিতা বাংলা ভাষায় উপহার দিতে সক্ষম হবেন। গ্রন্থটির বহুল প্রচার কাম্য। 
কত দেশ কত গল্প, সম্পদ বড়ুয়া, বেঙ্গল পাবলিকেশন্স, ২০১৮, প্রচ্ছদ : নিঝর্র নৈঃশব্দ্য, মূল্য ৩৬০ টাকা

এবিএন/সাদিক/জসিম

এই বিভাগের আরো সংবাদ